পশ্চিমবঙ্গ দেশের দ্বিতীয় সেরা আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র, মেনে নিচ্ছে কেন্দ্রও

ভারত সরকারের পর্যটন মন্ত্রক প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া ট্যুরিজ়ম ডেটা কমপেন্ডিয়াম ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণে দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে বাংলা। রিপোর্টে স্পষ্ট হয়েছে যে গত কয়েক বছর ধরে রাজ্য সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগেই পশ্চিমবঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লিখছেন অধ্যাপক ড. রূপক কর্মকার

Must read

অনন্ত ধারায় বহে প্রাণ//যেখানে সিক্ত হয় হৃদয়// আসমুদ্র হিমাচল যেখানে রয়//সেখানে পর্যটক হয় বিহ্বল। পশ্চিমবঙ্গ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণে সমৃদ্ধ এক নগরী। বাংলার পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই শুধু দৃষ্টিনন্দন জলছবি। একদিকে জীব বৈচিত্র্যের অন্যতম পীঠস্থান সুন্দরবন, অন্যদিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান টয় ট্রেন সমৃদ্ধ দার্জিলিং। দার্জিলিং যা আপামর ভারত তথা বিশ্ববাসীর কাছে ‘শৈল শহর’ নামে পরিচিত। আবার যদি কখনও পাহাড় বা জঙ্গল থেকে উল্টো পথে হাঁটতে হয় তবে ধরাধামে নবনির্মিত জগন্নাথদেবের কাছে সমুদ্রসৈকত তো রইলই। একটা সময় পশ্চিমবঙ্গ নির্দিষ্ট কিছু পর্যটনক্ষেত্রের উপরে নির্ভরশীল ছিল।

আরও পড়ুন-পথকুকুরকে খাওয়ানো নিয়ে হেনস্থা অভিনেতা-দম্পতিকে

দি-দা অর্থাৎ দিঘা-দার্জিলিং ছিল রাজ্যের মধ্যে অধিকাংশ মানুষের কাছে পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের রুচি, আর রুচির বদল এর সাথে সাথে তাল মিলিয়ে পর্যটকদের পর্যটনের সাধ। বিগত একদশকে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন ক্ষেত্রের এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। আর এই বদল সম্ভব হয়েছে সঠিক পরিকল্পনার ফলে। অবশ্য পরিকল্পনার মূলে যখন এক মহীয়সী নারীর প্রচেষ্টা সেখানে পরিকল্পনা বাস্তবরূপ নেবে সেটাই ভবিতব্য। কোনও রাজ্য সরকারের যে কোনও বিভাগ শুধু তার বাজেট তৈরি করে তা কিন্তু নয়, সেই বাজেটকে যথাযথভাবে প্রণয়ন করাও সেই বিভাগের কাজ, কিন্তু অধিকাংশ সময় আমরা দেখি বাজেট শুধু খাতায় কলমেই থেকে যায়। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেই বাজেটের সার্থক রূপায়ণ হতে আমরা দেখেছি। যার ফলাফল ও আমাদের চোখের সামনে। সারা ভারতবর্ষের মধ্যে পর্যটনের অন্যতম সেরা ক্ষেত্র হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ যে উঠে এসেছে তার পুরো কৃতিত্ব বাংলার মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টার। আর তারই ফলস্বরূপ সাম্প্রতিক সময়ে শ্রেষ্ঠ পর্যটনের গন্তব্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের উঠে আসা ভারতবর্ষের বুকে।
এবার কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যটন দফতরের দেওয়া ২০২৫-এর তথ্য দেখে নেওয়া যাক। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে দেশীয় পর্যটকদের আগমনের সংখ্যা ছিল ১৪৫.৬৬৯ মিলিয়ন এবং বিদেশি পর্যটকের আগমনের সংখ্যা ছিল ২.৭০৭ মিলিয়ন। ২০২৪-’২৫-এ দেশীয় পর্যটকের আগমনের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৮৪.৪৭৬ মিলিয়ন এবং বিদেশি পর্যটকের আগমনের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩.১২৪ মিলিয়ন অর্থাৎ ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৮.৮০৭ মিলিয়ন যা শতকরা হারে ২৬.৬৪ শতাংশ। শুধু দেশীয় পর্যটক নয় বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে বেড়ে হয়েছে ০.৪১৭ মিলিয়ন, যার শতকরা বৃদ্ধি পায় ১৫.৪০ শতাংশ। সবথেকে গর্বের বিষয় হল ২০২৪-’২৫-এ মোট বিদেশি পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ সারা ভারতবর্ষের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে, যা নিসন্দেহে বাংলার পর্যটন মুকুটে এক নতুন পালক। বাংলার আগে শুধুমাত্র মহারাষ্ট্রের অবস্থান। মহারাষ্ট্রে যেখানে মোট বিদেশি পর্যটকের আগমনের হার ১৭.৬৯ শতাংশ, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের আগমনের শতকরা হার ১৪.৯২ শতাংশ। এই অভাবনীয় সাফল্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বেশকিছু পদক্ষেপের উপর নির্ভর করেই হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রতিক নানান দিক বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু দিক উঠে আসবে।

আরও পড়ুন-ভয়ানক! পুনেতে IT কর্মীর উপরে SUV চালক ও তাঁর সঙ্গিনীর প্রাণঘাতী হামলা

WBTDCL পশ্চিমবঙ্গকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রসার এবং প্রচারের জন্য ২০২৪-’২৫-এ রাজ্যব্যাপী ২০০টি ভ্রমণ- সংক্রান্ত প্যাকেজ চালু করেছে। প্রতিবছর পশ্চিমবঙ্গ চিরাচরিত পর্যটন কেন্দ্রগুলোর বাইরে গিয়ে নতুন নতুন কিছু পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করার প্রচেষ্টা করে। সেই প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ২০২৪-এও নতুন কিছু পর্যটন কেন্দ্র বাংলার মানচিত্রে যোগ হয়েছে যেমন, পুরুলিয়ার মুরগুমা পর্যটনকেন্দ্র, চন্দননগরের আলো পর্যটন কেন্দ্র, বাঁকুড়ার বড়োঘুটু, বীরভূমের বাউল বিতান, বীরভূমের বাউল অ্যাকাডেমি, রামপুরহাটের তারাবিতান টুরিস্ট কমপ্লেক্স ইত্যাদি। এছাড়াও আরও কিছু নতুন উদ্যোগ যেমন পশ্চিম বর্ধমানের চুরুলিয়ায় কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভূমি নতুন রূপদান, হুগলির দেবানন্দপুরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসস্থানের সৌন্দর্যায়ন, বীরভূম জেলার লাভপুরের হাঁসুলীবাগ পর্যটন কেন্দ্রকে সাজানো, হুগলির জাঙ্গিপাড়াতে বিভূতিভূষণ সংস্কৃত মঞ্চ নির্মাণের পরিকল্পনা ইত্যাদি।
শুধু নতুন নতুন পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলাই নয়, ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্রগুলো-কে সংস্কার এর জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার কাজটাও সমানতালে করে গেছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু যে পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হয়ে সরকারের আয় বেড়েছে তা নয়। পর্যটন, বন এবং আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগ দ্বারা মোট ৫৩২২টি হোমস্টে নিবন্ধিত হয়েছে যার মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। এই হোমস্টে পর্যটন ক্ষেত্রের CAGR (COMPOUND ANNUAL GROWTH RATE) বৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ যা দেশের মধ্যে অন্যতম। পর্যটনকে সামনে রেখে বেশ কিছু পুরস্কারও পশ্চিমবঙ্গের ঝুলিতে চলে এসেছে। তার মধ্যে ভারত সরকারের পর্যটন মন্ত্রক কৃষি-পর্যটন ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ পর্যটন গ্রাম ২০২৪-এর হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বরানগর গ্রামটিকে বেছে নিয়ে পুরস্কৃত করেছে। এমনকী পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনের সুবাস দূরদেশেও পৌঁছে গেছে। পাঠকদের মধ্যে সার্ভের ভিত্তিতে নিউ ইয়র্কের ভ্রমণ ম্যাগাজিন ট্রাভেল অ্যান্ড লেজার (যার পাঠক সংখ্যা ৪.৮ লক্ষ) কলকাতাকে ১৯তম স্থান প্রদান করেছে। অর্থাৎ নানান কুৎসা ও অপপ্রচার একপাশে মানুষের ভরসার পরিসংখ্যান আরেক পাশে। অবশ্য এই পরিসংখ্যান আশ্চর্যের কিছু নয়।
বিগত এক দশক ধরে বাংলার মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে পশ্চিমবঙ্গকে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন সেখানে এই পরিসংখ্যানকে কেন্দ্রীয় সরকার তুলে ধরবে তা বলাই বাহুল্য। পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা মতে ভবিষ্যতে ‘দুর্গা অঙ্গন’ ও সুবিশাল ‘মহাকাল মন্দির’ যে আপামর পর্যটকদের হৃদয়ে স্থান করে নেবে তা হলফ করে বলা যায়। সর্বশেষে বলতে হয় প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কিছু মনের কথা যা আমাদের সকলের খুব প্রিয় তা হল— ‘আমি বাংলায় ভালোবাসি, আমি বাংলাকে ভালোবাসি, আমি তারই হাত ধরে সারা পৃথিবীর-মানুষের কাছে আসি’।

Latest article