সম্পাদকীয়

‘তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’

দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতেই হত। এত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন সহ্যের সব সীমা পার করে ফেলেছিল। সেইজন্য তৃণমূল কংগ্রেসের দাবিকে মান্যতা দিয়েই, লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির নামে যে অন্যায় চলছিল তাঁর সমূলে বিরোধিতা করেছে এবার সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়। লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির লিস্ট জনসমক্ষে আনা, বিএলএ-২-দের শুনানি কেন্দ্রে অনুমতি দেওয়া, তাছাড়া মাধ্যমিকের এডমিট কার্ডও গ্রহণ করছিল না (পশ্চিমবঙ্গে জন্ম প্রমাণপত্র হিসেবে মাধ্যমিক-এর অ্যাডমিট কার্ড বৈধ) সেই অ্যাডমিট কার্ড যাতে গৃহীত হয় তার জন্য পদক্ষেপ করতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। সুতরাং এ এক বড় জয় তৃণমূল কংগ্রেসের করা মামলায়। ভোটযুদ্ধে বাংলার রাজনীতি বরাবরই উল্টো ধারায় বয়। তবে শেষে জয় কিন্তু হয় বাংলার মানুষেরই।

আরও পড়ুন-হাড় নিরাময়কারী আঠা

ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলার বিপ্লবীরা যে ভাবে ব্রিটিশদের রাতের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছিল বা বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের কালিমালিপ্ত শাসনকাল উচ্ছেদ করার জন্য মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে এগিয়ে এসেছিলেন, তেমনভাবেই তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা SIR-কেও জব্দ করে চলেছে ক্ষণে ক্ষণে, এই কর্মকাণ্ডের জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয় তাদের। সাম্প্রতিক সময়ে SIR অর্থাৎ Special Intensive Revision যেন মানুষের দুশ্চিন্তার এক অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। SIR-এর যে উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে সুযোগ-সুবিধা বেশি করে দেওয়া অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারীরা যদি ভোটার তালিকা থেকে বাদ যায় তবে নিয়মানুসারে তারা ভারতবর্ষের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন এবং ন্যায্য ভারতবাসীরা আরও বেশি করে সুযোগ-সুবিধা পাবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে SIR-এর নাম শুনলেই মানুষ আঁতকে উঠছে। কারণটা অবশ্যই ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব হারানোর ভয়। লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি বা বলা ভাল, তথ্যগত গরমিল, সাধারণ কথায় যদি বলি সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করার এক অন্য পন্থা। তাঁর কিছু কারণ রাখা যেতে পারে, প্রথমত যদি ২০০২-এর ভোটার লিস্টে নাম না থাকে তবে তাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে সে ভারতীয়। আবার কারও বাবার বা মায়ের নাম যদি ২০০২-এর ভোটার লিস্টে থাকে এবং তার বয়স ২০০২ যদি ১৮ বছর হয়ে যায় এবং দুর্ভাগ্যবশত যদি সে ভোটার লিস্টের নাম না তুলে থাকে তাহলেও তাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে সে ভারতীয় কি না! ১৯৮০ দশকে সে-যদি জন্মগ্রহণ করে এবং তার যদি জন্মের প্রমাণপত্র না থাকে এবং যদি সে পড়াশোনা না-করে থাকে, তাহলে সে কীভাবে প্রমাণ করবে যে সে ভারতীয়? সাধারণ মতে বলে যদি কারও বাবা-মায়ের নাম ২০০২-এর ভোটার লিস্টে থাকে তাহলে তাকে SIR-এর শুনানিতে ডাকাই উচিত নয়। দ্বিতীয়ত যারা বিবাহিত, সেই সব মহিলাদের বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন হয় এটাই তো বাংলার সামাজিক রীতি, তাদেরকেও শুনানি-তে ডাকতে হবে? বিএলও-র মাধ্যমে শুনানি করে কি এদেরকে ছাড় দেওয়া যেত না? তৃতীয়ত বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের বয়সের ফারাক একটু বেশি হলেই শুনানি-তে ডাকা হচ্ছে। বেশি বয়সে কি কেউ বিবাহ করতে পারেন না? কেন তাঁদের মাইল-এর পর মাইল দূরে শুনানি কেন্দ্রে যেতে হবে? এইরকম ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে। যার ফলস্বরূপ SIR এখন আতঙ্কের আরেক নাম। এবার আসি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিজেপি SIR-এর আড়ালে চেয়েছিল আগামী বিধানসভায় ক্ষমতায় আসতে। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবকেরা বা বলা ভাল বিএলএ-রা যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করছে তা এককথায় অকল্পনীয়। সরকারে অনেকগুলো ভূমিকা থাকে তার মধ্যে বিশেষ দ্বৈত ভূমিকা সেই রাজনৈতিক দলের সরকারকে অনেকটাই এগিয়ে রাখে। সেই দ্বৈত ভূমিকা হল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ও সরকারি প্রকল্পের সঠিকভাবে দেখভাল করা। বিশেষ করে SIR-এর ফলে যেভাবে সাধারণ মানুষ নাস্তানাবুদ, সেইখানে সরকার তাঁদের নির্দিষ্ট কাজ করবে, নাকি সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করবে সেটাই ছিল কঠিন কাজ। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই কান্ডারি মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দেখানো পথের পথিক মাননীয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে তৃণমূলস্তরে এসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন তা এককথায় অসাধারণ। তৃণমূল স্তরের রাজনৈতিক শক্তি কতটা হলে একটি দল অনায়াসেই মানুষকে স্বস্তির বার্তা দিতে পারে যে তারা সাধারণ মানুষের পাশে আছে। একটি দল বলছে মানুষকে বাদ দাও, আরেকটি দল বলছে মানুষকে যোগ করো। এখানেই হয়ত সার্থকতা একটি রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তার। নিন্দুকেরা সমালোচনা করবে সেটাই স্বাভাবিক, এটাও স্বাভাবিক যে সমালোচনা সেখানেই হয়, যেখানে কাজ হয়। আর এই কাজের ফিরিস্তি উন্নয়নের পাঁচালি দিয়ে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। উন্নয়নের ফিরিস্তি যেভাবে পাড়ায় পাড়ায়, গলিতে গলিতে মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে তাতে আগামী দিনে বিরোধীদলের প্রচারের মুখ আদৌ থাকবে কিনা সেটা যথেষ্ট সন্দেহের বিষয়।

আরও পড়ুন-সত্যিই আসন্ন মোদির বিদায়বেলা? বয়স নিয়ে খোঁচা গড়করির

শুধু দলীয় নেতারা নয় দলীয় কর্মীরা যেন আরও উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছে এই SIR-এর আবহে। আমাদের বাড়ির আশেপাশে এমন অনেক মানুষজন আছে যারা SIR-এর শুনানিতে ডাক পেয়েছেন, তাঁরা বেশ বিচলিত আছেন এই নিয়ে যে, ভবিষ্যতে তাঁদের ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব আদৌও থাকবে কি না! তবে তৃণমূলের কর্মীরা যেভাবে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং সাহস জোগাচ্ছেন তাঁদের কুর্নিশ না করে পারা যাচ্ছে না। বিধানসভা ভোট হয়ত দুয়ারে, তবে বিধানসভা ভোটের আগেই যেভাবে তৃণমূল কর্মীরা উদ্দীপ্ত তাতে বোধ হয় SIR নামক যম বেশ দুঃশ্চিন্তায় আছে। আদৌ তারা সাধারণ মানুষজনের কাগজের প্রাণ হরণ করতে পারবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্ধিহান। SIR-এর উদ্দেশ্য অবশ্যই ভাল তবে রাজনৈতিক স্বার্থে জ্ঞানেশ কুমারের নির্যাতন কমিশনকে সামনে রেখে সেটা ব্যবহার করতে গিয়ে যেভাবে বদনাম হল নির্বাচন কমিশনের, তাতে আগামী দিনে সাধারণ মানুষের আতঙ্কের লিস্টে এই SIR নামটা অবশ্যই থাকবে। আর গলিতে গলিতে যেসব তৃণমূল কংগ্রেসের সৈনিক দিন-রাত এক করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়াচ্ছে তাতে বাংলার সংগ্রামী অস্মিতা ফের একবার নিশ্চিতভাবে তাদের আশীর্বাদ করবে ইভিএমের বোতাম টিপে। জয় বাংলা!

Jago Bangla

Recent Posts

হাড় নিরাময়কারী আঠা

অর্থোপেডিক সার্জারির এক নতুন দিগন্ত। হাড় বা অস্থি, দেহের অন্যতম শক্ত অংশ যা আমাদের শরীরের…

9 minutes ago

স্মৃতিদের পাঁচে পাঁচ

বরোদা, ১৯ জানুয়ারি : ডব্লুপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর স্বপ্নের দৌড় অব্যাহত। সোমবার গুজরাট জায়ান্টসকে ৬১…

45 minutes ago

দিনের কবিতা

‘জাগোবাংলা’য় (Jago Bangla) শুরু হয়েছে নতুন সিরিজ— ‘দিনের কবিতা’ (poem of the day)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের…

54 minutes ago

মঙ্গলবার ডায়মন্ড হারবারে সেবাশ্রয়-২ পরিদর্শনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের ছোট ছোট অসুবিধাগুলিকে দূর করে তাদের জীবন সহজ করা। সেবার মধ্যে দিয়ে কঠিন বাধা…

1 hour ago

সত্যিই আসন্ন মোদির বিদায়বেলা? বয়স নিয়ে খোঁচা গড়করির

নাগপুর : এবারে কি সত্যিই ঘনিয়ে এল মোদির বিদায়বেলা? দলের অন্দর থেকেই সুস্পষ্ট বার্তা, অনেক…

11 hours ago

জঙ্গিদের সঙ্গে গুলির লড়াই, কিশতওয়ারে শহিদ জওয়ান

শ্রীনগর : সেনাবাহিনীর (Indian Army) সঙ্গে কিশতওয়ারের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল…

11 hours ago