২০২৬-এর শুরুতেই স্পষ্ট কথাটা স্পষ্টভাবে বলে নেওয়া দরকার। যেভাবে প্রতিনিয়ত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলায় কথা বলার জন্য পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার চালানো হচ্ছে, তাতে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে ভিনরাজ্যে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে।
এই প্রেক্ষিতে বিজেপিকে বাংলা থেকে তাড়াতে হবে, যেভাবে তারা বাংলায় কথা বলার জন্য বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকে তাড়াচ্ছে। এরপর কোনও বাঙালির উপর অত্যাচার হলে বিজেপি নেতাদের গাছে দড়ি দিয়ে বেঁধে পেটানো ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না। যেমন আয়নায় মুখ দেখাবে, তেমনটাই দেখবে।
এসআইআর শুনানি যত এগোচ্ছে মানুষের ক্ষোভ ততই চড়ছে। তাতে অবশ্য বিজেপি নেতৃত্বের হেলদোল নেই। উল্টে কমিশনের প্রতিটি কাজের সাফাই দিচ্ছে। কমিশনের কাজের দায় আগ বাড়িয়ে নিজেদের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। এছাড়া বিজেপির উপায়ও নেই। কারণ এই মুহূর্তে কমিশনই ভরসা। বিজেপির সুবিধে হবে, এমনই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কমিশন। ইনিউমারেশন শুরু হতেই বিজেপি বুঝেছিল, বুথের ভোটারকেই সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএলএ করার ক্ষমতা তাদের নেই। বিষয়টি স্পষ্ট হতেই কমিশন জানিয়ে দিল, বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার হলেই যে কোনও বুথের বিএলএ হতে পারবেন। বাংলায় শুনানিতে থাকবে মাইক্রো অবজার্ভার। তাঁরা সকলেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মী অথবা অফিসার। তবে, এটা কেবল বাংলার জন্যই। এসব দেখে অনেকে বলছেন, পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে এরপর হয়তো ভোট কাউন্টিংয়ে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি থাকার উপরেও জারি হবে নিষেধাজ্ঞা। ফলে কমিশনের কাজকে দু’হাত তুলে সমর্থন করা ছাড়া বিজেপির কোনও রাস্তা নেই। তাই মানুষের চরম দুর্ভোগ, হয়রানি সত্ত্বেও বিজেপি নেতৃত্ব কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে। শুনানিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের মন্তব্যে ভুক্তভোগীদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়েছে। মানুষের এই হয়রানি সুকান্তবাবুদের মনে দাগ কাটেনি। উল্টে তিনি শুনানিতে অসুস্থ ও বয়স্কদের যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, ‘যাঁরা অসুস্থ তাঁরা ভোট দিতে কীভাবে ভোটকেন্দ্রে আসবেন? তখন অসুবিধে হবে না?’ সাফাই দিতে গিয়ে টেনে এনেছেন নিজের বাবার উদাহরণ। তিনি বলেছেন, ‘আমার বাবা অসুস্থ মানুষ। তিনি ভোট দিতে যেতে পারেন না। তাই এসআইআরে তাঁর নাম নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। আপনি যদি ভোট দিতে যেতে পারেন, তাহলে এসআইআরে যেতে পারবেন না কেন?’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সর্বোপরি একজন অধ্যাপকের থেকে এমন প্রতিক্রিয়া কল্পনাও করা যায় না! সুকান্তবাবু কমিশনের ‘অমানবিক’ কাজকে সমর্থন করতে গিয়ে এমন সব কথাবার্তা বলছেন যা পুত্রস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকেও হার মানিয়েছে। তবে, সুকান্তবাবু নিরুপায়। বিজেপির ‘বিগ বস’ অমিত শাহ বাংলায় ‘ঘুসপেটিয়া’দের নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। তাই তাঁকেও সেই সুরে সুর মেলাতে হবে। বেসুরো হলেই হাল যে পূর্বসূরি দিলীপ ঘোষের মতোই হবে, সেটা তিনি বিলক্ষণ জানেন। তাই কমিশনের প্রতিটি কাজকে সমর্থন করা ছাড়া উপায় নেই।
আরও পড়ুন-নতুন বছরে সন্তানকে দিন নতুন পথের দিশা
এসআইআর শুরুর আগে বঙ্গ বিজেপি বলেছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমান ও রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেওয়া হবে। তাহলেই পতন ঘটবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের। কারণ তৃণমূল সরকার রোহিঙ্গাদের ভোটেই টিকে আছে। কিন্তু, শুনানিতে মুসলিমদের পাশাপাশি প্রচুর হিন্দুও ডাক পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, এসআইআর সময়সাপেক্ষ কাজ। বছর খানেকের বদলে কমিশন বাংলায় সেই কাজটাই করতে চাইছে মাত্র তিন মাসে। কমিশনের তাড়া না থাকলেও বিজেপির আছে। কারণ শিয়রে বাংলায় ক্ষমতা দখলের লড়াই। পুরোনো ভোটার তালিকা ধরে ভোট করলে বিজেপিকে বাংলায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই কমিশনকে দিয়ে নিজেদের পছন্দের ভোটার তালিকা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। এসআইআর শুনানি পর্বে হিন্দু মুসলমান, মতুয়া সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সব বাঙালি টের পাচ্ছেন, বিজেপির দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নেই।
অকারণে শুনানির লাইনে দাঁড়াতে যাঁরা বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা প্রত্যেকেই অসন্তুষ্ট। নাকে অক্সিজেনের পাইপ নিয়েই শুনানিতে আসতে হয়েছে বোলপুরের ভোটারকে। মার্চেন্ট নেভিতে কাজের সুবাদে দেশে দেশে ঘুরেছেন। ২০০২ সালের তালিকায় তাঁর নাম নেই। তাই তিনি সন্দেহজনক। নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে কলকাতা থেকে দাঁতনে আসতে হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামী পরিবারের সন্তান প্রশান্তকুমার মোহান্তিকে। এই অবসরপ্রাপ্ত বিচারক প্রচণ্ড বিরক্ত। এমনকী, ডাক পেয়েছেন প্রাক্তনস্ত্রীও। সর্বস্তরের মানুষকে হয়রানির মুখে ফেলেছে কমিশন।
এসআইআর শুরুর সময় আতঙ্কে ছিলেন মূলত সংখ্যালঘুরা। এখন তা ছড়িয়েছে হিন্দুদের মধ্যেও। শুনানি-যন্ত্রণা সর্বত্র। এই হয়রানির ক্ষোভ কতটা, ইভিএম খুললেই টের পাবে বিজেপি। গেরুয়া নেতারা তখন বুঝতে পারবেন, যে ডালে বসে তাঁরা এতদিন ডানা ঝাপটেছেন, এসআইআর করতে গিয়ে সেই ডালটাই কেটে বসেছেন।
খেলা হবে। জয় বাংলা।

