দু’হাজার ছাব্বিশ বিজেপি হাপিশ

গত সাত বছরে বাংলা থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তুলে নিয়ে গিয়েছে, অথচ এ-রাজ্যের গরিব মানুষের প্রাপ্য টাকা আটকে রেখেছে দিল্লির জমিদারেরা। বাংলার মানুষকে ভাতে মারতে চেয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ১০০ দিনের প্রকল্প চালু করেনি বিজেপির সরকার। আবাসের টাকাও দেয়নি। এবার পাল্টা দেওয়ার পালা বাংলার মানুষের। তারাই বিজেপিকে বাংলা-ছাড়ার ব্যবস্থা করছে। জানাচ্ছেন পার্থসারথি গুহ

Must read

বাংলার আকাশ-বাতাসে বিজেপি নামক ভাইরাসের ঘনঘটাতেও সুখের কথা, গোবলয়ের গোয়েবলসদের গোয়ার্তুমির হাত থেকে আমাদের বাঁচাতে সূর্যের প্রজ্জ্বলন নিয়ে মাউন্ট এভারেস্টের মতো দাঁড়িয়ে আছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা বঙ্গজননী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাঁর নির্দেশে আরএসএস-বিজেপিকে ছিন্নভিন্ন করতে রাজ্য জুড়ে নবগ্রহের মতো সেই আকাশভরা সূর্যতারা প্রদক্ষিণ আরম্ভ করেছেন মমতাময়ীর যোগ্য সেনাপতি তরুণ তুর্কি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাংলা তথা দেশের শত্রু ইংরেজের পোষ্যপুত্র আরএসএস-বিজেপিকে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে মুছে দিতে বদ্ধপরিকর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। তাই এবারের নির্বাচন শুধু একটি সাধারণ বিধানসভা ভোট নয়। বাংলা থেকে বিজেপিকে হাপিশ করার গণতান্ত্রিক যজ্ঞ। বাংলার মাটি থেকে এমনভাবে উৎখাত করা হবে গেরুয়া-বর্গীদের যাতে অদূর-ভবিষ্যতে ভূ-ভারতে বিজেপির হদিশ খুঁজে পাবে না।
বস্তুত, অভিষেকের তেজ কী জিনিস তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে তাবড় বিজেপির মাথামুণ্ডুরা। এবার যার জেরে রীতিমতো কেঁপে উঠেছেন জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এতদিন তিনি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, বিহারের তেজস্বী যাদব, কেজরিওয়ালের আপ, এনসিপি (শরদ)-এর লুজ বল পাচ্ছিলেন। আর বেমালুম চালিয়ে খেলছিলেন। হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, বিহারে নির্বাচন পর্ব সাঙ্গ হওয়ার পর ভোট চুরি ইস্যু সামনে এনে কার্যত ইসিআইকে ওয়াকওভার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্য প্রতিনিধি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেই চোখে চোখ রেখে কথা বলতে আরম্ভ করেছেন, ল্যাজেগোবরে হতে আরম্ভ করেছে টিম জ্ঞানেশ কুমার। বস্তুত, অভিষেকের সুনিপুণ যুক্তিবাণের মুখে পড়ে জ্ঞানেশ কুমারের ভ্যানিশিং কারসাজি চৌপাট হওয়ার মুখে। ঘন ঘন ইয়র্কারের মুখে উত্তেজিত হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলতে গিয়ে সেই হীনমন্যতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। বেআব্রু হয়ে উঠেছে আপাত নিরপেক্ষতার তকমা।

ভানুমতীর খেলের মতো গিলি গিলি গে বলে ইচ্ছামতো বেড়াল থেকে রুমাল কিংবা রুমাল থেকে পায়রার ম্যাজিক তো অনেক দেখেছেন। এখন নতুন করে দেখতে হচ্ছে ভ্যানিশ কুমারের নেতৃত্বে চলতে থাকা বৈধ ভোটার রাতারাতি গায়েব করার আজব জাদুখেলা। গণতন্ত্র ধ্বংসের এই প্রহসনকে জাদু না বলে কালাজাদু বলাটাই মনে হয় সমীচীন। দিল্লির দানবরা যখন বুঝল যে ক্রমে তাদের পায়ের তলার মাটি সরছে তখনই যাবতীয় নখদন্ত বের করে ‘পিছে কা খিড়কি’র জাদুটোনা আরম্ভ করেছে। যদিও পাবলিকের মার দুনিয়ার বার বা পক্ষান্তরে পগারপার। এই সহজ সরল সত্যিটা এখনও গন্ডারের চামড়াওয়ালা বিজেপি-আরএসএস বুঝতে পারছে না। বুঝতে পারছে না, কত ধানে কত চাল। বাংলায় তৃণমূলের কাছে এতবার গো হারা হারার পরেও লম্বাচওড়া ডায়লগবাজি একটুও কমেনি।

আরও পড়ুন- ভাল থাকুন বছরভর

এই তো বিগত লোকসভা নির্বাচনের আগে, ইসবার চারশো পারের ফানুস কীভাবে চুপসে গিয়েছে দেশবাসী চাক্ষুষ করেছেন। আর বাংলার কথায় এলে, সেই ২১-য়ের বিধানসভা ভোটের আগে ইসবার দুশো পারের ভাঁওতাবাজি আর ২৪-য়ের লোকসভায় প্রধানমন্ত্রীর বুক ঠুকে বলা, এবার সারা দেশের মধ্যে বাংলায় সবথেকে ভাল ফল করবে বিজেপি-র প্রোপাগান্ডা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। তাও বিজেপির অশ্বডিম্ব প্রসব করা নেতাদের হম্বিতম্বি উপরন্তু বেড়েই চলছে।

যার নয়ে হয় না, তার নব্বইতেও হবে না, এই সাধারণ কথাটাই ধরতে পারছে না গেরুয়া বাহিনী। কিংবা বুঝেও অহংয়ের অমানিশা গ্রাস করেছে তাদের। অবশ্য, এক্ষেত্রে অমানিশা না বলে, বলা ভাল বিজেপি রাহুর গ্রাসে পড়েছে। এসআইআর যে তাদের দিকে ব্যুমেরাং হয়ে ধেয়ে আসতে চলেছে তা বুঝতেও হয়তো অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে গোবলয়ের গাম্বাটদের। কারণ, এসআইআরের নামে এ রাজ্যে সবথেকে ক্ষতির মুখে পড়েছে মতুয়া, রাজবংশী, নমশূদ্র-সহ প্রান্তিক হিন্দুদের এক বিরাট জনগোষ্ঠী। খড়কুটো ভেবে বিজেপিকে বিশ্বাস করে এখন তাঁরা কালনাগিনীর খপ্পরে পড়েছেন। সরল-সাধাসিধা মানুষগুলোর বিশ্বাসে কোনও দোষ নেই। কথাতেই বলে বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু। তাঁরাও ওপার বাংলা থেকে এই বাংলায় এসে মরীচিকার মায়ায় জড়িয়েছেন। কিন্তু ‘মায়াবন বিহারিণী হরিণী’ যে মারীচ-নামক রাক্ষসের মৃগরূপ সে তো তাঁরা কল্পনাও করতে পারেননি। যখন বুঝলেন, তখন গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। তাঁদের সরল-বিশ্বাসে প্রলেপের নামে বানের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে সাম্প্রদায়িক নরপিশাচরা। হ্যাঁ, লক্ষ লক্ষ মতুয়া, রাজবংশী-সহ বিশাল অংশের মানুষ আজ অসহায়। রাষ্ট্রযন্ত্রের দমনপীড়নে না ঘরকা, না ঘাটকা হওয়ার দিকে।

ঠিক যেন অসমের অ্যাকশন রিল্পে চলছে। যেভাবে বাঙালির জাতিগত সত্তা, ঐতিহ্য ভুলিয়ে গোবলয়ের হিন্দুত্বের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে কয়েদ করা হয়েছে, এই রাজ্যেও অনুরূপভাবেই এগোতে চাইছে বিজেপি। বলিপ্রদত্ত করা হচ্ছে প্রান্তিক হিন্দুদের। এখানেই মোক্ষম প্রশ্ন জাগছে, বিজেপি-আরএসএস এখন ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির রোমের মতো ক্রীতদাস সমাজ গড়ে তুলতে চাইছে। যাঁরা সামান্য গ্রাসাচ্ছদনের জন্য বিজেপির পেয়ারের পুঁজিপতিদের কাছে বেগার খাটবে। কিংবা ভানতারার মতো আইনি জটিলতায় জর্জরিত কোনও চিড়িয়াখানায় পশুর মতো পণ্য হয়ে উঠবে। মোচ্ছব-করা মনুবাদী তথা মানুষের শ্রম চুরি করা পুঁজিবাদীরা তাঁদের নিংড়ে নেবে। প্রদর্শনীশালায় উপস্থাপিত হতে হবে বিলুপ্তপ্রায় সম্প্রদায়ের মতো। নিজেদের ঐতিহ্য, গরিমা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা ধুলোয় লুটোপুটি খাবে। এতটাই গভীরে পৌঁছেছে ইসিআইয়ের বকলমে বিজেপির ছলাকলা।
যার বিরুদ্ধে একমাত্র অস্ত্র প্রতিরোধ। বিজেপির মুখে ঝামা ঘষে দেওয়া হোক এমনভাবে যেন বাংলার হারের জেরে সারা দেশে মুখ লুকোতে হয় তাদের। বাংলায় বিজেপিকে ছিবড়ে করে দিতে পারলে পদ্মবন ঝোপঝাড়ে পরিণত হবে। বিজেপির অ্যান্টিডোট যে বাংলার শস্য-শ্যামলা ভূমি এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তা ইতিমধ্যেই বহুলপ্রচলিত। এবার সময় এসেছে সেই বিজেপি-বিরোধী প্রতিষেধক দেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে দিতে। বাংলায় বৃহত্তর জয়ের মাধ্যমে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস যে-কাজ সুদৃঢ়ভাবে করতে প্রস্তুত।

Latest article