ভয়ঙ্কর এসআইআর বন্ধ হওয়া দরকার

গ্রাম উজাড় করে শুনানির নোটিশ, সংখ্যালঘু-তফসিলি মহল্লায় ঘোর আতঙ্ক, পুরুষ ভোটারদের তুলনায় বেশি সংখ্যায় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের সুবিধা প্রাপকদের নাম বাদ, রাজ্যসভায় সাংসদ থেকে প্রাক্তন বিদেশ সচিব, এমনকী ইসরোর বিজ্ঞানীকেও হিয়ারিং-এর নোটিশ প্রেরণ, সব মিলিয়ে এক আজব অনভিপ্রেত অবস্থা ভ্যানিশ কুমারের এসআইআর তাণ্ডবের সৌজন্যে। এই ভুলবহুল প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ না হলে বাংলার মানবসম্পদের ক্ষতি আরও বাড়বে। লিখছেন দেবাশিস পাঠক

Must read

ভ্যানিশ কুমার জ্ঞানেশ কুমার সহজ কাজকে জটিল করে তুলে অশান্তি তৈরি করেছেন এবং করছেন। এই যে অশান্তি সৃষ্টি, সেটা পুরাঘটিত বর্তমান না হয়ে ঘটমান বর্তমান হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটাও হয়েছে একেবারে পরিকল্পনামাফিক।

আরও পড়ুন-শিক্ষা, সাহিত্য থেকে রঙ্গমঞ্চ এক অসাধারণ প্রতিভা ব্রাত্য

নির্বাচন কমিশনের কাজটা কী ছিল?
কাজটা ছিল একটা সাফসুতরো ভোটার লিস্ট তৈরি করা। সেই কাজের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটকর্মীরা নাম নথিভুক্ত করলেই কাজটা সুসম্পন্ন হতে পারত। কিন্তু সে-পথে না হেঁটে ভ্যানিশ কুমার কী করলেন? তিনি আমলাতান্ত্রিক কায়দায় শুনানির নাম করে সাধারণ মানুষকে ডেকে পাঠিয়ে শুনানির লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
ফলে যাঁরা নােটিশ পেলেন, তাঁদের মধ্যে রইলেন ৮৮ বছর বয়স্ক প্রাক্তন বিদেশ সচিব কৃষ্ণন শ্রীনিবাসন, চন্দ্রযান অভিযানের সঙ্গে যুক্ত মহাকাশ বিজ্ঞানী তথা লুলিয়া ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষক অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলামের মতো লক্ষ লক্ষ মানুষ।
কয়েকদিন আগে দেখছিলাম, কোনও একটি চ্যানেলে, বিজেপির এক ভোটে হারা নেতা বড় বড় লেকচার মারছেন। বলছেন, নির্বাচন কমিশন যাকে খুশি তাকে শুনানির জন্য ডাকতে পারে, সে ক্ষমতা তার আছে।
কিন্তু প্রশ্নটা ক্ষমতা প্রয়োগের নয়, বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের।
প্রাক্তন বিদেশ সচিবকে কেন নাগরিকত্বের প্রমাণ দাখিল করতে হবে অশীতিপর বার্ধক্য দশায়? ১৯৯৪-১৯৯৫-তে দেশের বিদেশ সচিব কৃষ্ণন শ্রীনিবাসন বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনের দায়িত্ব সামলেছেন, পাঁচ-পাঁচটা দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন এই মানুষটি। লন্ডনে কমনওয়েলথ-এর ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। ২০০২ সালের পাসপোর্ট হাতে তিনিও দাঁড়িয়েছেন লাইনে, নাগরিকত্ব প্রমাণের দায়ে। কিন্তু কোন যুক্তিতে তাঁর নাগরকত্ব নিয়ে সংশয়ী ভ্যানিশ কুমার?
সবাইকে ডেকে পাঠাতে পারে কমিশন, সে ক্ষমতা না-হয় তার আছে। কিন্তু কোন যুক্তিতে নাগরিকত্ব সংশয়দীর্ণ হয়ে উঠবে সালকিয়ার উত্তম ঘোষ লেনের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রে, এর কোনও যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর কি কমিশনের কাছে আছে? যে চন্দ্রযানের সাফল্যের ঢাক নিজের কাঁধে নিয়ে মোদি ঘুরে বেড়ান, সেই চন্দ্রযান অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ইসরোর বিজ্ঞানী ভারতীয় কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে?

আরও পড়ুন-বিদ্যেবতী সর্বত্র পূজ্যতে

বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছিল সোনালি খাতুনকে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে লড়াকু ভূমিকা পালন করেছিলেন সামিরুল ইসলাম, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ। রাজ্যে রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের যে বর্বরতা ও নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে, সেটা প্রতিরোধে একটা পাঁচিলের নাম সামিরুল। বীরভূমের হাসানের ভোটার। ২০০২-এর ভোটার তালিকায় তাঁর বাবার নাম আর তাঁর নিজের নামে নাকি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি খুঁজে পেয়েছে কমিশনের কর্তারা।
শুধু সামিরুলের ক্ষেত্রেই নয়, রাজ্যের সংখ্যালঘু এলাকা এবং তফসিলি নিবিড় গরিব মহল্লাতে এরকম নোটিশ সহস্র ব্যক্তি পেয়েছেন। খসড়া তালিকায় নিজেদের নাম দেখে তাঁরা নিশ্চিন্ত ছিলেন, এখন লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কালা জাদুতে হয়রান। কারণ, তাঁদের নামের বানান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে লেখা হয়েছে। ইংরেজির ‘এস’ বাংলায় কখনও ‘শ’ হয়েছে, কখনও আবার ‘স’। সংখ্যালঘু মানুষেরা কেউ নামের আগে ‘শেখ’ লেখেন, কেউ নামের পরে। একই অবস্থা ‘আলি’র ব্যবহার নিয়েও। কেউ করেন, কেউ করেন না। সংখ্যালঘু মহিলারা তাঁদের নামের সঙ্গে ‘খাতুন’ কিংবা ‘বেগম’ যোগ করেন। তা নিয়েও বিড়ম্বনা।
তফসিলি সম্প্রদায়ের অনেকেই আগে পদবি হিসেবে ‘বাউরি’ লিখতেন, এখন লেখেন ‘বাগ’, আগে লিখতেন ‘ক্ষেত্রপাল’, এখন কেবল ‘পাল’।
এরকম পরিবর্তন, বানানে বা পদবিতে, আগে কোনও দিন এঁদের জীবনযাপনে বা ভোটদানে কোনও সমস্যা সৃষ্টি করেনি। কিন্তু এখন কমিশনের চােখে তাঁরা সন্দেহজনক। যাঁরা এসআইআর শুরুর সময় সোৎসাহে এনুমারেশন ফর্ম ভরতি করে বিএলও-দের হাতে তুলে দিয়েছিল, তাঁরাই এখন শুনানির নোটিশে জেরবার।
কমিশনের বৈধ নথির মধ্যে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড ছিল না। কিন্তু শুনানি পর্বে বহু বৈধ ভোটারই জন্মের শংসাপত্র থেকে পারিবারিক সূত্র ধরে নথি হিসেবে অ্যাডমিট কার্ড জমা দিয়েছিলেন। বিএলও-দের নির্দেশেই তাঁরা ওই নথি জমা দিয়েছিলেন।
আর গত বৃহস্পতিবারই, যে কায়দায় রাতারাতি নোটবন্দির কথা জানিয়েছিলেন মোদি, সেই কায়দাতেই আচমকা ভোটবন্দি কার্যকর করতে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড গ্রাহ্য করা হবে না বলে জানিয়ে দিল কমিশন।
বাদবাকিদের কথা বাদই দিলাম। এই হযবরল দশায় অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (এইআরও) পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারছেন না, কীভাবে তাঁরা নথি যাচাই করবেন। শ্যামপুকুরের রূপা দাসের মতো অনেককে শুনানিতে ডেকে পাঠানো হচ্ছে কারণ তাঁর সঙ্গে তাঁর ঠাকুমার বয়সের তফাত ৪০ বছরের কম। আবার, ওই অঞ্চলেরই শ্যামলী মণ্ডলের মতো ভোটারদের হিয়ারিং-এ ডেকে পাঠানো হচ্ছে কারণ তাঁর সঙ্গে তাঁর বাবার বয়সের পার্থক্য ৫২ বছর। নয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মাধবী রুদ্রকেও হিয়ারিং নোটিশ ধরানো হয়েছে অভিন্ন কারণে। এইআরও তাঁর বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে বেশ বুঝতে পারছেন, এরকম বয়সগত পার্থক্যের যৌক্তিক কারণ। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের হুকুম তামিল করার জন্য শুনানির নোটিশ না-পাঠিয়ে তাঁর উপায় নেই।

আরও পড়ুন-ট্রাম্পকে রাজি করাল সৌদি, কাতার ও ওমান

আর ভ্যানিশ কুমারেরও বিজেপির হুকুম তামিল করার জন্য এরকম তুঘলকি নির্দেশ জারি না করে উপায় নেই। তাঁর নির্বাচন কমিশন তো কার্যত কর্পোরেট সেলস টিমের মতো হয়ে গিয়েছে। টার্গেট বেঁধে দিয়েছে মো-শা। অ্যাচিভ না-হলেই পেছনে লাথি পড়বে। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, অচিরেই এমন একটা অবস্থা আসবে, যখন কোনও কাগজ দেখিয়েই ভোট দেওয়ার অধিকার প্রমাণ করা যাবে না।
দশ মিনিটে ডেলিভারির ঘটনা আমাদের যুগপৎ উদ্বিগ্ন ও বিচলিত করে। একই সঙ্গে মোদি-জমানার দশ বছরের অপ্রাপ্তিতেও আমাদের অনেকেই অবিচলিত অবস্থানে স্থিত। কিন্তু, অবিলম্বে এসআইআর-এর নামে এরকম নষ্টামি বন্ধ না হলে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের গৌরবটাই তো লুঠ হয়ে যাবে!

Latest article