লেখক জগদীশচন্দ্র

বিজ্ঞানসাধনার পাশাপাশি সাহিত্যসাধনায় ডুব দিয়েছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু (Jagdishchandra Basu)। বাংলা এবং ইংরেজিতে লিখেছিলেন বেশকিছু গ্রন্থ। তাঁর 'অব্যক্ত' গ্রন্থটি বিশেষভাবে পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছিল। আজ জন্মদিনে তাঁর লেখক-জীবনের উপর আলোকপাত করলেন অংশুমান চক্রবর্তী

Must read

চিন্তাভাবনার মিল
সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানী। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন গবেষণাগারে। অবসরে যতটুকু সময় পেতেন, বই পড়তেন। মূলত বিজ্ঞানের বই। পাশাপাশি সাহিত্যের বই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর অন্তরঙ্গ সুহৃদ। অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর হয়ে উঠেছিল দুজনের বন্ধুত্ব। এর পিছনে প্রধান কারণ ছিল মনের মিল, চিন্তাভাবনার মিল। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হতেন জগদীশচন্দ্র। দীর্ঘ চিঠিতে জানাতেন ভাললাগার কথা। তাতে প্রশংসা যেমন থাকত, তেমনই থাকত অনুরোধ, পরামর্শ। একটি চিঠিতে তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেন মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্রকে নিয়ে কবিতা লেখার জন্য। বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন কর্ণের নাম। তারপরই রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’। এইভাবেই জগদীশচন্দ্র নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথও তাঁকে উৎসাহিত করেছেন নানাভাবে।
প্রবাস থেকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে জগদীশচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘তোমার স্বরে আমি মাতৃস্বর শুনিতে পাই।’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘তোমার বন্ধুত্ব যে আমাকে এমন প্রবল ও গভীরভাবে আকৃষ্ট করিবে তাহা একবৎসর পূর্ব্বে জানিতাম না।’ এইরকম প্রচুর চিঠি লিখেছেন তাঁরা। একে অপরকে। জগদীশচন্দ্রের চিঠির সংখ্যা ৮৮। রবীন্দ্রনাথের ৩৬। ‘কথা’ কাব্য জগদীশচন্দ্রকে উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেইসঙ্গে লিখেছিলেন ‘জগদীশচন্দ্র বসু’ শীর্ষক একটি কবিতাও।

আরও পড়ুন-ঘূর্ণিঝড় দিতওয়া, তামিলনাড়ু-পুদুচেরি-অন্ধ্রে লাল সতর্কতা

প্রথম কল্পকাহিনির লেখক
বিজ্ঞানসাধক জগদীশচন্দ্র ডুব দিয়েছিলেন সাহিত্যসাধনাতেও। বাংলা ভাষায় প্রথম কল্পকাহিনির লেখক ছিলেন তিনিই। তাঁর লেখা সায়েন্স ফিকশন ‘নিরুদ্দেশের কাহিনি’ পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছিল। কীভাবে রচিত হয়েছিল এই কাহিনি? বাংলার বিখ্যাত ব্যবসায়ী ছিলেন হেমেন্দ্রমোহন বসু। তিনি ছিলেন সাহিত্য রসিক। ১৮৯৬ সালে নতুন পণ্য ‘কুন্তলীন’ নামে মাথার চুলের তেল বিক্রির প্রচারের জন্য অবলম্বন করেছিলেন নতুন পন্থা। তিনি এক ছোট গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। সেই প্রতিযোগিতায় সকলের অংশগ্রহণ করার অনুমতি ছিল। বিজেতার জন্য বন্দোবস্ত করা হয়েছিল বিশেষ পুরস্কারের। ছোট গল্পের প্রতিযোগিতার একটিমাত্র শর্ত ছিল, গল্পের মধ্যে যেভাবেই হোক সেই চুলের তেলের কথা লিখতে হবে অথবা তেলটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতায় বহু গল্প জমা পড়েছিল। যে গল্পটা সর্বশ্রেষ্ঠ গল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, তার পটভূমিকায় ছিল কলকাতাকে তছনছ করে দিতে পারা একটি ঝড়। ‘কুন্তলীন’ তেল ব্যবহার করা এক ব্যক্তি সেই ঝড়কে নিমেষে থামিয়ে দিয়েছিলেন। গল্পটি হল জগদীশচন্দ্রের লেখা ‘নিরুদ্দেশের পথে’। এই গল্পটিকেই আধুনিক ভারতে লেখা শুরুর দিকের কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গল্প মনে করা হয়। পটভূমি পড়ে সম্পূর্ণ আজগুবি বলে মনে হয়। কল্পনার সাহায্য নিলেও জগদীশচন্দ্র গল্পের মধ্যে বিজ্ঞানকে সূক্ষ্মভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানের বহু ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই গল্পের মধ্যে ছিল। পরবর্তীকালে জগদীশচন্দ্র এই গল্পকেই ঘষামাজা করে তাঁর ‘পলাতক তুফান’ গল্পটি লিখেছিলেন। এই দু’টি গল্পের বহু মিল রয়েছে। ‘পলাতক তুফান’ পরে ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
একটি অসাধারণ গ্রন্থ
জগদীশচন্দ্রের লেখা একটি অসাধারণ গ্রন্থ ‘অব্যক্ত’। তাঁর একমাত্র বাংলা গ্রন্থ। প্রথম প্রকাশক বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ। প্রকাশকাল ১৯২১। পরবর্তীকালে গ্রন্থটি প্রকাশ করে বসুবিজ্ঞান মন্দির। এই গ্রন্থটি তাঁর সাহিত্য-প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। বিশেষভাবে লাভ করে পাঠকপ্রিয়তা। এতে আছে ‘পলাতক তুফান’-সহ ২০টি লেখা। বাকি লেখাগুলোও অসাধারণ।
এই গ্রন্থের ‘যুক্তকর’ একটি অন্যরকমের প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধে লেখক অজন্তার গুহাচিত্র, তার বাইরে স্থিত বুদ্ধমূর্তি এবং এক নিমন্ত্রণ বাড়িতে বুদ্ধের সামনে করজোড়স্থিত এক জননীর চিত্র দেখে প্রাচীনের সঙ্গে বর্তমানের সম্পর্ক এবং প্রকৃতির মাতৃরূপ স্নেহের প্রকাশের আশ্চর্য বিবরণ দিয়েছেন। ‘আকাশ-স্পন্দন ও আকাশ-সম্ভব জগৎ’ আরও একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। এই প্রবন্ধে কঠিন, তরল ও বায়বীয় পদার্থের মধ্যে দিয়ে শক্তি কীভাবে শব্দ, বিদ্যুৎ ও সূর্যকিরণ রূপে প্রবাহিত হয় তার সরল বর্ণনা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন-চাপে জেলেনস্কি, প্রধান সহকারীর বাড়িতে হানা দুর্নীতিদমন শাখার

ছোটদের জন্য লেখা
গাছের প্রাণ আছে, প্রমাণ করেছিলেন জগদীশচন্দ্র। তিনি বলেছিলেন, উদ্ভিদ অন্যান্য জীবনের মতোই সংবেদনশীল, একটি জীবনচক্র আছে এবং তাদের নিজস্ব প্রজনন ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি তাঁর নিজস্ব আবিষ্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে গাছের স্পন্দন রেকর্ড করে তা প্রমাণ করেছেন। ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থের ‘গাছের কথা’ প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র গাছের সঙ্গে অন্যান্য জীবের জীবনপ্রণালীর সহজে দৃশ্যমান মিলগুলোর সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। এই প্রবন্ধটি মূলত ছোটদের জন্য লেখা।
‘উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু’ও এই বিষয়টিকে ছুঁয়েই যায়। এতে একটা সাধারণ উদ্ভিদের বীজ থেকে পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্তি, বংশবিস্তার ও মৃত্যুর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এটাও মূলত ছোটদের জন্য লেখা। ছোটদের জন্য লেখা আরও একটি প্রবন্ধ ‘মন্ত্রের সাধন’। এই প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র বর্ণনা করেছেন কীভাবে মানুষ ক্রমাগত সাধনার দ্বারা আকাশে ওড়ার জন্য বেলুন ও তারপর পাখাওয়ালা যন্ত্র আবিষ্কার করেছে।
বিনা তারে সংবাদ পাঠানোর পরীক্ষা
‘অব্যক্ত’ গ্রন্থের ‘অদৃশ্য আলোক’ প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান আলোর নানা ধর্ম, তাদের উপর করা নিজের এবং অন্যান্যদের গবেষণার বর্ণনা দিয়েছেন তাত্ত্বিক জটিলতার মধ্যে না গিয়ে। অদৃশ্য আলোর উপর করা তাঁর নিজের পর্যবেক্ষণের উপরেও তিনি অনেকটাই আলোকপাত করেছেন। এই প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র জানিয়েছেন যে, তিনি ১৮৯৫ সালে কলকাতা টাউনহলে বিনা তারে সংবাদ পাঠানোর নানা পরীক্ষা দেখিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, অদৃশ্য আলোকের সম্মুখে জানালার কাচ ধরলে তার ভিতর দিয়ে এইরূপ আলো সহজেই চলে যায়। কিন্তু জলের গেলাস সম্মুখে ধরলে অদৃশ্য আলো একেবারে বন্ধ হইয়া যায়।
আসা যাক ‘অগ্নিপরীক্ষা’ গল্পের কথায়। ১৮১৪ সালে ইংরেজ গভর্নমেন্ট নেপাল রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। সেইসময় নেপালের সীমান্তপ্রদেশে কলুঙ্গা নামক জায়গায় হওয়া ইংরেজ-সৈন্যের সঙ্গে কলুঙ্গা দুর্গাধিপতি বলভদ্রের সৈন্যের যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনার উপর নির্ভর করে জগদীশচন্দ্র এই গল্পটি রচনা করেন।
নদীর উৎপত্তি ও গতিপথের বর্ণনা
কাল্পনিক বিবরণমূলক ছোটগল্প ‘ভাগীরথীর উৎস-সন্ধানে’। গঙ্গা নদী হিমালয় পর্বতশ্রেণির নন্দদেবী গিরিশৃঙ্গের হিমশৈলে উৎপন্ন হয়ে দীর্ঘ পথ পরিক্রম করে ভাগীরথী ধারা বেয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। জগদীশচন্দ্র নদীর উৎপত্তি, তার গতিপথ, সাগরে পতন এবং তারপরেও জলের নৈমিত্তিক কাজ অতীব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। ভূগোল ও বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়কে তিনি তাঁর রচনায় সুসংহত করেছেন, ছন্দবদ্ধ করেছেন। তাঁর সাবলীল লেখা নদীর স্রোতের মতই গতিময়। এই গতিময়তায় অবগাহন করলে সমুদ্র স্নানের স্বাদ মেলে। রবীন্দ্রনাথ ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এটা বাংলাসাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় গদ্যরচনা হিসাবে পরিচিত। ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থের ‘বিজ্ঞানে সাহিত্য’ রচনাটি বঙ্গীয় লেখকের সাহিত্য-সম্মিলনীর ময়মনসিংহ অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণ। এতে জগদীশচন্দ্র কবি-সাহিত্যক ও বৈজ্ঞানিকের চিন্তাধারার ও কাজের মিল ও অমিল দেখিয়েছেন। এছাড়া তিনি অদৃশ্য আলো ও গাছের উপর করা পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়েও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থের ‘নির্ব্বাক জীবন’ প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র গাছের স্পন্দনশীলতা নিয়ে বিশদে কথা বলেছেন। জানিয়েছেন যে, গাছের উদ্দীপনা বা সংকোচন ধরার জন্য তিনি সমতাল যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। সেই তরুলিপি যন্ত্রে দুটি তার এক সুরে বাঁধা থাকে এবং একটি তার লেখনী হিসাবে কাজ করে। তিনি আরও জানান, গাছের দেহে স্নায়বীয় সংবাদ প্রেরিত হয়, যা ভেকের দেহের তুলনায় মন্থর। তিনি বনচাঁড়ালের পাতার নাচ বা স্পন্দন নিয়েও বৈজ্ঞানিক আলোচনা করেছেন।

আরও পড়ুন-পাগলে কী না বলে, হাসনাবাদে শান্তনুকে তীব্র কটাক্ষ সুজিতের

একসঙ্গে কাজের আহ্বান
জগদীশচন্দ্রর সাহিত্য-পরিষদে সভাপতি হিসাবে অভিভাষণ ‘নবীন ও প্রবীণ’। এখানে তিনি সাহিত্য-পরিষদের উন্নতির জন্য নবীন ও প্রবীণকে দলাদলি ভুলে একসঙ্গে কাজের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
‘বোধন’ হল জগদীশচন্দ্রের বিক্রমপুর সম্মিলনে সভাপতির ভাষণ। তিনি এখানে সমসাময়িক কালে দেশের স্বাস্থ্য, সেবা, শিল্প ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থের ‘মনন ও করণ’ প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র স্বদেশে তাঁর কাজের স্বীকৃতির অভাব নিয়ে খানিকটা বিলাপ করেছেন। জানিয়েছেন যে, তাঁর সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ও পরীক্ষা তৎকালীন বঙ্গে বাংলা ভাষায় প্রকাশ হওয়া সত্ত্বেও পাত্তা পায়নি। বিদেশি প্রভাব না থাকায়। যদিও সেই কাজই পরে বিদেশে সমাদৃত হয়েছে।
গবেষণা জীবনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা
‘রানী সন্দর্শন’ একটি ছোট্ট প্রবন্ধ। এতে জগদীশচন্দ্র মানুষ, প্রাণী ও পৃথিবী রূপে মাতৃত্বের বন্দনা করেছেন। প্রবন্ধটি প্রাণবন্ত ভাষায় লেখা। বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে জগদীশচন্দ্র লিখেছিলেন ‘নিবেদন’। এতে তিনি তাঁর গবেষণা জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন। সেইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এটা ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে মূল্যবান। রচিত হয়েছিল ১৮৭৭ সালে। ‘দীক্ষা’ একটি অনুপ্রেরণামূলক রচনা। জগদীশচন্দ্র চেয়েছিলেন আরও অনেক শিক্ষিত যুবক বিজ্ঞান সাধনায় মনোনিবেশ করুক। সেই কারণেই তিনি এই প্রবন্ধটি রচনা করেন। সাহিত্য পরিষদের দেওয়া তাঁর একটি বক্তৃতা ‘আহত উদ্ভিদ’। এতে তিনি গাছের স্পন্দনশীলতা ও তার যন্ত্রনির্ভর পরিমাপ সুবিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন।
‘স্নায়ুসূত্রে উত্তেজনা-প্রবাহ’ প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র জীবের স্নায়বিক উত্তেজনাবৃদ্ধির পরীক্ষানির্ভর বিশ্লেষণ করেছেন। কীভাবে তিনি স্পন্দনশীলতা বাড়ানোর জন্য গাছ ও ভেকের উপর পরীক্ষা করেছিলেন, তার বর্ণনাও দিয়েছেন। ‘অব্যক্ত’-র ‘হাজির’ প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র সুন্দর ভাষায় বিবরণ দিয়েছেন কীভাবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাধা-বিপত্তির সময় তিনি ভিতরকার সমালোচনাশীল ও অনুসন্ধিৎসু মন থেকে অনুপ্রেরণা পেতেন।

আরও পড়ুন-পশ্চিমবঙ্গ দেশের দ্বিতীয় সেরা আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র, মেনে নিচ্ছে কেন্দ্রও

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মুদ্রিত
‘অব্যক্ত’ গ্রন্থের অধিকাংশ লেখা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হওয়ার আগেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলো হল, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি প্রতিষ্ঠিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকা। এতে প্রকাশিত হয়, ‘আকাশ স্পন্দন’ ও ‘আকাশ-সম্ভব জগৎ’। শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত শিশুপত্রিকা ‘মুকুল’-এ প্রকাশিত হয় ‘গাছের কথা’, ‘উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু’, ‘মন্ত্রের সাধন’। মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘মোসলেম ভারত’-এ প্রকাশিত হয় ‘অদৃশ্য আলোক’। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘দাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘পলাতক তুফান’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘ভাগীরথীর উৎস-সন্ধানে’। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘বিজ্ঞানে সাহিত্য’, ‘বোধন’, ‘আহত উদ্ভিদ’, ‘হাজির’। ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা’য় ‘নবীন ও প্রবীণ’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সম্পাদিত ‘সচিত্র ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় ‘রানী সন্দর্শন’, ‘নারায়ণ’, ‘প্রবাসী’ এবং ‘সাহিত্য পত্রিকা’য় ‘নিবেদন’ প্রকাশিত হয়। ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থের শেষ রচনা ‘হাজির’। রচনাটি জগদীশচন্দ্রের শেষ বয়সের লেখা। এই রচনায় তাঁর আত্ম-উপলদ্ধি ও জীবনদর্শনের পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ
জগদীশচন্দ্রের প্রথম মুদ্রিত বই ১৯০২ সালে প্রকাশিত ‘Response in the Living and Non-living’. এরপর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বেশকিছু ইংরেজি বই ও গবেষণাপত্র। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘Nervous Mechanism in Plants’. এই বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন, ‘To my life long friend Rabindranath Tagore’.
অর্থাৎ, বাংলা এবং ইংরেজি— দুই ভাষাতেই গল্প-প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনা করেছেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। বিজ্ঞান ও সাহিত্যিসাধক হিসেবে তাঁর অবদান কোনোভাবেই ভোলার নয়। রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতার পিছনে তাঁর যেমন অপরিসীম অবদান ছিল, তেমনই তাঁর সাহিত্য মনস্কতার পিছনেও বিরাট অবদান ছিল রবীন্দ্রনাথের। দুই বন্ধু পরস্পর পরস্পরকে আলোকিত করেছেন এইভাবেই। এ এক মস্তবড় দৃষ্টান্ত।

Latest article