চকৌরির হাতছানি

স্বপ্নের দেশ চকৌরি। উত্তরাখণ্ডের পিথরাগড় জেলার ক্ষুদ্র শৈল শহর। কুমায়নের কোলে লুকানো রত্ন। এখানে রূপের পশরা সাজিয়ে বসেছে প্রকৃতি। নির্জন পাহাড়ি অঞ্চলটিতে ছড়িয়ে রয়েছে অপার শান্তি। মন এবং শরীরের ক্লান্তি দূর করতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন। লিখলেন অংশুমান চক্রবর্তী

Must read

উত্তরাখণ্ডের ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ চকৌরি। পিথরাগড় জেলার একটি ক্ষুদ্র শৈল শহর। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। দূষণহীন নীল আকাশ। শ্বেতশুভ্র হিমালয় পর্বতমালা পরিবেষ্টিত। নিচে ওক, পাইন, দেওদারের জঙ্গল। অন্যদিকে বিস্তীর্ণ চা-বাগিচার পিছনে দুধসাদা হিমালয়ের সুউচ্চ প্রাচীর। এখানকার নিরালা প্রকৃতি এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মায়াবি রংবদল পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বাধ্য করে বার বার যেতে। সবমিলিয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ। কুমায়নের কোলে লুকানো রত্ন। উচ্চতা ২০১০ মিটার।

আরও পড়ুন-ইয়ং, মিচেলের ব্যাটে সমতায় সিরিজ

চকৌরিকে স্থানীয়রা বলেন চকোরি। জায়গাটা এত সুন্দর শহর, যেন এক টুকরো স্বপ্নের দেশ। এখান থেকে নন্দাদেবী, নন্দাদেবী ইস্ট, নন্দাকোট, পানওয়ালিদ্বার, মাইকতোলি ইত্যাদি পর্বত শৃঙ্গ খুব স্পষ্ট দেখা যায়। সূর্যোদয়ের সময় এই সব শৃঙ্গের নয়নাভিরাম দৃশ্য পার্থিব সমস্ত কিছু ভুলিয়ে দেয়। আশপাশের ছোট শহর এবং গ্রামগুলোও নিজের মতো করে সুন্দর। রূপের পশরা সাজিয়ে বসেছে।
বাগেশ্বর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চকৌরি। কৌসানি থেকে দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। চাইলে আলমোড়া থেকেও যাওয়া যায়। গাড়িতে কৌশানি থেকে আলমোড়া হয়ে চৌকরি পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। যেতে যেতে দু’চোখ ভরে উপভোগ করা যায় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। যাওয়ার পথে গোলু চেতনা, বৈজনাথ, বাগেশ্বর, সোমেশ্বরের মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মন্দির পড়ে। অনেকে মনের ইচ্ছে জানিয়ে তা পূর্ণ হওয়ার আশায় ঘণ্টা বেঁধে দেন গোলু চেতনা দেবীর মন্দিরে। তাই মন্দির চত্বরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে চারিদিকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন আকারের ঘণ্টা।
শহুরে জীবনযাত্রা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন চকৌরি। রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান। আর রয়েছে খান পাঁচেক হোটেল। তৈরি হচ্ছে কয়েকটি রিসর্ট। তবে এখানে খুব বেশি মানুষ রাত্রিবাস করেন না। তবে রাত্রিবাস করলে হিমালয়ের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করা যায়। তারাদের সমাহার দিনের সব ক্লান্তি কেড়ে নেয়। দরকার হয় না ল্যাম্পপোস্টের আলো। তারাদের আলোতেই আলোকিত হয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ এলাকা। এমন দৃশ্য উত্তরাখণ্ডের অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

আরও পড়ুন-কেন্দুলির মকর সংক্রান্তি মেলা, পুণ্যস্নান মানুষের ঢল

আলাদা করে এই জায়গায় তেমন কিছু নেই। এমনকি বিংশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা চা-বাগানগুলোও প্রায় মুছে যেতে বসেছে। নেই তথাকথিত সানসেট পয়েন্ট। নেই কোনও সাইটসিনের জায়গা। হিমালয়ের কোলে সূর্য অস্ত গেলেই চিতাবাঘের ভয়ে বাইরে বেরনোরও উপায় থাকে না। তবু চৌকরি বহু পর্যটকের পছন্দের জায়গা। কারণ এই নির্জন পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে অপার শান্তি, চিরসবুজ প্রকৃতির সঙ্গ লাভের সুযোগ। ভোরের নরম আলো, কিচিরমিচির পাখির ডাক মন ভালো করে দিতে পারে।
পুরনো চা-বাগানের রাস্তা এখনও কাঁচা-পাকা। এই রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে গেলেই নিচের দিকে রয়েছে গভীর জঙ্গল। তবে জঙ্গল শুরুর আগে রয়েছে এমন এক জায়গা, যেখান থেকে হিমালয়ের প্যানারামিক ভিউ দেখা যায়। এক দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে নন্দাদেবী, অন্যদিকে পঞ্চচুল্লি। যেন অনন্ত মহাকাব্য লিখে রেখে গেছেন কোনও মহাকবি। প্রকৃতির মতো কবিতা আর কী আছে!
চকৌরি হল মেঘের দেশ। মাঝেমধ্যেই চারিদিক মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়। নামে অঝোরে বৃষ্টি। বৃষ্টি থামার পর ঝলমলিয়ে ওঠে চারদিক। তখন অনেকটা স্নান সারা যুবতীর মতো লাগে। সেই সৌন্দর্য মনের মণিকোঠায় আলাদা জায়গা করে নেয়। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে দু’চোখ ভরে দেখা যায়, দূরে রাশি রাশি গিরিশৃঙ্গ, মাথায় বরফের সাদা মুকুট পরে রাজার আসনে অধিষ্ঠিত। শ্বেতশুভ্র সাদা চূড়াগুলি থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়। তাকালেই চোখের আরাম।
পাহাড় চূড়া থেকে নিচের বাড়িগুলো অনেকটা ছোট ছোট দেশলাইয়ের বাক্সের মতো লাগে। দেখতে দেখতে মনে হয় প্রকৃতি তার সমস্ত রহস্যময়তা ও সৃষ্টি উজাড় করে দিয়েছে আমাদের। আর আমরা ধ্বংস করে চলেছি ক্রমাগত। চকৌরির মতো পাহাড়ি অঞ্চলে কমপক্ষে দু’রাত কাটাতেই হবে। নাহলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বেড়ানো। হাতছানি দেয় চকৌরি? শীতের মরশুমে সপরিবারে ঘুরে আসুন। পেয়ে যাবেন বরফের দেখা।

Latest article