শীতের শহরে সার্কাস

শীতের সার্কাস। অঙ্গ হয়ে গেছে বঙ্গ জীবনের। ১২ বছর পর তাঁবু পড়েছে কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে। পশুপাখি নেই। তা সত্ত্বেও রকমারি খেলার টানে ভিড় হচ্ছে ভালই। সার্কাসের আশ্চর্য মায়াজগৎ ঘুরে এসে লিখলেন অংশুমান চক্রবর্তী

Must read

কলকাতার বাঙালি প্রতিষ্ঠান
শীত এলেই সার্কাস (circus) আসে। এমনটাই ধারণা সাধারণ মানুষের। বিরাট তাঁবু পড়ে বিশাল আকার মাঠে। বাইরে রকমারি খেলার রঙিন ছবি। কৌতূহল বাড়ায়। রোমাঞ্চিত করে। কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে ভিতরে যাওয়া। মাঝখানে আকর্ষণীয় মঞ্চ। চারদিকে নানা রঙের চেয়ার। আশ্চর্য এক মায়াজগৎ। এই জগতের সঙ্গে মিশে আছে অগণিত মানুষের শৈশব, কৈশোর-স্মৃতি। শীত এলেই ঘুম ভাঙে। মনে পড়ে যায়।
আসলে বাঙালির শীতকাল মানেই নরম লেপের আদর, দুপুরের রোদ, চড়ুইভাতি, জয়নগরের মোয়া, নলেন গুড়, পিঠেপুলি। আর? ময়দান-কাঁপানো সার্কাস (circus)। তবে আগেকার সার্কাসের সঙ্গে এখনকার সার্কাসের আকাশ-পাতাল তফাত। কীরকম তফাত? সেইসময় সার্কাসের মঞ্চে দেখা যেত হিংস্র বাঘ-সিংহের খেলা। এই খেলা দেখার জন্যই ভিড় জমাত সাধারণ দর্শক। শুঁড় উঁচিয়ে মানুষের সঙ্গে বল খেলত হাতি। গণেশ পুজো করত। দেখা যেত আরও অনেক জন্তু-জানোয়ার। সঙ্গে পাখি। এখন আর দেখা যায় না। সার্কাসে বন্ধ হয়ে গেছে পশুপাখির খেলা। তাই কিছুটা হলেও আকর্ষণ কমেছে। তা সত্ত্বেও শীতের হাত ধরে শহরে সার্কাস আসে। মাঠে বিরাট তাঁবু পড়ে। আগের মতো না হলেও, দর্শকের ভিড় হয়।
নানা কারণে সার্কাসের বহু দল উঠে গেছে। তবে এখনও দর্শকদের আনন্দ দিয়ে চলেছে অজন্তা সার্কাস। ৫১ বছর হল কলকাতার এই বাঙালি প্রতিষ্ঠানের। ঐতিহ্যবাহী দলটি প্রায় ১২ বছর পর তাঁবু ফেলেছে কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে। এ যেন একপ্রকার ঘরে ফেরা। প্রায় এক যুগ পর পার্ক সার্কাস ময়দানে এলেও, এর মধ্যে দলটি কলকাতার সিঁথির মোড়ে, পাটুলিতেও শো করেছে।

বাচ্চা থেকে বয়স্ক
বছরের প্রথম দিন সকালে ঘুরে এলাম। দেখলাম শো। কথা হল অজন্তা সার্কাসের ম্যানেজার রথীন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘‘এক যুগ, অর্থাৎ ১২ বছর পর পার্ক সার্কাস ময়দানে অজন্তা সার্কাস এসেছে। ফলে আমরা খুবই উত্তেজিত। আগের মতো না হলেও, দর্শক সমাগম বেশ ভালই। বাচ্চা থেকে বয়স্ক, সব বয়সের মানুষেরাই আসছেন। হুইল চেয়ারেও আসছেন কিছু মানুষ। এতটাই উৎসাহ। এই সার্কাস (circus) অনেককেই স্মৃতিমেদুর করে তোলে। এটা ঠিক, আগের তুলনায় বর্তমানে সার্কাসে ভিড় কম। এর পিছনে রয়েছে বেশকিছু কারণ। বর্তমানে মানুষের রুচি অনেক বদলে গেছে। হাতের মুঠোয় মোবাইল। রকমারি বিনোদন। আগে পশুপাখির আকর্ষণে সার্কাসে ব্যাপক ভিড় হত। এখন তাদের নিয়ে খেলা দেখানো বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারণে ব্যবসা কিছুটা হলেও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। স্বীকার করতেই হবে, মানুষের মন থেকে আজও কিন্তু পশুপাখির স্মৃতি মুছে ফেলা যায়নি। অনেকেই এসে বাঘ-সিংহের খোঁজ করেন। আমাদের সার্কাসে আগে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, হাতি, ঘোড়া, ভল্লুক, কুকুরের খেলা দেখানো হত। কয়েক রকমের পাখি তো ছিলই। তখন লাইন দিয়ে মানুষ টিকিট কেটে সার্কাস দেখতে আসতেন। সেই দিন সুখের দিন আজ অতীত।’’

দেশ-বিদেশের শিল্পী
এখন দেখানো হচ্ছে বেশকিছু আকর্ষণীয় খেলা। সেগুলো রোমাঞ্চিত করে। দেখলাম ফ্লাইং ট্রাপিজ, গ্লোব, ফায়ার ড্যান্স, রিং ড্যান্স, জিমন্যাস্টিক, জাগলিং, আগুনের খেলা, ব্যালান্সের খেলা ইত্যাদি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পাশাপাশি বিদেশি অনেক শিল্পী এই দলে আছেন। মঙ্গোলিয়া, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, রাশিয়ার শিল্পীদের খেলা দেখার জন্য ভিড় হচ্ছে ভালই। তিনি জানালেন, ‘‘আমাদের দলে দেশ-বিদেশের মিলিয়ে ৪৫ জনের মতো শিল্পী আছেন। একটা সার্কাসের দল চালাতে খরচ প্রচুর। এতগুলো স্টাফের মাইনে, খাওয়া দাওয়া— সবকিছুই সামলাতে হয়। শীতের মরশুমে দর্শকদের উন্মাদনা বেশি থাকে। তবে আমরা সারাবছরই শো করি। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায়। দর্শকদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলতে চাই, যেভাবেই হোক, সার্কাসকে বাঁচাতে হবে। শিল্পটা বাঁচাতে হবে। সার্কাস ভাল চললে মালিক উৎসাহ পাবেন। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের মতো অনেক মানুষের রুটিরুজি। সহযোগিতা চাই সরকারের।’’

মেরা নাম জোকার
অসমের গুয়াহাটির জিয়ারুল হক। অজন্তা সার্কাসের জোকার চার্লি। কম উচ্চতার হাসি মুখের মানুষটি ছোটদের খুব প্রিয়। তিনি মঞ্চে এলেই হাততালির ঝড় ওঠে। বাচ্চারা অসীম কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে। কথা হল তাঁর সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘‘আমি প্রায় পনেরো-ষোলো বছর সার্কাসে (circus) আছি। এর আগে কাজ করেছি জেমিনি, রয়্যাল, কোহিনুর, ফেমাস প্রভৃতি সার্কাসে। দুই-তিন বছর হল আছি অজন্তা সার্কাসে।’’
কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন সার্কাসের সঙ্গে? তিনি জানালেন, ‘‘কম বয়সেই আমি সার্কাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি। গুয়াহাটির কাছে আমাদের গ্রামে একটা সার্কাসের দল ছিল। খুব ছোট্ট দল। আমার উচ্চতা কম দেখে ওই দলের মালিক আমাকে কাজের অফার দেন। বলেন সার্কাসে জোকার সাজার কথা। সঙ্গে সঙ্গে আমি রাজি হয়ে যাই। তারপর মেক আপ করে মঞ্চে উঠে লোক হাসাই। দর্শকরা আমার খেলা এবং হাবভাব দেখে আনন্দ পেলে, হাততালি দিলে আমার খুব ভাল লাগে। সব বয়সের দর্শকদের জন্যেই কমেডি করি, তবে আমার মূল লক্ষ্য ছোটদের আনন্দ দেওয়া। ছোটদের হাসানোর জন্য নানারকম মজা করি। পাশাপাশি আমি ফ্লাইং ট্রাপিজের খেলাও দেখাই। ট্রাপিজের খেলা শিখেছি দুই-তিন বছর প্র্যাকটিস করে। প্রথম প্রথম ভয় লাগত। কখনও কখনও হাত ছেড়ে জালের উপর পড়েও গেছি। তবে হার মানিনি। প্র্যাকটিস করতে করতে খেলা শিখে গেছি।’’

আরও পড়ুন-ওড়িশায় বিডিও অফিসে বিজেপি বিধায়কের তাণ্ডব

প্রতিযোগিতা আছে
বাড়ির বাইরে ঘুরে ঘুরে কাজ। কে কে আছেন পরিবারে? তিনি জানালেন, ‘‘আমার মা নেই। বাবা আছেন। ভাই-বোন আছে। কাজের জন্য বাড়ি ছেড়ে দলের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। তবে প্রয়োজন পড়লে মালিকের অনুমতি নিয়ে বাড়ি যাই। কিছুদিন থেকে আবার ফিরে আসি। কেরল, তামিলনাড়ু, গুজরাত, রাজস্থান, ওড়িশা প্রভৃতি জায়গায় শো করেছি। কলকাতায় শো করতে বেশ লাগে। পার্ক সার্কাস ময়দানে ভালই দর্শক হচ্ছে। কলকাতা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর, সোনামুখী, হাড়োয়ায় শো করেছি। সার্কাসকে (circus) এতটাই ভালবেসে ফেলেছি যে, এখন আর অন্য কোনও কাজের কথা ভাবতেই পারি না। এখানে সুখেই আছি। পরিবারের মতো সবাই মিলেমিশে আছি। হাসি-মজা করি। মালিক আমাদের সবরকমের সুবিধা দেন। ফলে কোনও অসুবিধা হয় না। আমি ছাড়াও দলে আরও কয়েকজন জোকার আছে। তাদের সঙ্গে আমার ভালই সম্পর্ক। তবে প্রতিযোগিতা আছে। একে অপরের থেকে ভাল কাজ করার চেষ্টা করি। কেউ অন্যরকম কিছু করলে শেখার চেষ্টা করি। নতুন যারা শিখতে চায়, তাদের পরামর্শ দিই। প্রথম থেকেই আমি ছোটদের খুব ভালবাসি। অনেক খুদে দর্শক শোয়ের শেষে আমাদের খোঁজ করে। দেখা করে। আমাদের সঙ্গে সেলফি তোলে। হাত মেলায়। কথা বলে। সবমিলিয়ে সার্কাসে ভালই আছি।’’

আগুন নিয়ে খেলা
অসমের অজয় তেরং। অজন্তা সার্কাসে (circus) কাজ করছেন প্রায় দুই বছর। আগে অন্য দলে ছিলেন। তিনি দেখান আগুনের খেলা। ফায়ার ড্যান্স। খুবই কঠিন এবং বিপজ্জনক খেলা। কেরোসিন তেল মুখে নিতে হয়। তারপর মুখের সামনে জ্বালাতে হয় আগুন। কথা হল তাঁর সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘‘খেলাটা শিখতে আমার দুই বছর লেগেছে। আগুন নিয়ে খেলা। যথেষ্ট কঠিন এবং ভয়ের। তবে দর্শকদের সামনে এই খেলা দেখিয়ে আমি আনন্দ পাই। সবাই হাততালি দিলে ভালই লাগে। আমার মেয়ে সার্কাসে এসে আমার এই খেলা দেখেছে। তবে তার মোটেও ভাল লাগেনি। সে ভীষণ ভয় পেয়েছে। এমন ভয়ঙ্কর খেলা খেলতে আমাকে বারণ করেছে। কিন্তু থেমে থাকলে তো চলবে না। এটা আমার পেশা। এই কাজ করেই উপার্জন করতে হয়। মেয়েকে সেটা বুঝিয়েছি। দলে আমরা একটা পরিবারের মতো থাকি। সবাই সবার বন্ধু। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করি। কাজের ফাঁকে সকালের দিকে কলকাতা ঘুরি। করি টুকটাক কেনাকাটা। দারুণ শহর। আরও অনেক জায়গায় শো করেছি। আগুনের খেলা ছাড়াও আমি আরও কিছু খেলা জানি। আগে ঘোড়ায় চড়ে নানারকম খেলা দেখাতাম। এখন তো সার্কাসে পশুপাখির ব্যবহার বন্ধ। তাই ওইসব খেলাও উঠে গেছে। বর্তমানে সার্কাস মূলত জিমন্যাস্টিক নির্ভর।’’

বঙ্গ জীবনের অঙ্গ
শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে সার্কাস (circus) দেখতে এসেছিলেন বহু মানুষ। কথা হল কয়েকজনের সঙ্গে। একজন গৃহবধূ জানালেন, ‘‘ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে এই পার্ক সার্কাস ময়দানে সার্কাস দেখতে আসতাম। এখন এসেছি স্বামীর সঙ্গে। একটা সময় আমরা বাঘ-সিংহের খেলা দেখেছি। একেবারে সামনে বসে। তখন খুব ভিড় হত। শো হত হাউসফুল। সেই ভিড় এখন আর নেই।’’
একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন, ‘‘পশুপাখির খেলা বন্ধ। তবে এখানে যেসব খেলা দেখলাম, সেগুলো ভালই লাগল। বিদেশিদের খেলা মনের মধ্যে থেকে যাবে। তাদের শারীরিক কসরত আমাকে মুগ্ধ করেছে।’’
এক স্কুল ছাত্রীর প্রতিক্রিয়া, ‘‘আমি কোনওদিনই সার্কাসে বাঘ-সিংহের খেলা দেখিনি। বাড়িতে বড়দের মুখে শুনেছি। এখনকার খেলাগুলো আমার ভালই লেগেছে। রামরাজাতলা শঙ্কর মঠের মাঠেও এবার সার্কাস এসেছে। অজন্তা সার্কাসের মতো বড় নয়। তবে খারাপ লাগেনি। বিদেশিদের খেলা রীতিমতো উপভোগ করেছি।’’
যাই হোক, শীতের সার্কাস (circus) বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে। পশুপাখি নিয়ে হাহুতাশ নয়। যেগুলো আছে সেগুলো নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। বাঁচাতে হবে এই শিল্পকে। সেই দায়িত্ব দর্শকের।
এবারে পার্ক সার্কাস ময়দানে শো টাইম প্রতিদিন দুপুর ১টা, বিকাল ৪টে, সন্ধ্যা ৭টা। টিকিটের দাম ৫০০, ৪০০, ২৫০ এবং ১৫০ টাকা। অ্যাডভান্স বুকিংয়ের সুযোগ রয়েছে। শুরু হয়েছে ৮ ডিসেম্বর। চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। সপরিবারে ঘুরে আসতে পারেন। ছবি : সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

Latest article