এসআইআর আসলে কী? সাইলেন্ট ইন্টিগ্রেটেড রিগিং নাকি সাউন্ড অফ ইমেজারেবল রাভেজেস?

ভোট-চোররা অতি-সক্রিয়। অকারণে হেনস্থা বাড়ছে। বাড়ছে এসআইআরের কারণে মৃতের সংখ্যাও। এই এসআইআর আসলে কী? লিখছেন সঙ্গীতা মুখোপাধ্যায়

Must read

এসআইআর যে স্পেশাল ইন্টেসিভ রিভিশন বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নয়, সেটা আগেই বোঝা গিয়েছিল। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে।
প্রথম প্রথম মনে হচ্ছিল, এই এসআইআর প্রক্রিয়া হল সাইলেন্ট ইন্টিগ্রেটেড রিগিং বা নীরব নিবিড় ভোট জালিয়াতি।
এখন এই মাঘের গোড়ায় এসে মনে হচ্ছে, এ হল সাউন্ড অফ ইমেজারেবল রাভেজেস অর্থাৎ অপরিমেয় ধ্বংসের শব্দ।
যদি মনে হয়, ভুল কিছু বলছি, তাহলে, দয়া করে অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যগুলো ঝালিয়ে নিন। দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে যাবে।
শুধু গত কয়েকদিনের ঘটনা।

আরও পড়ুন-চকৌরির হাতছানি

১৪ জানুয়ারি, ২০২৬।
বাঁকুড়ার খবর : খাতড়া মহকুমার ঘটনা। ফর্ম-৭ বোঝাই গাড়ি আটক। পুলিশের হাতে গ্রেফতার বিজেপির তিন কর্মী। ধৃতদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, বেআইনি ভাবে সরকারি নথি নিয়ে যাওয়া, সরকারি নথি জালিয়াতি ও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় নথি জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-এর ৩১৮(২), ৩১৯ (২), ৩৩৬(২), ৩৩৮, ৩৩৯, ৩৪০(২) এবং ৬১(২) নম্বর ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ। ভোটার তালিকায় কোনও নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করা বা মৃত বা স্থানান্তর হওয়া ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে ব্যবহৃত হয় ‘ফর্ম-৭’। সেগুলো গাড়িতে বহন করার ‘অপরাধে’ বিজেপির দলীয় কর্মীদের গ্রেফতারি।
ধৃতেরা জামিন-পাওয়া মাত্র আদালত চত্বরেই ভোট চোরদের মিছিল। ভাবখানা এমন যেন, আদালতে জামিন হওয়ার অর্থ ধৃতেরা নির্দোষ!
ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ। কে বা কারা ‘ফর্ম-৭’ পূরণ করে জমা দেওয়ার চেষ্টা করছিল তা পুলিশ তদন্ত করে দেখবে। তারপর এর বিচার হবে।
ওই ১৪ জানুয়ারির আর-একটি ঘটনা।
ঘটনাস্থল পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া শহর।
স্কুলশিক্ষক এবং বিএলও স্বামী খাওয়াদাওয়া সেরে কাজে বেরিয়েছিলেন। দুপুরে ভাতঘুম দিচ্ছিলেন স্ত্রী। নিশ্চিন্ত দুপুরে হঠাৎ ছন্দপতন। হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন কর্তা। বাড়িতে ঢুকেই স্ত্রীর হাতে এসআইআর শুনানির নোটিশ ধরালেন তিনি। সঙ্গে নিজেও নিজেকে একটি নোটিশ দিলেন। হতভম্ব স্ত্রী খানিকক্ষণ অনিমেষে চেয়ে রইলেন স্বামীর দিকে।
বিএলও-স্বামী ব্যাখ্যা করলেন, এ সবই এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)-এর কারণে তৈরি হওয়া ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র খেলা।
বিএলও দেবশঙ্কর জানিয়েছেন, তাঁর বাবার নাম পুলকেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নামের বানান সঠিক ছিল। কিন্তু এ বার ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (যুক্তিগত গরমিল)-র কারণে পদবির বানান ভুল দেখানো হয়েছে। অন্য দিকে, স্ত্রীর বাপের বাড়ি নদিয়ার নাকাশিপাড়া থানার মাঝেরগ্রামে। তাঁর বাবার নাম অনিল চট্টোপাধ্যায়। সেই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র কারণে বাবা-মেয়ের বয়সের পার্থক্য হয়েছে ৫০ বছর। তাই তাঁকেও নোটিশ দিয়েছে কমিশন।
নোটিস পাওয়ার পর অনিন্দিতার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া বিশেষ ‘তাৎপর্যপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘নোটিসেই লেখা রয়েছে, কোনও প্রশ্ন থাকলে বিএলও-কে জিজ্ঞাসা করতে হবে। আমার স্বামীই এই বুথের বিএলও। নোটিশ তো তিনিও পেয়েছেন।’
এসআইআর কোন হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।

আরও পড়ুন-দলবদলুকে পাল্টা জবাব দেবাংশুর প্রতিবাদ-মিছিল পরিণত জনজোয়ারে

এর মধ্যেই চলে এসেছে নির্বাচন কমিশনের ফতোয়া। একেবারে মরার উপর খাঁড়ার ঘা! এমনিতেই এসআইআরের কাজের চাপে মাস দুয়েক ধরে নাজেহাল ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরওরা। তার উপর এবার তাঁদের জন্য কমিশনের নয়া ফতোয়া। তাতে বলা হয়েছে, চলতি মাস, অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারির মধ্যে শুনানি প্রক্রিয়ার যাবতীয় কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। কমিশনের এই তুঘলকি কাণ্ডে রীতিমতো দিশাহারা শুনানির মূল দায়িত্বে থাকা এই ডব্লুবিসিএস আধিকারিকরা।
কারণ, এসআইআরের মূল নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল শুনানি শেষের সময়সীমা। তার সাতদিন পর, অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা। কিন্তু তার অনেক আগে শুনানি প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ করার ফরমান জারি হয়েছে।
অথচ, বর্তমানে যা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে এই নির্দেশ কার্যকর বাস্তবে একরকম অসম্ভব। নো-ম্যাপ ভোটার-সহ যে সংখ্যক সন্দেহজনক ভোটারের নোটিশ ইস্যু করে শুনানি করতে হবে, তাতে স্বাভাবিক বিজ্ঞানের নিয়মেই এত অল্প সময়ে কাজ শেষ সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত সময়েও এই কাজ শেষ করা যাবে কিনা সন্দেহ। জানাচ্ছেন অন্য কেউ নয়, খোদ ইআরওরা।
এখনও পর্যন্ত ৬৫ লক্ষ ৭৮ হাজার ৫৮টি শুনানির নোটিশ তৈরির কাজ শেষ হলেও ভোটারদের পাঠানো হয়েছে তার অর্ধেকেরও কম— ৩২ লক্ষ ৪৯ হাজার ৫১টি। এখনও বিপুল সংখ্যক নোটিশ তৈরিই হয়নি। শুনানির ক্ষেত্রেও এক চিত্র। রাজ্য জুড়ে এ-পর্যন্ত মাত্র ৯ লক্ষ ৩০ হাজার ৯৯৩ জন ভোটারের শুনানি সম্পন্ন করা গিয়েছে। দুই ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়ার মতো জেলায় নোটিশ পৌঁছানো থেকে শুরু করে শুনানি প্রক্রিয়ায় বড় ফাঁক রয়ে গিয়েছে। এক একজনের শুনানি শেষ করতে লেগে যাচ্ছে বিস্তর সময়।
এই পরিস্থিতিতে এমন নির্দেশ সম্পূর্ণ অবাস্তব বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। তাঁদের যুক্তি, এই বিপুল সংখ্যক সন্দেহজনক ভোটারের তথ্য আগেই সঠিকভাবে সংগ্রহ করে যাচাই করা হলে, এত সংখ্যক শুনানির প্রয়োজন পড়ত না। কিন্তু বিএলওদের স্বল্প সময়ের মধ্যে এইসব সন্দেহজনক ভোটারদের নথি সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। বিএলওরা সেই তথ্য সংগ্রহ করে অ্যাপের মাধ্যমে আপলোড করলেও, তা যাচাইয়ের পর্যাপ্ত সময় মেলেনি। ফলে বিপুল সংখ্যক সন্দেহজনক ভোটারকে এখন শুনানির জন্য ডেকে পাঠাতে হচ্ছে ইআরওদের। শুনানি কেন্দ্র বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও ২ হাজার মাইক্রো অবজার্ভারকেও শুনানির কাজে নিয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু তাতেও কমিশনের এই তুঘলকি ফরমান কার্যকর করা পুরোপুরি অসম্ভব বলেই মনে করছেন ইআরওরা।
এর মধ্যেই চলেছে মৃত্যুমিছিল, এসআইআর-এর কারণে।

আরও পড়ুন-আগামী সপ্তাহে বাড়বে তাপমাত্রা

অনিতা বিশ্বাস উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ার বাসিন্দা। ১৯৯৫ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর মায়ের নাম থাকলেও অজ্ঞাত কারণে ২০০২ এর লিস্টে পাওয়া যায়নি। এসআইআর শুনানিতে ডাক পান তিনি। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি শুনানিতে হাজির হন অনিতা বিশ্বাস ও তাঁর পরিবার। সেই দিন প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়া হলেও আধিকারিকদের তরফে কোনও স্পষ্ট উত্তর বা আশ্বাস দেওয়া হয়নি। অনিতা হতাশায় ভুগছিলেন। বারবার বলছিলেন, শেষ বয়সে যদি জেলে যেতে হয়! এরপর ৭ জানুয়ারি অনিতাদেবীর স্ট্রোক হয়। রবিবার মৃত্যু।
এরকম অজস্র মৃত্যুর জন্য দায়ী ভ্যানিশ কুমারের কমিশন।
নিজ দেশের বৈধ নাগরিকদের ওপর এই নৃশংস অভিযান অবিলম্বে বন্ধ হোক।

Latest article