২২ অগাস্ট, ২০২৫। বাংলার চা-শিল্পে এক ঐতিহাসিক দিন।
কারণ, ওই দিন রাজ্য সরকারের শ্রম দপ্তর থেকে উত্তরের চা-শিল্পের শ্রমিকদের ২০% হারে ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে বোনাস দেবার সরকারি নির্দেশনামা (মালিকপক্ষকে অ্যাডভাইজ়রি) জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশনামায় দার্জিলিং, কালিম্পং কার্শিয়াং, তরাই ও ডুয়ার্সের প্রত্যেকটি চা-বাগানে আগামী ১৫/৯/২৫-এর মধ্যে বোনাস প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সরকারি (mamata banerjee government) এই ঘোষণায় চা-শিল্পে কতিপয় বছর পর বাগান শ্রমিকদের মধ্যে এক আনন্দমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। গত ২০১৯-’২০, ২০২০-’২১ এবং ২০২১-’২২ পর পর তিন বছর ২০ শতাংশ হারে বোনাস দেওয়া হলেও গ্রেস দিয়ে বহুলাংশ বাগানে কম হারে পেমেন্ট করা হয়েছে।
যদিও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্য ২৮ আগাস্ট ও পরবর্তী পর্যায়ে ৬ এবং ৭ যে আক্রমণ, চায়ের নিলামে মন্দা বাজার, টি বোর্ডের আদেশে গত ১ ডিসেম্বর থেকে উৎপাদন বন্ধ এছাড়াও বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে কম শতাংশ হারে বোনাস সওয়ালের সুযোগ রইল না। শ্রমিক পক্ষ ও দরকষাকষি থেকে চিন্তামুক্ত থাকল।
বিগত কয়েক বছরে পূজার আগে বোনাস বিষয়ে পাহাড়-সহ বেশ কিছু বাগানে অশান্তির কারণেই এবছর সরকার আগেভাগে ২০ শতাংশ হারে বোনাস ঘোষণা করে চা-শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল।
সরকারি সিদ্ধান্তের পর পরই কিছু সংবাদপত্র ও বিভিন্ন মহল থেকে ট্রেড ইউনিয়নের অস্তিত্ব বিপন্ন, চা-শিল্পে সরকার নাকি ট্রেড ইউনিয়ন মুছে দিতে চায় এবং ট্রেড ইউনিয়নের কফিনে সরকার পেরেক ঠুকে দিয়েছে, এসব বিভ্রান্তিকর কথা বলা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন চা-শ্রমিক আন্দোলনের সংগে যুক্ত থাকার সুবাদে আমার পূর্ণ বিশ্বাস যে সরকারি ঘোষণায় দলমতনির্বিশেষে সব শ্রমিক সংগঠনগুলির সরকারি ২০ শতাংশ হারে বোনাস ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে রাজ্য সরকারকে সাধুবাদ জানানো উচিত। শ্রমিকের চাহিদা পূরণে খুশির জোয়ার চা-শিল্পে পাহাড়, ডুয়ার্স ও তরাই এলাকায়।
কারণ বিগতদিনে যখন মজুরি চুক্তিতে মালিকপক্ষ-শ্রমিকপক্ষ সহমত না হতে পারায় চা-শিল্পে অশান্তি যেন বাড়াবাড়ি না হয় তার জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যা (mamata banerjee government)য় মজুরি অ্যাডহক বৃদ্ধি ঘোষণা করেন। গত বছর বোনাস নিয়ে জটিলতার সময় শেষ মুহূর্তে রাজ্য সরকার হস্তক্ষেপ করে এবং ১৬ শতাংশ হারে বোনাস ঘোষণা করে মালিকপক্ষকে মেনে নেবার আবেদন জানায়। মালিকপক্ষও তা মেনে নেন।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন যে, চা-শিল্পে তৃণমূল সরকার একতরফা হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি চালু করেছে। এই বিষয়ে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে আসল সত্যিটা জনসমক্ষে তুলে ধরার অনুরোধ জানাই। আর সত্যি টা হল…
তৃণমূল সরকার ২০১১ সালে রাজ্যের দায়িত্ব নেবার পর থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চা-বাগান শ্রমিকদের ও চা-শিল্পের স্বার্থে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন অতীতে কোনও সরকারকেই চা-শিল্পের ও শ্রমিকদের জন্য এ-ধরনের কল্যাণমূলক তেমন কিছু উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। যেমন—
২০১১ সালে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ৬৫ (পঁয়ষট্টি) টাকা, বর্তমানে বেড়ে দৈনিক ২৫০/- (দুইশত পঞ্চাশ) টাকা। মজুরি নতুন বর্ষের আবার বৃদ্ধি হবার কথা। আগে বাগানে শ্রমিকদের রেশন বাবদ টাকা কেটে নেবার রেওয়াজ ছিল, বর্তমানে নেই। এখন ফ্রি রেশন ব্যবস্থা।
প্রতিটি বাগানের মহিলা শ্রমিকেরা প্রতিমাসে মুখ্যমন্ত্রীর আবেগের প্রকল্প কন্যাশ্রী থেকে ১২০০/১০০০ টাকা, বিধবা ভাতা, স্বাস্থ্যসাথী, মিড-ডে-মিল, সবুজসাথী থেকে শুরু করে এমনকী জন্ম থেকে মৃত্যুর পরে ও বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে।
আরও পড়ুন-আদালতের নির্দেশ ও পর্যবেক্ষণকে যুগান্তকারী বললেন মুখ্যমন্ত্রী, পরিযায়ী মামলায় সুপ্রিম বিপাকে কেন্দ্র
সরকারের পক্ষ থেকে বাগানে-বাগানে পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। শিশুদের জন্য ক্র্যাশ হাউস ছাড়াও বিভিন্ন বাগানে মেডিক্যাল টিম পাঠানো ও হাসপাতাল তৈরির কাজ এগোচ্ছে। প্ল্যান্টেশন লেবার অ্যাক্ট অনুযায়ী স্থায়ী কর্মীদের জন্য মালিকদের বাসস্থান করে দেবার কথা থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাব অনুসারে বাগানে বাগানে চা-সুন্দরী প্রকল্পের অধীনে পাকা বাসস্থানের ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এখানেই থেমে নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার। সুদীর্ঘ কাল থেকে শ্রমিকদের দাবি মেনে স্বনামে জমির মালিকানা (পাট্টা) ও গৃহনির্মাণের জন্য এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে সরকারের তহবিল থেকে।
শ্রমিকদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়াও তৃণমূল সরকার তার সময়কাল থেকে চা-শিল্পকে চাঙ্গা রাখতে মালিকদের পাশেও দাঁড়িয়েছে। এখন আর কোনও মালিককে রাজ্য সরকারকে ইরিগেশন সেস্ দিতে হয় না, লিজে নেওয়া জমির ট্যাক্স দিতে হয় না তেমনি দিতে হয় না এ্যাডুকেশন সেস। রাজ্য সরকার মকুব করে দিয়েছে। বাগানের স্কুলে বিদ্যালয়কক্ষ ও নানান উন্নয়নমূলক কাজ পঞ্চায়েতের মাধ্যমে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকার টি বোর্ডের মাধ্যমে যেসব সুযোগ-সুবিধা বাগানে শ্রমিককল্যাণে দেওয়া হত, সেগুলিও দীর্ঘদিন থেকে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার হয় তুলে দিয়েছে নয়তো সাময়িক বন্ধ করে রেখেছে। এমনকী গত বছর কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দেশের চা-শিল্পের উন্নয়নে এক হাজার কোটি টাকা দিলেও পশ্চিমবঙ্গের চা-মালিকদের ব্রাত্য করে রেখেছে, একটি টাকাও এই রাজ্যে কাউকেই দেওয়া হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের চা-শিল্পকে ব্রাত্য করা হল কেন? এর কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি কেন্দ্রের কাছ থেকে।
কেউ কেউ আবার প্রশ্ন তুলেছেন যে, বোনাস বিষয়ে রাজ্য সরকারের অ্যাডভাইজরি জারি করা এক্তিয়ারভুক্ত নয়।
শিল্প-শ্রমিক ও মালিক একে অন্যের পরিপূরক। আইনশৃঙ্খলা জনিত বিষয়ে রাজ্য সরকারের একশো শতাংশ হস্তক্ষেপের অধিকার থেকে চা-শিল্পে বোনাস ঘোষণা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এটা অনস্বীকার্য যে গতবছর বোনাস ইস্যুতে ডুয়ার্স ও পাহাড়ের চা-শ্রমিকদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
পরিশেষে বলতে হয় সরকারি বোনাস সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত চা-শিল্পে ট্রেড ইউনিয়নের তথা শ্রমিক সংগঠনগুলির আরও শক্ত বুনিয়াদ তৈরির সহায়ক হল। সব মহলে পরিষ্কারভাবে এক বার্তা গেল যে, শ্রমিক ও শিল্পের স্বার্থরক্ষায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার (mamata banerjee government) প্রহরীর ভূমিকায় ছিল, আছে, থাকবে।