বাংলা সাহিত্যের মহাপার্বণ

রবীন্দ্রসদন-নন্দন-বাংলা আকাদেমি প্রাঙ্গণে চলছে ‘সাহিত্য উৎসব ও লিটন ম্যাগাজিন মেলা’। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত এই আয়োজন প্রাণসঞ্চার ঘটিয়েছে লেখক-পাঠকের মনে। ঘুরে এসে লিখলেন অংশুমান চক্রবর্তী

Must read

ছোট ছোট আড্ডা। আলাপ-পরিচয়। চায়ের তুফান। বই-পত্রিকার হাতবদল। কবিতা। গান। আলোচনা। নিজস্বী। সমস্তকিছু নিয়ে এই মুহূর্তে জমজমাট কলকাতার রবীন্দ্রসদন-নন্দন-বাংলা আকাদেমি প্রাঙ্গণ। উপলক্ষ ‘সাহিত্য উৎসব ও লিটন ম্যাগাজিন মেলা ২০২৬’। বাংলা ভাষার এই বৃহত্তম সাহিত্য পার্বণ শুরু হয়েছে ৯ জানুয়ারি। আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি।

আরও পড়ুন-ই-রিকশা বা টোটো নথিভুক্তির সময়সীমা বাড়াল রাজ্য সরকার

উদ্বোধন করেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও ছিলেন কবি সুবোধ সরকার, সাহিত্যিক আবুল বাশার, সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্ত, প্রকাশক সুধাংশুশেখর দে, কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি প্রসূন ভৌমিক, বিভাগের আধিকারিক কৌস্তুভ তরফদার, আকাদেমির সচিব বাসুদেব ঘোষ প্রমুখ। সভামুখ্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি ব্রাত্য বসু। প্রকাশিত হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের উপর একটি বই ও সাময়িক পত্রের সংকলন। নবস্পন্দন গ্রন্থমালায় এইবছর বেরিয়েছে মামনি সরকার ও ওয়াহিদা খন্দকরের কবিতা এবং রঙ্গন রায় ও তন্ময় মণ্ডলের গল্পের পুস্তিকা। অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয়েছে আকাদেমির বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা। মেলা চলবে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত।
এবার অংশগ্রহণ করছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৫০০ লিটল ম্যাগাজিন। পাশাপাশি আছে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের স্টল। যেমন, সাহিত্য অকাদেমি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, বইঘর, নন্দন, বসুমতী, মিনার্ভা নাট্য সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি, রাজ্য সঙ্গীত আকাদেমি, পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা আকাদেমি, শিশু কিশোর আকাদেমি, পশ্চিমবঙ্গ দলিত সাহিত্য আকাদেমি, তথ্য অধিকার, প্রত্নতত্ত্ব অধিকার, লোক সংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ, রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, রাজ্য চারুকলা পর্ষদ, বঙ্কিম ভবন, কলকাতা পুরসংস্থা এবং পাবলিশার্স ও বুকসেলার্স গিল্ড, উদ্বোধন ইত্যাদি। প্রতিটি স্টলেই চোখে পড়ছে পাঠকের উন্মাদনা। বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, বিক্রি হচ্ছে ভালই।

আরও পড়ুন-প্রশাসনের উদ্যোগে নৌবাইচ প্রতিযোগিতায় বিপুল সাড়া

ভিড় দেখা যাচ্ছে ‘পুরবৈঁয়া’, ‘আবার বিজল্প’, ‘অবমানব’, ‘উদার আকাশ’, ‘কলকাতার যিশু’, ‘বান্ধবনগর’, ‘প্রোরেনাটা’, ‘অনুভূতি’, ‘তকমিনা’, ‘অঙ্কুরীশা’, ‘বৃষ্টিদিন’, ‘খেয়া৯’, ‘তিতীর্ষু’, ‘চারণ’, ‘উড়োচিঠি পত্রিকা’, ‘কবিতা পাক্ষিক’, ‘শব্দহরিণ’, ‘লুব্ধক’, ‘উত্তরপক্ষ’, ‘প্রাতিস্বিক’, ‘ইদানীং’, ‘সপ্তধা’, ‘পুরুষকথা’, ‘মৃদঙ্গ’, ‘ইসক্রা’, ‘মহুলবন’, ‘ঝোড়োহাওয়া’, ‘বনানী’, ‘প্লাটফর্ম’, ‘ছায়াবৃত্ত’, ‘অনঘ’, ‘রাবণ’, ‘পদ্য’, ‘উপলব্ধিকথা’, ‘কাব্যপথিক পত্রিকা’, ‘খেয়া’, ‘অচিন পাখি’, ‘গ্রামীণ পুঁথি’, ‘টার্মিনাস’, ‘এবং সইকথা’, ‘আলো’, ‘তাবিক’, ‘বইওয়ালা’, ‘টংঘর’, ‘পরিধি ছাড়িয়ে’, ‘গুহালিপি’, ‘ইলশেগুঁড়ি’, ‘শব্দবাউল’ প্রভৃতি পত্রিকার টেবিলে। চলছে কেনাকাটা। ক্রেতাদের মধ্যে কেউ খুঁজছেন সিরিয়াস প্রবন্ধের বই, কেউ খুঁজছেন গল্প-কবিতা-ছড়া, উপন্যাস-নাটকের বই। আছে কয়েকটি ছোটদের পত্রিকাও। পাঠকদের উঁকিঝুঁকি দেখা যাচ্ছে ‘ফজলি’, ‘আনন্দকানন’, ‘ছোটর দাবি’, ‘কচিকাঁচা সবুজসাথী’, ‘টাট্টুঘোড়া’, ‘ছোটদের মিষ্টিকথা’, ‘শরৎশশী’ প্রভৃতি পত্রিকার টেবিলে।
প্রতিদিন থাকছে নানারকমের অনুষ্ঠান। একতারা মুক্তমঞ্চ, বাংলা আকাদেমি সভাঘর, জীবনানন্দ সভাঘর, অবনীন্দ্র সভাঘরে। এবার কবিতাপাঠ, আলোচনাসভায় অংশ নিচ্ছেন ৯০০-র বেশি কবি-সাহিত্যিক। বিভিন্ন লেখকের গল্প পাঠ করছেন বাচিক শিল্পীরা। শনিবার একতারা মুক্তমঞ্চে নলিনী বেরা এবং অমর মিত্র-র গল্প পাঠ করেন রজতাভ দত্ত এবং বিন্দিয়া ঘোষ।
কবি-সাহিত্যিকের নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন জেলাকে। উত্তরবঙ্গ থেকে এসেছেন অনেকেই। এসেছেন জঙ্গলমহল থেকেও। অংশ নিচ্ছেন তাঁরা। কবিতা পড়ছেন। আলোচনা করছেন। প্রবীণদের পাশাপাশি আছেন নবীন লেখকরাও। তালিকায় আছে এমন কিছু নাম, যাঁরা এই উৎসবে আমন্ত্রণ পেলেন প্রথমবার।

আরও পড়ুন-ঘন কুয়াশায় বিঘ্ন হতে পারে পরিবহণ পরিষেবা

উৎসবের অঙ্গ হিসেবে গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় আয়োজিত হয়েছে একটি বিশেষ প্রদর্শনী। শিরোনাম ‘মহাশ্বেতা দেবী : শতবর্ষের শ্রদ্ধার্ঘ্য’। গবেষণা ও সামগ্রিক দৃশ্যবিন্যাসে শোভন তরফদার। উদ্বোধন করেছেন মন্ত্রী ব্রাত্য বসু। এখানেও দেখা যাচ্ছে দর্শক সমাগম। প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি ছিলেন সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী।
মেলা উপলক্ষে কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা। প্রতিদিন কিছু পত্রিকার টেবিল ঘিরে আয়োজিত হচ্ছে বই-পত্রিকা প্রকাশ অনুষ্ঠান। অনেকেই পাঠ করছেন কবিতা, রাখছেন বক্তব্য, গাইছেন গান। উঠছে দেদার ছবি। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
মাটির গানের সুরে সুরে শেষ হচ্ছে প্রতিটি সন্ধ্যা। ঘোরাঘুরির শেষে অনেকেই চেয়ার টেনে নিচ্ছেন একতারা মুক্তমঞ্চের সামনে। শ্রোতাদের দলে মিশে যাচ্ছেন লেখক-সম্পাদকরাও। সবমিলিয়ে পৌষের হাড় কাঁপানো শীতে গত দু’দিন সাহিত্যের এই মহাপার্বণ উষ্ণতা ছড়িয়েছে, প্রাণসঞ্চার ঘটিয়েছে লেখক-পাঠকের মনে। সবাই মেতে উঠেছেন বাঁধভাঙা উন্মাদনায়। আজ, রবিবার, পাঁচদিনের মেলার তৃতীয়দিন, উন্মাদনা ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছবে, আন্দাজ করাই যায়।

Latest article