Featured

বাঙালির পেটপুজো

বাঙালির পরিচিতি ভোজন রসিক হিসেবে। যাকে বলে, মহাপেটুক। লোভনীয় খাবারের নাম শুনলেই জিভে জল। খেতে যেমন ভালবাসে, তেমন ভালবাসে খাওয়াতে। ঘরের সুস্বাদু রান্না কবজি ডুবিয়ে খায়। সেইসঙ্গে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে পড়ে রেস্তোরাঁর খাবারের স্বাদ নিতে। কলকাতা শহরে আছে বেশকিছু ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান। কয়েকটি শতবর্ষপ্রাচীন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীনতার আগে। কিছু দোকান বিখ্যাত মানুষের পদধূলিধন্য। বহু ইতিহাসের সাক্ষী। কোথাও পাওয়া যায় কষা মাংস, ফিশফ্রাই, কোথাও মেলে মোগলাই পরোটা, বিরিয়ানি, চপ, কাটলেট ইত্যাদি। বিভিন্ন বয়সিদের দেখা যায় হাসিমুখে পেটপুজো সারতে। কফি এবং শরবতের জন্যেও বিখ্যাত কোনও কোনও দোকান। এই প্রতিবেদনে খাদ্য রসিকদের জন্য মহানগরের কয়েকটি পুরনো বিখ্যাত খাবারের দোকানের সন্ধান দেওয়া হল।

আরও পড়ুন-বৃক্ষনিধন: দিল্লির এলজির তীব্র নিন্দা সুপ্রিম কোর্টের

ইন্ডিয়ান কফিহাউস
১৫ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট। সরু ঘিঞ্জি প্রবেশদ্বারটি দেখে ভিতরের আন্দাজ পাওয়া মুশকিল। প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেই বোঝা যায় ভবনের বিশালতা। উপরে উঠে, ডানদিকের গেট পেরোলেই চোখের সামনে জেগে ওঠে অপার বিস্ময়! এটাই কফিহাউস!
এক-একটি টেবিল ঘিরে কয়েকটি চেয়ার। প্রতিটি চেয়ার ভর্তি। টেবিল জুড়ে কফিকাপ, খাবার প্লেট, জলের গ্লাস ইত্যাদি। টেবিলগুলো ঘিরে জমে উঠেছে তুমুল আড্ডা। বিভিন্ন বয়সিদের। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো।
আড্ডায় মশগুল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। একটু দূরের টেবিলেই আলাপচারিতায় মেতে উঠেছেন অধ্যাপকের দল। কোনও কোনও টেবিল কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদকদের দখলে, কোথাও কফিতে চুমুক দিতে দিতে নতুন ছবি, নতুন নাটক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে মত্ত সমালোচকরা। তার পাশেই হয়তো চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে এসে নস্টালজিয়ায় ডুব দিচ্ছেন কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আছেন অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রশিল্পী। এই হল ইন্টালেকচুয়াল বাঙালির অন্যতম সেরা আড্ডার ঠিকানা, কফিহাউস। এক ছাদের নিচে নানা মত, নানা ভাবনার সমাহার।

আরও পড়ুন-ভয়াবহ বন্যায় ভাসছে অসম ফুঁসছে ব্রহ্মপুত্র, মৃত ৯০

জানা যায়, পরাধীন ভারতেই সূচনা হয়েছিল এই কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসের। ১৯৪২ সাল নাগাদ। তার আগে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউয়ে একটি কফিহাউস খোলা হয়েছিল। দুটি কফিহাউসেই জমে উঠত বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আড্ডা। কফি কী, একটা সময় জানত না কলকাতা। হেনরি পিডিংটন সম্ভবত ১৮৪৮ সালে কলকাতায় কফি পানের প্রচলন শুরু করেছিলেন। কারণ সেইসময় ব্রিটিশ যুবকরা অত্যাধিক পরিমাণে মদ্যপ হয়ে উঠেছিলেন। সেই নেশা দূর করতেই কফিকে জনমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসেছিল সাফল্য। বহু তরুণ-তরুণী আকৃষ্ট হয়েছিলেন এই গরম পানীয়ের প্রতি। বিশেষত শিক্ষিত সমাজে দারুণ কদর বেড়েছিল। তার দীর্ঘ সময় পরে কলকাতার কলেজপাড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে কফিহাউস। যেখানে আনাগোনা শুরু হয় বিদ্বান, রুচিশীল মানুষজনের। কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসের ভবনটির পরিচয় ছিল ‘অ্যালবার্ট হল’ নামে। ছিল ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম আঁতুড়ঘর। জানা যায়, রানি ভিক্টোরিয়ার স্বামী অ্যালবার্ট প্রিন্স কনসর্টের নামেই ভবনটির এই নামকরণ। ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেনের ঠাকুরদা রামকমল সেন ছিলেন এই ভবনের মালিক। ১৮৭৬ সালের ২৫ এপ্রিল তিনি এখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অ্যালবার্ট ইনস্টিটিউট। তিনিই ভবনটির নামকরণ করেছিলেন অ্যালবার্ট হল। কেশবচন্দ্র সেনের সময় তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তির পদধূলি পড়েছিল এই ভবনে। এখানেই হয়েছিল ভারতসভার প্রতিষ্ঠা। সবমিলিয়ে ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসের পোশাকি নাম ‘ইন্ডিয়ান কফিহাউস’। পরিচালনা করে ইন্ডিয়ান কফি ওয়ার্কার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড। ভবনটির দোতলার পাশাপাশি তিনতলার ব্যালকনিতেও পাতা আছে বেশকিছু চেয়ার-টেবিল। বসেন বিভিন্ন বয়সি বহু মানুষ। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত গমগম করে। এই টেবিল থেকে ওই টেবিল, হাসি মুখে ঘুরে বেড়ান বেশ কয়েকজন সাদা পোশাকের ওয়েটার। পরিবেশন করেন ব্ল্যাক কফি ইনফিউশন, মিল্ক কফি, ফিশ ফ্রাই, চিকেন স্যান্ডউইচ, ফিশ ফিঙ্গার, পকোড়া, বাটার টোস্ট-সহ বিভিন্ন রকমের খাবার। কফিহাউস নিয়ে বাঁধা হয়েছে গান, লেখা হয়েছে কবিতা, প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকা। গত শতকের চারের দশকে শুরু হয়েছিল পথচলা। আজও সেই ধারা অব্যাহত। কফিহাউস এমন একটি রেস্তোরাঁ, যেখানে আলো এবং উষ্ণতা পায় বাঙালির মনন চিন্তন কল্পনার জগৎ। এখান থেকে প্রত্যেকেই ফিরে যান কিছু না কিছু সৃষ্টিশীল ভাবনার রসদ নিয়ে।
অনাদি কেবিন
বাংলার মোগলাই-ভক্তদের মুখে মুখে ফেরে কলকাতার ‘অনাদি কেবিন’-এর নাম। ধর্মতলা অঞ্চলের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ। মোগলাই পরোটার সঙ্গে কষা মাংস, মাছ ভাজা। জিভে জল আসতে বাধ্য। ১৯২৫ সালে বলরাম জানা এই দোকানের প্রতিষ্ঠা করেন। জানা যায়, তাঁর দুই সন্তান— অনাদি এবং আদি। বড় ছেলে অনাদির টাইফয়েডে অকালমৃত্যু হয়েছিল। তাঁরই নামে এই রেস্তোরাঁ। বলরাম পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর মহকুমার মোহনপুরের ধুইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। আর্থিক অনটনের কারণে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে একটা সময়ে বেরিয়ে পড়েন ভাগ্যান্বেষণে। ধুইপাড়া থেকেই এসেছিলেন কলকাতায়। প্রথমে ঢাকাই পরোটার দোকান দিয়েছিলেন মহানগরীর ধর্মতলা অঞ্চলে। একটু ভিতরের দিকে। ছোট দোকান। পরে বর্তমান অনাদি কেবিনের জায়গায় উঠে আসে দোকানটি। আয়তনে বাড়ে। কেউ কেউ বলেন, বলরাম প্রথম জীবনে ফুটপাথে বসে পোস্ত ইত্যাদি বিক্রি করতেন। কোনওভাবে তাঁর সঙ্গে ব্রিটিশদের যোগাযোগ হয়। আবার কারও মতে, তিনি পরে লোহার ব্যবসায় মন দিয়েছিলেন। সে যাই হোক, ধীরে ধীরে নাম হতে শুরু করে তাঁর খাবারের দোকানের। ‘অনাদি কেবিন’-এর মোগলাই পরোটা এবং কসা মাংসের খ্যাতি শহরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। বাড়তে থাকে ভিড়। জমে ওঠে ব্যবসা। শিক্ষাব্রতী হিসেবেও বলরামের পরিচিতি ছিল। স্বাধীনতার আগে ‘অনাদি কেবিন’-এর আয় থেকেই, ১৯৪৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন মায়ের নামে স্কুল। সেই স্কুলে এখন প্রচুর ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। বলরাম আজ আর নেই। তবে রমরমিয়ে চলছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষ ছুঁই-ছুঁই ‘অনাদি কেবিন’। বর্তমানে দোকান দেখাশোনা করেন আদির পুত্র, বলরামের নাতিরা। সাধারণ মানুষকে খাইয়েই তাঁদের তৃপ্তি। দোকানটি প্রতিদিন দুপুর ১-৩০ থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

আরও পড়ুন-পরপর বিপত্তি! এবার লক্ষাধিক টাকার মহাপ্রসাদ নষ্টের অভিযোগ সেবায়েতের

মিত্র ক্যাফে
কলকাতার ‘মিত্র ক্যাফে’। শতবর্ষপ্রাচীন এই ক্যাফের প্রতিষ্ঠা করেন সুশীল রায়। যদিও ক্যাফের নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে তারও অনেক আগে থেকে। শতাব্দীপ্রাচীন এই ক্যাফের ফাউল কাটলেট, ফিশ কবিরাজি, ফিশ ফ্রাই, চিকেন ও মটন স্টিউ, ব্রেন চপের আকর্ষণে ছুটে যান ভোজনরসিক বাঙালিরা। শুরুর দিকে ক্যাফেতে পর্দাঘেরা ছোট চৌকো ঘর বা কেবিন ছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে বনেদিবাড়ির মহিলারা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে নির্বিঘ্নে মুখরোচক খাবার উপভোগ করতে পারেন। তখন এই কেবিন ক্যাফেগুলোর চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে চপ, কাটলেটের স্বাদ নিতে নিতে অসংখ্য নতুন সম্পর্কের জন্ম হয়েছে। সমাজ এবং সময়ের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে এই কেবিনগুলোর ব্যবহারেও ক্রমশ পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মিত্র ক্যাফের প্রায় ১৪টি আউটলেট রয়েছে। একটি আউটলেট আছে পুরীতে। বর্তমানে মাল্টি ক্যুইজিন খাবার পাওয়া যায়। বাঙালি খানা তো রয়েছেই, পাশাপাশি চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, তন্দুর, সিফুড ইত্যাদি রকমারি ক্যুইজিন মেলে। প্রতিদিন শোভাবাজার এবং শ্যামবাজারের আউটলেট খোলা হয় দুপুর ৩টেয়। বাকিগুলো দুপুর ১২টায়। মোটামুটি রাত ১০টা পর্যন্ত। ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে মিত্র ক্যাফেতে। এখনও পর্যন্ত বজায় রয়েছে খাবারের গুণগতমান। প্রবীণরা আসেন। সেইসঙ্গে আসেন নবীনরাও। বহু বিখ্যাত মানুষ এসেছেন খাবারের স্বাদ নিতে। সবার মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে খুশি হন তাপস রায়। তিনি মিত্র ক্যাফের সিইও, প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় প্রজন্ম। আগামী দিনে আরও কয়েকটি আউটলেট খোলাই তাঁর লক্ষ্য।

আরও পড়ুন-ভেঙে পড়ল স্কুল, নাইজেরিয়ায় মৃত ২২ পড়ুয়া

দিলখুসা কেবিন
কলেজ স্ট্রিট ও মহাত্মা গান্ধী রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত দিলখুসা কেবিন। ১০৫ বছরের পুরনো। হেরিটেজ তকমার পেয়েছে। ৮৮ নম্বর মহাত্মা গান্ধী রোডের এই বাড়িতে আজও খুঁজে পাওয়া যায় এক চিলতে অতীতের কলকাতাকে। দেখা যায় পুরনো কাঠের চেয়ার-টেবিল, জানলায় লাল পর্দা, সাবেকি মেঝে, বেলজিয়াম গ্লাসের জানলার কাচ। প্রতিষ্ঠাতা চুনীলাল দে। দোকানটির বাইরে তাঁর আমলের সিমেন্টে খোদাই করে ‘দিলখুসা কেবিন’ লেখাটি সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজও বেঁচে রয়েছে। এখান থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বেই ভোজনরসিক পটলডাঙার টেনিদার বাড়ি। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সৃষ্টি চরিত্র। এখানে আনাগোনা ছিল সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদারও। বাংলা সাহিত্যের অনেক চরিত্রকেই রসেবশে রাখার দায়িত্বে ছিল এই কেবিন। তাই তো বহু গল্প উপন্যাসে এই কেবিনের উল্লেখ আছে। প্রাচীন কলকাতার থিয়েটার পাড়ার নামজাদা অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক, কবি-সাহিত্যিক, বিদ্বজ্জনদের নিয়মিত আড্ডা বসত এই কেবিনে। আজও অনেক কবি-সাহিত্যিক বসেন। খেতে খেতে আড্ডা দেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের কালে বিপ্লবীদের অনেক গোপন পরিকল্পনার আঁতুড়ঘর ছিল এই কেবিন। দিলখুসার কবিরাজি কাটলেট, মাটন চপ, ডেভিল চপ, ব্রেস্ট কাটলেট বহু প্রবাদপ্রতিম বঙ্গসন্তানের চিন্তার গোড়ায় রসদ জুগিয়েছে। এখানে স্ন্যাকস ছাড়াও চিরাচরিত ফ্রায়েড রাইস চিলি চিকেনের মতো অন্যান্য পেটভরানো খাদ্যের সম্ভারও রয়েছে। সেই কারণেই এই কেবিন বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। কারণ সকলেই জানেন, পেটে খেলে তবেই বাঙালির মস্তিষ্কে সয়। প্রতিদিন বেলা ১২টা থেকে রাত ৮.৩০টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
গোলবাড়ি
শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের বিখ্যাত দোকান ‘গোলবাড়ি’। বিধান সরণির রাস্তায় পড়বে দোকানটি। পুরনো কলকাতার গন্ধ লেগে আছে দোকানের দেওয়াল জুড়ে। কাঁচা বয়সের ভোজনপ্রিয় থেকে প্রবীণ, গোলবাড়ির কষা মাংসে মজে আছেন প্রত্যেকেই। এখানকার স্পাইসি, গ্রেভি কষা মাংসর স্বাদ মনে করায় খাঁটি বাঙালি মাংসের ঝোলের কথা। অসম্ভব সুস্বাদু এই মাংসের রেসিপি প্রায় একশো বছরের বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তা বজায় রেখে চলেছে। ১৯২৩ সালে দোকানের প্রতিষ্ঠা করেন রতনচন্দ্র অরোরা। এই অরোরা পরিবার তিন পুরুষ ধরে দোকানের দায়ভার সামলাচ্ছেন। অরোরা, মূলত পাঞ্জাবি পরিবার। তবে তাঁদের রান্নার মধ্যে পাঞ্জাবি গন্ধের চেয়েও বেশি পাওয়া যায় বাঙালি স্বাদ। আর এই স্বাদেই মজে আছে কয়েক প্রজন্ম। গোলবাড়ির কষা মাংস কিন্তু বাড়ির মতো নয়। এর রং অনেকটা কালচে। মাংসের চর্বি গলিয়ে গ্রেভির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। তার ফলে আইটেমের স্বাদ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। মাংসের দাম বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে দোকানের কষা মাংসের দামেরও বদল ঘটে। দোকানের কর্মী সৌরভ পট্টনায়ক জানালেন, বর্তমানে কষা মাংসের দাম ২৭২ টাকা। পরোটা ১১ টাকা। খাদ্যপ্রিয় বাঙালিরা জমিয়ে খান। দেখা যায় কলেজ-ফেরতা যুবক-যুবতী, অফিস-ফেরতা কলিগ যুগল, প্রবীণ নাগরিকদের ভিড়। গোলবাড়ির অন্যান্য জনপ্রিয় আইটেমগুলির মধ্যে রয়েছে ফিশফ্রাই, চিকেন কাটলেট, ব্রেনচপ এবং এগ কাটলেট।

আরও পড়ুন-হারারেতে সিরিজ জয় শুভমনদের

শিরাজ
‘শিরাজ’-এর অবস্থান কলকাতার ১৩৫, পার্ক স্ট্রিট, মল্লিক বাজার ক্রসিং-এ। নিউরোসায়েন্স হসপিটালের পাশে। এখানকার বিরিয়ানির কোনও তুলনা নেই। এমনিতে কলকাতার বিরিয়ানি লখনউ বা হায়দরাবাদি বিরিয়ানির থেকে কিছুটা আলাদা। বহু বিরিয়ানি রসিকের মতে শিরাজের বিরিয়ানিই সেরা। তা চিকেন হোক বা মাটন। তুলতুলে মাংসের টুকরো আর সুসিদ্ধ আলু দিয়ে তৈরি এই বিরিয়ানির স্বাদ জিভে লেগে থাকে। মোগলাই খানা পরিবেশনের উদ্দেশ্যে ১৯৪১ সালে বিহার থেকে কলকাতায় আসেন মহম্মদ আরশাদ আলি এবং মহম্মদ হুসেন। এখানে তাঁদের সঙ্গে দেখা হয় নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের খাস বাবুর্চির বংশধর মহম্মদ সামসুদ্দিনের সঙ্গে। এই তিনজন মিলে বানিয়ে ফেলেন শিরাজ রেস্তোরাঁ। ১৯৫৬ সালে পাকাপাকি ভাবে রেস্তোরাঁর নাম হয় শিরাজ গোল্ডেন রেস্তোরাঁ। আর ডি বর্মন, ফারুক শেখ, আমজাদ খান, মকবুল ফিদা হুসেন থেকে শাবানা আজমি, জাভেদ আখতার, মহেন্দ্র সিং ধোনি, সাবা করিম, শোয়েব আখতার, রণবীর কাপুর, আশিস বিদ্যার্থী, বিপাশা বসু, সুস্মিতা সেন— সকলেই শিরাজের বিরিয়ানিতে মজেছেন। প্রতিদিন বেলা ১২টা থেকে রাত ১১.১৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

আরও পড়ুন-বিজয়া

প্যারামাউন্ট
কলেজ স্কোয়্যারের বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অবস্থিত ‘প্যারামাউন্ট’। বরিশালের নীহাররঞ্জন মজুমদার ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। তবে কলকাতার এই বিখ্যাত শরবতের দোকানের আদি নাম ছিল প্যারাডাইস। স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিযুগে বিপ্লবীরা এটাকে স্বদেশি অনুশীলন কেন্দ্র বানিয়েছিলেন। আসতেন বাঘাযতীন ও পুলিনবিহারী দাসের মতো প্রথমসারির বিপ্লবীরা। এসেছেন সুভাষ বসু, জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন বসুও। একটা সময় ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও পুলিশ বন্ধ করে দেয় এই দোকান। ১৯৩৭ সালে প্যারামাউন্ট নামে আবার চালু করা হয়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই দোকানে বারবার আসতেন। এছাড়াও আসতেন সত্যজিৎ রায়, উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, শচীনদেব বর্মন, বিকাশ রায়। আসতেন সৌমেন ঠাকুর, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, অমর্ত্য সেন, নবনীতা দেবসেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিষ্টুচরণ ঘোষ, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, মনোহর আইচ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও। বিশিষ্টদের টান ছিল ডাবের শরবতে। এই শরবতের রেসিপি দিয়েছিলেন স্বয়ং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি নীহাররঞ্জন মজুমদারকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে বসিরহাট থেকে আনা ডাবের শাঁস মিশিয়ে শরবতে নতুন স্বাদ আনতে হয়। খোলা থাকে বেলা ১২টা থেকে রাত ৯.৩০ পর্যন্ত।

আরও পড়ুন-ঋণ মকুব-সহ একাধিক দাবি! ফের কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন কৃষকদের

অ্যালেন কিচেন
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের উপর, গ্রে স্ট্রিট মোড় থেকে ধর্মতলার দিকে এগোলে বাঁদিকে অবস্থিত ‘অ্যালেন কিচেন’। এই দোকানটি আদতে ছিল স্কটিশ সাহেব মিস্টার অ্যালেনের। চার পুরুষ আগে জীবনকৃষ্ণ সাহা স্পেনসেস হোটেল ছেড়ে এখানে কাজ করতে আসেন। অ্যালেন সাহেব দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় দোকানের স্বত্ব দিয়ে যান জীবনবাবুকে। এ্যালেনের স্পেশাল আইটেম প্রন বা ভেটকি কাটলেট, চিকেন-মাটন স্টেক, কবিরাজি কিংবা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ঘরানার মাছ-মাংসের পুর দেওয়া চপ। খাদ্যপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা, আমলা, সাংবাদিক, সঙ্গীতকার, কবি, অভিনেতাদের অনেকেরই প্রিয় শতবর্ষ উত্তীর্ণ এই ছোট্ট রেস্তোরাঁটি। খোলা থাকে বিকেল ৪.৩০টা থেকে রাত ৯.৩০টা পর্যন্ত।

Jago Bangla

Share
Published by
Jago Bangla

Recent Posts

নিজের কেবিনে একাধিক মহিলার সঙ্গে অশ্লীল আচরণ, সাসপেন্ড পুলিশকর্তা

এক নয়, একাধিক! নিজের দফতরে মহিলাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর শাস্তি পেলেন সেই পুলিশ আধিকারিক। কর্নাটক…

1 hour ago

রাজ্যে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

প্রতিদিন ১ ডিগ্রি করে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। কলকাতা (Kolkata) থেকে আগামী কয়েকদিনে প্রবল শীতের কনকনানি…

2 hours ago

সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি, নেপথ্যে কোন অঙ্ক?

নয়াদিল্লি : অভূতপূর্ব ঘটনা বিজেপিতে (BJP)। মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই বিজেপি সভাপতি পদে বসলেন নীতিন…

2 hours ago

সিআরপিএফ ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার নাবালিকা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করল ক্ষুব্ধ তৃণমূল

নয়ডা : ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যে এখন নারী-নিরাপত্তার নামে যে কতবড় প্রহসন চলছে তা আরও…

2 hours ago

‘তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’

দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতেই হত। এত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন সহ্যের সব…

2 hours ago

হাড় নিরাময়কারী আঠা

অর্থোপেডিক সার্জারির এক নতুন দিগন্ত। হাড় বা অস্থি, দেহের অন্যতম শক্ত অংশ যা আমাদের শরীরের…

2 hours ago