নাম দিয়ে জায়গাকে চেনা ভারি দুষ্কর, নাম দিয়ে কি বোঝা যায় থাকে কারা, সাধু নাকি তস্কর?

"What's in a name? That which we call a rose / Would smell sweet to the name." লিখে গেছেন শেক্সপিয়ার, রোমিও জুলিয়েট নাটকে। কিন্তু বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে নামকরণের রাজনীতি চলছে। এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। লিখছেন ইতিহাসের অধ্যাপক আজিজুল বিশ্বাস

Must read

ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—নামকরণের রাজনীতি। এটি আর কেবল রাস্তা, রেলস্টেশন কিংবা সরকারি স্থাপনার নাম পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নেই; এবার আস্ত শহরের নামকরণেও এই প্রবণতার বিস্তার ঘটেছে। বিশেষত, বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এই নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কি নিছক ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য?

বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশে নাম পরিবর্তনের প্রবণতা সর্বাধিক প্রকট। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার একাধিক ঐতিহাসিক শহরের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। এলাহাবাদের নাম পরিবর্তন করে ‘প্রয়াগরাজ’ ও ফৈজাবাদের নাম করা হয়েছে ‘অযোধ্যা’। এছাড়াও, আগ্রার নাম পরিবর্তন করে ‘অগ্রবন’ বা ‘অগ্রবাল’ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। যোগী সরকারের মতে, ফিরোজাবাদের নাম ‘চন্দ্রনগর’ করার সিদ্ধান্ত একটি ঐতিহাসিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। বিজেপির দাবি অনুযায়ী, রাজা চন্দ্রসেনের শাসনামলে শহরটির নাম ছিল চন্দ্রনগর। পরবর্তীতে মুঘল সেনাপতি ফিরোজ শাহ চন্দ্রসেনকে পরাজিত করে শহরের নাম পরিবর্তন করেন। এছাড়া উত্তর প্রদেশে মুজাফ্‌ফরনগরের নাম ‘লক্ষ্মীনগর’ করার দাবি উঠেছে।

উত্তরপ্রদেশ ছাড়াও বিজেপি-শাসিত উত্তরাখণ্ডেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির সরকার হরিদ্বারের ‘আউরঙ্গজেবপুর’-এর নাম ‘শিবাজিনগর’, ‘ঘাজিওয়ালি’-এর নাম ‘আর্যনগর’, এবং ‘আকবরপুর ফজলপুর’-এর নাম ‘বিজয়পুর’ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। দেরাদুনের ‘মিয়াওয়ালা’কে ‘রামজিওয়ালা’ এবং নৈনিতালের ‘নবাবি রোড’-কে ‘অটল মার্গ’ হিসেবে নামকরণের প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে।
মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটেও একই রকম উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। গুজরাটের পুরনো রাজধানী আহমেদাবাদের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠেছে। সুপ্রাচীন এই বাণিজ্যিক শহরের নাম পরিবর্তন করে ‘কর্ণাবতী’ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের দাবি, এই নামটি আহমেদাবাদের পূর্ববর্তী নাম যা মধ্যযুগীয় গুজরাটের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির পরিচায়ক।এই প্রবণতা অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। মহারাষ্ট্রে ঔরঙ্গাবাদের নাম পরিবর্তন করে মারাঠা শাসক ছত্রপতি শম্ভাজির নামে ‘শম্ভাজিনগর’ করার দাবি উঠেছে। এই দাবিকে মান্যতা দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মহারাষ্ট্রের দুই ঐতিহাসিক শহর ঔরঙ্গাবাদ ও ওসমানাবাদের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে ‘ছত্রপতি শম্ভাজিনগর’ ও ‘ধারাশিব’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

আরও পড়ুন-দু’মুখো বাম-বিজেপি, ত্রিপুরায় এক, আর বাংলায় অন্য রূপে

অপর বিজেপি শাসিত রাজ্য মধ্যপ্রদেশে ভোপালের নাম পরিবর্তন করে ‘ভোজপাল’ করার দাবি করা হচ্ছে, যা রাজা ভোজের প্রতি সম্মান জানিয়ে দেওয়া প্রস্তাব।সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ঘোষণা করেছেন যে, দেওয়াস জেলার ৫৪টি গ্রামের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের দাবি, মুসলিম ঐতিহ্যবাহী ব্যক্তিদের নামে থাকা গ্রামগুলোর নাম পরিবর্তন করে স্থানীয় জনগণের অনুভূতিকে সম্মান জানানো হবে এবং ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা হবে। নাম পরিবর্তনের আওতাভুক্ত গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে মুরাদপুর, যার নাম পরিবর্তন করে মুরলিপুর রাখা হয়েছে; হায়দারপুরকে হিরাপুর, শামসাবাদকে শ্যামপুর এবং ইসলামনগরকে ঈশ্বরপুর নামকরণ করা হয়েছে। বিজেপি নেতারা এই পদক্ষেপকে ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার’ হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের মতে, এটি হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সম্মান রক্ষার উদ্যোগ। মধ্যপ্রদেশে নাম পরিবর্তনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে বিজেপি সরকার শাজাপুর জেলায় ১১টি এবং উজ্জয়িনী জেলার ৩টি গ্রামের নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘মৌলানা’ গ্রামের নাম পরিবর্তন করে ‘বিক্রম নগর’ রাখা। সেই পদক্ষেপও তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। এই নাম পরিবর্তনের প্রবণতা ঐতিহাসিক সত্যকে মুছে ফেলার প্রয়াস। তাদের মতে, মুসলিম শাসকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বা নামকৃত গ্রামগুলোর নাম পরিবর্তন ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায়কে অস্বীকার করার সমান। ভারতের আরেক বিজেপি শাসিত উত্তরপূর্বের আসামের হেমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার করিমগঞ্জের নাম বদলে করেছে শ্রীভূমি। এমনকি কংগ্রেস শাসিত এবং হিমাচল প্রদেশে সিমলার নাম ‘শ্যামলা’ করার দাবি উঠেছে।

নাম পরিবর্তনের প্রবণতা এখন বিজেপি শাসিত নয় এমন রাজ্যেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে, তেলেঙ্গানার বিজেপি নেতারা রাজ্যের রাজধানী হায়দরাবাদের নাম পরিবর্তন করে ঐতিহাসিক নাম ‘ভাগ্যনগর’ করার দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, ভাগ্যনগর নামটি হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই সাংস্কৃতিক পরিচিতি পুনরুদ্ধার করা হবে। বিজেপি নেতারা জানিয়েছেন, শুধু হায়দরাবাদ নয়, সেকেন্দ্রাবাদ ও করিমনগরের মতো আরও কিছু ঐতিহাসিক শহরের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। তারা মনে করেন, এই নামগুলো পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।

এই নাম বদলের খেলা সমানে চলছে দিল্লিতে। ইতিমধ্যে আওরঙ্গজেব রোডের নাম এ পি জে আব্দুল কালাম, এবং তুঘলক রোডের নাম হয়েছে বিবেকানন্দ মার্গ। এমনকি শাহজাহান রোড,হুমায়ুন রোড, আকবর রোডের নাম বদলে ফেলার দাবি উঠেছে। কারণ মুঘল, সুলতানি শাসনকাল হল ভারতের গোলামির প্রতীক। এই ধরনের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগকে বিজেপি নেতারা ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, সমালোচকরা এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ বলে মনে করছেন। এই নাম পরিবর্তনের প্রবণতার পেছনে মূলত রয়েছে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সম্প্রসারণ ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ প্রতিষ্ঠার কৌশল। বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যে সমস্ত স্থানের নাম পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, তাদের অধিকাংশেরই নাম ইসলামি উৎস থেকে এসেছে। বিজেপি মনে করে, এই নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে হিন্দু সংস্কৃতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সহজতর হবে। বিজেপির সমর্থকদের কাছে এই নামকরণ প্রকল্প একধরনের ঐতিহাসিক প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতীক। এটি যেমন মুসলিম শাসনের ‘অন্যায়’ সংশোধন বলে তাদের মনে হয়, তেমনই হিন্দু ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার করার একটি প্রচেষ্টা। এছাড়াও, নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে জনগণের মনোযোগ প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে সরিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।

যদিও বিজেপির সমর্থকদের কাছে এই উদ্যোগ জনপ্রিয়, তবে এর সমালোচনাও কম হয়নি। বিরোধীরা মনে করেন, বিজেপি এই নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশকে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে। এছাড়াও, প্রকৃত উন্নয়নের অভাব ঢাকার জন্য এই ধরনের সাংস্কৃতিক রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। নাম পরিবর্তনের এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে। কারণ, জনগণ বিজেপিকে মূলত উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য ভোট দিয়েছে, ধর্মীয় আবেগকে উস্কে দেয়ার জন্য নয়। ভারতে বিজেপির নেতৃত্বে নামকরণের এই রাজনীতি একটি নতুন ধারা তৈরি করেছে। যদিও এর পেছনে ইতিহাসের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবী করা হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে এটি হিন্দুত্ববাদী আদর্শের প্রচারের একটি রাজনৈতিক কৌশল। তবে বিজেপিকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, শুধুমাত্র ধর্মীয় আবেগকে উস্কে দেয়া যথেষ্ট নয়। প্রকৃত উন্নয়ন ও জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করাই তাদের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হতে পারে।

Latest article