বয়স্কদের উষ্ণ রাখতে

হাড়কাঁপানো শীত আর উত্তুরে হাওয়া। দিনে দিনে বাড়ছে ঠান্ডা। এই সময় সবচেয়ে জেরবার বাড়ির বয়স্করা। জবুথবু, প্রায় চলচ্ছক্তিরহিত, কোষ্ঠকাঠিন্য, অখিদে— সবমিলিয়ে বাঁচার ইচ্ছেটাই যেন অস্তমিত! কী করে ভাল রাখবেন তাঁদের? রইল তার গাইডলাইন। লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

প্রবল শীত। তাপমাত্রার পারদ নিচে নামছে ক্রমাগত সঙ্গে উত্তুরে হাওয়া। শহরের আশপাশ অঞ্চল, মফস্বলের দিকে ঠান্ডা বেশি পড়েই কিন্তু এবার খোদ জনবহুল শহর কলকাতা শীতজ্বরে কাবু। এতটাই ঠান্ডা যে সুয্যিমামাও মাঝে মাঝে বেরচ্ছেন না! প্রায়শই রোদহীন দিনের শুরু হচ্ছে। রাত থেকেই ঘন জমাট কুয়াশা।
আট থেকে আশি সবাই কাবু কিন্তু সবচেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন বয়স্করা।
শীতে কেন বয়স্কদের বিপত্তি
শীতকালেই বয়স্কদের মৃত্যু হার বেশি। এর কারণ আমাদের প্রত্যেকের শরীরের নিজস্ব একটা তাপ তৈরির ক্ষমতা থাকে সেটা ততক্ষণ থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রয়েছে কিন্তু বয়স্ক মানুষদের সেই অ্যাক্টিভিটি থাকে না ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীরে সেই তাপ তৈরির ক্ষমতাও কমে যায়। সেই কারণে বয়স্ক শরীর ঠান্ডা নিতে পারেন না। এর মধ্যে যেসব বয়স্ক মানুষ রোগগ্রস্ত ডায়াবেটিস, হাইপ্রেসার, হার্টের রোগ, ক্যানসার, পারকিনসন, নিউমোনিয়া, কোমর এবং পিঠে ক্রনিক ব্যথা, ক্রনিক সিওপিডি, হাঁপানি, ফুসফুসের সমস্যা রয়েছে,আর্থ্রাইটিস রয়েছে তাঁদের প্রাণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

আরও পড়ুন-খনিতে ধস নেমে মৃত ৩, আশঙ্কা আটকে একাধিক

কী হয় ঠান্ডায়
প্রেসার হু হু করে বাড়ে কোনও কারণ ছাড়াই, পালস অনেকটাই বেশি থাকে, প্রায় জবুথবু অবস্থা হয়ে যায়, শরীরে কোনও বল থাকে না, সকালের ঘুম থেকে কিছুতেই যেন উঠতে সক্ষম হন না। হয়তো জেগে রয়েছেন কিন্তু তা-ও শুয়ে রয়েছেন। যাঁদের আর্থ্রাইটিস রয়েছে তাঁদের ব্যথা বেড়ে হয় দ্বিগুণ। গাঁটে-গাঁটে ব্যথায় চলচ্ছক্তি রহিত অবস্থা হয়। হেঁটে রোদে যাওয়ার মতো অবস্থা তাঁদের থাকে না, বাড়ির অন্য সদস্যরা হয়তো কাজেকর্মে বেরিয়ে গেছেন ফলে তাঁদের রোদে নিয়ে যাওয়ার কেউ থাকে না অনেক সময়। এতে সারাদিনের অ্যাক্টিভিটি আরও কমে যায়। স্নানটাও হয়তো করতে পারছেন না কারণ শরীর নেবে না সেই ঠান্ডা কিছুতেই। বেশিরভাগ সময় শুয়ে কাটাচ্ছেন। এক্ষেত্রে বডি মুভমেন্ট হচ্ছে না শরীরে সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
হঠাৎ আসতে পারে বিপদ
এই সময় ভোরের দিকে বয়স্কদের ব্লাড প্রেসার বেড়ে থাকে এর ফলে হঠাৎ করে স্ট্রোকের সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যায়। শীতে শিরা সংকুচিত থাকে ফলে মস্তিষ্কে রক্ত কম পৌঁছয় এবং প্রেসার বাড়তে থাকে— মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এইসময় হাইপোথার্মিয়া হতে পারে এই অবস্থায় শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের চেয়ে কম বা ৯৫-এর নিচে নেমে গেলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এমন জটিলতায় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। খুব কাঁপুনি হচ্ছে দেখলে দ্রুত শরীর গরম করার ব্যবস্থা করুন।
অবধারিতভাবে বাওয়েল মুভমেন্টে একটা বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয় বয়স্কদের। কম অ্যাক্টিভিটির জন্যেই এটা হয়, এর ফলে খিদে তেমন থাকে না আর শরীরে খাবার না গেলেও সেই তাপ তৈরি হবে না। ফলে ঠান্ডায় দ্রুত কাবু হয়ে পড়বেন বয়স্করা।
বয়স্করা অনেকসময় ওষুধ খান না— ভুলে যান। শীতেও মাথা কাজ করে না, মনে রাখতে পারেন না যেটা ক্ষতিকর। এর ফলে প্রিকশন নিলেও কাজ হয় না। এই সময় জ্বরজারি এলে যেটা সবার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয় সেটা বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে উঠতেই পারে। সংক্রমণ বাড়তে পারে, শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
এইসময় যেসব বয়স্ক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন তাঁরা সিভিয়র শ্বাসকষ্ট নিয়েই ভর্তি হন। যাঁরা আগে ধূমপায়ী ছিলেন তাঁদেরও পরবর্তীতে বড় ধরনের সমস্যা হয়ে যায়। তাই ভ্যাকসিন সবসময় নিউমোনিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা দুটোই নিয়ে নেওয়া দরকার যাঁদের বয়স পঞ্চাশের ওপর। এগুলো নিলে কিছুটা হলেও এক আধটা ভাইরাস থেকে মুক্তি মেলে।

আরও পড়ুন-খসড়ায় ‘মৃত’! ১০ ‘ভূত’কে কোচবিহারের সভামঞ্চে আনলেন অভিষেক, খোঁচা কমিশনকে

কী কী করণীয়
শীতে আমি কাবু হয়ে যাব না। মাফলার, সোয়েটার, চাদর— সব যা আমার প্রয়োজনীয় ব্যবহার করব এই মানসিক স্থিতিটাকে বয়স্ক মানুষের নিজের মধ্যে আনতে হবে।
বাড়ি হোক বা ফ্ল্যাট, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এই সময় না ঢুকলেই ভিতরটা স্যাঁতসেঁতে সেই সঙ্গে রাতে হিমশীতল মেঝেতে পা দেওয়া দুষ্কর। জামা, কাপড় এমনকী বালিশ, তোশক, কম্বল, লেপ— সব ঠান্ডাজল। বাটি, ঘটি সব ঠান্ডা। সবচেয়ে কঠিন হল জল খাওয়া। হাড়কাঁপানো শীতে প্রাথমিক এবং প্রধান একটাই সুরক্ষা তা হল কীভাবে তাঁদের গরম রাখবেন। হাজার, দুহাজার ওয়াটের দামি রুম হিটার কিনতে হবে তার কোনও মানে নেই কিন্তু। ঘরের মাপ অনুযায়ী সন্ধের পর একটা দুশো কি তার বেশি পাওয়ারের বাল্ব লাগিয়ে দিন। তারপর, দেখুন ঘর কেমন নিমেষে গরম হয়ে যায়।
এই সময় খাবার জল একটু গরম করে দিন। প্রচণ্ড শীতে শিরা-উপশিরা সংকুচিত হয়ে থাকে এতে রক্ত চলাচল বাধা পায়, মস্তিষ্কে রক্তচলাচল স্বাভাবিক না হলেই বিপত্তি, হালকা গরম জল খেলে শিরা উপশিরার সংকোচন হবে না।
লেপ, কম্বল তোশক দিনে সূর্যের আলোয় এপিঠ ওপিঠ করে তাতিয়ে রাখুন। পাঢাকা পোশাক পরান। পা গরম থাকলে শরীর গরম হবে। ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে কাপড় পরাবেন না। সেগুলোও রোদে রাখুন।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন করলা, টম্যাটো, ব্রকোলি, ক্যাপসিকাম, পালংশাক, বাঁধাকপি, কমলালেবু, পেয়ারা এবং ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার, যেমন— ডিম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তবে হাইপ্রেসার থাকলে দিনে একটাই ডিম চলতে পারে। মাঝেমধ্যে কুসুমটা বাদ দিতে পারেন। দুধ, দই, পনির দেওয়া যেতে পারে চিকিৎসকের পরামর্শে।রাতে হালকা সহজপাচ্য খাবার দিন। স্যুপ বা স্ট্যু দিন শরীর গরম থাকবে।

Latest article