ভারতীয় জুমলা পার্টি জল মেশাচ্ছে জিডিপিতে

মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম দিকে একটি কমিটি গড়ে দেশের জিডিপি’র হার জানতে চায়। দেখা যায় ভারতের জিডিপি’র হার আগের আমলের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে না। বিজেপি সরকার এই রিপোর্ট মানেনি। পরিসংখ্যান দফতরের মাধ্যমে পরবর্তীতে জিডিপি মাপলেও তাতে নিজেদের লোক বসিয়ে জিডিপিতে জল মিশিয়ে চলেছে। মিথ্যের পর্দা ফাঁস করতে লিখলেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবনারায়ণ সরকার

Must read

বাজেটের আগে জানা দরকার মোদির আমলে জিডিপি মাপার পদ্ধতি কতখানি ত্রুটিপূর্ণ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘অরূপরতন’ নাটকে বলেছিলেন, ‘ফন্দি জিনিসটা খুব ভালো, যদি তার মধ্যে নিজে আটকে না পড়া যায়’। কার্যত, রবীন্দ্রনাথ বলতে চেয়েছেন, কৌশল প্রয়োগে এমনভাবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে নিজেকেই সেই ফাঁদে পড়তে না হয়। আসলে ভারতে মোদি সরকারের আমলে বছরের পর বছর দেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) পরিসংখ্যান এমন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হচ্ছে যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদেরা এই পদ্ধতিতে বড় মাপের ত্রুটি নির্দেশ করা সত্ত্বেও মোদি সরকার তাতে আমল দেয়নি। শেষ পর্যন্ত আইএমএফ তার সাম্প্রতিক রিপোর্টে ভারতের জিডিপি মাপার পদ্ধতিকে গুরুতর ত্রুটি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে সেটিকে ‘C’ গ্রেড হিসেবে নির্বাচিত করে। এটি তাদের চিহ্নিত চারটি গ্রেডের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অর্থাৎ তারা ভারতের জাতীয় আয় মাপার সামগ্রিক পদ্ধতিকে এমন কিছু মৌলিক দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে যা বিশ্বের নামকরা আন্তর্জাতিক সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গিতে গুরুতর ও যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। সাত বছর পূর্বে ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদির প্রাক্তন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন যে ভারতে বর্তমান সরকারের আমলে জিডিপি বৃদ্ধি ২.৫ শতাংশ বেশি করে দেখানো হচ্ছে। তখন বর্তমান সরকার একথায় আমলই দেয়নি। এখন আইএমএফের ঠেলায় মোদি সরকার বিশ্বের আস্থা অর্জনের জন্য বলতে বাধ্য হচ্ছে আগামীতে আইএমএফের নির্দেশিত ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হবে। অথচ অতীতে ভারতকে তথ্যের জাগলারি নিয়ে এত লজ্জায় পড়তে হয়নি।

আরও পড়ুন-সন্তোষের দল ঘোষণা বাংলার

১ ফেব্রুয়ারি বাজেটের আগে গত ৭ জানুয়ারি চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) ভারতে প্রকৃত জিডিপির সম্ভাব্য হার নিয়ে বড় ঘোষণা করল কেন্দ্রের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রক। এই পরিসংখ্যানের মধ্যে কতখানি প্রকৃত তথ্য এবং কতখানি জল সেটাই বড় প্রশ্ন দেশবাসীর কাছে। এবার তথ্যে আসা যাক। চলতি অর্থবছরে প্রকৃত হিসাবে ভারতীয় অর্থনীতি ৭.৪ শতাংশ হারে বাড়তে চলেছে বলে গত ৭ জানুয়ারি তাদের প্রকাশিত প্রথম অগ্রিম হিসাব (ফার্স্ট অ্যাডভান্সড এস্টিমেট) – এ জানিয়েছে জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর, গত বছর যা ছিল ৬.৫ শতাংশ। চলতি বছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ৬ মাসে ৮% এবং শেষ ৬ মাসে ৬.৮%, চলতি বছরের পরিষেবা ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাবে ৯.৯%। উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে ৭%। শিল্পখাতে ৭% এবং কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৩.১%। মোদি সরকার আগামী বাজেটে যেটা ভারতবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাইছে তা হল ট্রাম্প সাহেব ৫০% শুল্ক বসালেও ভারতের অর্থনীতি এগােচ্ছে দ্রুতগতিতে। গত বছর জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫%। এ বছরে বাড়বে ৭.৪%। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত বছরের চেয়ে চলতি অর্থ বছরে ভারতের জিডিপি অতিরিক্ত বাড়বে প্রায় ৯.৫%। এই তথ্যের মধ্যে যে অনেকটা ভোজবাজি রয়েছে সে প্রশ্নটাই তুলে দিল স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাটি (IMF)। ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটাই প্রশ্ন— ভারতের প্রকৃত জিডিপির মধ্যে কতখানি জল এবং কতখানি প্রকৃত তথ্য।
আইএমএফ ভারতের জিডিপির পরিমাপের ক্ষেত্রে যে মৌলিক ত্রুটিগুলো তুলে ধরেছে (যা মোদি সরকার অস্বীকার করতে পারেনি) তার কয়েকটি নিম্নে বিচার করা যাক। প্রথমত, ভারতের জিডিপি মাপার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুতর অভিযোগ ভিত্তিবর্ষ নিয়ে। এখনও মোদি সরকার ১৫ বছর আগে ২০১১-১২ অর্থবর্ষকে জিডিপি মাপার ভিত্তিবর্ষ হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছে। আইএমএফ মনে করে দীর্ঘ ১৫ বছরের মধ্যে ৩/৪ বার ভিত্তিবর্ষ বদল করা উচিত ছিল। তারা মনে করে বর্তমান খরচের ধারা, মানুষের ব্যয়ের অভ্যাস, উৎপাদন কাঠামোর পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং সেবাক্ষেত্রের আধিপত্য— এই পুরনো ভিত্তি বছরে মোটেই ধরা পড়ে না। প্রথমে নোট বাতিল, তারপর জিএসটি, এরপর ফিনান্সিয়াল ব্যঙ্কিং সেক্টরের সমস্যা, অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপর আঘাত, এরপর কোভিড মহামারী, এরপর পুনরায় অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপর আঘাত— এই পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে জিডিপি মাপার ভিত্তি বছর একাধিকবার পরিবর্তন করা উচিত ছিল বলে জোরালোভাবে মনে করে সংস্থাটি। নোট বন্দির সময় ৩ লাখ সংস্থাকে শেল কোম্পানি বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু পরিসংখ্যানে তার কোনও প্রভাব পড়েনি। সার্ভে অব সার্ভিস সেক্টরের জরিপের সময় দেখা গেছে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির ৩৫ শতাংশ কোম্পানি যেখানে লিস্টে ছিল, সেগুলো আর নেই। বিগত বছরগুলোতে অসংগঠিত ক্ষেত্রে বারবার বিরাট আকারের আঘাতে জর্জরিত হয়েছে, কিন্তু কোনও প্রভাব জিডিপিতে পড়েনি। তাই ১৫ বছর পূর্বের এই ভিত্তি বছরের উপর বর্তমানের জিডিপি পরিমাণ নিঃসন্দেহে ত্রুটিপূর্ণ।

আরও পড়ুন-‘অন্যায় ভাবে নাম কাটলে রুখে দাঁড়ান’ — এসআইআর নিয়ে নবান্নে বিস্ফোরক মুখ্যমন্ত্রী

দ্বিতীয়ত, জিডিপি মাপার পদ্ধতি বর্তমান সরকারের সময় বদলে ফেলা হয়েছে। দাম সূচক এমন এক অর্থনৈতির সূচক (এবং সঠিক সূচক) যা দেশীয় উৎপাদকদের তাদের উৎপাদনের জন্য প্রাপ্ত বিক্রয়মূল্যের গড় পরিবর্তনকে পরিমাপ করে। সমস্ত উন্নত দেশগুলোতে এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশে এই সূচকই ব্যবহার করা হয়। মোদির আমলে পাইকারি দাম সূচকেই জিডিপি মাপা হয়। অর্থাৎ যদি সরকার দেশের জিডিপি বৃদ্ধি দেখাতে চায়, তাহলে সরকারি ট্যাক্স বাড়িয়ে দিলেই হবে। তাই আইএমএফ মনে করে উৎপাদন দাম সূচকের পরিবর্তে প্রক্সি সূচক (পাইকারি দাম সূচক, যা মোদি সরকার চালু করেছে) কখনও জিডিপি’র প্রকৃত তথ্য দেয় না। মোদ্দা কথা, বাজেটের তথ্যে জল মেশানোর জন্য এই সূচক ব্যবহার করেছে মোদি সরকার।
তৃতীয়ত, আরও উদ্বেগের বিষয় হল, মোদি সরকার জিডিপি মাপার জন্য ব্যয় ভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করছে। আগে উৎপাদন ভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করা হত। এর ফলে গণনার ক্ষেত্রে বড় রকমের পার্থক্য ঘটছে। এক্ষেত্রেও আইএমএফ মনে করে তথ্যে জল মেশানোর সুযোগ থাকে।
চতুর্থত, মোদির আমলে জিডিপি পরিমাপের ক্ষেত্রে অসংগঠিত ক্ষেত্রের তথ্য (যেখানে দেশের ৮৫ শতাংশের বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়) সংগঠিত ক্ষেত্রের তথ্য দিয়ে অনুমান করা হচ্ছে। এক্ষেত্রেও তথ্যে জল মেশানো হচ্ছে। পঞ্চমত, ভারতে ত্রৈমাসিক যে জিডিপির তথ্য পরিমাপ করা হয় তাতে ঋতু অনুসারে সামঞ্জস্য করা হয় না, যা ফলত অসত্য তথ্য দেয়।
মোদির আমলে জিডিপি মাপার আরও অনেক ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছে আইএমএফ। এবার মোদি সরকার বলতে বাধ্য হয়েছে যে আইএমএফের নির্দেশিত ত্রুটিগুলি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেটানো হবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসছে যে গত ১৫ বছর যাবৎ মোদি সরকার যে তথ্য ও পদ্ধতির উপর দেশের জিডিপি হিসাব করে চলেছে তাতে যথেষ্ট ভুল ছিল এবং এই তথ্যে যথেষ্ট জল মেশানো ছিল।
এটা ঘটনা যে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম দিকে একটি কমিটি গড়ে দেশের জিডিপি’র হার জানতে চায়। তাতে দেখা যায় ভারতের জিডিপি’র হার কংগ্রেস আমলের চেয়ে বেশি দেখানো যাচ্ছে না। বিজেপি সরকার এই রিপোর্ট মানেনি। সরকার তখন নীতি আয়োগ দিয়ে জিডিপি মাপায়, যদিও নীতি আয়োগ জিডিপি মাপার অথরিটি নয়। দেশে শোরগোল ওঠায় পরিসংখ্যান দফতরের মাধ্যমে পরবর্তীতে জিডিপি মাপলেও তাতে তারা নিজেদের লোক বসিয়ে ক্রমশ জিডিপিতে জল মিশিয়ে চলেছে। অর্থাৎ ভারতের অতীতের স্বচ্ছ নীতিকে বিসর্জন দিয়ে বর্তমান সরকার নিজেদের মতো করে একটি পদ্ধতি তৈরি করে দেশের জিডিপি মেপে দেখিয়ে চলেছে যে কংগ্রেস আমলের চেয়ে বর্তমান আমলে জিডিপি’র হার অনেক অনেক বেশি। কার্যত, ম্যানিপুলেশন করে কীভাবে দেশের জিডিপি বেশি দেখানো যায় সেটাই সর্বদা চেষ্টা করে চলেছে মোদি সরকার।
বিশ্বের কাছে এই মৌলিক ত্রুটিপূর্ণ জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতির মাধ্যমে (যেটা মূলত ইচ্ছাকৃত) ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হচ্ছে ভারত জার্মানিকে ছাড়িয়ে বিশ্বে চতুর্থ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, যার জিডিপি প্রায় ৪.১৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০৩০ এর মধ্যে জার্মানিকে টপকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে উন্নীত হতে চলেছে ভারত। এটা কতখানি সত্য সেটাই এখন ভারতবাসীর কাছে প্রশ্ন। মোদি সরকারের ইচ্ছা যদি ম্যানিপুলেশন হয়, তাহলে আইএমএফ-এর উপরিউক্ত সমস্ত প্রক্রিয়াগুলি সম্পন্ন করলেও জিডিপি ডেটাতে আগামীতেও জল মেশানো হবে, এটা অনেকটাই নিশ্চিত।

Latest article