স্কুলের অনুষ্ঠানে সাংসদ-বিধায়কদের উপস্থিতি এবার কি বাধ্যতামূলক হচ্ছে?

শিশুদের মনস্তত্ত্বকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের দিকে প্রভাবিত করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

Must read

নয়াদিল্লি: কেন্দ্রীয় আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রকের অধীনে থাকা একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুলগুলোতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাংসদ এবং বিধায়কদের অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর সাম্প্রতিক নির্দেশিকাটি শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে। ন্যাশনাল এডুকেশন সোসাইটি ফর ট্রাইবাল স্টুডেন্টস দ্বারা জারি করা এই সার্কুলারে বলা হয়েছে, বার্ষিক উৎসব, স্বাধীনতা দিবস, সাধারণতন্ত্র দিবস বা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোতে জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি সেইসব আয়োজনের ‘গুরুত্ব বৃদ্ধি’ করবে এবং শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে। তবে সরকারের এই পদক্ষেপকে শিক্ষার রাজনীতিকরণ এবং শিশুদের মনস্তত্ত্বকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের দিকে প্রভাবিত করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন-বঙ্গোপসাগরে চিনের তৎপরতা রুখতে হলদিয়ায় নতুন নৌঘাঁটি গড়ছে ভারত

তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দিক থেকে এই নির্দেশিকাটি খোদ জাতীয় শিক্ষানীতির মূল সুরের পরিপন্থী। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর ভিত্তিতে তৈরি ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ফর স্কুল এডুকেশন স্পষ্টভাবে জানায় যে, স্কুলের অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। সেখানে অভিভাবকদের কেবল দর্শক হিসেবে নয়, বরং বিদ্যালয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ন্যাশনাল এডুকেশন সোসাইটি ফর ট্রাইবাল স্টুডেন্টস-এর এই নতুন সার্কুলারে অভিভাবকদের গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষার অরাজনৈতিক পরিবেশকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, এর ফলে মূলত শাসক দলের সাংসদ ও বিধায়কদেরই আমন্ত্রণ জানানো হবে। সেক্ষেত্রে এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সরকারি সাফল্য এবং নিজেদের দলের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে বক্তৃতা দেবেন। আদিবাসী শিশুদের মতো সহজ-সরল ও বিকাশমান মস্তিষ্কের ওপর এই ধরনের রাজনৈতিক বয়ান চাপিয়ে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। এটি শিশুদের মধ্যে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শ ঢুকিয়ে দেওয়ার একটি পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বেসরকারি স্কুলগুলোতেও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তৃণমূল স্তরে আদিবাসী সমাজের সঙ্গে প্রশাসনের যোগসূত্র স্থাপনের কথা বলা হলেও সমালোচকদের মতে, এই নির্দেশিকা শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির চেয়ে সরকারি প্রচারের ক্ষেত্র তৈরিতেই বেশি সহায়ক হবে। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক মেলা যেখানে ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীলতা প্রকাশের জায়গা হওয়ার কথা, সেখানে রাজনৈতিক অতিথিদের দীর্ঘ বক্তৃতা এবং প্রটোকল বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই ধরনের পদক্ষেপ স্কুলগুলোকে রাজনৈতিক কর্মসূচির এক একটি অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে নিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি।

Latest article