বঙ্গ

রামপ্রসাদের গান: বাঙালির নিজস্ব ঘরের গান

ভক্তিগীতি বিশেষত শ্যামাসংগীতের অন্যতম রূপকার সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন৷ সহজ কথায় আর সুরের আর্তিতে তাঁর রচিত সংগীত ছোঁয় সাধারণ মানুষের হৃদয়৷ তবে ভক্তিরসের সঙ্গে সমন্বয়ের বার্তাও যে ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে, তারই বিশ্লেষণে অন্বয় গুপ্ত

আরও পড়ুন-বিনামূল্যে রেশন বন্ধের ভাবনা কেন্দ্রের! মোদিকে চিঠি সৌগতর

এডওয়ার্ড টমসন তাঁর ‘বেঙ্গলি লিরিক্স’ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন— ‘the latter side of Saktaism is the one which is generally present in Ramprasad.’ রামপ্রসাদ সেন সহজ ভাবের সাধনা করতেন—
‘‘জাঁক-জমকে করলে পূজা, অহঙ্কার হয় মনে মনে।
তুমি লুকিয়ে তারে করবে পূজা, জানবে নারে জগজ্জনে।।
ধাতু পাষাণ মাটির মূর্তি, কাজ কি রে তোর সে গঠনে।
তুমি মনোময় প্রতিমা করি, বসাও হৃদি-পদ্মাসনে।।”

আরও পড়ুন-সবুজ মেরুন ভদ্রলোক

রামপ্রসাদের ভক্তির প্রগাঢ়তার সঙ্গে বেদান্ত-আগমের গূঢ় তত্ত্বগুলি মিশে গিয়ে তাঁর সংগীতকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন তন্ত্রসাধক। তন্ত্রসাধকের যাত্রাপথ হল প্রবৃত্তি। বীর ভাবের স্তরে সাধককে উন্নীত হয়ে আধ্যাত্মিক পঞ্চমকারের অধিকার অর্জন করতে হয়।

ইন্দ্রিয়ের দাসত্বমুক্ত হয়ে তাকে মূলাধারচক্রের কুলকুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ ঘটিয়ে যথাক্রমে দেহস্থ স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত ও বিশুদ্ধ আজ্ঞাচক্রের মধ্য দিয়ে চালনা করে তার সপ্তমচক্র সহস্রাধারে স্থিত শিবের সঙ্গে মিলিত করে দিতে হয়, এতে মুক্তি ঘটে। এই সাধনমার্গের পথিক ছিলেন রামপ্রসাদ।

তাঁর গানে তা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর শেষদিকের রচনায় শুধুই মায়ের চরণে আত্মসমর্পণের আকুতি। তিনি মূলত কালীসাধক হলেও তাঁর রচনায় পাওয়া যায় সমন্বয়ের সুরও—
‘‘কালী হলি মা রাসবিহারী
নটবরবেশে বৃন্দাবনে।”
কিংবা,
‘‘মহাকাল কানু, শ্যামা শ্যাম তনু,
একই সকল বুঝিতে নারি।।”
বাংলা সাহিত্যে শক্তিদেবতার সঙ্গে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয় চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে। দেবী চণ্ডীর সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক ছিল যতটা ভয়ের, ততটা ভক্তি কিংবা ভালবাসার নয়। কালের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার শাক্তকবিদের হাতে পড়ে জগজ্জননী কালীমাতা কখনও হয়ে গেলেন মায়ের মতো, কখনও ভক্তরা তাঁদের সন্তানজ্ঞান করলেন। আঠারো শতকের মাঝামাঝি রামপ্রসাদ সেনের হাতেই মায়ের এই বিশেষ রূপটি পরিস্ফুট হয়েছিল।
বঙ্গভূমে নতুন এক যুগ এনেছিলেন চৈতন্যদেব।

আরও পড়ুন-ত্রিপুরায় আরও তিন মামলা কুণাল ঘোষের বিরুদ্ধে

আঠারো শতকের শুরুতেই সমগ্র গৌড়বঙ্গ জুড়ে নেমে এসেছিল এক অন্ধকার যুগ। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বিশেষত বাংলা ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। চারদিকে দাঁতনখ বার করে ফেলেছিল সামাজিক অবক্ষয়। চৈতন্যদেবের সমতুল অপর কোনও ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব না ঘটায় বাঙালি যেন চোখে অন্ধকার দেখে। বৈষ্ণব পদাবলি কিংবা সহজপন্থী বৈষ্ণব সাধনার প্রতি গৃহী মানুষ বিরূপ হয়ে পড়েছিল।

বৈষ্ণবদের প্রেমধর্ম সমাজের কৃষ্টি সম্প্রদায়ের কাছে ‘নেড়ানেড়ির কাণ্ড’ বলে বিদ্রূপের বিষয়ে পরিণত হয়। এই চূড়ান্ত অব্যবস্থার মধ্যে জগজ্জননী দেবীর কাছে বিষয় বাসনার ঊর্ধ্বে উঠে আত্মসমর্পণ করলেন রামপ্রসাদ। সম্ভবত তিনিই প্রথম শাক্ত পদাবলি রচনা করেছিলেন। তাঁর শাক্তপদগুলি বৈষ্ণবদের মতো বিষয় এবং দৈনন্দিন জীবন বিমুখ ছিল না। রামপ্রসাদ ছিলেন সংসারধর্মী, যথেষ্ট বিষয়বুদ্ধি তাঁর ছিল।

ডিক্রি, ডিসমিস, তহবিল তছরুপ, ঘুড়ি, পাশাখেলা একের পর এক প্রচলিত শব্দের ব্যবহার ইত্যাদির সঙ্গে জনসাধারণ খুব সহজেই দৈনন্দিন বিষয়গুলিকে মেলাতে পেরেছিল। সংসারের গ্লানি, নগ্নরূপ, দারিদ্র, রিক্ততা, বহুবিবাহ, স্নেহহীন বিমাতা প্রভৃতি অত্যন্ত প্রকটভাবে রামপ্রসাদের গানে উপস্থিত।

শাক্ত পদাবলির দুই ধারা আগমনী-বিজয়া এবং ভক্তের আকুতি উভয়ক্ষেত্রেই রামপ্রসাদের কৃতিত্ব অতুলনীয়। হিমালয়-মেনকার কন্যা উমাকে শিবের সঙ্গে বিয়ের পর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টিকে মধ্যবিত্ত সংসারে অনাসক্ত বাঙালি এক পরিবারের সঙ্গে মিলিয়ে শ্বশুরবাড়িতে কন্যার দারিদ্রের কথা চিন্তা করে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলা এবং তিনদিনের জন্য কন্যার বাপের বাড়িতে আগমন ঘিরে আনন্দ— উৎকণ্ঠার আশ্চর্য চিত্র এঁকেছেন রামপ্রসাদ এবং অন্যান্য শাক্তকবি।

আরও পড়ুন-আবুধাবিতে উইলিয়ামসনরা জিতলেই ভারতের আশা শেষ

কন্যা উমা বাপের বাড়িতে এলে মা মেনকা অশ্রুসিক্ত নয়নে বারবার মেয়ের কুশলসংবাদ জানতে চান—
‘‘পুনঃ কোলে বসাইয়া, চারুমুখ নিরখিয়া,
চুম্বে অরুণ অধরে।
বলে, জনক তোমার গিরি, পতি জনম-ভিখারি,
তোমা হেন সুকুমারী দিলাম দিগম্বরে।”
পতিগৃহে কন্যা উমার দীর্ঘ অদর্শনের ফলে শোকে কাতর মা মেনকা গিরিরাজকে বারবার অনুনয় করে কৈলাসধামে পাঠালে জামাতার অনুমতি নিয়ে গিরিরাজ কন্যাকে স্বগৃহে নিয়ে এলেন। অভিমান-অভিযোগ-কুশল মঙ্গল আদানপ্রদানের সঙ্গে উমা তিনদিন রইলেন পিতৃগৃহে। দশমীর প্রভাতে জামাতা শঙ্কর এসে উমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান।

কিন্তু মেয়েকে ছাড়তে মন চায় না—
‘‘গিরি, এবার আমার উমা এলে
আর উমা পাঠাবো না,
আমায় বলে বলবে লোকে মন্দ,
কারো কথা শুনবো না।
যদি এসে মৃত্যুঞ্জয়
উমা নেবার কথা কয়,
এবার মায়ে ঝিয়ে করবো ঝগড়া,
জামাই বলে মানবো না।”

আরও পড়ুন-ত্রিপুরায় আরও তিন মামলা কুণাল ঘোষের বিরুদ্ধে

কন্যার অদর্শনের উৎকণ্ঠা দিয়ে শুরু, বিদায়ের বেদনায় তার সমাপ্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন— ‘‘আমাদের এই ঘরের স্নেহ, ঘরের দুঃখ, বাঙ্গালী গৃহের এই চিরন্তন বেদনা হইতে অশ্রুজল আকর্ষণ করিয়া বাঙ্গালীর হৃদয়ের মাঝখানে শারদোৎসব পল্লবে ছায়ায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।… আগমনী ও বিজয়া বাঙ্গালীর মাতৃহৃদয়ের গান।”

রামপ্রসাদের কাছে দেবী বরাভয়দাত্রী। তাঁর মুখমণ্ডল সুপ্রসন্ন ও হাস্যবিকশিত— অভয়ং বরদঞ্চৈব…সুখপ্রসন্নদেশাং স্মেরাননসরোরুহাম্। কবিস্বভাব রামপ্রসাদ ভয়ানক কিংবা বীভৎস রসকে উপেক্ষা করে আশ্রয় নিয়েছেন মধুর রসে। দেবীর কাছে সন্তানরূপে রামপ্রসাদ শুধু আবদার, অভিযোগ এবং বায়নাই করে গেছেন— ‘মা, নিম খাওয়ালে চিনি বলে, কথায় করে ছলো/ ও মা, মিঠার লোভে, তিত মুখে সারা দিনটা গেল।’

প্রবৃত্তির জ্বালায় জ্বলেপুড়ে মরা সন্তানকে মা যেকোনও পরিস্থিতিতে রক্ষা করবেনই— ‘কুপুত্র অনেক হয় মা, কুমাতা নয় কখনো তো।’
কল্যাণময়ী মায়ের কাছে তিনি সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেছেন। তিনি বলতে পারেন—
‘আমি কি দুখেরে ডরাই?…/
সুখ পেয়ে লোক গর্ব করে, আরও করি দুখের বড়াই।।’
ভয়ঙ্করী শ্যামামূর্তির পরিবর্তে রামপ্রসাদ তাঁকে কল্যাণময়ী জননীরূপেই গ্রহণ করেছেন। মিশে গিয়েছে শ্যাম ও শ্যামা—
‘যশোদা নাচাতো গো মা বলে নীলমণি ;
সে বেশ লুকালে কোথা করালবদনী?
একবার নাচগো শ্যামা—
হাসি বাঁশী মিশাইয়ে, মুণ্ডমালা ছেড়ে, বনমালা পরে,
অসি ছেড়ে বাঁশী লয়ে, আড়-নয়নে চেয়ে চেয়ে,
গজমতি নাসায় দুলুক।’
সেরেস্তায় খাতা লেখার সময় হিসেবের খাতায় রামপ্রসাদ লিখেছিলেন—
‘আমায় দেও মা তবিলদারি,
আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী।।

পদরত্ন ভাণ্ডার সবাই লুটে, ইহা আমি সইতে নারি।
ভাঁড়ার জিম্মা যার কাছে মা, সে যে ভোলা ত্রিপুরারি।
শিব আশুতোষ স্বভাব দাতা, তবু জিম্মা রাখো তাঁরি।।
অর্ধ নগ্ন জায়গীর তবু শিবের মাইনে ভারি।
আমি বিনা মাইনের চাকর কেবল চরণ ধূলার অধিকারী।।
যদি বাপের ধারা ধরো তবে বটে আমি হারি।
যদি আমার বাপের ধারা ধর, তবে তো মা পেতে পারি।
প্রসাদ বলে এমন পদের বালাই লয়ে আমি মরি।
ও পদের মতো পদ পাই তো সে পদ লয়ে বিপদ সারি।।’

আরও পড়ুন-অপমানের অভিযোগ তুলে দলত্যাগ জয়ের

তাঁর মালিক এই গানের কথা পড়ে তাঁকে চাকরি থেকে মুক্তি দিয়ে মাসোহারার ব্যবস্থা করে দেন। জগজ্জননী বিশ্বের জীবজগৎ সৃষ্টি করে জীবিকানির্বাহের জন্য সমস্ত দ্রব্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করে রেখেছেন। বিলি-ব্যবস্থার ভার দিয়েছেন মহাদেবের হাতে। তিনি ভোলানাথ এবং আশুতোষ।

তিনি বড় দাতা, পাত্রাপাত্র বিচার না করে সবকিছু দেদার দান করছেন বলে অপচয় ঘটছে। তাই কবি নিজের হাতে জননীর কৃপাভাণ্ডার রাখতে চেয়েছেন। আসলে তন্ত্রসাধনার দিক থেকে দেখতে গেলে এর গভীর অর্থ আছে। সাধনার অধিকারী ভেদ আছে। তা না মেনে অনেকেই অহেতুক সুযোগ গ্রহণ করেন। সাধকের অভিযোগ, যেন যোগ্য সন্তানরাই মায়ের কৃপা লাভ করেন।
রামপ্রসাদের অলংকার ব্যবহারও অসাধারণ। এই পদটি শ্লেষ অলংকার ব্যবহারের একটি অসাধারণ নিদর্শন—
‘এমন দিন কি হবে মা তারা
(যবে) তারা তারা তারা বলে,
তারা বেয়ে পড়বে ধারা।।
এমন দিন কি হবে মা তারা
হৃদিপদ্ম উঠবে ফুটে,
মনের আঁধার যাবে ছুটে
তখন ধরাতলে পড়বো লুটে,
তারা বলে হব সারা
এমন দিন কি হবে তারা
ত্যজিব সব ভেদাভেদ,
ঘুচে যাবে মনের খেদ
(ওরে) শত শত সত্য বেদ,
তারা আমার নিরাকারা
এমন দিন কি হবে তারা।’
ভক্তের কাছে ভক্তিই বড়। অহংচেতনা বিলোপের মাধ্যমে মায়ের পায়ে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলে তারা মনের খেদ দূর করবেন। তাঁর অবস্থান সর্বত্র। জগজ্জননী তিমির দূর করেন।

সংসারচক্রে বাঁধা পড়ে মানুষ প্রতিদিন হাবুডুবু খাচ্ছে। সে যেন কলুর বলদ। জীবনে কোনও উদ্দেশ্য নেই। অসহায় অবস্থায় সে শুধু ছয় রিপুর হাতে মার খেয়ে চলে। বলদ সারাদিন খেটে তেল নিষ্কাশন করে দিলেও নিজে সেই তেলের স্বাদ থেকে বঞ্চিত—
‘মা আমায় ঘুরাবে কত?
কলুর চোখ-ঢাকা বলদের মতো
ভবের গাছে জুড়ে দিয়ে মা,
পাক দিতেছ অবিরত।
তুমি কী দোষে করিলে আমায়,
ছ’টা কলুর অনুগত।।’
রামপ্রসাদের ব্যক্তিজীবন ছিল মানসিক এবং আর্থিক দুঃখে বিচলিত—
‘মাগো তারা ও শঙ্করী।।
তুমি কোন অবিচারে আমার উপর
করলে দুঃখের ডিক্রিজারি
কোন অবিচারে আমার উপর
করলে দুঃখের ডিক্রিজারি
মাগো তারা ও শঙ্করী।
এক আসামী ছ’টা পেয়াদা,
বল মা কিসে সামাই করি।।
আমার ইচ্ছা করে ঐ ছ’টারে
বিষ খাওয়াইয়ে প্রাণে মারি।
মাগো তারা ও শঙ্করী।
পলাইতে স্থান নাই মা,
বল মা কিবা উপায় করি।।
ছিল স্থলের মধ্যে অভয় চরণ
তাও নিয়েছেন ত্রিপুরারী।
মাগো তারা ও শঙ্করী।
পেয়াদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র,
তাঁর নামেতে নিলাম জারি।।
রামপ্রসাদেরে দায় ঠেকায়ে
বসে আছ রাজকুমারী
প্রসাদেরে মাগো আমার
প্রসাদেরে দায় ঠেকায়ে
বসে আছ রাজকুমারী।
মাগো তারা ও শঙ্করী।।’

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম থাকায় গানটির যথেষ্ট ঐতিহাসিক গুরুত্বও আছে।
‘প্যাদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, তাঁর নামেতে নিলাম জারি।
ঐ যে পান বেচে খায় কৃষ্ণ পান্তি তারে দিলে জমিদারি’
এখানে আলিবর্দি খাঁ-র কোপে পড়ে কৃষ্ণচন্দ্রের কারাগারে বাস এবং ইংরেজ বণিকদের কল্যাণে এবং নিজের আশ্চর্য বুদ্ধিতে পানবিক্রেতা কৃষ্ণচন্দ্রের অগাধ সম্পত্তির মালিকানা লাভের কথা উঠে এসেছে।
বাংলার মরমি গানে অর্থাৎ বাউল-মারফতি-ফকিরি-মুর্শিদ-দেহতত্ত্বমূলক গানে মানব শরীরের সঙ্গে জমির উপমা দেওয়া বহুকাল ধরেই চলে আসছে, সম্ভবত কৃষিকাজের প্রাধান্যই এর কারণ। রামপ্রসাদ এই মানবদেহকে মানবজমিন রূপে বর্ণনা করেছেন—
‘মন রে কৃষিকাজ জান না।
এমন মানবজমিন রইল পতিত
আবাদ করলে ফলত সোনা।।’
তৎকালীন বঙ্গভূমিতে বৈষ্ণব-শাক্তের বিরোধ তীব্র ছিল। চৈতন্যদেবের সময় থেকেই বৈষ্ণব সাহিত্যে শাক্ততন্ত্র সম্পর্কে অপ্রিয় মন্তব্যের অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। আর শাক্তরাও বৈষ্ণবদের অনেক সময় সুনজরে দেখতেন না। রামপ্রসাদ অনেকগুলি পদে এই সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করেছেন, আঠারো শতকের সামাজিক পরিবেশে যার সমর্থন ছিল না। শাক্তধর্ম প্রচারে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র নদিয়ায় এক হাজার কালীপুজো করিয়েছিলেন আর দশ হাজার বলি হয়েছিল বলে কথিত আছে—
‘আর কাজ কি আমার কাশী।

মায়ের পদতলে পড়ে আছে, গয়া গঙ্গা বারাণসী।।
হৃৎকমলে ধ্যানকালে, আনন্দ সাগরে ভাসি।
ওরে কালীর পদ কোকনদ, তীর্থ রাশি রাশি।।’
তীর্থভ্রমণের অসারতাও নিয়ে রামপ্রসাদ গেয়েছেন—
‘কাজ কিরে মন, যেয়ে কাশী।
কালীর চরণ কৈবাল্য রাশি।।
সার্ধ ত্রিশ কোটী তীর্থ, মায়ের ও চরণবাসী।
যদি সন্ধ্যা জান শাস্ত্র মান, কাজ কি হয়ে কাশীবাসী।।
হৃৎকমলে ভাব বসে, চতুর্ভুজা মুক্তকেশী।
রামপ্রসাদ এই ঘরে বসি, পাবে কাশী দিবানিশি।।’
চর্যাপদে আছে— ‘পরগট বিনা মুক্তি নাহি সব সাধক পয়মান।’
ভারতীয় সিদ্ধ ও ভক্তি সাহিত্যে গুরুর ওপর খুব জোর দেওয়া হয়েছে। শাক্ততন্ত্র ও সহজিয়া সাধনায় গুরু অপরিহার্য। কবীর, দাদু, নানক, সুন্দরদাস প্রমুখের মধ্যে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে দেখা যায়। সুফিদের দেখা যায় মুর্শিদের প্রতি শ্রদ্ধা। গুরুবাদ ভারতীয় ধর্মের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। রামপ্রসাদ অনেকবার এই বিষয়ে লিখেছেন।

‘গুরুবাক্য শিরে ধর, আত্মতত্ত্ব তত্ত্ব কর।’, ‘বিদ্যাতত্ত্ব, রাখ নিয়ে পাতে পাতে’, ‘মধুপুরী যাব, মধু খাব, শ্রীগুরুর নাম হৃদয়ে ধরি রে।’ ‘গুরুদত্ত মহাসুধা, ক্ষুধায় খেতে নাহি দিলি।’
রামপ্রসাদ কিংবদন্তি হয়ে আছেন পদাবলি, প্রসাদী সুরের সৃষ্টিকর্তা এবং সাধক হিসেবে। এই প্রসাদী সুরে গান বেঁধেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও— ‘আমি শুধু রইনু বাকি’, ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’, ‘শ্যামা এবার ছেড়ে চলেছি মা।’

তাঁর কণ্ঠে মায়ের বন্দনা, বাৎসল্য ও প্রতিবাৎসল্য ধ্বনিত হয়ে সমকালীন গ্রামীণ জীবনের, কৃষি জীবনের, দারিদ্রের, দুঃখ-বেদনার বার্তা উঠে এসেছিল।
রামপ্রসাদের বড় পরিচয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিরোধিতা করে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের বার্তা প্রকাশের একজন কবি হিসেবে।
ঋণ :
১. শাক্ত পদাবলী— ধ্রুবকুমার মুখোপাধ্যায়।
২. রামপ্রসাদ সেনের শাক্ত পদাবলী : মনের গান মানুষের গান— আমিনুল ইসলাম।
৩. বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত— অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।
৪. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড-১— ভূদেব চৌধুরী
৫. সাধক কবি রামপ্রসাদ— যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত।
৬. সাধক রামপ্রসাদ : জীবনী ও তাঁর পদাবলী— প্রশান্ত সেন সম্পাদিত।

Jago Bangla

Recent Posts

আরও একধাপ এগোলেন! ভ্যান্স-রুবিওকে সঙ্গে নিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখল ট্রাম্পের

গ্রিনল্যান্ড (Greenland_Donald Trump) দখলে মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার একধাপ এগিয়ে মঙ্গলবার ট্রাম্প তাঁর…

58 minutes ago

নিজের কেবিনে একাধিক মহিলার সঙ্গে অশ্লীল আচরণ, সাসপেন্ড পুলিশকর্তা

এক নয়, একাধিক! নিজের দফতরে মহিলাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর শাস্তি পেলেন সেই পুলিশ আধিকারিক। কর্নাটক…

4 hours ago

রাজ্যে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

প্রতিদিন ১ ডিগ্রি করে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। কলকাতা (Kolkata) থেকে আগামী কয়েকদিনে প্রবল শীতের কনকনানি…

5 hours ago

সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি, নেপথ্যে কোন অঙ্ক?

নয়াদিল্লি : অভূতপূর্ব ঘটনা বিজেপিতে (BJP)। মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই বিজেপি সভাপতি পদে বসলেন নীতিন…

5 hours ago

সিআরপিএফ ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার নাবালিকা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করল ক্ষুব্ধ তৃণমূল

নয়ডা : ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যে এখন নারী-নিরাপত্তার নামে যে কতবড় প্রহসন চলছে তা আরও…

5 hours ago

‘তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’

দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতেই হত। এত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন সহ্যের সব…

5 hours ago