নতুন বছরের প্রথম দিনটি রাজ্য রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ১ জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা দিবস। ১৯৯৮ সালের এই দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দলটির জন্ম দিয়েছিলেন, আজ তা পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল এবং দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। প্রতিষ্ঠার ২৮ বছরে পা রাখল তৃণমূল কংগ্রেস। প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার রাজ্য জুড়ে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলা, ব্লক ও বুথস্তরেও পালন করা হয় প্রতিষ্ঠা দিবস। সেই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বুথ লেভেল এজেন্ট বা বিএলএ-২-দের সংবর্ধনা প্রদান। এসআইআর-এর কাজ নিরলসভাবে এবং নির্ভুলভাবে করার জন্য দল থেকে প্রায় প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্রেই তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন-গদ্দার-ঘনিষ্ঠ নেতা রেলের চাদর চোর
এ বছরের প্রতিষ্ঠা দিবসের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ আর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। বাংলায় বারংবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্ব খাড়া করার চেষ্টা করলেও তাকে বিফল মনোরথ হতে হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাকে বঞ্চনার অপচেষ্টা অব্যাহত। তাই এবারের আসন্ন বিধানসভা ভোট কার্যত যুদ্ধ। প্রায় একইসময়ে চার রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন, কিন্তু বলা বাহুল্য, বাংলার বিধানসভা নির্বাচনই কার্যত বলে দেবে আগামীতে ভারতের রাজনীতি কোন দিকে যেতে চলেছে। প্রবীণ এক সাংবাদিক অন্যত্র মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘এবারের ভোটে হিন্দুত্ব নেহাত প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং তা হবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক। ধর্মীয় শোভাযাত্রা, উৎসবের রাজনীতি, ইতিহাসের পুনর্লিখন— সব মিলিয়ে এক স্থায়ী মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা হবে। এ-রাজনীতির লক্ষ্য একটাই— ভোটার যেন নিজেকে আগে হিন্দু ভাবে, পরে বাঙালি। বিজেপির সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র বরাবরের মতোই ভীতি প্রদর্শন। ‘NRC-CAA’, সীমান্ত, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ এ-শব্দগুলো ২০২৬-এর প্রচারে নতুন করে প্রাণ পাবে। আর ঠিক এইসব কারণেই এইবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের একটা বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের রাজনীতির প্রত্যুত্তর এখনও অবধি দিতে পেরেছে গোটা দেশের মধ্যে শুধু একটাই রাজনৈতিক দল, তার নাম সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। তাই গোটা দেশের ভবিষ্যৎ, ভারতের সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ চরিত্রটি আগামীতে বদলে যাওয়া বা অপরিবর্তিত থাকা, সমস্ত কিছুই নির্ভর করছে তৃণমূল কংগ্রেস কীভাবে এই অসাংবিধানিক ‘হিন্দুত্ববাদী’ চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়ছে, তার ওপরে। তাই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন একটা যুদ্ধের চেয়ে কম নয়। এ-যুদ্ধ ধর্ম আর অধর্মের, ন্যায় বনাম অন্যায়ের, ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্ম নিয়ে রাজনীতির। এ-যুদ্ধে বাংলাকে জিততেই হবে।
এমতাবস্থায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এবং মাননীয় সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বছরের দ্বিতীয় দিনে বারুইপুরে যে সভাটি করলেন, তার গুরুত্ব ঐতিহাসিক। যথার্থই সেনাপতি অভিষেক এই সভার নাম দিয়েছেন ‘রণসংকল্প সভা’। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত এই সভা গোটা রাজ্য জুড়ে আগামী দিনে চলতে থাকবে। তবে এর সূচনা হল সাংসদের নিজের কর্মভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বারুইপুর থেকেই।
আরও পড়ুন-হিয়ারিং-আতঙ্কে মৃত্যু ৩ জনের, শোকার্ত পরিবারের পাশে তৃণমূল
নিজের ফেসবুক হ্যান্ডেলে অভিষেক লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রের গণদেবতার কাছে আমি দৃঢ়চিত্তে প্রতিজ্ঞা করলাম বাংলা-বিরোধী, গণতন্ত্র-বিরোধী বিজেপিকে এই পুণ্যভূমি থেকে সমূলে উৎপাটন করবই। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বর্গ নির্বিশেষে এই বাংলার প্রত্যেকটি মানুষকে ভালো রাখতে তৃণমূল কংগ্রেস অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলার মানুষের মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে তৃণমূল কংগ্রেস অতন্দ্র প্রহরীর মতো সদা জাগ্রত। বাংলার একজন বৈধ নাগরিকেরও ভোটাধিকার হরণ করতে দেবো না আমরা। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলার উন্নয়ন নিবৃত্ত করা, ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করা, সাধারণ মানুষের উপর নির্মম অত্যাচার করা— বিজেপির আসল চেহারা জনসমক্ষে উন্মোচিত। বিজেপির সমস্ত চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রকে পদদলিত করে, বাংলা-বিরোধী স্বৈরাচারী জমিদারদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত।’
হলফ করে বলতে পারি, বাংলাবিরোধীরা বাংলার মানুষের ক্ষতি করার জন্য সেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে, তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস আজ বাংলার পাশে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে না থাকলে কেন্দ্রের জুমলাবাজরা এতদিনে বাংলার বিপদঘণ্টা বাজিয়ে ফেলত। কিন্তু তা এতদিনে শত চেষ্টা সত্ত্বেও করতে পারেনি আর আগামী সময়েও পারবে না। বীর-বিপ্লবীদের মহান পুণ্যভূমি এই বাংলার মাটিকে কখনও কলুষিত হতে দেবে না মা-মাটি-মানুষের দল তৃণমূল কংগ্রেস। জননেত্রী মমতা এবং জননেতা অভিষেক অক্লান্তভাবে নির্ভীক যোদ্ধার মতো বাংলার মাটি, বাংলার মানুষের জন্য লড়ে যাচ্ছেন। এমনকি এসআইআর শুরুর আগেও অপদার্থ নির্বাচন কমিশন কত ভয়ই না দেখিয়েছিল, তার সবকিছুকে রুখে দিয়ে বুক চিতিয়ে সমস্ত অশুভ শক্তি, সকল ঝড়ের কবল থেকে বাংলাকে বারবার বাঁচালেন মমতা এবং অভিষেক।
আরও পড়ুন-বীরভূমে ১১তে ১১ টার্গেট: রামপুরহাটে দাঁড়িয়ে বিজেপি নেতাদের কীর্তি ফাঁস অভিষেকের
আজ থেকে শতসহস্র বছর বাদে বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস যখন লেখা হবে, তখন সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে বাংলার দুই নির্ভীক অতন্দ্র প্রহরীর নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের সম্মিলিত লড়াই, বাংলার জন্য যারা তাদের বুকের শেষ রক্তবিন্দু অবধি দিয়ে দিতে রাজি। এখন পশ্চিমবঙ্গের আম নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কার্যত সমস্ত ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে দিয়ে বাংলার বর্তমান, আগামীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং অতীতের অবমাননাকে রুখে দেওয়া। বাংলাবিরোধীরা যতই চক্রান্ত করুক, যতদিন মমতা-অভিষেক আছেন, যতদিন তৃণমূল সরকারের ওপর আমরা আস্থা রাখতে পারছি, ততদিন নিরাপদ থাকবে বাংলা, ততদিন জিতবে মানবতা, ‘জিতবে বাংলা’!

