নজরুলের মিলন বার্তা ও নিজস্বিকরণ, প্রসঙ্গ ইসলামী গান

Must read

গিয়াসুদ্দিন দালাল: খতিয়ে দেখতে গেলে নজরুলের অধিকাংশ গীতিকবিতাই একঅর্থে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

কিন্তু প্রাথমিকভাবে যে গীতি কবিতাগুলি আমরা বিশেষ ধর্মীয় অনুষঙ্গের সাথে জুড়ে দিই, সেই ইসলামি
গানেই এই বৈশিষ্ট বিশেষভাবে বিদ্যমান তা আমরা দেখিনা।এই বিষয়ে নজরুল বাংলা সাহিত্যে পথিকৃৎ।

সাধারণ মানুষের মুখের কথা সাহিত্য গুণান্বিত করে উপযুক্ত সুরে আপামর
বাঙালির মননে গেঁথে দেওয়া,এ নজির অতুলনীয়।
সমগ্র নজরুল অনুবাদের সুবাদে এই ধরনের গানগুলি আমাকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হয়েছে
তাই এ কথা বলা।
নজরুলের তথাকথিত ইসলামি গানগুলি বৈচিত্রে ভরা হলেও তা মূলত তিনটি ধারায় প্রবাহিত ও কবির গানের অনেকটা জুড়েই বিদ্যমান। যা পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমির তিন চার ছয় ও সাত নং খন্ডে
সন্নিবিষ্ট এবং যা মূলত জুলফিকার,বনগীতি ও অগ্রন্থিত গানের মধ্যে লভ্য। ধারা তিনটি এক,হামদ অর্থে আল্লাহর প্রসংশা মূলক। দুই, নাত অর্থে রসুলের প্রসংশা মূলক। তিন,ভক্তের নিবেদন ও ইসলামি জাহানের কথা।

আরও পড়ুন- তালিবানের উত্থানে পাক মদত, আমেরিকার কাছে অভিযোগ বিদেশসচিবের

বিষয়বস্তু ও ভাবের প্রতি সৎ থেকে নিজস্ব মিলনের কাব্যাদর্শকে কিভাবে কুশলী শব্দ প্রয়োগে
এইসব গানে বজায় রেখেছেন , তা কতকগুলি গান ধরে ধরে দেখব।
সমস্ত গানে নজরুল যেভাবে আধুনিকতা এনেছেন এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
তার সাথে যুক্ত হয়েছে লোকজ সুর,বাংলা সহ বিশ্বের আঞ্চলিক সুর।
এক নজরুল বীণায় এত স্থানীয় সুর ধরা পড়ল এবং তা কবির
জারক রসে জারিত হয়ে নতুনরূপে বেরিয়ে এল, এ বিস্ময়ের।
এবার এইসব গানে ভাষার পরম্পরাটি বুঝতে ঐতিহাসিকতার দিকে তাকাই।
এইসব গানের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে কবি বিষয় অনুসারী শব্দ তুলে এনেছেন এবং সাহায্য নিয়েছেন ইসলামি ঐতিহ্যের। যা বহিরাগত ও বাংলা সাহিত্য পরম্পরা বহির্ভূত ভেবে এড়িয়ে যাওয়া যায়না।
এখানেই একটু পেছনে তাকাই।
বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বাংলায় ইসলাম ধর্মের আগমনের সময়ের ব্যবধান খুব একটা বেশি নয়।
মাগধী অপভ্রংশ থেকে বের হয়ে বাংলা ভাষা শুরু হল পাল আমলে। বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ সাধারণের মধ্যে প্রচারের জন্য কথ্য ভাষায় দোহা রচনা করল। এল চর্যাপদ, বাংলার প্রথম সাহিত্যকৃতি।
ব্রাহ্মণ্যবাদী অবাঙালি সেন রা ধরে রইল দেবভাষা সংস্কৃতকে।
যদু বা সম্রাট জালালুদ্দিন ছিলেন বাঙালি। তাই বাংলাচর্চা পেল পৃষ্ঠপোষকতা।
এই সময়েই বিশেষ সামাজিক কারণে বাংলার প্রায় অর্ধেক লোক মুসলমান হয়ে যায়। ফলতঃ প্রশাসনিক কারণে যেসব তুর্কী ইরানী হাবশি সুলতান সুবেদার নবাব ও রাজ কর্মচারীরা এখানে এলেন, তাঁরা বাংলা
ভাষা চর্চার উপর জোর দিলেন।
গৌড়ের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু শাস্ত্রাদির বঙ্গানুবাদ শুরু হল। এই উৎসাহ প্রদানকে হিন্দু জমিদার ও হিন্দু রাজাগণ উপেক্ষাও করতে পারলেন না।
ফলতঃ বাংলা ভাষা প্রতিপত্তি পেল রাজসভায়। এবং “ব্রাহ্মণ পন্ডিতগণ অনন্যগতি হইয়া ইহার পরিচর্যায়
লাগিয়া গেলেন” (আহমেদ শরিফ, ঢাকা) যার ফলে পঞ্চদশ হয়ে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত প্রধানতঃ মুসলিম পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা চর্চা চলতে থাকল হিন্দু দেবদেবীর প্রাধান্য নিয়েই। এর মধ্যেই ক্ষীণভাবে একটি মৌলিকতা গড়ে উঠলো মুসলিম কবিদের মাধ্যমে। মানুষের সুখ দুঃখের কাহিনি নিয়ে গড়ে ওঠল কাব্যগাথা। এবং তাতে অদ্ভুতভাবে উঠে এল ব্যবহৃত শব্দসহ তখনকার মুসলিমদের জনজীবন, যারা সম্পূর্ণরূপে বাঙালি। খন্ডিত হল এই রূপকথা যে বাঙালি মানেই হিন্দু। এক সময় গড়ে উঠল এক অভিজাতশ্রেণী, যাদের বিরোধিতা ও সমর্থনের মধ্য দিয়েই সাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে আসে ইসলাম ও মুসলমান জীবন।

আরও পড়ুন-সৌম্যদীপের জবাব তলব টিটি ফেডারেশনের

আমরা ক্রমশঃ পেয়ে যাই ঈশ্বর গুপ্ত, হেম বঙ্কিম নবীন,জ্যোতিরিন্দ্র মনমোহন গিরিশচন্দ্র কে উনিশ শতকেই যার দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা গদ্য রচনার শুরুতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে ইংরেজরা এক
প্রচ্ছন্ন অসূয়াকে উসকে দেয় এবং ‘পৃষ্ঠ পোষকতার আঙুরফল’ এর নীতি গ্রহণ করে।
ফলতঃ আমরা দেখি হিন্দুপন্ডিতগণ,মার্শম্যান ও উইলিয়াম কেরীর প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষার যে প্রথম অভিধান
“এ ডিকশনারি অফ দি বেঙ্গলী ল্যাঙ্গুয়েজ” রচিত হল তাতে সাধারণ মুসলিমদের ব্যবহৃত ইসলামি শব্দ গুলিকে বাংলাসাহিত্য গন্ডির বাইরে রাখা হল। কারণ হিসেবে বলা হল,নব্বই ভাগ বাংলাশব্দই সংস্কৃতজাত।
অথচ তখনই লেখা হল ‘আলালের ঘরের দুলাল’।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও মোহিতলাল মজুমদারের রচনা বাংলাসাহিত্যে ইসলামি শব্দচর্চায় উজ্জ্বল। কোর্টকাছারিতে
ব্যবহৃত বিপুল আরবি ফারসি শব্দের থেকে পরবর্তী কালে আমারা আলাদা থাকতে পারিনি।
এমনি ছিল ইতিহাসের বাধ্যবাধকতা।

এই পরম্পরার সার্থক উত্তরসূরী হলেন নজরুল।
কায়কোবাদের ‘বিশুদ্ধ’ সাহিত্য রচনা করে তথাকথিত প্রশংসা লাভের পথে না হেঁটে,তিনি দাঁড়ালেন বাস্তবের
মাটিতে। অগনিত এতাবত উপেক্ষিত ‘মাটির কাছাকাছি’র সাধারণ মানুষের মুখের কথা কে সাহিত্যে তুলে
ধরলেন।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটিও ইসলামি গানে বড় কুশলতার সঙ্গে বজায় রেখেছেন এই শব্দ শিল্পী ও কথার যাদুকর এইভাবেঃ
(ক) একই ইসলামি গানে ইসলামি ঐতিহ্যের সাথে জড়িত ভাবানুষঙ্গ সম্বলিত শব্দ এবং পৌরাণিক বা বৈদিক
ঐতিহ্যের সাথে জড়িত ভাবানুষঙ্গ সম্বলিত শব্দ ব্যবহার করে। যেমনঃ
(১) কেয়ামত,কওসর,তৌহিদ, বেহেশত, কাবা,সেরেস্তা, পয়গম্বর, নবী, আল্লা,রসুল,মুরিদ,রোজহাসর,
নামাজ,আজান,সেজদা,ফজিলত, মেহেরবানি,তাকিদ,মুফিদ,লিল্লাহ…..ইত্যাদি। এবং
(২) অনন্ত,জ্যোতি,করুণা,নামের ভেলা,মায়ার বাঁধন, অন্তর্যামী,জীবন-স্বামী,
ভবনদী,অসীম সাগর,অমৃত,যুগল-কুসুম,ভিক্ষা মুষ্টি,পাপ-তাপ-বিনাশী….ইতাদি।
(খ) আবার ইসলামি গানেই দেশজ শব্দ সহযোগে দুই ভাবানুষঙ্গের যুগ্ম শব্দ ব্যবহার করেছেন অতি দক্ষতায়।
যেমনঃ
‘আরশ’ ইসলামি শব্দ তার সাথে যোগ করলেন দেশজ ‘ধাম’ শব্দ, হল ‘আরশ ধাম’।
একই ভাবে এল ‘আমিনা দুলাল’, ‘নিশান-বরদার’, ‘ঝাড়ু-বরদার’, ‘গোলাপ গুল’,
এবং ‘শোভায় অতুল’ এর সাথে ছন্দ মেলালেন ‘আল্লা রসুল’। যেন এ দেশি বিদেশি শব্দের উদ্বাহবন্ধন। যা
বাংলা ভাষায় অভূতপূর্ব ও অনন্য।যেন দুই শব্দ নয়,দুই ধারা দুই জাতির মিলন।অথবা বিদেশি শব্দের
বঙ্গিকরণ যাতে বাংলা ভাষাই উপকৃত হয়েছে।
নজরুলের ঐসব গানের ইংরেজি ভাষান্তর করতে গিয়ে তাই এক অসম্ভব পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে
আমাকে উপযুক্ত ইংরেজি প্রতিশব্দের খোঁজে, কারণ অধিকাংশ অভিধান এসব শব্দ রাখেনি।
বাংলায় বাংলা ভাষার এতটা অবজ্ঞা মর্মে ক্ষরণ ঘটায় বৈকি।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি হল এইসব গানে যে বিদেশিশব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তাতে দেশজ উচ্চারণ ও বানান বজায় রাখা। কারণ বাংলা বর্ণমালা ও ধ্বনিবিজ্ঞান মূল ভাষার ঐ শব্দ উচ্চারণ সমর্থন করেনা। সেজন্য সাধারণ মানুষ যেভাবে তার সরলীকরণ করেছে তাই প্রয়োগ করেছেন। ফলতঃ আমরা দেখি লোক্যালাইজেশন বা স্থানীয়করণ
পদ্ধতিতে নজরুল বাংলা ভাষায় প্রচুর বিদেশি শব্দের আমদানি ঘটিয়েছেন যাকে আমরা নিজস্বিকরন বলেছি। যেমন,’ক্যায়ামত’ নয় সরলীকৃত ‘কেয়ামত’। ন্যামত নয় নিয়ামত, ফরিস্তা নয় ফেরেশতা,
দাবত নয় দাওয়াত, খুস-নসীব নয় খোশনসীব, নমাজ নয় নামাজ,জিক্র নয় জেকের ইত্যাদি।
ফলে শব্দ হয়েছে সহজ স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ ও মাটির কাছাকাছি।

চতুর্থত এক্কেবারে অপ্রচলিত ও অভাবনীয় রূপক ও অন্তমিলের ধ্বনি ও ভাবগত প্রয়োগকুশলতা।
যেমন ‘মাঝি মাল্লা’র সাথে ‘লা শরিক আল্লা’ র প্রয়োগের মুন্সিয়ানা। যা সাহিত্য প্রেমিককে বাকরুদ্ধ করে দেয়।

আমরা বাংলার সাংস্কৃতিক বিরাসত, নজরুলের মিলনের বার্তা ও নিজস্বতা এইভাবে উপেক্ষা করে চলেছি।

শেষে একটি কথা বলি।

নজরুলের ইসলামি গানের প্রতীক ভেঙে এগিয়ে গেলে যে অদ্ভুত সম্ভাবনার দিক আমাদের সামনে প্রতিভাত হয় তা আমরা ভেবেও দেখিনা।
শুধু আল্লা রসুলের প্রশংসা নয়,নজরুলের ইসলামি গান হল এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে মানুষের জাগরণ প্রয়াস।আমাদের বুঝতে হবে সে জাগরণ চেতনার,সম্মিলিতভাবে দেশমাতৃকার মুক্তির পথে ধাবিত হবার।
তা যে পরে আর কিছু লাভ বা হাসিল করার কাজে ও মনন উন্নয়নের কাজে প্রযুক্ত হতে পারে তা বুঝতে হবে।
আসল কথা হল এক স্রোতের চেতনায় কড়া নাড়া।

‘দূর আরবের স্বপন দেখি বাংলা দেশের কূটীর হতে’ বলেছেন নজরুল।
দূর আরব প্রতীকী,অর্থে বহির্বিশ্ব। কূটীর নিবাসী বাঙালি কে সারা ভারত তথা বিশ্ব বাজারের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সচেতন হতে হবে না?
দেশ বা অর্থনীতির নৌকো যখন ভেসে চলে সবাই কে নিয়েই চলে।যখন ডোবে তখন লোক বেছে বেছে, জাতি বেছে বেছে, ধর্ম বেছে বেছে নিয়ে ডোবে না।

তাই নজরুল যখন বলেন,’ভব নদীর তুফান ভারি করো করো পার,তোমার দয়ায় তরে গেল লাখো গুনাহগার’ তা তিনি শুধু মদিনার ‘নাইয়া’ কেই বলেন না। সে নাইয়া যে কোন দেশের নেতৃত্ব হতে পারে। আর বিনয়াবনত ‘গুনাহগার’ হতে পারে সে দেশের সাধারণ মানুষ।
যে তুফানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমাদের বিশ্ব,তাতে এই বিশ্বাসের জায়গাটা ঠিক রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে এই
মকলুকাতের স্বার্থে। ইসলামি শব্দ প্রয়োগে যদি এ কথা বলা হয় তাহলে তার সর্বজনীনতা ঢাকা পড়ে যায় না।
আর তাই তা ছড়িয়ে দেয়া দরকার সবার মধ্যে।তাই নজরুল বললেন:
‘উঠুক তুফান পাপ দরিয়ায় ও ভাই, আমি কি তায় ভয় করি,পাক্কা ঈমান তক্তা দিয়ে গড়া যে আমার তরী’।

দেশকে ও এই বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সৌহার্দের ও বিশ্বাসের এমনিই একটি তরী ও তার কান্ডারী আজ আমাদের খুব দরকার।
=======================================================
* লেখক সমগ্র নজরুল অনুবাদক, গীতিকার কবি।

Latest article