অটিজম রোগ নয়

‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিজর্ডার’ বা ‘এএসডি’ কোনও অসুখ নয় একটি মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা। এই রোগটি সম্পর্কে অনেকেরই কোনও স্বচ্ছ ধারণা নেই। তাই সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২ এপ্রিল পালিত হয় বিশ্ব অটিজম দিবস এবং এই মাসটা পালন করা হয় বিশ্ব অটিজম সচেতনতা মাস হিসেবে। লিখছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

অটিজম কোনও বংশগত রোগ নয়। একজন সুস্থ মা-ও কিন্তু অটিস্টিক শিশুর জন্ম দিতে পারেন। তবে এটা নিয়ে অনেকেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই বলে ভয় পান সবাই। প্রসঙ্গত অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, মোৎসার্ট, বিল গেটস, স্টিভ জোবস-সহ অনেক সফল মানুষই অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার নিয়েই বিশ্ব জয় করে ফেলেছেন। কাজেই ভয়ের বিষয় অটিজম নয়। আজ ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস এবং এপ্রিল হল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা মাসও। এই মাস এবং দিনটি পালনের উদ্দেশ্য অটিজম নিয়ে সঠিক ধারণা তৈরি এবং অটিজম আক্রান্তদের সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরা কারণ অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে আলাদা হয় ফলে তাঁরা সুস্থ সামাজিক বিষয়গুলির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না বা আয়ত্ত করতে দেরি হয়।
অটিজম কী
অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অটিস্টিক বলা হয়। ইংরেজি অটিজম শব্দটি ল্যাটিন autismus শব্দ থেকে এসেছে। তাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী যে সমস্ত মানুষ Aut বা ‘নিজ’কে নিয়ে Ism বা ‘মগ্ন’ থাকার প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করতে পারেন না তাঁদের এই অবস্থাকে অটিজম বলে। বাংলা ভাষায় একে ‘আত্মমগ্নতা’, ‘স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা’ প্রভৃতি বলে। এটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশজনিত বা আচরণগত সমস্যা। অটিজমের লক্ষণ ধরা পড়ে শিশুর জন্মের প্রথম দু-তিন বছরের মধ্যেই। শিশুর ব্যবহার, ছোট ছোট বদলকে নিছক দুষ্টুমি বা জেদ বলে এড়িয়ে যাবেন না। বাবা-মায়ের সচেতন পদক্ষেপ অটিস্টিক শিশুকে ফেরাতে পারে জীবনের মূলস্রোতে।
ইতিহাসে
অটিজম বা বিকাশজনিত সমস্যাযুক্ত মানুষ অনেককাল আগে থেকেই পৃথিবীতে ছিল কিন্তু তা আজকের মতো করে চিহ্নিত করা হয়নি। ১৯১১ সালে সুইস মনোচিকিৎসক ইউজেন ব্লিউলার তীব্র সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে প্রথম অটিজম শব্দটি ব্যবহার করেন। এরপর লিও ক্যানার নামক একজন আমেরিকান মনোচিকিৎসক ১৯৪৩ সালে একটি গবেষণার মাধ্যমে অটিজমের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেন যার নাম দেন ইনফেনটাইল অটিজম।
১৯৪৪ সালে অস্ট্রিয়ার মনোবিজ্ঞানী ড. হ্যান্স অ্যাসপাজার এ বিষয়ে যে পর্যবেক্ষণ করেন,পরবর্তীতে তা গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। তাঁর পর্যবেক্ষণটি এত উঁচুমানের এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যধারী ছিল যে, পরবর্তী সময়ে এই গবেষকের নামে অটিজমের একটি শ্রেণিভাগ করা হয় যার নাম আসপর্জার সিনড্রোম তবে অটিজম নিয়ে চলছে নানা গবেষণা তাতে দেখা গেছে অটজিমের তীব্রতা ভীষণভাবেই বেড়ে চলেছে।
অটিজম বুঝবেন কীভাবে
অটিস্টিক শিশুর লক্ষণ বোঝা একটু কষ্টকর তবে সচেতনতা থাকলে বোঝা যায়। অটিস্টিক শিশু চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করে না। তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যদি তার সামনে আঙুলনাড়া হয় তবে দেখা যাবে সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
নিজের জগতে বিভোর থাকে। সামাজিক হতে পারে না। অপরিচিত জায়গা বা মানুষ পছন্দ করে না।
অনেক অটিজম আক্রান্ত শিশুই অসাধারণ মেধাবী হয়, তাঁদের বিশেষ গুণও থাকে, আবার অনেকে অসম্ভব অমনোযোগী, অস্থিরও হয়।
কথা বলা, নিজের মনের ভাব প্রকাশের সমস্যা দেখা যায়। গুছিয়ে বাক্য গঠন করতে পারে না।
কেউ হাসলে তার প্রতি-উত্তর দিতে পারে না। স্থির দৃষ্টিতে কোনও একদিকে তাকিয়ে থাকে।
হয়তো কেউ একটা কথা বলছে সে শিশুটি সেটাকেই রিপিট করবে। যেমন কেউ জিজ্ঞেস করল ‘তোমার নাম কী’? শিশুটি উত্তর দেবে ‘তোমার নাম কী’? একে চিকিৎসার পরিভাষায় বলে ইকোলেলিয়া। এটা অটিজমে আক্রান্ত শিশুরই থাকে।
বাড়ির একটা নির্দিষ্ট জায়গাকেই বেশি পছন্দ করবে। যে খেলনাটা তার পছন্দ হবে, সেটা নিয়েই থাকতে চায় সারাক্ষণ। বারবার একই কাজ করতে থাকে।
খুব জোরালো আলো, উচ্চস্বরে কথা, জোর আওয়াজ নিতে পারে না অটিস্টিক শিশু। যেখানে ভিড়, কোলাহল, সেখান থেকে পালিয়ে যেতে চায়। জোরে কোনও কিছু তাদের পছন্দ হয় না।
হঠাৎ করে হেসে ওঠা, লাফিয়ে ওঠা, একা একা হাসা, ডাকলে সাড়া না দেওয়া— এসবকিছুই দেখতে পাওয়া অটিস্টিক শিশুর মধ্যে।
অটিজম মানেই অক্ষমতা নয়
তবে একটা কথা বাবা মা কিংবা অভিভাবককে মনে রাখতে হবে, হতাশ হবার কিছু নেই কারণ অটিজম মানেই অক্ষমতা নয়। বরং বিশেষজ্ঞরা বলছেন অটিজম বেশ কিছু দিক থেকে একটি শিশুকে এগিয়ে রাখে অর্থাৎ অ্যাডভান্টেজ দেয়। তার মধ্যে অন্যতম হল ভাবার ক্ষমতা। তারা মৌলিকভাবে ভাবতে পারে।
চিকিৎসা নয় বিশেষ প্রশিক্ষণ
দুই বা আড়াই বছর বয়স থেকেই শিশুদের স্কুলে পাঠান বাবা-মায়েরা। অটিজ়মের লক্ষণ থাকলে সেখানেও শিক্ষক বা শিক্ষিকারা তা ধরতে পারেন। বাকি বাচ্চাদের থেকে তাদের আলাদা করতে পারেন। প্রতিটি শ্রেণিতেই কিছু পড়ুয়া থাকে, যারা বাকিদের সঙ্গে পেরে ওঠে না পড়াশোনায়। তাদের মধ্যে থাকতেই পারে অটিজমের লক্ষণ। তাঁদেরকে ফাঁকিবাজ ধরে নিয়ে বকঝকা না করে বা এড়িয়ে না গিয়ে উচিত তাদের প্রতি মনোযোগী হওয়া।
অটিস্টিক শিশুদের অনেকেরই উন্নত স্মৃতিশক্তি, প্রখর দৃষ্টি ও যে কোনও জটিল বিষয় সহজে বুঝে যাওয়ার ক্ষমতা থাকে। সকলেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায় তা নয়। কাউন্সেলিং করালেই অনেকটা পজিটিভ রেজাল্ট পাওয়া যায়
অটিস্টিক শিশুদের একটু বিশেষ ধরনের যত্নের প্রয়োজন। ‘স্পেশ্যাল এডুকেশন’ দরকার। কিছু নির্দিষ্ট থেরাপি রয়েছে যেমন অকুপেশনাল থেরাপি, ‘স্পিচ থেরাপি’, স্পেশাল এডুকেটর লার্নিং থেরাপি’। এগুলোর মাধ্যমেও একজন অটিস্টিক শিশুকে স্বাভাবিক দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

Latest article