শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার (liver)। এর অনেকগুলো কাজ যার মধ্যে প্রধান হল হজম করানো।
লিভার পিত্ত তৈরি করে যা চর্বি হজমে সহায়তা করে। লিভার কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ফ্যাট বিপাক করে শরীরে শক্তি সরবরাহ করে। রক্ত থেকে ক্ষতিকারক পদার্থ দূর করে শরীরকে পরিষ্কার রাখে। লিভার রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি করে। শর্করার মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল বিশ্বের প্রায় ২৫% শতাংশ জনসংখ্যা লিভারের রোগে আক্রান্ত। যেমন— ফ্যাটি লিভার, হেপাটাইটিস, সিরোসিস, নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ইত্যাদি। মূত্রথলির ক্যানসার থেকে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার— সবেরই গোড়ার কারণ সেই লিভার। এমনকী কিডনির বিভিন্ন জটিল অসুখের নেপথ্যেও রয়েছে লিভার। তাই লিভার সুস্থ রাখা সবচেয়ে জরুরি। আর লিভার ভাল রাখতে দরকার ডিটক্সিফিকেশন। লিভারকে (liver) সুস্থ রাখতে রান্নাঘরেই রয়েছে অনেক কিছু। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ডায়েট এবং কিছু ডিটক্স জ্যুস বা ডিটক্স ওয়াটার রাখুন আপনার রোজকার ডায়েটে।
বিটের রস বা বিটরুট জ্যুস
বিটের রসে রয়েছে খুব উচ্চমাত্রার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বিটালাইন লিভারকে সুস্থ রাখতে খুব কার্যকরী। বিটে রয়েছে উচ্চমানের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা রক্ত পরিস্রুত করে। একটা বিট, অল্প আদা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিন। ওই মিশ্রণটি ছেঁকে মধু আধচামচ, পাতিলেবুর রস এবং সামান্য বিট নুন দিয়ে খান।
অ্যালোভেরা জ্যুস
অ্যালোভেরায় রয়েছে অ্যালোইন নামে প্রোটিন আছে যা শরীরে জমে থাকা টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে। অ্যালোভেরায় ভিটামিন এ, সি, ও, ই থাকে যা লিভার ভাল রাখতে সহায়তা করে। দিনের যে কোনও সময়ে খেতে পারেন অ্যালোভেরার জুস। এটা বাজারের প্যাকড জ্যুস আকারেই কিনতে পাওয়া যায়।
আপেল জ্যুস
আপেলে থাকা পলিফেনল, পেকটিন লিভারের সিরাম এবং লিপিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। আপেলে রয়েছে ম্যালিক অ্যাসিডও যা টক্সিন এবং কার্সিনোজেন অপসারণ করতে সাহায্য করে। আপেল ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ করে তাই আপেল জ্যুস খান নিয়মিত। একটি আপেল টুকরো করে সঙ্গে আদা টুকরো দিয়ে ব্লেন্ড করে নিন। মিশ্রণটি ছেঁকে ওর মধ্যে লেবু, বিটনুন মিশিয়ে খান।
গাজরের জ্যুস
গাজরের রসে থাকা বিটা-ক্যারোটিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট লিভারকে সুরক্ষিত রাখে। এই পুষ্টি উপাদানগুলি পিত্ত নিঃসরণ বাড়ায় এবং হজমে সহায়তা করতে পারে। গাজরের রস দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া ও বদহজমের সমস্যা কমায়। এটি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ-এর ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে। ফলে লিভারের সমস্যায় যাঁরা ভুগছেন তাঁরা নিয়মিত গাজরের রস খেলে উপকৃত হবেনই।
লেবুর জল
রোজ সকালে লেবুর জল খেলে পিত্ত উৎপাদন বৃদ্ধি করে। পিত্ত লিভারকে আরও সহজে চর্বি ভাঙতে সাহায্য করে এবং হজমে সহায়তা করে। লেবুতে ভিটামিন সি-ও রয়েছে, যা লিভারকে অনেকটা পরিস্রুত করে ফলে লিভার টক্সিন-মুক্ত থাকে। একটা পাতিলেবু, একচামচ মধু দিয়ে এক গ্লাস জলে মিশিয়ে অল্প বিটনুন ছড়িয়ে খান। যাঁদের লেবুতে অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে তাঁরা অল্প পরিমাণে লেবুর রস মিশিয়ে এই জলটি খান।
আরও পড়ুন: প্রয়াত ‘ব্ল্যাক সাবাথ’-এর ফ্রন্টম্যান ওজি অসবোর্ন
আমলকীর জ্যুস
আমলকী, ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। আমলকীর রস অক্সিডেটিভ স্ট্রেস-জনিত ক্ষতির হাত থেকে লিভারকে রক্ষা করে। আমলকীর রস ডিটক্স ওয়াটারের কাজ করে, তাই এটা নিয়মিত খেলে লিভার এবং কিডনি দুইই ভাল থাকে।
আমলকী টুকরো করে কেটে ব্লেন্ড করে ওই মিশ্রণ ছেঁকে নিন। ওর মধ্যে অল্প মধু এবং লেবুর রস মিশিয়ে খান।
বেদানার জ্যুস
বেদানায় রয়েছে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিশেষ করে পুনিকালাগিন, অ্যান্থোসায়নিন এবং পলিফেনল। কমপ্লিমেন্টারি থেরাপিজ ইন মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণা অনুসারে বেদানার রস খেলে লিভারের এনজাইমের মাত্রা উন্নত হয় বিশেষ করে যাঁরা স্থূল বা হজমের সমস্যায় ভুগছেন তাঁরা নিয়মিত বেদানার রস খেলে ভাল ফল মেলে। নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার-জনিত সমস্যা প্রতিরোধ করে বেদানা। বেদানা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে অল্প বিটনুন দিয়ে খান।
ব্লুবেরি এবং ক্র্যানবেরি জ্যুস
ব্লুবেরি এবং ক্র্যানবেরিতে রয়েছে অ্যান্থোসায়ানিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা প্রদাহ কমায় এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস-জনিত ক্ষতি থেকে লিভারকে রক্ষা করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে ব্লুবেরি এবং ক্র্যানবেরি লিভারের ড্যামেজ থেকে রক্ষা করে এবং ফাইব্রোসিসের ঝুঁকি কমায়।
গবেষণায় দেখা গেছে ব্লুবেরির নির্যাস লিভার ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধ করে। এক কাপ ব্লুবেরি ধুয়ে নিয়ে এক চামচ ভিনিগার এবং আধচামচ বেকিং সোডায় ভিজিয়ে রাখুন। এরপর তুলে নিয়ে আবার ধুয়ে ব্লেন্ড করে নিন। ওর মধ্যে এক চামচ লেবুর রস মেশান আবার একবার ব্লেন্ড করুন। ওপরে বিটনুন ছড়িয়ে খান।
সবজি
ব্রকোলি, ফুলকপি এবং ব্রাসেলস স্প্রাউট থাকা যৌগ লিভারের এনজাইমগুলিকে সক্রিয় করে। এই এনজাইমগুলি শরীরের টক্সিন অপসারণে সহায়তা করে। একটি গবেষণা বলছে ব্রোকলি ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকিও কমাতে পারে।
চর্বিযুক্ত মাছ
বিভিন্ন চর্বিযুক্ত মাছ যাতে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে যেমন স্যামন, সার্ডিন, টুনা, কাতলা, ইলিশ খাদ্যতালিকায় পরিমাপমতো রাখুন।
এই হেলদি ফ্যাটগুলি লিভারের প্রদাহ কমাতে এবং চর্বি জমা রোধে সাহায্য করে। গবেষণা অনুযায়ী ওমেগা-৩ লিভারের সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিদের লিভারের চর্বি এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।