অথ ইতু লক্ষ্মী কথা

কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে শুরু, অগ্রহায়ণের সংক্রান্তিতে সমাপন— এটাই ইতু ব্রত পালনের নিয়ম। মহিলারা এই ব্রত পালন করেন সাংসারিক কল্যাণ ও শ্রীবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। কেউ কেউ মনে করেন ইতু মিত্র অর্থাৎ ইতু সূর্যের পুজো, আবার কারও মতে ইতু ইন্দ্রদেবের পুজো। লিখলেন তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চারক

Must read

‘‘অষ্ট চাল অষ্ট দূর্বা কলসপাত্র ভরে
ইতুব্রত কথা শুন প্রাণ ভরে
ইতু দেন বর ধনে জনে বাড়ুক ঘর’’

বাংলার একটি লোক উৎসব হল ইতুপুজো। সাধারণভাবে বলা হয় যে, শস্য বৃদ্ধির কামনায় প্রতি অগ্রহায়ণ মাসে রবিবারে এই পুজো করা হয়। একটা সময় পর্যন্ত গ্রামবাংলায় কৃষিই ছিল মানুষের প্রধান জীবিকা। ধনধান্যে, শস্য ভাণ্ডার যেন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেই কামনায় এই পুজোর রীতি— এটাও বলা হয়ে থাকে। অগ্রহায়ণ মাস। গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ধানের সুবাস। এই সময়ই ধান ওঠে।
কার্তিক মাসের সংক্রান্তি থেকে অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত এই পুজোর নিয়ম। গোটা একটা মাস ধরে বাংলার মায়েরা, মেয়েরা এই পুজোয় ব্রতী হন। অঘ্রান মাসে রবিবারে ইতুর পুজো করে, সংক্রান্তির দিন পুজো শেষ করতে হয়। অর্থাৎ ইতুকে বিসর্জন দিতে হয়।
ইতুপুজোর নামকরণ
ইতুপুজো নিয়েও নানা মত রয়েছে। ইতু শব্দটি মিতু অর্থাৎ মিত্র থেকে এসেছে। মিত্র শব্দের অর্থ সূর্য।
অগ্রহায়ণ মাসে সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করে, এবং এই অবস্থানে সূর্যের নাম মিত্র। প্রধানত রবিবার পুজো করা হয় বলে একে সূর্যের পুজো বলা হয়। সূর্যের উপাসনা হলেও এই পূজার রীতি উপাচার বিশ্লেষণ করলে ইতুকে মাতৃ দেবী রূপে মনে করা হয়। সহজ সরল পদ্ধতি এবং রীতি নীতির জটিলতা না থাকায় বাংলার ঘরে ঘরে ইতুপুজো শুরু। ইতুপুজো মানে সূর্যের পুজো হলেও।
বাংলায় ইতুকে শস্যের দেবী হিসেবেই পুজো করা হয়ে থাকে।
মতান্তরে, ইতুপুজো ইন্দ্রদেবের পুজো। তবে এই পুজো নিয়ে মতভেদ যাই থাকুক না কেন পুজোর মূল উদ্দেশ্য হল সাংসারিক কল্যাণ ও শ্রীবৃদ্ধি। এমনটাই বিশ্বাস করেন ব্রতীরা, যে ইতু ব্রত করলে আর্থিক উন্নতি, সংসারের আয় উন্নতি এবং মনোকামনা পূরণ হয়।

আরও পড়ুন-মুম্বইয়ে ১১ লক্ষ ডুপ্লিকেট ভোটার

প্রাচীন পারস্য দেশে একসময় মিথু পুজো হত, মিতু, ইতু—প্রাচীনকালে কুমারী মেয়ের পতি লাভ আর সংসারিক কল্যাণ কামনায় সূর্যের পুজো মহিলা মহলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
মহাভারতে কুন্তীপুত্র কর্ণ ছিলেন সূর্যেরই সন্তান। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য ইতুপুজো বিষয়ে বলেছেন, সূর্যের অপর নাম আদিত্য। এই আদিত্য থেকে ইতু শব্দটি এসেছে। এবং শাক্ত ধর্মের প্রভাবে ইতু ক্রমশ দেবীতে পরিণত হয়েছেন। সূর্য দেবতা থেকে ইতু শস্যদেবী লক্ষ্মীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। এই কারণে তিনি ইতু লক্ষ্মী নামের রাঢ় বাংলায় পূজিত।
ইতুপুজো প্রসঙ্গে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য তাঁর বাংলা লোকনৃত্য গ্রন্থে বলেছেন, সূর্য ব্রত ভারতে নারী সমাজের একটি প্রধান ব্রত।
সূর্য উর্বরা শক্তির আধার। সূর্যের আশীর্বাদে নারী সন্তান লাভ করে এবং অভিশাপে বন্ধ্যাত্বপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং সূর্যকে প্রসন্ন করতে না পারলে নারী কখনও সন্তানের জননী হতে পারে না। সেজন্য সূর্যকে প্রসন্ন করার এই প্রচেষ্টা। আবার আচার্য সুকুমার সেনের মতে, ইতু হল প্রাচীন ইন্দ্রপুজোর দৃষ্টান্ত। ইন্দ্র বৈদিক যুগের প্রধান দেবতা। আবার বিয়ের দেবতাও ছিলেন তিনি। মেয়েদের ব্রত আচার কৃত্যে ইন্দ্র ক্রমশ স্থান লাভ করেন। ইন্দ্রের মতো বরের কামনায় আজও ইন্দ্র দ্বাদশীর দিন মেয়েরা ইন্দ্রপুজো করে।
অগ্রহায়ণ মাসে নতুন বছর শুরু হত। এই সময় রবিশস্য বিশেষ করে গম, যব, সরষে ইত্যাদি ফসল লাগানো হত, বোঝাই যায় ইতু আসলে রবিশস্যের অঙ্কুরোদগমের কৃষি উৎসব।
ইতুপুজোর ধরন
একটা মাটির পাত্রে বা সরায় মাটি ভরে, তাতে কচু কলমি, লতা, আখ, শুশনি, ধান, পাঁচ কলাই গাছ এবং বীজ বপন করে সেটাকে পুজো করা হয়। এছাড়া পরিবারের লোকজনের নামে নেওয়া হয় ঘট। ঘটের গায়ে সিঁদুর এঁকে, ঘটে জল ভরে তার মধ্যে শস্যদানা ও আট গাছা, মতান্তরে একুশ গাছা দুব্বো, চন্দন দিয়ে সাজিয়ে সরায় বসিয়ে ভক্তি ভরে পুজো করা হয়। খড়ের বিঁড়ের ওপরেই ইতুর সরাকে বসানো হয়। প্রতিদিন শুদ্ধ মনে ও শুদ্ধ বস্ত্র পরে ঘটে ও সরায় জল দিতে হয়। ধানের বীজ ও মান কচুর মূল ও ওই সরায় দেওয়া হয়। ছোলা, মটর, মুগ তিল, যব-সহ পাঁচ, মতভেদে আট রকমের শস্যের বীজ ছড়ানো হয়।
এই পুজোয় কোনও মূর্তি নেই। ঘটকেই মূর্তি হিসেবে পুজো করা হয়।
প্রতি রবিবার পুজোর সময় ঘটে জল দেওয়ার নিয়ম। কুমারী, সধবা, বিধবা সব মেয়েরাই এই পুজো করে থাকে। প্রার্থনা জানান, ‘‘যে জ্যোতির দ্বারা তুমি অন্ধকার নষ্ট করো এবং যে কিরণে সমস্ত বিশ্বজগৎ প্রকাশ করো, তার দ্বারা আমাদের সর্বপ্রকার দারিদ্র নষ্ট করো, আমাদের পাপ রোগ ও দুঃস্বপ্ন দূর করো। অঞ্চলভেদে ইতুপুজোর নিয়মরীতির ভিন্নতা রয়েছে। ইতু ঠাকুরকে সাধ দেওয়ার প্রথা রয়েছে কোথাও কোথাও। নতুন গুড়ের পায়েস রান্না করে ইতু ঠাকুরকে নিবেদন করা হয়।
ইতুর পুজোয় বিশেষভাবে থাকে পায়েসের মধ্যে উমনো-ঝুমনো তৈরি। অনেকে সরুচাকলীও দেয়।
ইতুপুজোয় সাধারণত সবটাই নতুন শস্য যা ওঠে সেটাই দেবীকে নিবেদনের নিয়ম।

আরও পড়ুন-বিনামূল্যে সিএএ শিবির লিখতে বাধ্য হল বিজেপি

ইতু ব্রতকথা
এক দেশে এক গরিব ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী দুই মেয়েকে নিয়ে থাকত। ব্রাহ্মণ ভিক্ষে করে যা পেত তাই দিয়ে তার সংসার চলত। ব্রাহ্মণের একদিন পিঠে খাওয়ার শখ হয়। সে অতি কষ্টে ভিক্ষে করে চাল, গুড়, তেল সব জোগাড় করে ব্রাহ্মণীকে দিয়ে পিঠে তৈরি করতে বলে। আর বলে যেন একটাও পিঠে কাউকে না দেওয়া হয়। এরপর ব্রাহ্মণ রান্নাঘরের পেছনে লুকিয়ে বসে থাকে। আর ব্রাহ্মণী কড়াইতে একটা করে পিঠে ভাজে, ছ্যাঁক করে শব্দ হয় আর ব্রাহ্মণ দড়িতে একটা করে গিঁট দিয়ে কতগুলো পিঠে হল তা গুনে রাখে। এরপর ব্রাহ্মণী ব্রাহ্মণকে পিঠে খেতে দিলে ব্রাহ্মণ দড়ির গিঁট খুলতে খুলতে দেখে দুটো পিঠে কম। তখন ব্রাহ্মণ জিজ্ঞেস করলে সে দুই মেয়েকে দুটো পিঠে দেওয়ার কথা বলে। এই শুনে ব্রাহ্মণ রেগে তার দুই মেয়ে উমনো-ঝুমনোকে তাদের মাসির বাড়ি রেখে আসবে বলে জঙ্গলে ঘুমন্ত ফেলে চলে আসে। গভীর রাতে বাঘ-ভালুকের শব্দে ঘুম ভেঙে তারা কাঁদতে থাকে। একটি বটগাছকে হাত জোড় করে বলে, তুমি আজ রাতের জন্য তোমার কোটরে স্থান দাও। এরপর বটগাছ দু’ফাঁক হয়ে গেলে তারা দু’বোনে বটগাছের কোটরে রাত কাটায়। সকাল হতে তারা বটগাছকে প্রণাম করে এগোয়। কিছুটা গিয়ে দেখে একটা বাড়ির সামনে মাটির সরা করে মেয়েরা পুজো করছে। ঘটে করে কী পুজো করছে, ওরা জিজ্ঞাসা করলে বাড়ির গিন্নি জানায়, এর নাম ইতুপুজো। তখন তারা নিজেদের দুঃখের কথা খুলে বলে। তখন গিন্নি তাদের ইতুপুজো করতে বলে। ওই দিনটা ছিল কার্তিক মাসের সংক্রান্তির দিন। ওরা ইতুপুজো করে।
তাদের নিষ্পাপ ভক্তি দেখে ইতু ভগবান অর্থাৎ সূর্যদেব উমনো-ঝুমনোর মনোস্কামনা তাদের বাবার দুঃখ দূর হওয়ার বর দেন। এরপর তারা অগ্রহায়ণ মাসের প্রতি রবিবারে ভক্তি সহকারে পুজো করতে থাকে। ওদিকে বামুনের ঘর ধনে ভরে ওঠে। ব্রাহ্মণী মেয়েদের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। হঠাৎ একদিন উমনো-ঝুমনো বাড়ি ফিরে আসে। তাদেরকে দেখে ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর আনন্দের সীমা থাকে না। বাড়ি ফিরে তারা আবার ইতুপুজো আরম্ভ করে দেয়। তা দেখে ব্রাহ্মণ তাদের কাছে জানতে চায় তারা কী পুজো করছে। তারা ইতুপুজোর কথা বলে আর সূর্যদেবের আশীর্বাদে যে তাদের বাবার অবস্থা ভাল হয়েছে সেটাও বলে। তা শুনে ব্রাহ্মণী পুজো শুরু করে দেয়। তাদের অবস্থা ক্রমশ ভাল হতে থাকে। এইভাবে দিকে দিকে ইতুপুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে।

Latest article