নতুন বছরের শুরুতেই সুখবর চার কৃতী বাঙালি পেলেন রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান পুরস্কার (শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার বিভাগ) (Bhatnagar Award)। তৈরি করলেন মাইলফলক। কে এই চার বিজ্ঞানী। তাঁরা কেন এই কৃতিত্বের অধিকারী হলেন।
ড. দিব্যেন্দু দাস
কলকাতার বিখ্যাত রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে, ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (IACS) থেকে পিএইচডি অর্জন করেন ড. দিব্যন্দু দাস। তাঁর পিএইচডি-র বিষয় ছিল মলিকুলার অ্যাসেম্বলি এবং ন্যানো-টেকনোলজির প্রাথমিক স্তর। পিএইচডি শেষ করার পর তিনি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের সান্নিধ্যে গবেষণার সুযোগ পান। তাঁর কর্মজীবনের এই সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইজরায়েলের নেগেভ-এর বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা করেন। তখন তাঁর বিষয় ছিল মূলত ‘সিস্টেম কেমিস্ট্রি’ এবং ‘অটো-ক্যাটালিটিক সেট’। এরপর তিনি জার্মানির মিউনিখ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন অণুর বিবর্তন এবং আদিম জৈবিক কাঠামোর কৃত্রিম রূপদান নিয়ে কাজ চালাতে থাকেন। বিদেশে গবেষণার প্রভূত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ড. দাস ২০১৩-’১৪ সাল নাগাদ তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (IISER) কলকাতা-তে শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে রসায়ন বিভাগের একজন সম্মাননীয় অধ্যাপক।
IISER কলকাতায় তিনি নিজস্ব একটি রিসার্চ গ্রুপ তৈরি করেন, যা বৈজ্ঞানিক মহলে ‘Das Group’ নামে পরিচিত। তাঁদের গবেষণার প্রধান লক্ষ্য হল— অ্যাবায়োজেনিক প্রোটোকল (নির্জীব থেকে সজীব বস্তুর বিবর্তনের গাণিতিক ও রাসায়নিক মডেল তৈরি) এবং ন্যানো-মেডিসিন— এমন সব জৈব-অণু তৈরি করা যা নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় সাহায্য করে। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণহীন জড় পদার্থ থেকে কীভাবে প্রাণের স্পন্দন বা প্রথম কোষ তৈরি হয়েছিল, সেই রহস্য উন্মোচনই তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য। তিনি এমন কিছু রাসায়নিক অণু তৈরি করেছেন যা নিজে থেকেই নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করতে পারে (Self-assembly)। ড. দাস দেখিয়েছেন কীভাবে সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে জটিল জৈবিক কাঠামো তৈরি হওয়া সম্ভব। তাঁর এই কাজ বিশ্বজুড়ে রসায়নবিদদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁর গবেষণাগারে এমন কিছু পদার্থ তৈরি হচ্ছে যা বাইরের উদ্দীপনায় (যেমন আলো বা তাপ) নিজের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারে, যা ন্যানো-প্রযুক্তিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার (Bhatnagar Award) ছাড়াও ড. দাস তাঁর কর্মজীবনে একাধিক সম্মান লাভ করেছেন। ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ তাঁকে স্বর্ণজয়ন্তী ফেলোশিপ প্রদান করেছে। কেরিয়ারের শুরুতেই তাঁর গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে সিএসআইআর ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞান পত্রিকায় ড. দাসের প্রায় দেড়শ মতো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাগারের চার দেওয়ালের বাইরেও ড. দাস একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক।
আরও পড়ুন-জনসভায় দাঁড়িয়ে জনতার সমস্যা শুনে বাস্তবসম্মত সমাধান বাতলে দিলেন অভিষেক
ড. দেবার্ক সেনগুপ্ত
ইন্দ্রপ্রস্থ ইনস্টিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি (IIIT), দিল্লির বায়োলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. দেবার্ক সেনগুপ্তের কর্মজীবন আধুনিক বিজ্ঞানের এক চমৎকার বিবর্তন। তিনি একজন প্রথাগত জীববিজ্ঞানী নন, বরং কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞানের মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে ‘কম্পিউটেশনাল বায়োলজি’র এক নতুন যুগের সৃষ্টি করেছেন।
ড. দেবার্ক সেনগুপ্তের উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি সেখান থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI) কলকাতা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার মূল বিষয় ছিল গাণিতিক মডেল এবং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে জৈবিক তথ্যের বিশ্লেষণ। পিএইচডি শেষ করার পর তিনি বিশ্বখ্যাত গবেষণাগারে কাজ করার সুযোগ পান। সিঙ্গাপুরে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে মূলত জিনোম ইনস্টিটিউট অফ সিঙ্গাপুর (GIS)-এ ‘সিঙ্গেল সেল জিনোমিক্স’ নিয়ে কাজ শুরু করেন। কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে কয়েক লক্ষ কোষের তথ্য নিমেষের মধ্যে বিশ্লেষণ করা যায়, সেই দক্ষতা তিনি সেখান থেকেই অর্জন করেন। বিদেশের ল্যাবে থাকাকালীন তিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জিনতত্ত্ববিদদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন, যার ফলে তাঁর গবেষণাপত্রগুলো আন্তর্জাতিক স্তরে সমাদৃত হয়। বর্তমানে তিনি IIIT দিল্লি-তে ‘অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর’ হিসেবে কর্মরত। এর পাশাপাশি এমন একটি অত্যাধুনিক গবেষণাও পরিচালনা করছেন যা ভবিষ্যতে কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং জীববিদ্যার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে ড. দেবার্কের কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল ক্যানসার নির্ণয় এবং চিকিৎসায় কম্পিউটারের ব্যবহার। তাঁর ল্যাব এমন কিছু সফটওয়্যার টুল তৈরি করেছে যা কোষের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে কোন কোষটি ভবিষ্যতে টিউমার তৈরি করতে পারে কি না। প্রতিটি মানুষের শরীর আলাদা। তাই সবার জন্য এক ওষুধ কার্যকর হয় না। ড. দেবার্কের অ্যালগরিদম রোগীর জিনের তথ্য দেখে চিকিৎসকদের বলে দেয় কোন্ ওষুধটি তাঁর জন্য সেরা হবে।
শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার ছাড়াও তিনি আরও অনেক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি (INSA) মেডেল লাভ করেন। বিআইআরএসি (BIRAC) ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড।‘নেচার কমিউনিকেশনস’ এবং ‘বায়োইনফরমেটিক্স’-এর মতো বিশ্বসেরা বিজ্ঞান পত্রিকায় তাঁর গবেষণালব্ধ ফলাফল নিয়মিত প্রকাশিত হয়। ড. দেবার্ক তাঁর আবিষ্কৃত প্রযুক্তিগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বেশ কিছু স্টার্টআপ এবং স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন।
ড. অর্কপ্রভ বসু
কম্পিউটার আর্কিটেকচার এবং সিস্টেম সিকিউরিটির একজন বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ হলেন ড. অর্কপ্রভ বসু । তাঁর কর্মজীবন মূলত হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের এমন এক জটিল সন্ধিস্থলে আবর্তিত, যা আধুনিক কম্পিউটিংয়ের গতি ও নিরাপত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
অর্কপ্রভ বসুর মেধার পরিচয় পাওয়া যায় ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই। তিনি ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিটস পিলানি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক (B.E.) সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার টানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি (Ph.D.) ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল কম্পিউটারের মেমোরি সিস্টেম এবং ভার্চুয়ালাইজেশন।
পিএইচডি শেষ করার পর বিশ্বখ্যাত সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি AMD-এর রিসার্চ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU) এবং আধুনিক প্রসেসরের নকশা তৈরির গবেষণায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এই শিল্প-অভিজ্ঞতা তাঁকে হার্ডওয়্যারের বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝতে সাহায্য করে, যা পরবর্তীকালে তাঁর অ্যাকাডেমিক গবেষণায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
২০১৫ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং দেশের শ্রেষ্ঠ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISC), বেঙ্গালুরুতে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড অটোমেশন (CSA) বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। এখানে তিনি নিজস্ব গবেষণাগারে ‘কম্পিউটার সিস্টেম আর্কিটেকচার’ নিয়ে কাজ করেন।
ড. বসুর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় অবদান হল কম্পিউটারের মেমোরি ম্যানেজমেন্ট এবং হার্ডওয়্যার সিকিউরিটি। বর্তমানের বড় বড় ডেটাসেন্টার এবং ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে তথ্যের আদান-প্রদান দ্রুততর করার জন্য তিনি নতুন ধরনের গাণিতিক মডেল ও হার্ডওয়্যার নকশা তৈরি করেছেন। সফটওয়্যার ভাইরাস বা অ্যান্টিভাইরাস নিয়ে আমরা সচেতন থাকলেও, হার্ডওয়্যার স্তরেও তথ্য চুরি হতে পারে (যাকে সাইড-চ্যানেল অ্যাটাক বলা হয়)। ড. বসু এমন কিছু চিপ আর্কিটেকচার তৈরি করেছেন যা এই ধরনের হ্যাকিং প্রতিরোধ করতে সক্ষম। হার্ডওয়্যারের সাথে অপারেটিং সিস্টেমের মেলবন্ধন ঘটানোর মাধ্যমে কীভাবে কম্পিউটারের কর্মক্ষমতা বাড়ানো যায়, তা তাঁর গবেষণার অন্যতম স্তম্ভ।
শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার (Bhatnagar Award) ছাড়াও তিনি আরও অনেক আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। কম্পিউটার আর্কিটেকচার জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মান IEEE মাইক্রোটপ পিক্স তার ঝুলিতে। বছরের সেরা গবেষণাপত্রগুলোর জন্য তিনি একাধিকবার এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তাঁর গবেষণার গুরুত্ব বিবেচনা করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি সংস্থাগুলো তাঁকে গুগল এবং ফেসবুক ফ্যাকাল্টি অ্যাওয়ার্ড-এ সম্মানিত করেছেন ও অনুদান প্রদান করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন তাঁর কাজের উৎকর্ষতার জন্য তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন (NSF) ফেলোশিপ লাভ করেন।
অধ্যাপক সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়
টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR), মুম্বইয়ের গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় সমসাময়িক সময়ের গণিত বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তাঁর কর্মজীবন মূলত গণিতের জটিল সমীকরণ এবং মহাবিশ্বের গাণিতিক কাঠামোর এক অপূর্ব সমন্বয়।
সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়ের গাণিতিক প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ছাত্রজীবনের একেবারে শুরু থেকেই। তিনি কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI) থেকে গণিতে স্নাতক (B.Stat) ও স্নাতকোত্তর (M.Stat) সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি উচ্চতর গবেষণার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত জ্যাকবস ইউনিভার্সিটি ব্রেমেন (Jacobs University Bremen) থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘কমপ্লেক্স ডাইনামিক্স’— যা গণিতের অত্যন্ত কঠিন এবং আধুনিক একটি শাখা। পিএইচডি করার পর তিনি বিশ্বের সেরা কিছু গাণিতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার আমন্ত্রণ পান। ব্রাউন ইউনিভার্সিটি (USA)-তে তিনি পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন। আবার, ইউরোপের ইনস্টিটিউট অফ ম্যাথমেটিকাল সায়েন্সেস (স্পেন)-এ কাজ করার সময় তিনি গণিতের অমূর্ত জ্যামিতিক কাঠামোর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেন। ২০১৭ সালে তিনি মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR)-এ যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে গণিত বিভাগের একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। এখানে তিনি তাঁর নিজস্ব একটি ‘ডাইনামিক্যাল সিস্টেম গ্রুপ’ পরিচালনা করেন। সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়ের কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল ‘কমপ্লেক্স অ্যানালিসিস’ এবং ‘হলোগ্রাফিক ডাইনামিক্স’। ম্যানডেলব্রট সেট (Mandelbrot Set) গণিতের এমন এক জটিল জ্যামিতিক নকশা যা জুম করলে একই ধরনের কাঠামো বারবার ফিরে আসে। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এই সেটের সীমানা এবং এর গাণিতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে এমন কিছু প্রমাণ দিয়েছেন যা বিশ্ব জুড়ে গণিতবিদদের অবাক করেছে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রকৃতির এলোমেলো নকশার মধ্যেও (যেমন মেঘ বা গাছ) এক নিখুঁত গাণিতিক শৃঙ্খলা লুকিয়ে থাকে। গণিতের জগতে ‘করস্পন্ডেন্স’ বা দুটি ভিন্ন জগতের গাণিতিক মিল খুঁজে বের করায় তিনি দক্ষ। তাঁর এই কাজ ভবিষ্যৎ মহাকাশ বিজ্ঞান এবং স্ট্রিং থিওরির গাণিতিক ব্যাখ্যায় কাজে লাগতে পারে। শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার তাঁর কর্মজীবনের একটি মুকুট মাত্র। এ-ছাড়াও তিনি বিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য পান বি এম বিড়লা সায়েন্স প্রাইজ। ভারতের ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি তাঁকে ইনসা (INSA)বা ইয়ং সায়েন্টিস্ট মেডেল প্রদান করে। ‘ইনভেন্টিওনেস ম্যাথমেটিকা’তে নিয়মিত তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় কেবল একজন গবেষক নন, তিনি একজন অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষকও। বাঙালি গণিতবিদদের যে দীর্ঘ উত্তরাধিকার (যেমন সত্যেন্দ্রনাথ বসু) রয়েছে, অধ্যাপক সব্যসাচী তাকে একবিংশ শতাব্দীতে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
অবশেষে বলাই যায়, বঙ্গভূমি আজও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলোর জন্মদাত্রী, আর ২০২৫-এর এই রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান পুরস্কার তারই এক জীবন্ত দলিল৷

