বৈদেশিক বাণিজ্যে ধারাবাহিকতা পশ্চিমবঙ্গের অগ্রগমনের অনন্যতা

কলকাতা বিমানবন্দর থেকেও ১৭.২৬ শতাংশ পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এছাড়াও পেট্রাপোল সীমান্ত থেকে ৭.১১ শতাংশ পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ভারতবর্ষ থেকে প্রধান যে সকল দ্রব্য রপ্তানি হয় তার মধ্যে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, প্যাকেজড ঔষধ, অলংকার, টেলিফোন, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য অন্যতম। এই সকল পণ্যগুলো পশ্চিমবঙ্গের রপ্তানির লিস্টে অনেকটাই বর্তমান। তাও নাকি বাংলা বাণিজ্যে পিছিয়ে! অপপ্রচারের জবাব দিতে কলম ধরেছেন অধ্যাপক ড. রূপক কর্মকার

Must read

কোন দেশের বহিঃবাণিজ্য বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাফল্য অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক। বাণিজ্য সাধারনত প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, প্রযুক্তির আদান প্রদান, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সাহায্য করে শুধু নয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধিও আনে। তবে সবটাই বাণিজ্যের পরিমাণ ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা বা বাজারের বৈচিত্রের অভাব ঝুঁকি ও তৈরি করতে পারে। সাধারণত বহি:বাণিজ্য একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলেও, এর সুফল পুরোপুরি পেতে হলে উৎপাদনশীলতার বৈচিত্র আনা এবং আমদানি-রপ্তানির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। পরিসংখ্যান বলছে বর্তমানে বিশ্বে পণ্য দ্রব্য রপ্তানিতে ভারতের অংশীদারত্ব প্রায় ২ শতাংশ। তবে এই অংশীদারত্ব কোন একটি রাজ্যের উপর নির্ভর করে হয় নি। বিভিন্ন রাজ্যের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ভারতবর্ষের স্থান বৈদেশিক বাণিজ্যে সুদৃঢ় হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি সুদৃঢ় ভূমিকা পালন করে। বিশেষত রাজ্যের সমৃদ্ধ শিল্প, কৃষি সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের উপর ভিত্তি করে বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নতি যেন ব্যবসায়িক সাফল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি করেছে। বেশ কিছু পণ্য আছে যেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ সুনাম অর্জন করেছে।

আরও পড়ুন-স্বামী বিবেকানন্দের সর্বজনীন সম্প্রীতির বার্তা চিরন্তন পথপ্রদর্শক: শ্রদ্ধায়-স্মরণে বার্তা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের

ট্যানারি শিল্পের কারণে পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদিত চামড়া ভারতবর্ষের পণ্য রপ্তানিতে বড় অংশীদারের ভূমিকা পালন করে। এছাড়া দার্জিলিং ও ডুয়ার্সের চা বিশ্ববাজারে বেশ সমাদৃত। ভারতবর্ষের যে কয়েকটি সুপ্রসিদ্ধ দ্রব্য বৈদেশিক বাজারে রপ্তানি হয় চা তারমধ্যে অন্যতম। সংযুক্ত আরব এমিরেটস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেপাল, ভুটান ও চীনের মত দেশগুলো পশ্চিমবঙ্গের পণ্যের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। কৌশলগত অবস্থানের কারণে পশ্চিমবঙ্গ ব্যবসা-বাণিজ্যের বহুল সুবিধা ভোগ করে থাকে। বিশেষত নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশের সীমানা কাছাকাছি থাকার ফলে পণ্য রপ্তানির খরচ খুব কম হয় এতে লাভের পরিমাণ ও বেশি হয়। ভারতবর্ষের বাণিজ্য মন্ত্রক দ্বারা প্রতিষ্ঠিত FIEO (Federation of Indian Export Organisation) থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ থেকে রপ্তানির পরিমাণটা ছিল ১১.৬৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রপ্তানির পরিমাণটা বেড়ে হয়েছে ১২.৬৭ বিলিয়ন ইউএস ডলারের। ভারতবর্ষের যে দশটি রাজ্য থেকে সর্বাধিক রপ্তানি হয় তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অন্যতম।
২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের স্থান যেখানে ছিল দশম, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তা এক ধাপ উন্নীত হয়ে নবম-এ এসেছে। ভারতবর্ষ থেকে যে পরিমাণ পণ্য বিদেশের বাজারে রপ্তানি হয় তার ২.৮৯ শতাংশ পণ্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে রপ্তানি হয়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে দশটি দেশে সর্বাধিক পণ্য রপ্তানি করা হয় তারমধ্যে প্রথম পাঁচটি দেশ হলো সংযুক্ত আরব এমিরেটস (১৬.২৬%), বাংলাদেশ(১৩.৫৮%), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৯.২১%), নেপাল (৮.৪১%) ও ভুটান (৫.০৬%)। ভারতবর্ষ থেকে মোট ১৬৯ ধরনের দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি হয়। এই ১৬৯ টি দ্রব্যের মধ্যে প্রায় ১৬১ টি পণ্য পশ্চিমবঙ্গের রপ্তানির লিস্টে বর্তমান। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল চাল, পেট্রোলিয়াম দ্রব্য, চামড়ার জিনিস, লোহা, স্টিল, সোনার অলংকার, সামুদ্রিক দ্রব্য, অর্গানিক কেমিক্যাল, চা ইত্যাদি।

আরও পড়ুন-চা-বাগানের পিএফ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের দাবিতে আজ গর্জে উঠবে আইএনটিটিইউসি

বঙ্গোপসাগরের নৈকট্য বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে আরও সহজ করে তুলেছে পশ্চিমবঙ্গের বাণিজ্যিক পরিস্থিতিতে। বর্তমানে রাজ্য সরকারের তৈরি উন্নত সড়ক ব্যবস্থার দরুন জলপথ, স্থলপথ ও আকাশ পথের সংযোগস্থাপন আরও সহজতর হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে মোট রপ্তানির ৩৯.৪৮ শতাংশ পণ্য রপ্তানি কলকাতা বন্দর থেকে হয়েছে। এমনকি কলকাতা বিমানবন্দর থেকেও ১৭.২৬ শতাংশ পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এছাড়াও পেট্রাপোল সীমান্ত থেকে ৭.১১ শতাংশ পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ভারতবর্ষ থেকে প্রধান যে সকল দ্রব্য রপ্তানি হয় তার মধ্যে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, প্যাকেজড ঔষধ, অলংকার, টেলিফোন, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য অন্যতম। এই সকল পণ্যগুলো পশ্চিমবঙ্গের রপ্তানির লিস্টে অনেকটাই বর্তমান।
বিগত একদশকে পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসা বাণিজ্যের চেহারা অনেকটাই বদলেছে। সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও উৎপাদনশীলতার ওপর ভর করে বিশ্বব্যাপী পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান বেশ সুদৃঢ় হয়েছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ থেকে রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় ব্যপক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রভাব শুধু রাজ্যের অর্থনীতিতেই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে।

Latest article