শব্দরঙ হাউস থেকে প্রকাশিত হয়েছে আবু রাইহান-এর কাব্যগ্রন্থ ‘প্রগাঢ় শূন্যতার নিজস্ব অন্ধকার’। নামকরণটি গভীর, অর্থবহ। ভাবায়, জাগায়। দাঁড় করায় মহাবিশ্বের বিশালতার মুখোমুখি। মনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অজানা জগতে, অপার শূন্যতার শীর্ষদেশে, যেখানে অলৌকিক আলোকরশ্মির ঔদ্ধত্য চরণচিহ্ন আঁকতে পারে না। গভীর অন্ধকারের অন্দরে চলে শূন্যতার নিভৃত সাধনা। এই সাধনায় স্থিরভাবে চেনা যায় নিজেকে। নিজের আত্মাকে, অস্তিত্বকে।
আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে কবি নিজেকেই চেনার চেষ্টা করেছেন, জানার চেষ্টা করেছেন। এক কবিতা থেকে অন্য কবিতায় যেতে যেতে হয় আত্ম-উন্মোচন।
আরও পড়ুন-৩-৪ ডিসেম্বর গুচ্ছ কর্মসূচি, মালদহ-মুর্শিদাবাদে জনসভা মুখ্যমন্ত্রীর
প্রথম কবিতা ‘আগুন মানেই তো আলো’। কবিতার প্রথম পংক্তি ‘নিঃশব্দ শুয়ে আছে কোলাহলের কাছে’। শব্দহীনতার পথ ধরেই চেনা যায় নিজেকে, জানা যায় নিজেকে। সেই কথাই আলোকিত হয়েছে। হাজারের ভিড়ে আশ্চর্য একা। আরোপিত নয়, একা থাকা আসলে পবিত্র অর্জন। এই অর্জনের জন্য মনকে নিয়ে যেতে হয় ধ্রুবে।
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খুঁটিনাটি হিসেবনিকেশ রচিত হয় পার্থিব বস্তুজগতেই। এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে জটিল দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা। ফলে উধাও হয়ে যায় নির্ভেজাল ভালবাসা। সেই ভাবনা থেকেই ‘অলৌকিক আলোর উজ্জ্বল ছায়া’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘বস্তুজগতের অপ্রাপ্তি অহরহ বাড়িয়ে তোলে/ জাগতিক সব ক্রোধ/ বিশুদ্ধ ভালোবাসায় আত্ম জারিত হলে তবেই/ জাগরিত হয় মহৎ ভালোবাসার মহাজাগতিক বোধ।’
মৃত্যু চেতনার বিবর্ণ ছবি ফুটে উঠেছে কবিতার মধ্যে। ‘এই অস্থায়ী পৃথিবীর মায়া’য় তিনি লিখেছেন, ‘এখন রাতে মাঝে মাঝে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেলে/ মৃত্যুর ভাবনা আসে/ শেষ বিদায়ের অনিবার্য মুহূর্তটা কল্পনার চিত্রকল্পে ভাসে।’
শেষ বিদায়ের মুহূর্ত সত্যিই অনিবার্য। অগ্রাহ্যের উপায় নেই। এই মৃত্যুচিন্তা বেদনাবিধুর করে কবিকে। তিনি ভাবনার জালে আটকা পড়েন, কাঙ্ক্ষিত ঘুম না আসা পর্যন্ত। মধ্য বয়স স্পর্শ করেছে যাঁদের, এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদেরও। দুর্বিষহ হলেও চিরসত্য। সত্য, অন্ধকার রাতের মতো।
‘শীতের চাদর ও অমোঘ মৃত্যুর ঘোর’ কবিতার মধ্যেও দেখা যায় ছায়াছায়া মৃত্যু চেতনা। অপরাধবোধের প্রকাশ ঘটাতেও কুণ্ঠা নেই কবির। তিনি লেখেন, ‘তোমার কাছে নতজানু হলে/ ভেতরে জেগে ওঠে অপরাধবোধ/ আর নিজের প্রতি সীমাহীন ক্রোধ।’ কার কাছে নতজানু হন কবি? দিনের আলোর কাছে? নাকি রাতের কালোর কাছে? দ্বিতীয়টির পাল্লাই ভারী। নতজানু হল পবিত্র সমর্পণ। পরাজয়ের নামান্তর। মৃত্যু-সমান। পাশাপাশি নিজের প্রতি অবহেলার কথাও প্রকাশ করেছেন কবি। তীব্র শ্লেষ জাগিয়ে নিজেকে বলেছেন বোধশূন্য। আঁধারের ডাক শোনা মাত্র ফুটে উঠেছে অভিমানী স্বর। বলেছেন, ‘যেদিন ঝরে যাবো, কোনোদিন দেখবো না আর/ আজন্মের চেনা ভোর।’
তথাকথিত ঔজ্জ্বল্য নেই এই কবির কবিতায়। উচ্ছ্বাস নেই, উল্লাস নেই। আছে গভীরতা, নির্জন গোধূলিপথে হেঁটে যাওয়া একলা পথিকের অচঞ্চল গতি। সূচনা থেকে মহাপ্রস্থানের গন্তব্যে তার সঙ্গী হতে হয়। তবেই কোনও একদিন মুখোমুখি হওয়া যায় প্রগাঢ় শূন্যতার নিজস্ব অন্ধকারের। ১৩০ টাকা দামের ৪৮ পৃষ্ঠার বইটির প্রচ্ছদশিল্পী নিশিপদ্য।
আরও পড়ুন-পথকুকুরকে খাওয়ানো নিয়ে হেনস্থা অভিনেতা-দম্পতিকে
উদার আকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে সা’আদুল ইসলাম-এর কাব্যগ্রন্থ ‘ঋতুবদলের কালোয়াতি’। দেশ ও দেশের বাইরে ঘটে চলেছে একের পর এক অন্যায়, অসহনীয় ঘটনা। দাঙ্গা ও মিথ্যা যুদ্ধের বলি হচ্ছে অসংখ্য সাধারণ মানুষ। নিধন ও নির্যাতন চলছে নারী, পুরুষ, শিশুদের উপর। সেইসব ঘটনা দেখেই কবির মধ্যে জন্ম নিয়েছে গভীর যন্ত্রণা, ক্ষোভ। রচিত হয়েছে কবিতা। সেই কবিতাগুলোই হয়েছে দুই মলাটবন্দি। কুয়াশার আস্তরণ নেই, বক্তব্যকে প্রকাশ করা হয়েছে স্পষ্ট ভাষায়। সহজ-সরল ভাষায় লেখা কবিতাগুলোকে তরল ভাবলে ভুল হবে।
প্রথম কবিতা ‘বিমূঢ় গন্ধের গান’। এখানে কবি উচ্চস্বরে স্বীকার করেছেন— ‘রক্ত আখরে লিখেছি পদ্য’। অত্যাচার, অবিচার দেখে মনের মধ্যে তুমুল রক্ষক্ষরণ হয়েছে তাঁর। বিমূঢ় গন্ধ ছড়িয়েছে আকাশে বাতাসে। যেন বারুদ-গন্ধ। ফুলের মধ্যে ভুল। ঠকতে হয়েছে বিশ্বাস করে। নানাভাবে শিকার হতে হয়েছে প্রতারণার। যদিও শেষপর্যন্ত কবি শুনিয়েছেন আশাবাদের কথা। বলেছেন, ‘সোনালি সকাল হবে।’
লজ্জার খোঁজ করেছেন কবি। ‘লজ্জা’ কবিতায়। অন্যদেরও আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘সবাই মিলে হামলিয়ে পড়ে খোঁজ কর লজ্জার’। কী কারণে লজ্জা? তিনি লিখেছেন, ‘কত ঘর পোড়ে, কত লাশ পড়ে, কোথাও রক্তনদী/ ওসব কথায় কাজ কী তোদের সব মিথ্যার বেসাতি।’
বিশ্বের পরিস্থিতি দেখে, মিথ্যার বাড়বাড়ন্ত দেখে লজ্জিত, বিচলিত কবি কবিতার মধ্যে দিয়ে ঘটিয়েছেন ক্ষোভের প্রকাশ। অক্ষরের চাদর বুনেছেন মণিপুরের মা-বোনেদের লজ্জা নিবারণের জন্য। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন অপ্রতিরোধ্য অশুভ-শক্তির বিরুদ্ধে।
কবি শ্মশানের পাশে রেখেছেন কবরকে। ফুটিয়েছেন সম্প্রীতির ফুল। বলেছেন বিশ্ব মানবতার কল্যাণের কথা। বিস্ফার, শব্দের হুঙ্কার ছাপিয়ে তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে সময়ের ছবি, সমাজের ছবি। ১৫০ টাকা দামের ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির প্রচ্ছদশিল্পী মৌসুমী বিশ্বাস।
প্রিয় মেঘদূত
প্রয়াত কবি অশোক আচার্যের বড্ড প্রিয় ছিল ‘প্রিয় মেঘদূত’। এখন সম্পাদনায় বিকু আচার্য। ৫১ বছর ধরে প্রকাশিত পত্রিকাটির এই সংখ্যা পবিত্র সরকার, গৌরশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামলকান্তি দাশেদের কবিতায় সমৃদ্ধ হলেও তরুণদের কবিতাও কিন্তু মন টানে। পাশাপাশি ভাল গদ্য লিখেছেন আসিফুর রহমান, দিশারী মুখার্জি, প্রসূন দাস প্রমুখ। সন্তোষ শর্মাচার্যর অপ্রকাশিত চিঠিগুলি চমৎকার। পড়ে অনেক কিছু জানা গেল। অচ্যুত সরকারের উপন্যাসের আলোচনা গবেষকদের সাহায্য করবে। পদ্য, গদ্য, আলোচনা, খবরাখবর ৫০ টাকা দামের পত্রিকাটিকে সংগ্রহযোগ্য করে তুলেছে।

গল্পসংগ্রহ
কবি হলেও শ্যামাপদ রায় আদতে কথাশিল্পী। নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ান এবং দেখেন সাধারণ মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত মানুষজনের জীবনচর্চা। মননে এবং লেখায় তিনি আদ্যন্ত আধুনিক মনস্ক। অফুরন্ত গল্পভাণ্ডার থেকে নানান স্বাদের গল্প নিয়ে তাঁর ‘নির্বাচিত গল্পসংগ্রহ’ যত্ন করে প্রকাশ করেছে পু-STOCK প্রকাশন সংস্থা। ৪০০ টাকার দামের বইটিতে গল্পসংখ্যা ৩২। গল্পগুলির মধ্যে ‘যে ধূপের গন্ধ নেই’, ‘একটি নর্দমার গল্প’, ‘রক্ত ও চরকা’, ‘নতুন তরঙ্গ’ আলোচকের মতো মনস্ক পাঠকদেরও নাড়িয়ে দেবে। চন্দন মিশ্রের প্রচ্ছদ গল্পগুলির মতোই মনোগ্রাহী।

ছড়ার খোঁজে
কবি-গল্পকার অর্চনা দাস দীর্ঘদিন সৃজনশীল লেখার জগতে বিচরণ করছেন। বাস্তবিকতা ও কল্পনাপ্রবণ ঝরঝরে ছড়াও লিখছেন সমান দক্ষতায়। ৬৮টি ছড়ার কুঁড়ি নিয়ে ডালি সাজিয়েছেন ‘ছোটোদের ছন্দকথা ছড়ার খোঁজে’ বইটিতে। বইমেলা নিয়ে লিখেছেন ‘বইমেলা বইমেলা ঘুরে ঘুরে কাটে বেলা/ চারিদিকে শুধু বই সারাদিন হইচই’। বা ‘বাগমণি বাগানে ছিল এক দৈত্য/ শুনশান আঁধারে করে যেত নৃত্য’র মতো ছন্দোবদ্ধ ছড়া বা কবিতাগুলি ছোটদের আগাগোড়া টেনে রাখবে নিশ্চিত। শুভদীপ রায়ের প্রচ্ছদ ছোটদের ভাল লাগবে। নতুন দিগন্ত প্রকাশনীর ছিমছাম বইটি পাবেন ২০০ টাকায়।


