নয়াদিল্লি: শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্রে সোমবার সকালে ইসরোর মহাজাগতিক মিশনের স্বপ্ন মাত্র আট মিনিটের মাথাতেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এদিন ১০টা ১৮ মিনিটে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ISRO) পিএসএলভি- সি ৬২ রকেটটি যাত্রা শুরু করে। কিন্তু উড়ানের কয়েক মিনিটের মধ্যে তা ভেঙে পড়ে। ইসরোর এদিনের মিশনের লক্ষ্য ছিল মহাকাশ অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল ‘সার্ভার রুম’ বা তথাকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা। প্রথম দুটি পর্যায়ে রকেটটি নিখুঁতভাবে অগ্রসর হলেও তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছতেই ছন্দপতন ঘটে। ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় যখন রকেটটি তার তৃতীয় পর্যায়ে (পিএস৩) প্রবেশ করে, তখনই একটি প্রবল যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয়। মিশন কন্ট্রোল সেন্টারের ট্র্যাকিং স্ক্রিনে রকেটের যাত্রাপথ বিচ্যুত হতে শুরু করে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে উপস্থিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়ায়। রকেটটি তার নির্ধারিত কক্ষপথ থেকে মারাত্মকভাবে সরে যায়। ফলে বৈপ্লবিক ‘ডিস্ট্রিবিউটেড পাওয়ার গ্রিড’-এর প্রমাণস্বরূপ ‘এমওআই-১’ পেলোডটি তার ৫০০ কিলোমিটার দূরের গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। এদিনের মিশনটি সাফল্যের মুখ না দেখার ফলে হায়দরাবাদ-ভিত্তিক স্টার্টআপ ‘টেক মি টু স্পেস’ এবং ‘ইয়ন স্পেস ল্যাবস’-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষী রোডম্যাপও এখন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। মহাকাশে একটি সার্বভৌম ভারতীয় ‘পাওয়ার ব্যাঙ্ক’ গড়ার স্বপ্ন ছিল তাদের, যা ছোট ছোট স্যাটেলাইটগুলোকে রিয়েল-টাইমে বিশাল এআই মডেল প্রসেস করার শক্তি জোগাত। এই পরিকাঠামোটি ভারতকে মহাকাশ অর্থনীতির শিল্প মেরুদণ্ডে পরিণত করার ক্ষমতা রাখত। কিন্তু সোমবারের মিশন মুখ থুবড়ে পড়ায় গোটা প্রকল্প ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও স্বপ্নদ্রষ্টারা হাল ছাড়তে নারাজ। এই ব্যর্থতা আবারও মনে করিয়ে দিল যে ইন্টারনেটের ভূগোল বদলাতে প্রস্তুত থাকলেও মহাকাশের দ্বার এখনও অত্যন্ত দুর্গম।
আরও পড়ুন-নির্বিঘ্নে মেলার লক্ষ্যে কড়া প্রশাসনিক নজরদারি
এদিনের এই মিশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ডিআরডিও-র তৈরি অত্যাধুনিক নজরদারি উপগ্রহ ‘অন্বেষা’। মহাকাশ থেকে শত্রু দেশের গতিবিধির উপর নজরদারি চালানোর জন্য এই স্যাটেলাইটটি ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল। তবে রকেটের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা আপাতত অনিশ্চিত। এদিনের মিশনে ভারতের পাশাপাশি ফ্রান্স, নেপাল ও ব্রাজিলের স্যাটেলাইট ছিল। এছাড়া ভারতীয় বেসরকারি সংস্থা ‘ধ্রুব স্পেস’-এর সাতটি স্যাটেলাইটও এই উৎক্ষেপণের অংশ ছিল। মিশন ব্যর্থ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠে গেল। ইসরোর (ISRO) বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মিশনের পিএস-৩ পর্যায়ের শেষের দিকে একটি অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে এই ব্যর্থতা আলাদা করে গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ এটিই পিএসএলভি রকেটের টানা চতুর্থ ব্যর্থ উৎক্ষেপণ। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই মিশন ব্যর্থ হওয়ায় হাজার কোটি টাকা মূল্যের স্যাটেলাইটগুলি মহাকাশেই চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে ইসরো।

