ভারতীয় সঙ্গীতে বরাবরই দেখা গেছে বঙ্গবাসী এবং বঙ্গভাষীদের জয়জয়কার। তা সে লাইট মিউজিকেই হোক বা ক্লাসিক্যাল। একটা সময় জাতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্রের গানে বিশেষ অবদান রেখেছেন পঙ্কজকুমার মল্লিক, শচীন দেব বর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, রাহুল দেব বর্মন, বাপ্পি লাহিড়ীর মতো বাঙালি সুরকাররা। কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে মান্না দে, গীতা দত্ত, কিশোর কুমারের নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। পরবর্তী সময়ে কুমার শানু, অভিজিৎ ভট্টাচার্য, বাবুল সুপ্রিয়, শান, শ্রেয়া ঘোষাল, অরিজিৎ সিং প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছেন। উষা উত্থুপ, অলকা ইয়াগনিক, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি বায়োলজিক্যালি বাঙালি না হলেও, বাংলার সঙ্গে, বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে এঁদের রয়েছে নিবিড় যোগ। উঠে আসতে পারে আরো অনেক নাম। তালিকা দীর্ঘ হয়ে যাবে।
সেই ধারা আজও অব্যাহত। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের রিয়েলিটি শোয়ে দেখা যায় বাংলার শিল্পীদের জয়জয়কার। তাঁদের সুরেলা কণ্ঠ এবং চমকপ্রদ পরিবেশনা বিচারকদের তো বটেই, বোদ্ধা থেকে সাধারণ শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায়।
এতক্ষণ হল গৌরচন্দ্রিকা। এবার আসা যাক মূল কথায়। এই মুহূর্তে সোনি এন্টারটেইনমেন্ট টেলিভিশন চ্যানেলে চলছে সঙ্গীতের অত্যন্ত জয়প্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ সিজন ১৫ (indian idol)। পেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ পথ। শনি ও রবিবার, ২৯-৩০ মার্চ, রাত ৮টা থেকে সম্প্রচারিত হবে শেষ দুই এপিসোড। সেরা আটে ছিলেন শুভজিৎ চক্রবর্তী, মানসী ঘোষ, মিশমি বসু, চৈতন্য দেবাদে, রাগিণী শিন্ডে, অনিরুদ্ধ সুসওয়ারাম, স্নেহা এবং প্রিয়াংশু দত্ত। শেষ পর্যন্ত সেরা ছয়ে রইলেন শুভজিৎ চক্রবর্তী, মানসী ঘোষ, চৈতন্য দেবাদে, অনিরুদ্ধ সুসওয়ারাম, স্নেহা এবং প্রিয়াংশু দত্ত। অর্থাৎ, ছয়জনের মধ্যে বাংলা থেকে রয়ে গেলেন তিনজন। মানসী ঘোষ, শুভজিৎ চক্রবর্তী এবং প্রিয়াংশু দত্ত। এখন দেখার শেষ হাসি কোনও বাঙালি হাসেন কি না।
ইন্ডিয়ান আইডল মঞ্চ থেকে দর্শক-মনে ঝড় তুলেছেন বাংলার মেয়ে মানসী ঘোষ। তিন বিচারক শ্রেয়া ঘোষাল, বিশাল দাদলানি, বাদশা রীতিমতো মুগ্ধ তাঁর গানে। দর্শকদের একটা অংশ মনে করেন এবার জয়ী হবেন ২৪ বছরের এই বঙ্গ তনয়াই। ইন্ডিয়ান আইডলের আগে তিনি অংশ নিয়েছিলেন সুপার সিঙ্গার সিজন ৩-এ। যদিও ফাইনালে পৌঁছেও জিততে পারেননি। জয়ীর মুকুট ওঠে সুচিস্মিতা চক্রবর্তীর মাথায়। দ্বিতীয় স্থানে থাকেন মানসী। তবে এবার গায়িকার ভক্তদের আশা, জাতীয় মঞ্চে ট্রফি জিতে সেই হারের আফসোস মেটাবেন মানসী। কলকাতার মেয়ে তিনি। থাকেন পাইকপাড়ায়। পড়াশোনা ক্রাইস্টচার্চ গার্লস স্কুলে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন ২০১৮ সালে। এরপর ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে স্নাতক। সুপারসিঙ্গারে থাকাকালীনই কলেজের ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তবে সেই সময়, করোনাকাল হওয়ায়, পরীক্ষা দিতে হয়েছিল অনলাইনে। এমনকী, সেই রিয়েলিটি শো-র ফাইনালের পর, ইংরেজি নিয়ে মাস্টার্স করার ইচ্ছেও প্রকাশ করেছিলেন। ছোটবেলায় নাচ শিখেছেন। পরবর্তীতে, গানকেই আপন করে নেন। ইন্ডিয়ান আইডলের মঞ্চে থাকতে থাকতেই বাংলার এই গুণী মেয়ে প্লেব্যাক করে ফেলেছেন। ললিত পণ্ডিত সুরারোপিত ‘মান্নু কেয়া কারোগে’ ছবিতে থাকছে তাঁর গান। শোনা যাচ্ছে, শানের সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছেন মানসী। তাঁর পাইকপাড়ার বাড়িতে ইন্ডিয়ান আইডল ট্রফি আসে কি না সেটাই এখন দেখার।
আরও পড়ুন-যে নারীদের হাতে তরবারি
খড়গপুরের ‘পানওয়ালা’ শুভজিৎ চক্রবর্তী। বয়স ২২। পানওয়ালা-র গানওয়ালা হয়ে উঠবার সফর শুরু হয়েছিল সুপার সিঙ্গারের মঞ্চে। আঞ্চলিক রিয়ালিটি শো-এর গণ্ডি পেরিয়ে আসেন সর্বভারতীয় মঞ্চে। তাঁর দরদ ভরা কণ্ঠে একের পর এক পরিবেশনা সবাইকে মুগ্ধ করেছে। ফাইনাল অডিশন পর্বেই তিনি নজর কেড়েছিলেন। বিচারকদের খাওয়ান নিজের হাতের পান। তারপর খমক বাজিয়ে গেয়ে শোনান ‘হৃদমাঝারে রাখিব ছেড়ে দেব না’। শুনে মুগ্ধ তিন বিচারক। পরবর্তী সময়ে শুভজিৎ গেয়েছেন নানা ধরনের গান। তাঁর বাবাও একজন সঙ্গীতশিল্পী। তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে সাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে গান শেখান। বাবাকে স্কুটার কিনে দিতে চান শুভজিৎ। একই সঙ্গে আরও অনেক স্বপ্নপূরণ করতে চান। এই মুহূর্তে ইন্ডিয়ান আইডল শিরোপা থেকে তিনি এক কদম দূরে।
ইন্ডিয়ান আইডল সিজন ১৫-এর (indian idol) মঞ্চে এবারের অন্যতম দাবিদার বাংলার প্রিয়াংশু দত্ত। থাকেন কলকাতায়। ২১ বছরের এই বাঙালি গায়ক বিচারকদের পাশাপাশি পেয়েছেন সাধারণ শ্রোতাদের প্রশংসা। যদিও মাঝে অরিজিৎ সিংকে লাগাতার অনুকরণ করার জন্য বকুনি খেতে হয়েছে। তবে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে কারও মনে কোনও প্রশ্ন নেই। এবার তিনি শিরোপা জিতলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
এই তিনজনের পাশাপাশি সেরা পনেরোয় ছিলেন বাংলার বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, ময়ূরী সাহা, রঞ্জিনী সেনগুপ্ত এবং সৃজন পোড়েল। এছাড়াও অসমের গুয়াহাটির বাঙালি কন্যা মিশমি বসুও সেরা পনেরোয় জায়গা পেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, এর আগেও ইন্ডিয়ান আইডল-সহ বিভিন্ন রিয়েলিটি শোয়ে বাঙালি শিল্পীরা পেয়েছেন সাফল্য। কেউ কেউ বিজয়ী হয়েছেন। ইন্ডিয়ান আইডল সিজন ১৫-য় বিভিন্ন সময় অতিথি হিসেবে এসেছেন সুরজ বরজাতিয়া, করণ জোহর, উদিত নারায়ণ প্রমুখ। এঁরাও বাঙালি শিল্পীদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাই মন বলছে, এবার ট্রফি আসতে চলেছে বাংলায়। সেটা খড়গপুরও হতে পারে, আবার কলকাতাও।