কী এই ফুসফুসের ক্যানসার
ফুসফুসের ক্যানসার (Lung cancer) হল একটি বা দুটি ফুসফুসে অস্বাভাবিক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ ক্যানসারগুলির মধ্যে একটি এবং সাধারণত ধূমপায়ীদের মধ্যেই এটি বেশি লক্ষ্য করা যায়। ফুসফুস হল দুটি স্পঞ্জের মতো অঙ্গ যা বুকে অবস্থিত এবং শ্বাসযন্ত্রের একটি অংশ। ফুসফুস শরীরের মধ্যে গ্যাসের জন্য একটি ফিল্টার হিসাবে কাজ করে এবং অক্সিজেনে শ্বাস নিতে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বের করতে সাহায্য করে।
কেন হয়
যাঁরা ধূমপান করেন বা ধূমপানের সংস্পর্শে আসেন অর্থাৎ প্যাসিভ স্মোকার তাঁদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। তবে ধূমপান করেন না এমন ব্যক্তির মধ্যেও ফুসফুসের ক্যানসার হতে দেখা যায়।
পারিবারিক ইতিহাস অর্থাৎ একই পরিবারে কারও এই রোগ হয়ে থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এই রোগ আসতে পারে।
টক্সিন অর্থাৎ ক্যানসার সৃষ্টিকারী গ্যাস এবং রেডন, অ্যাসবেস্টস ইত্যাদির দীর্ঘস্থায়ী এক্সপোজার। এর থেকে যাঁরা ধূমপান করেন না তাঁদেরও ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে।
কম্প্রোমাইজড ইমিউন সিস্টেম : উদাহরণস্বরূপ, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিরা, দীর্ঘমেয়াদি স্টেরয়েডের রোগীরা ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন।
ফুসফুস ক্যানসারের ধরন
‘নন স্মল সেল লাং কার্সিনোমা’, একে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমাও বলে। এটাই ফুসফুস ক্যানসারের (Lung cancer) খুব কমন একটা টাইপ।
স্মল সেল লাং ক্যানসার— এটাও খুব সাধারণ পরিচিত একটা ফুসফুস ক্যানসারের ধরন তবে এটা খুব দ্রুত ছড়ায়।
লাং কার্সিনয়েড টিউমার— এটা বিরল ধরনের ফুসফুস ক্যানসার যা আমাদের নিউরো-এন্ডোক্রিন সেলকে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আরও পড়ুন-নানুরের গণহত্যা বাম জমানার রক্তাক্ত স্মৃতি
উপসর্গ
দীর্ঘদিনের কাশি কমছে না উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ক্রনিক কফ যেটা ওষুধেও সারছে না পুরোপুরি।
কফের এবং কাশির সঙ্গে রক্তপাত হওয়া।
বুকে ব্যথা, একনাগাড়ে ব্যথা হতে থাকা এবং বুকের মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ।
মাঝেমাঝেই ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হওয়া। হালকা শ্বাসকষ্ট।
মাঝে-মাঝেই মাথার যন্ত্রণা।
কোনও কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া।
খিদে কমে যাওয়া। খাবার গিলে খেতে অসুবিধা হওয়া।
গলা ধরে যাওয়া বা গলার স্বর বদলে যাওয়া।
পাঁজরের হাড়ে খুব যন্ত্রণা।
ক্লান্তি এবং দুর্বলতা
ফুসফুসের ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয় হল এই ক্যানসার ধরা পড়ে খুব দেরিতে। কারণ উপসর্গ থাকলেও মানুষ রোগকে পাত্তা দেন না। যতক্ষণ না কাশি বা কফের সঙ্গে রক্ত বেরয়। আর এখানেই যত বিপত্তি। ধূমপায়ী ব্যক্তি যাঁরা তাঁদের উচিত একটা-দুটো উপসর্গ এলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
কী কী পরীক্ষা করবেন
একটি চেস্ট এক্সরে করিয়ে নেওয়া উচিত।
প্রয়োজন অনুযায়ী সিটি স্ক্যান, এফএনএসি বা বায়োপসি করাতে হতে পারে।
ব্লাড এবং স্পুটাম টেস্ট অর্থাৎ রক্ত এবং থুতু পরীক্ষা
এমআরআই করতে বলেন চিকিৎসকরা।
এছাড়া পিইটি স্ক্যান করা হয়।
জানেন কি!
ফুসফুস ক্যানসার বিপজ্জনক হয়ে উঠছে দিনে দিনে। ইদানীং ফুসফুসে একবার ক্যানসার বাসা বাঁধলে তা কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপিতেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এই ক্যানসার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে এবং দেখা দিচ্ছে প্রাণসংশয়।
বিশেষজ্ঞের মতে, ফুসফুসের ক্যানসার বাড়ছে এবং তা দিনে দিনে ভয়াবহ এক অসুখ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাঁর কারণ কিন্তু পুরোটা ধূমপান বা দূষণ নয়। এর অন্যতম প্রধান কারণ হল জিনের রাসায়নিক বদল। গবেষকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন ফুসফুসের ক্যানসারে যাঁদের মৃত্যু হচ্ছে, তাঁদের অধিকাংশেরই শরীরে রয়েছে বিশেষ কিছু জিন। ‘ইউরোপিয়ান সোসাইটি অফ মেডিক্যাল অনকোলজি ওপেন’ নামক একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এই গবেষণা সংক্রান্ত তথ্য। সেই বিশেষ জেনেটিক মিউটেশনের কারণে অস্বাভাবিক কোষবিভাজন হচ্ছে এবং টিউমার কোষ দ্রুত তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে শ্বাসনালি পর্যন্ত এবং এই ছড়িয়ে পড়া শুরু হলে আর তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তাই ফুসফুস ক্যানসার প্রতিরোধে ধূমপান এবং দূষণের পাশাপাশি রুখতে হবে এই জিনের রাসায়নিক বদলটাও। এই নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে এর কোনও সদুত্তর মিলবে।
তাই আগামী ১ অগাস্ট বিশ্ব ফুসফুস ক্যানসার দিবস। এই দিনটি ফুসফুসের ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করার জন্য পালন করা। এই ক্যানসার আজ মহামারী। জরুরি সতর্কতা এবং তীব্র সচেতনতা, জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোরভাবে ধূমপান বর্জন এবং পরিবেশ দূষণ মুক্তি। ২০২৫ এর বিশ্ব ফুসফুস ক্যানসারের থিম হল— “Breaking Barriers: Championing Early Detection and Equal Care”,
ফুসফুস ক্যানসারের জটিলতা
শ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়ায় জটিলতা
বুকে জল জমা (প্লুরাল ইফিউশন)
মেটাস্টেসিস অর্থাৎ মস্তিষ্ক এবং হাড়ের মতো কাছাকাছি অঙ্গগুলিতে এই ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া।
মুখের ঘা, দাঁতের ক্ষয় বা শুষ্ক মুখ
অন্যান্য অঙ্গ ও হাড়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ার কারণে হাড়ের ব্যথা
বারবার ডায়েরিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
চিকিৎসা
ফুসফুস ক্যানসারে (Lung cancer) মূল চিকিৎসা হল অস্ত্রোপচার। সার্জারি করে ফুসফুসের অংশ বা পুরো ফুসফুস বাদ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি, রেডিও সার্জারি, টার্গেটেড ড্রাগ থেরাপি, বায়োলজিক্যাল থেরাপি। এছাড়া যেসব ক্যানসার রোগীর ক্যানসারের আর চিকিৎসা করা যাবে না তাঁদের প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করে তাকে খানিকটা সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়। ফুসফুসের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সেরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রোগী কোন স্টেজে রয়েছেন তার ওপর নির্ভর করে অনেকটাই।