Featured

পরিবেশবিদ মাধব গ্যাডগিল

কয়েক বছর আগে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল কেরল রাজ্য। বন্যার জলে বন্দি ছিল প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। মৃতের সংখ্যাও অগুনতি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়েছিল হাজার হাজার কোটি টাকা। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে পরিবেশবিদরা বলেছিলেন মানুষ নিজের হাতে ডেকে এনেছে এই বিপর্যয়। এতে কেরলের যে অঞ্চল সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা উত্তর ও মধ্য অঞ্চল। সেই এলাকাগুলিকে আগেই পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকা বলে চিহ্নিত করেছিল ‘ওয়েস্টার্ন ঘাট ইকোলজি এক্সপার্ট কমিটি’। এই কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের গবেষক মাধব গ্যাডগিল। তিনি বলেছিলেন, ‘‘এই বিপর্যয় আসলে মানুষের তৈরি। জরুরি ভিত্তিতে আগাম ব্যবস্থা না নিলে কেরলের জন্য ভবিষ্যতে হয়তো আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।’’ ভবিষ্যদ্রষ্টা ছিলেন তিনি। সদ্য প্রয়াত হয়েছেন সেই কিংবদন্তি পরিবেশবিজ্ঞানী মাধব গ্যাডগিল। ভারতের বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে তাঁর গবেষণা ছিল গভীর। বিশেষত পশ্চিমঘাট পর্বতমালা নিয়ে তাঁর কাজ ছিল যুগান্তকারী।

আরও পড়ুন-চোখের জলে বিদায় দার্জিলিং-গর্ব প্রশান্তকে

সহ্যাদ্রি প্রেমিক গ্যাডগিল
ভারতের পশ্চিমতট রেখা বরাবর রয়েছে এক আশ্চর্য পর্বতমালা। গভীর অরণ্যময় উপত্যকা, কৃষিজমি, নদ-নদীময় এক প্রাকৃতিক ভূভাগ, ভৌগোলিকরা যাকে বলেন সহ্যাদ্রি বা পশ্চিমঘাট। কালিদাসের কাব্য রঘুবংশমে কবির বর্ণনায় এই পশ্চিমঘাট পর্বতমালাকে তিনি আখ্যায়িত করেন এক সুন্দরী যুবতী হিসেবে। সেই কাব্য পড়ে পুণের এক কিশোর এই পর্বতের প্রেমে পড়ে যায়। বাড়ির ছাদ থাকত সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত সহ্যাদ্রির দিকে। তাঁর কাছে আজীবনের সুন্দরী সহ্যাদ্রি জনগণের কাছে পরিচিত পশ্চিমঘাট নামে। সহ্যাদ্রির প্রতি সেই প্রেম দিনে দিনে বেড়েছিল তাঁর, একথা এক সময় নিজেই বলেছিলেন। তাই পশ্চিমঘাট তাঁর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন-মঙ্গলে ফের মেট্রো বিভ্রাট, আংশিক ব্যহত ব্লু-লাইন পরিষেবা

শৈশব, কৈশোরে
বিখ্যাত পরিবেশবিদ মাধব গ্যাডগিলের জন্ম ১৯৪২ সালে। বাবা ধনঞ্জয় রামচন্দ্র গ্যাডগিল ছিলেন কেমব্রিজের নামকরা স্কলার, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ এবং গোখেল ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন মূল পরিচালক। মাধব গ্যাডগিলের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল তাঁর বাবার।
ছোটবেলায় বাবা তাঁকে বলতেন, ‘‘যাই হয়ে যাক সবসময় নিজের অন্তরের কথাই শুনো।’’একবার অর্থনীতিবিদ ওয়েসিলি লিওনতেফ তাঁদের বাড়ি আসেন এবং বারো বছরের গ্যাডগিলকে জিজ্ঞেস করেন,‘‘তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও।’’ তখন গ্যাডগিল বলেছিলেন,‘‘আমি জীববিজ্ঞানী হতে চাই।’’ আসলে ছোট থেকেই তিনি জানতেন ভবিষ্যতে কী হতে চান।
উচ্চশিক্ষা
বোর্ড পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জনকারী মেধাবী ছাত্র গ্যাডগিল যখন পুণের ফার্গুসন কলেজে জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলে তখন গ্যাডগিলের পরিবার, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকরা হতাশ হন। আসলে এই বিষয় তখন উজ্জল কেরিয়ারের সম্ভাবনা কম ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও বাবার পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন গ্যাডগিল।
পুণের ফার্গুসন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধুনা মুম্বই তখনকার বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জীববিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপরে হাভার্ড মিউজিয়াম কম্পারেটিভ জুলজির ফিশারি বিভাগের কিউরেটর গিলস মেড তাঁকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার জন্য উৎসাহিত করেন। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৬৯ সালে পিএইচডি করেন। ১৯৭১-এ দেশে ফিরে আগারকর রিসার্চ ইনস্টিটিউটে তাঁর কর্মজীবন শুরু। ১৯৭৩ যোগ দেন বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে (IISc)। সেখানে দীর্ঘদিন তিনি অধ্যাপনা করেছেন। গবেষক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর অবদান যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনই ভারতের পরিবেশ আন্দোলনকে সংগঠিত করতে এবং পথের দিশা দেখাতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ।
এই সময় দুটো রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠা করেন সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল স্টাডিজ এবং সেন্টার ফর ইকোলজিক্যাল স্টাডিজ।


তাঁর অবদান
এই পশ্চিমঘাট পর্বতকে নিয়ে মাধব গ্যাডগিল এক অসামান্য বৈজ্ঞানিক দলিল তৈরি করেছিলেন, যা কী না ‘রিপোর্ট অব দ্য ওয়েস্টার্ন ঘাটস ইকোলজি এক্সপার্ট প্যানেল’ বা সংক্ষেপে ডব্লুজিইইপি (WGEEP) বলে খ্যাত ছিল। গ্যাডগিল ছিলেন পশ্চিমঘাট পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্যানেলের (WGEEP) সভাপতি, যা সাধারণত ‘গ্যাডগিল কমিশন’ নামে পরিচিত। পশ্চিমঘাটের পরিবেশগত সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে এই কমিশনের রিপোর্ট ভারতীয় পরিবেশ নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। যদিও ওই রিপোর্টের কিছু সুপারিশকে অত্যন্ত কঠোর বলে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। কমিশনের সুপারিশ ছিল পশ্চিমঘাটকে ‘পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল’ (Ecologically Sensitive Zones- ESZ) হিসেবে ঘোষণা করা, যা উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য আনবে। সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলন, বস্তারের অরণ্য সংরক্ষণ এবং পশ্চিমঘাট সংরক্ষণ সংক্রান্ত রিপোর্টে তাঁর অবদান অপরিসীম। ভারতের প্রথম বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ, নীলগীরি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ প্রতিষ্ঠার কাজে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ছিলেন স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর।


স্বীকৃতি ও সম্মান
পরিবেশ সংরক্ষণে আজীবন কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মাধব গ্যাডগিল বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক ‘টাইলার পুরস্কার’ উল্লেখযোগ্য পেয়েছেন কর্নাটক সরকারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান, ভারত সরকারের পদ্মশ্রী সম্মান, পদ্মভূষণ সম্মান, শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার, ভলভো পরিবেশ পুরস্কার, জাতিসংঘের তরফে চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য, আর্থ পুরস্কার সহ আরও বহু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সম্মান।
এলিওকার্পাস গাডগিলি হল একটি বিশেষ প্রজাতির গাছ যা ২০২১ সালে ভারতের কেরল রাজ্যের পালক্কাদ জেলার নেল্লিয়াম্প্যাথি পাহাড় থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রখ্যাত পরিবেশবিদ মাধব গ্যাডগিলের সম্মানে এই গাছটির নামকরণ করা হয়েছে।

Jago Bangla

Share
Published by
Jago Bangla

Recent Posts

দিনের কবিতা

‘জাগোবাংলা’য় (Jago Bangla) শুরু হয়েছে নতুন সিরিজ— ‘দিনের কবিতা’ (poem of the day)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের…

4 minutes ago

মঙ্গলবার ডায়মন্ড হারবারে সেবাশ্রয়-২ পরিদর্শনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের ছোট ছোট অসুবিধাগুলিকে দূর করে তাদের জীবন সহজ করা। সেবার মধ্যে দিয়ে কঠিন বাধা…

29 minutes ago

সত্যিই আসন্ন মোদির বিদায়বেলা? বয়স নিয়ে খোঁচা গড়করির

নাগপুর : এবারে কি সত্যিই ঘনিয়ে এল মোদির বিদায়বেলা? দলের অন্দর থেকেই সুস্পষ্ট বার্তা, অনেক…

10 hours ago

জঙ্গিদের সঙ্গে গুলির লড়াই, কিশতওয়ারে শহিদ জওয়ান

শ্রীনগর : সেনাবাহিনীর (Indian Army) সঙ্গে কিশতওয়ারের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল…

10 hours ago

ট্রাম্পের শুল্কতোপের মুখেও অনড় ইউরোপের ঐক্য, পাল্টা পরিকল্পনা

ওয়াশিংটন: ইউরোপের দেশগুলির উপর শুল্কের ভার চাপিয়ে গ্রিনল্যান্ড (Greenland_America) দখল করার কৌশল নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট…

10 hours ago

সাহিত্য অ্যাকাডেমির পাল্টা জাতীয় পুরস্কার ঘোষণা করলেন স্ট্যালিন

নয়াদিল্লি : কেন্দ্রীয় সরকারের সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অভিনব পদক্ষেপ নিলেন তামিলনাড়ুর…

10 hours ago