“… ব্রাত্য বসুর(Bratya Basu) থিয়েটার ও তার নিজস্ব রাজনীতি সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বদ্রিলার আওড়ালাম কেন? কারণ, নব্বই দশকের দ্বিতীয়ার্ধে, যেসময় থেকে ব্রাত্য তাঁর নাট্যপরিক্রমা শুরু করেন, অতি দ্রুত স্বীকৃতি পায় তাঁর অসম্ভব প্রতিভা, সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত, যে বিস্তৃত সড়ক তিনি অতিক্রম করে এসেছেন, সেই রাস্তার দুই পাশ এবং পটভূমি জুড়ে প্রবল পরাক্রমী উপস্থিতি এই উত্তর-আধুনিক সময়মাত্রার। খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্রাত্যর নাটক, তাঁর বিপুল গদ্য, অজস্র সাক্ষাৎকার, অসংখ্য পারফরম্যান্স এই উত্তর-আধুনিক সময়-চিহ্নিত। আমরা সেই বিপুল লক্ষণগুলোকে এড়িয়ে যেতে পারি না।’’—লিখেছেন সম্পাদক অর্ণব সাহা; ‘রিক্ত, অষ্টাবক্র সময়ের রাজনীতি’ শীর্ষক একটি লেখায়। সম্প্রতি, তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ব্রাত্য অবিকল্প নাট্যপুরুষ গ্রন্থ। ব্রাত্য বসুর বহুমুখী প্রতিভার আলোচনার ধারাতে একটি উজ্জ্বল নিদর্শন, ব্রাত্য অবিকল্প নাট্যপুরুষ (উদার আকাশ) গ্রন্থ। সম্পাদক স্বয়ং নিবিড় ‘ব্রাত্য চর্চা’য় রত অনেকদিন। একদা একটি রচনায় ব্রাত্য প্রতিভার মূল্যায়ন করতে বসে লিখেছিলেন, ব্রাত্য বসুর নাটকে ইতিহাসমান্য ন্যারেটিভের ভিতরেই ‘হাজারো অস্বস্তিকর প্রশ্ন ও পালটা বয়ানকে উসকে দেয়। গড়ে ওঠে ইতিহাসের এক প্রতিকল্প’।
বর্তমান গ্রন্থে প্রকাশক ফারুক আহমেদ স্বয়ং লিখেছেন, “…রাজনীতিতে প্রবেশের আগে, ব্রাত্য বসু বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। বামপন্থী রাজনীতির সমালোচক হিসেবে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় স্টল থেকে শুরু করে রাজপথে আন্দোলনের প্রথম সারিতে, তিনি সর্বদা সক্রিয় ছিলেন। তাঁর তুখোড় বক্তৃতা এবং যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ তাঁকে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।”
সুসম্পাদিত এই গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে ‘নির্বাসনে যেতে হলে সঙ্গে নেব শুধু বই আর গান, সিনেমার অ্যাপ’ শিরোনামে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার। বর্তমান গ্রন্থ-সম্পাদক এবং রাজীব বর্ধন, উভয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলাপচারিতায় বহুমুখী স্রষ্টার সৃজনের বিবিধ পরত উন্মোচিত হয়েছে:
“ …অর্ণব: ‘রুদ্ধসঙ্গীত’-এ সন্তোষকুমার ঘোষ, ‘অন্তিম রাত’-এ জিন্নাহ বনাম নেহরু, গান্ধীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বৈরথ, এগুলো থেকে একটা প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে যেন, ব্যক্তিই ইতিহাসের একমাত্র নিয়ন্তা। কিন্তু সেটাই তো ইতিহাসের একমাত্র সত্য নয়। আজকের এই চূড়ান্ত আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদী সভ্যতাতেও মানুষ ফের জোট বাঁধছে, যেমন সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন…এটা কি এক ধরনের সীমাবদ্ধতা নয়?
ব্রাত্য বসু: আমার নাটকে সত্যিই কি তাই ঘটছে? ‘অন্তিম রাত’ নাটকে যখন জিন্নার মেয়ে জিন্নাকে প্রশ্ন করছে, দেশভাগের পর তুমি তো আকাশপথে সীমানা পেরোবে, আর লক্ষ লক্ষ মানুষ কাঁটাতার পেরিয়ে যাবে…তখন তোমার মনের অবস্থা কী হবে? তখন সেটা তো আর নিছক ব্যক্তি থাকে না। তখন সেটা রাষ্ট্রের ঠিকানায় কড়া নাড়ে। সামাজিক স্তরে চলে যায়। একটা মানুষ মানসিকভাবে উদ্বাস্তু হচ্ছে এই দুয়ের মধ্যে একটা সত্যিকারের ফারাক থাকে। আর এই শারীরিকভাবে উদ্বাস্তু হওয়াটা যে আরও বেশি ভয়ংকর, সেটাই এখানে প্রকট হচ্ছে।”
‘বীক্ষণ/পর্যবেক্ষণ’ অংশে রয়েছে মোট ৪২টি নিবেদন। তার মধ্যে ৩৭টি বাংলা ভাষায় এবং বাকি ৫টি ইংরেজি ভাষায় লেখা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বাংলা লেখাগুলির মধ্যে, সুবোধ সরকার (‘ব্রাত্য বসু একটি বিপজ্জনক প্রতিভা’), গৌতম সেনগুপ্ত (‘ব্রাত্য বসুর নাটক’), ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী (‘বৃত্তের বাইরে ব্রাত্য’), বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় (‘একটি অন্তরঙ্গ বয়ান’), সৌম্য দাশগুপ্ত (‘গ্বেন্ডোলাইন–একটি স্মৃতিকথা’), মৈনাক বন্দ্যোপাধ্যায় (‘জনপ্রতিনিধির থিয়েটার ও এক বাঙালির ব্রাত্যদর্শন’), উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় (‘এক লেখকের লেখক’), অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য (‘ব্রাত্য বসুর অভিনয় সম্পর্কে অল্প কিছু কথা’), স্বাতী গুহ (‘ব্রাত্য বসু : আদ্যন্ত নাগরিক ব্যক্তিত্ব’), দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় (‘ডিজিটাল প্রজন্মের সমবেত এপিটাফ ব্রাত্যর নাটকে ভবিষ্যদ্বাণী’), রাকেশ ঘোষ (‘কুরুক্ষেত্র থেকে করোনা: আত্মজ-ধ্বংসের সময়-কাব্য’), রাজীব বর্ধন (‘অনুশোচনা: ভাবে-অনুভাবে’), নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী (‘ব্রাত্য একজন পাওয়ার-ইনটেলেকচুয়াল’), মৈনাক বিশ্বাস (‘ব্রাত্য বসু বিষয়ক’), শম্পা ভট্টাচার্য (‘ভাঙা গড়ার গল্প’) তীর্থঙ্কর চন্দ (‘যে প্রতিপক্ষের কাছে কৃতজ্ঞ আমি’), সেলিম বক্স মণ্ডল (‘ব্রাত্যযুগ: নির্মাণ ও ঐশ্বর্য’), পিনাকী রায় (‘ব্রাত্য বসুর মাৎস্যন্যায়: আলোচনা এবং পর্যালোচনায়’), প্রদীপ্ত মুখার্জি (‘নানা রূপে ব্রাত্য’), নির্মাল্য মুখোপাধ্যায় (‘আমার ব্রাত্য বসু’), সম্রাট সেনগুপ্ত (‘অনিশ্চয়ের নাট্যতত্ত্ব, ব্রাত্য বসুর ভয় এবং কৃষ্ণগহ্বর নাটকে চিন্তার অরৈখিক চলাচল’), রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী (‘থিয়েটারে ব্রাত্যায়ণ’); নানাদিক থেকে স্রষ্টার মূল্যায়ন করেছেন। কখনও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে প্রেসিডেন্সি সময়ের স্মৃতি রোমন্থন অথবা মেদিনীপুর সময় থেকে কালিন্দী পর্বের আলাপন, কখনও লেখা নাটকের বিশ্লেষণ, আবার কখনও নির্দেশিত চলচ্চিত্রের আলোচনা অথবা মঞ্চে সাবলীল অভিনয়কুশলতা, নানামুখী সৃজনপরম্পরায় লেখাগুলি আলো ফেলেছে।
গ্রন্থে সংকলিত ইংরেজি লেখাগুলির প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ; নন্দিতা ধাওয়ান লিখেছেন Creusa–The Queen নাটক নিয়ে (‘The disorder of Queen Creusa: Questioning the (im)possibility of justice’), রীতা দত্ত সামগ্রিকভাবে চলচ্চিত্রের অভিনেতা ব্রাত্য বসু-র মূল্যায়ন করেছেন (‘A Mirror of Changing Times: The Eclectic Oeuvre of Bratya Basu’), চিরন্তন সরকার Virus M নাটকের আলোচনা করেছেন (‘Virus M: Conflicting Perspectives on the Logic of Money-Driven Social Systems’), ঋতুশ্রী সেনগুপ্ত Winkle Twinkle নাটকের মূল্যায়ন করেছেন (‘Of Twists, Tinkles and Travesties: A critical reading of Bratya Basu’s Winkle Twinkle’) এবং কৌশিকী দাশগুপ্ত Boma নাটক বিষয়ে আলোচনা করেছেন (‘The Polemic of Politics: In the Theatrical World of Bratya Basu’)। স্রষ্টা ব্রাত্য বসুর বহুমুখী প্রতিভার দীপ্তিকে পাঠকসমীপে পেশ করার জন্যে বর্তমান গ্রন্থের সম্পাদক এবং প্রকাশক, উভয়েই ধন্যবাদার্হ।
ব্রাত্য অবিকল্প নাট্যপুরুষ
সংকলন ও সম্পাদনা : অর্ণব সাহা
উদার আকাশ
৫৯৯ টাকা
আরও পড়ুন-ক্ষমা চাইলেই ক্ষমা করে না মানুষ, পাল্টা ‘পরামর্শ’ শিশিরকে

