Featured

হাড় নিরাময়কারী আঠা

অর্থোপেডিক সার্জারির এক নতুন দিগন্ত। হাড় বা অস্থি, দেহের অন্যতম শক্ত অংশ যা আমাদের শরীরের গঠনের অন্যতম মূল কান্ডারি সেটি যখন কোনও কারণে ভেঙে যায়, তখনই বাধে গোল। দেহের অন্য কোনও অঙ্গ কাটা জোড়া করতে কোনও সমস্যা না হলেও অস্থির ব্যাপারে সেটি প্রায় অসম্ভব। যদিও প্লেট, স্ক্রু এবং ইন্ট্রামেডুলারি নেল-এর মতো কিছু ঐতিহ্যগত পদ্ধতি এই অস্থি জোড়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম, তবে বর্তমানে এমন একটি ‘হাড়ের আঠার’ সন্ধান মিলেছে, যা ভাঙা হাড়ের উপরিভাগকে তাৎক্ষণিকভাবে জুড়ে দিতে সক্ষম, এই বোন গ্লু এমন একটি উপাদান যা অর্থোপেডিক সার্জারির জগতে এক পরম আরাধ্য বিষয়।

আরও পড়ুন-স্মৃতিদের পাঁচে পাঁচ

হাড় জোড়া লাগানো কেন কঠিন?
হাড়ের আঠা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে এটি বোঝা জরুরি যে এটি তৈরি করা কেন একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। কাঠ বা ধাতুর মতো নির্জীব বস্তুর সাপেক্ষে হাড় হল একটি জীবন্ত, সিক্ত এবং গতিশীল টিস্যু।
সিক্ত পরিবেশ : অধিকাংশ শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত আঠা আর্দ্রতার উপস্থিতিতে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। হাড় ক্রমাগত রক্ত, আন্তঃকোষীয় তরল এবং লিপিড দ্বারা সিক্ত থাকে, যা সাধারণ আঠাকে ঠিকমতো বাঁধতে দেয় না।
জৈব-সামঞ্জস্যতা : আঠাটি বিষাক্ত হওয়া চলবে না। এটি আশেপাশের টিস্যুতে প্রদাহ বা কোষের মৃত্যু (নেক্রোসিস) ঘটাতে পারবে না।
যান্ত্রিক সামঞ্জস্য : হাড় একই সাথে শক্ত এবং নমনীয়। আঠা যদি খুব বেশি ভঙ্গুর হয়, তবে শরীরের ওজনে তা ফেটে যাবে; আবার যদি খুব নরম হয়, তবে হাড় সঠিক অবস্থানে জোড়া লাগবে না।
অস্টিওকন্ডাক্টিভিটি : আদর্শভাবে আঠাটি কেবল হাড়ের ওপর বসে থাকবে না। এটি একটি কাঠামো বা ‘স্ক্যাফোল্ড’ হিসেবে কাজ করবে যা নতুন হাড়ের কোষগুলোকে (অস্টিওব্লাস্ট) এর ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে এবং এক সময় প্রাকৃতিক হাড় দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে।
হাড়ের আঠার বর্তমান বিভাগসমূহ
হাড় নিরাময়কারী আঠা সংক্রান্ত গবেষণাগুলো মূলত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত : সিন্থেটিক পলিমার, জৈবিক আঠা এবং বায়োমিমেটিক (প্রকৃতি-অনুপ্রাণিত) আঠা।
পলিমাইথাইল মেথাক্রাইলেট
সাধারণত এটি ‘বোন সিমেন্ট’ নামে পরিচিত এবং কয়েক দশক ধরে অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন এবং মেরুদণ্ডের ফ্র্যাকচারে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুবিধা : এটি তাৎক্ষণিক যান্ত্রিক শক্তি প্রদান করে এবং খুব দ্রুত জমাট বাঁধে। অসুবিধা : এটি আসলে হাড়ের সাথে রাসায়নিকভাবে যুক্ত হয় না; এটি অনেকটা ফিলার বা গ্রাউটের মতো কাজ করে। জমার সময় এটি তাপ উৎপন্ন করে (এক্সোথার্মিক বিক্রিয়া), যা পাশের সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি শরীরে মিশে যায় না (বায়োডিগ্রেডেবল নয়)।
ক্যালসিয়াম ফসফেট সিমেন্ট
এগুলো রাসায়নিকভাবে প্রাকৃতিক হাড়ের খনিজ উপাদানের অনুরূপ।
সুবিধা : এগুলো অত্যন্ত জৈব-সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক হাড়ে রূপান্তরিত হতে পারে।
অসুবিধা : এদের ‘শিয়ার স্ট্রেন্থ’ বা মোচড় সহ্য করার ক্ষমতা খুব কম। এগুলো চাপ সহ্য করতে পারলেও, টান বা মোচড় দিলে হাড়ের টুকরোগুলোকে ধরে রাখতে পারে না।
বায়োমিমেটিক বা প্রকৃতির আঠা
এটি বর্তমান গবেষণার অত্যাধুনিক পর্যায়। বিজ্ঞানীরা সিক্ত পরিবেশে আঠা ব্যবহারের সমস্যা সমাধানে প্রকৃতির দিকে নজর দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন-রেল ওভারব্রিজ খোলার দাবিতে পথে সাংসদ শতাব্দী

ঝিনুকের আঠা
ঝিনুক এক ধরনের প্রোটিন নিঃসরণ করে যাতে ‘DOPA’ নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে, যা তাদের উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যেও পাথরের সাথে লেগে থাকতে সাহায্য করে। এর সিন্থেটিক সংস্করণ তৈরি করা হচ্ছে যা অস্ত্রোপচারের সময় সিক্ত অবস্থায় কাজ করবে।
স্যান্ডক্যাসেল ওয়ার্ম গ্লু
এই পোকাগুলো জলের নিচে বালি দিয়ে ঘর বানাতে এক ধরনের ইলেকট্রোস্ট্যাটিক আঠা ব্যবহার করে। গবেষকেরা এই পদ্ধতিটি অনুকরণ করে এমন আঠা তৈরি করছেন যা রক্তপ্রবাহে ধুয়ে যাবে না।
যুগান্তকারী উদ্ভাবন
ফসফোসেরিন-মডিফাইড আঠা : সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আশাব্যঞ্জক উন্নয়ন হলো ফসফোসেরিন-মডিফাইড সিমেন্ট। এই প্রযুক্তি সিন্থেটিক আঠার শক্তি এবং জীববিজ্ঞানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। এই আঠাগুলোতে ক্যালসিয়াম সিলিকেট বা ফসফেটের সাথে ফসফোসেরিন (দেহে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় এমন একটি অ্যামিনো অ্যাসিড) মিশ্রিত করা হয়। প্রয়োগ করার পর আঠাটি সরাসরি হাড়ের ক্যালসিয়াম আয়নের সাথে রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে এই আঠাগুলো :
২৪০ সেকেন্ডের কম সময়ে হাড়ের সাথে হাড় জোড়া লাগাতে পারে।
ধাতব ইমপ্লান্টকে হাড়ের সাথে আটকে রাখতে পারে।
সিক্ত অবস্থায় শক্তি বজায় রাখে।
নতুন হাড় গজানোর সাথে সাথে ১২ থেকে ৫২ সপ্তাহের মধ্যে শরীর দ্বারা শোষিত হয়ে যায়।
ক্লিনিকাল প্রয়োগ
এটি কোথায় ব্যবহৃত হবে?
এই হাড়ের আঠার প্রভাব কেবল হাড় ভাঙার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যখন কোনও হাড় অনেকগুলো ছোট টুকরোয় ভেঙে যায়, তখন প্রতিটিতে স্ক্রু লাগানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন এই হাড়ের আঠার প্রয়োগে সার্জনরা টুকরোগুলোকে পাজল মেলাবার মতো সাজিয়ে দিতে পারেন। আবার, বয়স্ক রোগীদের হাড় এতই নরম হয় যে তা স্ক্রু ধরে রাখতে পারে না। হাড়ের আঠা এখানে হাড়কে শক্তিশালী করতে বা ইমপ্লান্টকে স্থিতিশীল করতে ব্যবহৃত হতে পারে। এ ছাড়া চোয়াল বা মুখের সূক্ষ্ম হাড় পুনর্গঠনেও এই আঠা ব্যবহার করা যায়।
তাই বলাই যায় যে, হাড় নিরাময়কারী আঠা এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং একটি ক্লিনিকাল বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। যদিও আমরা এখনও এমন অবস্থায় পৌঁছোতে পারিনি যেখানে প্লাস্টার বা কাস্টের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে, তবে এই আঠার ব্যবহার ইতিমধ্যেই রোগীর সুস্থতার হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন বিজ্ঞানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল এমন এক চিকিৎসা যেখানে আঠা হাড়কে যান্ত্রিক শক্তি দেবে এবং হাড় নিজে থেকে সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে আঠাটি শরীর থেকে নিঃশেষ হয়ে যাবে।

Jago Bangla

Share
Published by
Jago Bangla
Tags: adhesivebone

Recent Posts

স্মৃতিদের পাঁচে পাঁচ

বরোদা, ১৯ জানুয়ারি : ডব্লুপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর স্বপ্নের দৌড় অব্যাহত। সোমবার গুজরাট জায়ান্টসকে ৬১…

37 minutes ago

দিনের কবিতা

‘জাগোবাংলা’য় (Jago Bangla) শুরু হয়েছে নতুন সিরিজ— ‘দিনের কবিতা’ (poem of the day)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের…

45 minutes ago

মঙ্গলবার ডায়মন্ড হারবারে সেবাশ্রয়-২ পরিদর্শনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের ছোট ছোট অসুবিধাগুলিকে দূর করে তাদের জীবন সহজ করা। সেবার মধ্যে দিয়ে কঠিন বাধা…

1 hour ago

সত্যিই আসন্ন মোদির বিদায়বেলা? বয়স নিয়ে খোঁচা গড়করির

নাগপুর : এবারে কি সত্যিই ঘনিয়ে এল মোদির বিদায়বেলা? দলের অন্দর থেকেই সুস্পষ্ট বার্তা, অনেক…

11 hours ago

জঙ্গিদের সঙ্গে গুলির লড়াই, কিশতওয়ারে শহিদ জওয়ান

শ্রীনগর : সেনাবাহিনীর (Indian Army) সঙ্গে কিশতওয়ারের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল…

11 hours ago

ট্রাম্পের শুল্কতোপের মুখেও অনড় ইউরোপের ঐক্য, পাল্টা পরিকল্পনা

ওয়াশিংটন: ইউরোপের দেশগুলির উপর শুল্কের ভার চাপিয়ে গ্রিনল্যান্ড (Greenland_America) দখল করার কৌশল নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট…

11 hours ago