আমজনতার পেটে লাথি মেরে ধর্মীয় উদযাপনের ঔদ্ধত্য কয়েকদিন আগে এক রবিবার চাক্ষুষ করল গোটা বাংলা। সৌজন্যে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ আয়োজিত ‘লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ’। ধর্মের নামাবলি গায়ে চড়িয়ে অধর্মের আস্ফালনের এক ন্যক্কারজনক নজির সম্প্রীতির রাজধানী কলকাতায় স্থাপন করল বিজেপির মুখ্য পৃষ্ঠপোষক আরএসএস। ধর্ম আমাদের সহিষ্ণুতার পাঠ দেয়। আত্মাকে প্রদান করে নমনীয়তা। কপালে তিলক কেটে তুলসীর মালা গলায় পরে ঘাস, পাতা খেলেই ধার্মিক হওয়া যায় না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লেখা ‘শিক্ষাষ্টকম্’-এর তৃতীয় শ্লোক অনুযায়ী—
“তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা।
অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ।।”
আরও পড়ুন-উত্তর গোলার্ধের আলোর বিস্ময়
অর্থাৎ যিনি তৃণ অপেক্ষা নিজেকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করেন, তরুর মতো সহিষ্ণু, মান শূন্য এবং অন্য সবাইকে সম্মান প্রদান করেন, তিনি-ই কেবল সর্বক্ষণ হরিকীর্তনের অধিকারী। অথচ গীতাপাঠের ব্রিগেডে ক্ষমতা ও দম্ভের প্রত্যক্ষ প্রতিফলনে লাঞ্ছিত হতে হল এক গরিব ফেরিওয়ালাকে। তাপ্পি মারা টিনের বাক্সে মেলার মাঠে ঘুরে ঘুরে প্যাটিস বিক্রি করে পরিবারের জন্য স্বপ্ন কেনেন আরামবাগের সেই ভদ্রলোক। ভগ্নপ্রায় ঘরে লণ্ঠনের আলোয় অপেক্ষারত ক্ষুধার্ত দুই জোড়া চোখ আর জীবন রণাঙ্গনের নিষ্ঠুর লড়াইয়ের চাপে খবর রাখা হয় না ধর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাজনীতির গেরুয়া রোজনামচার। পেটের দায়ে অজান্তেই তাকে রবিবারও হাজির হতে হয়েছিল বিপদের কেন্দ্রস্থলে। এ যেন দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধের ইঁদুর ধরার কল আর সেই কলে আচমকা ধরা পড়ল বছর পঞ্চাশের শেখ রিয়াজুল। দু’মুঠো শুকনো ভাত আর এক চিমটে লবণ জোগাড়ের নেশার দুনিয়ায় এক হয়ে যায় ব্রিগেড কিংবা খেলার মাঠ। সে দুনিয়ায় বিরাজ করে কেবল ঘাম ঝরিয়ে সৎপথে উপার্জিত অর্থে একপেট ভাতঘুম। থাকে না ধর্মীয় সংকীর্ণতার সমুদ্রমন্থনে উঠে আসা গরল পানের সুপ্ত বাসনা। যেখানে ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়— সেখানে রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় পরিচয় যাচাই বিলাসিতা বইকি! তাই খেলা থেকে মেলা কিংবা আন্দোলন থেকে সম্মেলনের মাঠে মুচমুচে চিকেন প্যাটিস নিয়ে ঘুরে বেড়ানো শেখ রিয়াজুলও ডিসেম্বরের সাত তারিখের দুপুরে ব্রিগেডের ময়দানে হাজির হয়েছিল খদ্দেরের আশায়। ময়দানের ‘মহৎ আয়োজন’ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা কিংবা উক্ত ধর্মীয় সমাবেশকে কালিমালিপ্ত করার কোনও উদ্দেশ্য তার ছিল না। অথচ যে হিন্দুধর্মে খাদ্যকে মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ধর্মের উপাসকরাই রিয়াজুলের টিনের বাক্সে লাথি মেরে নষ্ট করল প্রায় চার হাজার টাকার প্যাটিস। জনসমক্ষে উঠবোস করানো হল তাকে। চলল বেধড়ক চড়-থাপ্পড়। ধর্মের অজুহাতে ক্ষমতার কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হল দারিদ্র, ঠিক যেভাবে প্রাচীন রোমে একদল প্রতিপত্তিশালী, বিকৃতমনস্ক ব্যক্তি গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধের মাধ্যমে উপভোগ করতেন ষাঁড়ের সঙ্গে ক্রীতদাসের আমৃত্যু অসম লড়াই। অথচ ব্রিগেডের মাঠে অনেক নেতাকেই চামড়ার জুতো পরে গীতা হাতে ছবি তুলতে দেখা গেলেও তাঁদের উঠবোস করানো গেল না!
ফেরিওয়ালারা তো আমিষ-নিরামিষ ধরে বিক্রি করতে অভ্যস্ত নন। রোজ নিজেদের পণ্য নিয়ে বিক্রি করেন পেটের তাগিদে। যাদের প্যাটিস খাওয়ার নয়, তারা খাবে না। কিন্তু এই সরল সমীকরণকে জটিল ও হিংসাত্মক করে তোলার মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বিজেপির অসহিষ্ণুতার মতাদর্শ যেখানে অনুরণিত হয়— “বড়লোকের ঢাক তৈরি গরিব লোকের চামড়ায়।”
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মূলত আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং জীবনের দর্শন নিয়ে আলোচনা করে, কোনও নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসের বাধ্যতামূলক নিয়ম সেখানে চাপানো নেই। আমিষ নিষিদ্ধকরণের কথাও বলা হয়নি কোথাও। উপরন্তু হিন্দুধর্মকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন যে স্বামীজি তিনিও শারীরিক শক্তি অর্জনের নিমিত্তে যুব সম্প্রদায়কে আমিষভক্ষণের কথা বলেছিলেন। মুরগির মাংস তিনি পছন্দ করতেন বিশেষভাবে। সে সময় মুরগির মাংস গৃহস্থ ঘরে ঢোকা অনাচার হিসেবে গণ্য হলেও স্বামীজি এসব নিয়ম মানতেন না। নানা হোটেল ঘুরে যথেচ্ছ পরিমাণে মাংস ভক্ষণ করতেন। একদা এক শিষ্য শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে স্বামীজির নামে অভিযোগ জানায়। ঠাকুর হেসে বলেছিলেন, “খেয়েছে তো কী হয়েছে! তুই যদি রোজ হবিষ্যিও খাস, আর নরেন যদি রোজ হোটেলে মাংস খায়, তা হলেও তুই নরেনের সমান হতে পারবি না।”
আরও পড়ুন-কাল লখনউয়ে চতুর্থ টি-২০ ম্যাচ, রানে নেই মানে ফর্মে নেই এমন নয় : সূর্য
এই বাংলায় সরস্বতী পুজো আর বিজয়া দশমীতে জোড়া ইলিশ রান্নার রীতি প্রচলিত বহু গৃহস্থ বাড়িতে। তামিলনাডুর বুনিয়াদি স্বামী শিবমন্দিরে আজও ঈশ্বরকে চিকেন কিংবা মাটন বিরিয়ানি অর্পণ করা হয় ভোগ হিসেবে। পুরীর জগন্নাথ মন্দির চত্বরে অবস্থিত বিমলা মন্দিরে রামচন্দ্রের আরাধ্যা দেবী দুর্গার অবতার মা বিমলাকেও মাছ ও ছাগল ভোগ দেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশের তারকুলহা দেবীমন্দির কিংবা কেরলের কাদাভু মন্দিরেও আমিষ ভোগের প্রথা রয়েছে। এই বাংলার কালীঘাট, তারাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর কিংবা কঙ্কালীতলার কালীমাকেও আমিষ প্রদান করা হয়।
জাতীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যার ৭১%-ই আমিষভোজী। একটা ডিমকে দু’বেলা ভাগ করে খাওয়া ভারতবর্ষে পনির, মাশরুম, রাজমার মতো দামি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারগুলিকে নিয়মিত চেখে দেখা দিবাস্বপ্ন বইকি। যে-দেশে চারাপোনাতেই পকেট এফোঁড়-ওফোঁড়, সে-দেশে চিজ কেনা বিলাসিতা! তাই শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, ছাপোষা বাঙালির চিকেনই ভরসা। পুষ্টি, প্রোটিন আর পেট ভরানোর রসদ নিয়ে বেঁচে থাক রিয়াজুলের মতো প্যাটিসওয়ালারা। পঁচিশ টাকার চিকেন প্যাটিস দীর্ঘজীবী হোক! নাহলে, স্বাদ আর সাধ্যের মেলবন্ধনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এগিয়ে চলা বাঙালির রসনাকে বন্দি হতে হবে তালিবানি ফতোয়ার গেরুয়া সংস্করণে—
চিংড়ি মাছের মালাইকারি /
মামলা মোদির ফৌজদারি, /
সরষে দিয়ে ইলিশে ভাপা /
কাঠগড়াতে বিচার মাপা।/
পড়লে পাতে গরম খাসি /
অমিত শাহই দেবেন ফাঁসি,/
কাতলা-ল্যাটা-পাবদা খেলে,/
ভরবে ডিটেনশনের জেলে।
প্রতিদিন ১ ডিগ্রি করে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। কলকাতা (Kolkata) থেকে আগামী কয়েকদিনে প্রবল শীতের কনকনানি…
নয়াদিল্লি : অভূতপূর্ব ঘটনা বিজেপিতে (BJP)। মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই বিজেপি সভাপতি পদে বসলেন নীতিন…
নয়ডা : ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যে এখন নারী-নিরাপত্তার নামে যে কতবড় প্রহসন চলছে তা আরও…
দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতেই হত। এত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন সহ্যের সব…
অর্থোপেডিক সার্জারির এক নতুন দিগন্ত। হাড় বা অস্থি, দেহের অন্যতম শক্ত অংশ যা আমাদের শরীরের…
বরোদা, ১৯ জানুয়ারি : ডব্লুপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর স্বপ্নের দৌড় অব্যাহত। সোমবার গুজরাট জায়ান্টসকে ৬১…