ঋতুবন্ধের ডায়েট

মেয়েদের ঋতুবন্ধের বহু আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা। একদিকে অনিয়মিত ঋতুস্রাব, অন্যদিকে অচেনা উপসর্গ। তাই জরুরি ডায়েটের পরিবর্তন। একমাত্র খাওয়াদাওয়ায় বদল এনেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে ঋতুবন্ধের সমস্যাকে। কী খেলে শরীর-মন ভাল থাকবে— লিখছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

৪৫ থেকে ৫৫ বছর হল প্রিমেনোপজাল স্টেজ। একটি বয়সের পর ঋতুবন্ধ স্বাভাবিক ঘটনা। ৪০-এর পর মহিলাদের শরীর থেকে দ্রুত হারে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে শুরু করে। এর সঙ্গে কমে আসে সন্তানধারণের সম্ভাবনাও। ডিম্বাণু নিঃশেষিত হয়ে গেলে ডিম্বাশয়ে আর ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের ক্ষরণ হয় না। তখনই হয় ঋতুবন্ধ। বছরখানেক টানা ঋতুস্রাব না হলে ধরে নিতে হবে যে, ঋতুবন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল, ঋতুবন্ধ একা আসে না, সঙ্গে করে নিয়ে আসে বেশকিছু দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা। প্রচণ্ড মুড স্যুইং হয়, স্ট্রেস, রাত্রিবেলা অতিরিক্ত ঘাম হয়, ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেস, ঘুমের পরিবর্তন, হট ফ্লাশ, অবসাদ, ওজন বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা সমস্যা শুরু হয়ে যায় ঋতুবন্ধের বেশ কয়েকমাস আগে থাকতেই। মেনোপজের পর সেই জটিলতা আরও বাড়ে। কাজেই এই সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ডায়েট। কারণ খাওয়াদাওয়ার বেশকিছু রদবদলে আপনার প্রিমেনোপোজাল এবং মেনোপোজাল সিনড্রোমজনিত সমস্যাগুলো অনেকটাই কমতে পারে।

আরও পড়ুন-চাঁদের গভীরে মিলল গুহার খোঁজ

সবুজ শাকপাতা
সবুজ শাকপাতা যেমন পালংশাক মাস্ট সঙ্গে লেটুস, সেলারি ইত্যাদি খান নিয়মিত। অফ সিজনের বলে পালং শাক বাদ দেবেন না। কারণ এতে রয়েছে ভিটামিন এ, কে, ই, সি, বিটা ক্যারোটিন, ফোলিট, ভিটামিন বি১, বি২, বি৩, বি৫, বি৬। রয়েছে মিনারেলস যেমন আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম— যেগুলোর প্রত্যেকটি এই সময়ে শরীরের এইসব জটিলতা কমানোর জন্য খুব কার্যকরী।
গাঢ় সবুজ সবজি
গাঢ় সবুজ সবজি মানে ব্রকোলি। প্রি মেনোপজ স্টেজ হোক বা পোস্ট মেনোপজ ব্রকলি খুব উপকারী সবজি। কারণ এতে রয়েছে ফাইটোইস্ট্রোজেন এবং সালফোরাফেনের মতো বায়োঅ্যাক্টিভ যৌগ যা এই সময় হরমোনের এই ইমব্যালেন্সিংকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এই যৌগ ইস্ট্রোজেন বিপাককে আরও উন্নত করে। প্রি মেনোপজ এবং পোস্ট মেনোপজ সংক্রান্ত সব উপসর্গকে কমিয়ে দেয় লক্ষণীয়ভাবে। এই সময় বেশি করে ব্রকলি খাওয়া উচিত। এর ফলে একটা ভিন্ন ধরনের ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।

আরও পড়ুন-মিথ্যে বয়ানের জন্য চাপ দিয়েছে পুলিশ, কোর্টে দাবি অভিযুক্তের

দুধ এবং দই
যদি আপনার ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা দুধে অ্যালার্জি না থেকে থাকে তাহলে দুধ অবশ্যই রোজ খান। মেনোপজের পরে মেয়েদের হাড়ে আঘাত এবং ফ্রাকচারের সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যায় কারণ শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হতে শুরু করে। দুধ শুধু আপনার ক্যালসিয়ামের জোগান বাড়িয়ে হাড়গোড়কে পোক্ত করবে না তার সঙ্গে জোগান দেবে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ডি-র। দুধ খেতে না পারলে তার বদলে দই খান। দই শুধু স্বাদেই নয় এরমধ্যে রয়েছে প্রচুর ভাইটাল নিউট্রিয়েন্টস বিশেষত ক্যালসিয়াম, দইয়ে থাকা কিছু নির্দিষ্ট মিনারেলস ভীষণভাবে কাজ করে। সমীক্ষা বলছে চল্লিশোর্ধ্ব বা মেনোপজ হয়ে গেছে এমন প্রতি তিনজন মহিলার মধ্যে একজন অস্টিপোরোসিস এবং হাড়ের রোগে আক্রান্ত তাই দই অথবা দুধ তাঁদের ডায়েট রুটিনে মাস্ট।
তৈলাক্ত মাছ
তৈলাক্ত মাছ যেমন স্যালমন, টুনা, ম্যাকরেল, সার্ডিন, ভেটকি, ইলিশ, পাকা কাতলা এগুলোর প্রত্যেকটায় রয়েছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ও ভিটামিন ডি। এই মাছ রাখুন ডায়েটে। গবেষণা অনুযায়ী ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে যা মেনোপজ হয়ে যাবার পর সচরাচর মহিলাদের মধ্যে বেশি থাকে। ট্রাইগ্লিসারাইড এমন একধরনের ফ্যাট যা রক্তে ঘোরাফেরা করে এবং হার্টের রোগের সম্ভাবনা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন-বয়স, নামও ভাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষানবিশ আমলা, পূজার প্রশিক্ষণ-পর্ব স্থগিত করল প্রশাসন

দানাশস্য
দানাশস্য রাখুন খাদ্যতালিকায়। যেমন ব্রাউন রাইস, কুইনোয়া, ওটস। প্লেন ভাতের বদলে এগুলো রাখলে আপনার হজম প্রক্রিয়া যেমন উন্নত হবে সেই সঙ্গে ভিটামিন বি আর ম্যাগনেশিয়াম সরবরাহ হবে প্রচুর পরিমাণে। মেনোপজের সময় মুড স্যুইং মহিলাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যেটা কিন্তু অনেকটা কমে যাবে এইসব দানাশস্য খেলে। এর পাশাপাশি মেনোপজজনিত স্ট্রেস, অ্যাংজাইটিও থাকবে না।
পোল্ট্রি
মেনোপজ মানেই শরীরে প্রয়োজন প্রোটিন ব্যালান্স কারণ হরমোন পুরোটাই ইমব্যালান্স হয়ে আছে, কাজেই জরুরি ডিম এবং চিকেন। দুটোতেই থাকে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ভিটামিনস যা মেনোপোজাল সিনড্রোমগুলোকে অনেকটা কমিয়ে দিতে সক্ষম হবে। ভুলে যাওয়া, মনোযোগের অভাব, কনফিউশন ইত্যাদি মানসিক সমস্যাগুলোকে কমাবে।

আরও পড়ুন-বিহারে খুন প্রাক্তন মন্ত্রীর বাবা

ছোলা, মটর
ছোলা, মটর এই সময় স্বাস্থ্যের উৎস। প্রি ও পোস্টমেনোপজের পর্ব দিয়ে যাচ্ছেন এমন মহিলারা ইস্ট্রোজেনের মাত্রা যে হ্রাস পেয়েছে সেটা অনুভব করতে পারেন। কারণ শরীর অনেক কমজোর হতে থাকে। পেশির দুর্বলতা দেখা দেয়, হাড় অপোক্ত হয়ে যায়, বিভিন্ন রকম ব্যথা যা আগে ছিল না শুরু হয়। এগুলো থেকে মুক্তি পেতে ছোলা বা মটর জাতীয় খাবার নিয়মিত রাখতে হবে খাদ্য তালিকায়।
বাদাম এবং বীজ
বিভিন্ন ধরনের বাদাম যেমন আমন্ড বা কাঠবাদাম, পেস্তা, কাজুবাদাম, চিনে বাদাম, ফ্ল্যাকসিড ইত্যাদি প্রি এবং পোস্ট মেনোপোজাল স্টেজে মহিলাদের জন্য খুব উপকারী উপাদান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার আর বেশ ভাল মানের ফ্যাট। তার সঙ্গে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। বাদাম এবং বীজের গ্লাইসেমিক ইনডেস্ক কম। তাই এতে রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না। যেহেতু মেনোপজের পর ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বাড়ে, ওজন বাড়তে শুরু করে এবং হার্টের সমস্যা আসে বাদাম এবং বিভিন্ন বীজ এই ধরনের জটিলতা তৈরি হতে দেয় না। এই সময় মানসিক চাপ, স্ট্রেস থেকে উল্টোপাল্টা খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে যেটা এই জাতীয় নাটস এবং সিডস খেলে হয় না। পেট ভরা থাকে অনেক্ষণ ফলে চোখের খিদেও হয় না।
সয়াবিন খান বেশি করে। সয়াদুধও খুব উপকারী। ল্যাক্টোজ-মুক্ত এই দুধে থাকে প্রচুর প্রোটিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন রকম খনিজ উপাদান। সয়াদুধে থাকে ফাইটোইস্ট্রোজেন, যা এই সময় মহিলাদের জন্য বিশেষ জরুরি।

Latest article