শেখ হাসিনা-উত্তর বাংলাদেশে কেবল হিন্দুধর্ম অবলম্বী মানুষজন নয়, বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী মতের মানুষকেই পিটিয়ে অথবা গুলি করে মারা হয়েছে এবং হচ্ছে বাংলাদেশে। এক সার্বিক নৈরাজ্যের অন্ধকারে ডুবে গেছে আমাদের এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি।
শেখ হাসিনার সরকার উৎখাত হবার পর থেকেই বাংলাদেশ এই দিশাহীন হিংসার আবর্তে ডুবে গেছে। ধর্মোন্মাদ ইসলামিক মৌলবাদের হাত ধরেছে পেশাদার অপরাধীরা।
কিন্তু ভারতের এই পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে ইসলামিক মৌলবাদী শক্তির উত্থানে ভারতে কোন শক্তির সবচেয়ে বেশি লাভ?
খোলাচোখেই দেখা যাচ্ছে তারা হল বিজেপি- সহ গোটা সঙ্ঘ পরিবার, যারা আমাদের দেশেও সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌলবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। বিগত এগারো বছরে উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতে ‘মব লিঞ্চিং’-এ মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। হরিয়ানার ‘গোরক্ষক বাহিনী’র মনু মানেসর-সহ একাধিক হিন্দুত্ববাদী নেতার নাম উঠে আসছে, যারা মুসলিম গরিব মানুষকে পিটিয়ে মারছে। কখনও গোমাংস ভক্ষণ, কখনও গোমাংস পাচারের মিথ্যা অভিযোগে মারা হয়েছে মহম্মদ আখলাক, নাসের, জুনেইদ, পেহলু খান থেকে শুরু করে সাবির মালিককে। রাজস্থানের স্থানীয় বিজেপি কর্মী শম্ভুলাল রেগা অন ক্যামেরা পিটিয়ে মেরে পুড়িয়ে দিয়েছে বাঙালি মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিক আফরাজুলকে। নিছক মুসলিম হবার অপরাধে ঝাড়খণ্ডে পিটিয়ে মারা হয়েছে তাবরেজ আনসারিকে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এক অসম ঐতিহাসিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে অর্থশক্তি, পেশিশক্তি, এজেন্সি, কর্পোরেট-ফান্ডিং-এ পুষ্ট ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌলবাদী উত্থানের বিরুদ্ধে। ওরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও এখনও অব্দি বাংলার মাটিতে একহাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে ধূলিসাৎ করতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মৌলবাদী তাণ্ডব এই বিভেদকামী হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে কোরামিন জোগাচ্ছে।
বাংলাদেশের মাটিতে উন্মত্ত উচ্ছৃঙ্খল ‘মব’ যে ভয়াবহ আচরণ করছে প্রতিনিয়ত, একই জিনিস ছোট আকারে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। ‘লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ’ অনুষ্ঠানে একইসঙ্গে শারীরিক হেনস্থা করা হল দুই প্যাটিসবিক্রেতাকে। একজন মুসলমান, নাম শেখ রিয়াজুল। অপরজন হিন্দু, নাম শ্যামল মণ্ডল। কী তাদের অপরাধ? তারা নাকি গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে চিকেন প্যাটিস বিক্রি করছিল। ময়দান সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে, তারা জানেন, ওখানে সারাবছর হরেকরকম জিনিস নিয়ে ফেরি করেন দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ। স্বভাবতই, ব্রিগেডে বড় জমায়েত হলে পেশার তাগিদেই তাঁরা সেখানে যান রোজগারের আশায়। শেখ রিয়াজুল কেবল মুসলিম বলেই তাকে সেদিন বেধড়ক পেটানো হল, তার প্যাটিস বাক্স ভেঙে পুরো মালপত্র নষ্ট করা হল। যে-কেউ জানেন, প্যাটিসওয়ালাদের বাক্সে ভেজ, নন-ভেজ দু’রকম প্যাটিসই থাকে। অথচ ন্যারেটিভ তৈরি করা হল, শেখ রিয়াজুল নাকি ইচ্ছেকৃতভাবে ভেজ প্যাটিসকে নন-ভেজ প্যাটিস বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল। একজন গরিব মানুষকে যে তার পেশাগত জায়গায় পেটে লাথি মারা হচ্ছে, এটুকু বোঝার ক্ষমতাও এই মৌলবাদী হুলিগানদের নেই। আর শ্যামল মণ্ডলকে হেনস্থা করা হল কেন? সে তো হিন্দু। তার তো কোনও গোপন অ্যাজেন্ডা ছিল না। সে পেটের দায়ে ওইদিন ব্রিগেডে গিয়েছিল। তারও প্যাটিস নষ্ট করে দেয় হিন্দুত্বের স্বঘোষিত ঠিকাদার ওই গুন্ডারা। অর্থাৎ এই ‘মব ভায়োলেন্স’কে তারা জাস্টিফাই করছে ধর্মের নামে। অথচ ধর্মের সঙ্গে গরিব মানুষের পেটে লাথি মারার কোনও সম্পর্ক থাকারই কথা নয়।
আরও উল্লেখ্য, গুজরাতে বিলকিস বানোর ধর্ষকদের যেরকম মালা পরিয়ে বরণ করা হয়েছিল, কাঠুয়ায় আটবছরের মুসলিম মেয়ে আসিফাকে যেমন ধর্ষণ করার পর অপরাধী লোকটির নামে জয়ধ্বনি দিয়ে মিছিল করা হয়েছিল, উন্নাও-এর দলিত মেয়েটির ধর্ষক বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার বেল পাবার পর যেমন তাকে মালা পরিয়ে বরণ করা হয়েছিল, অবিকল একই কায়দায় শেখ রিয়াজুলকে হেনস্থা করা দুষ্কৃতীরা বেল পাবার পর তাদেরও মালা পরিয়ে বরণ করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। মাঝে মাঝে ভাবলে আতঙ্ক হয়, এটাই কি আমাদের গর্বের পশ্চিমবঙ্গ? ২০১৪ সালে একক শক্তিতে কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি যে ‘মবোক্রেসি’কে প্রশ্রয় দিচ্ছে তার আগুন কি এইবার বাংলার মাটিকেও স্পর্শ করল?
আরও পড়ুন: ৯১-এর বৃদ্ধাকেও ডাক শুনানিতে!
আসলে ইসলামিক মৌলবাদ আর হিন্দুত্ব মৌলবাদ দুটোই একে অপরের পরিপূরক। তারা উভয়েই এক নিশ্ছিদ্র ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে সমস্ত বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। এই দুই অপশক্তির বিরুদ্ধেই শেষ অব্দি লড়ে যেতে হবে আমাদের।

