লহ গৌরাঙ্গের নাম রে

মুক্তি পেয়েছে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’। চৈতন্যের বায়োপিক বা অন্তর্ধানের গবেষণা সবটাই নতুন আঙ্গিকে। কেমন হল এই ছবি? দেখে এসে লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবির নামটা ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে (Lawho Gouranger Naam Rey)’ না হয়ে ‘চৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য’ও হতে পারত। বিষয়বস্তুর আড়ালে সেটাই ছবির উপজীব্য। শুরু থেকেই চর্চা ছিল এই ছবির। ডাকাসাইটে স্টারকাস্ট। তার ওপর পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। স্বাভাবিক ভাবেই ছবিটা নিয়ে প্রত্যাশা ছিল অনেকটাই। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ হল কই!

ছবির বিষয় হয়তো ভারী কিন্তু দেখতে বসলে মনে হয় গল্প বলায় কোথাও একটা অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে। চৈতন্যদেবকে নিয়ে সেভাবে কোনও গল্পই বলা হল না ছবিতে। এমন একজনকে নিয়ে ছবি করতে গিয়ে আরও হয়তো রিসার্চের দরকার ছিল। ছবিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনকাহিনিকে তিনটি সময়কালের প্রেক্ষাপটে পরিবেশন করেছেন পরিচালক। যা নিঃসন্দেহে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। যাঁর প্রথমটি শ্রীচৈতন্যদেবের সমকালীন সময়। এই চৈতন্যের ভূমিকায় রয়েছেন অভিনেতা দিব্যজ্যোতি দত্ত। দ্বিতীয়টি বাংলা পেশাদারি থিয়েটারের স্বর্ণযুগ বা ‘গিরিশযুগ’। নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং অবিস্মরণীয় প্রতিভার অধিকারী নাট্যসম্রাজ্ঞী নটী বিনোদিনীর সময়কাল। যখন গুরু গিরিশ ঘোষের পরিচালনায় নটি বিনোদিনী একের পর এক চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলাখেলা নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করছেন, একনিষ্ঠ শিষ্য হয়ে অভিনয় করে চলেছেন। এই চৈতন্যের ভূমিকায় রয়েছেন শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় আর তৃতীয়টি বর্তমান সময়কালের প্রেক্ষাপট (Lawho Gouranger Naam Rey)। যেখানে রচিত হচ্ছে আরও এক চৈতন্যকথা। জাতীয় পুরস্কার পাওয়া পরিচালক রাই তৈরি করছেন চৈতন্যের জীবন অবলম্বনে একটি ছবি। এই ছবির চৈতন্যমহাপ্রভু হলেন এক নামজাদা অভিনেতা পার্থ যে পরিচালক রাইয়ের প্রেমিকও। এক বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত দুজনে। এই চৈতন্যের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিনেতা ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। ছবির গল্প এগোয় এই তিন চৈতন্য মহাপ্রভুকে নিয়ে। তিনটি সময়কালের প্রতিটা চরিত্রই একটা সময় মহাপ্রভুর অন্তর্ধান রহস্য খুঁজতে পৌঁছে গেছে পুরীধামে। সকলেরই উদ্দেশ্য চৈতন্যদেব অন্তর্ধান হয়েছিলেন নাকি তাঁর তিরোধান হয়েছিল— সেই রহস্য খুঁজে বের করা।

তিনটে সময়কাল ধরেছেন এবং জুড়েছেন পরিচালক। ছবি জুড়ে অতীত-বর্তমানের যাওয়া-আসা। কিন্তু সম্পৃক্ত হয়নি প্রতিটা সময়কালকে ছুঁয়ে যেতে গিয়ে খুব গভীরে যেতে পারেননি পরিচালক। নবদ্বীপধাম থেকে ঈশ্বরপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে চৈতন্যমহাপ্রভু ছুটে গিয়েছিলেন শ্রীক্ষেত্র পুরীতে। সেখানে দীর্ঘকালীন গম্ভীরা ভবনের ছোট্ট কুঠুরিতে ছিল তাঁর বাস। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভক্তদের কৃষ্ণনামের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়া। কৃষ্ণভক্তি আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন তিনি। যে কারণে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের রোষের শিকার হন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। সেই ভক্তি আন্দোলনের এতটুকু আঁচ পাওয়া গেল না ছবিতে। কারণ তাঁর কৃষ্ণপ্রেম একার ছিল না। তিনি তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বহু মানুষের মধ্যে। তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দলটাও ছিল বেশ বড়। এই ধরনের ছবির কোনও ক্লাইম্যাক্স হয় না। এখানেও তেমন করে কোনও মনে রাখার মতো শেষ কিছু নেই। ছবিটা দেখলে কৌতূহল জাগে নদের নিমাই অন্তর্ধান কী করে হলেন! তিনি কি খুন হয়েছিলেন নাকি শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের মাঝেই বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন। নাকি নিজেই হরে কৃষ্ণ নামে সমুদ্রে মিলিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই উত্তর মেলেনি ছবিতে। সেই অনুত্তরেই থেকে গেছে ছবি।

আরও পড়ুন-শাহ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজ্যের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় : অভিষেক

তবে এই ছবির যে বিষয়গুলো নিয়ে বলার তা হল অভিনয় এবং গান। অভিনয় প্রথমেই যার কথা বলতে হয় নবাগত দিব্যজ্যোতি দত্ত। শ্রীচৈতন্যদেবের ভূমিকায় অনবদ্য তাঁর অভিব্যক্তি। ছোটপর্দার পরিচিত মুখ দিব্যজ্যোতি চৈতন্যদেবকে জীবন্ত করে তুলেছেন অভিনয়গুণে। তাঁকে দেখলে কোথাও মনে হবে না তিনি অভিনয় করছেন। নাট্যাচার্য গিরিশ ঘোষ যাঁর উপস্থিতি ছবি জুড়ে জানান দেয়। এই ছবির সবচেয়ে বলিষ্ঠ দুটো চরিত্রের অন্যতম। দ্বিতীয়টি নটি বিনোদিনী। এই দুই ভূমিকায় অভিনেতা ব্রাত্য বসু এবং শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় এককথায় অসাধারণ। অসম্ভব সুন্দর তাঁদের মধ্যেকার রসায়ন। ব্রাত্য বসুর অভিনয়, গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ধরনে গিরিশ ঘোষকে নিংড়ে বের করে এনেছেন তিনি। আর বিনোদিনী এবং চৈতন্য হয়ে শুভশ্রী যেন নিজেকেও ছাপিয়ে গেছেন। স্টার থিয়েটারের সূচনাপর্ব, ‘থেটার’-পাগল গিরিশ ঘোষের স্বপ্নপূরণ করতে অনুরাগী গুরমুখ রায়ের সহায়তায় শিষ্য বিনোদিনী দাসীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ, তাঁর সঙ্গে গোপন বিশ্বাসঘাতকতা উঠে এসেছে পরতে পরতে। এই ছবিতে রামকৃষ্ণ পরমহংস চরিত্রে একটা সারপ্রাইজ রেখেছিলেন পরিচালক। যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেতা, সাংসদ পার্থ ভৌমিক। এখনকার সময়ের পরিচালক রাইয়ের চরিত্রে ইশা সাহা খুব সাবলীল অভিনয় করেছেন। অপমানে বিনোদিনীর রঙ্গমঞ্চ চিরতরে ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সঙ্গে রাইয়ের অসম্পূর্ণ প্রেম এবং জীবনকে এক করে দেখানোটা বোঝা যায়। নিত্যানন্দ চরিত্রে যিশু সেনগুপ্তকে কেন ঠিকমতো ব্যবহার করলেন না পরিচালক জানা নেই। ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত বেশ ভাল। লক্ষ্মীপ্রিয়ার চরিত্রে নবাগত আরাত্রিকা মাইতি যতটুকু ছিলেন বলিষ্ঠ। এছাড়া সুজন মুখোপাধ্যায়, সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুস্মিতা চট্টোপাধ্যায়, অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়— সবাই যথাযথ। অভিনয়ে কারও কোনও খামতি নেই কিন্তু দৃশ্যপট বেশ দুর্বল। ছবির সুরকার ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। আবহসঙ্গীত দারুণ।
অরিজিৎ সিং, জয়তী চক্রবর্তী এবং পদ্মপলাশের গাওয়া গানগুলো অন্তর ছুঁয়ে যাবে। ‘ক্ষণে গোরাচাঁদ ক্ষণে কালা’, ‘দ্যাখো দ্যাখো কানাইয়ে’, ‘নয়নের জলে’ প্রতিটা গান অনবদ্য। সবশেষে বলা যায় লো বাজেটে বড় ভাবনা ঠিক ফলপ্রসূ হয় না— আর এই ছবি বোঝার দর্শক একটু সীমিত।

Latest article