অলোক সরকার: মধুর জয়। মুশকিলেরও। কেউ না বুঝুক কেকেআর (KKR) বুঝল! স্পিন চাই বলে গত ক’দিন প্রচুর ঢক্কানিনাদ হল। কিন্তু কেকেআরকে জেতাল এমন এক উইকেট, যাকে রহস্য উইকেট বলতে হবে। বল সিম করল। গায়ে এল। সামান্য ঘুরল। যার সুবিধা নিয়ে বৈভব, হর্ষিত, রাসেল কষে ধাক্কা দিলেন।। এদের কেউ বল ঘোরাতে পারেন বলে শোনা যায়নি। প্রশ্ন উঠতে পরে, নাইটরা কি এরপরও ঘূর্ণি উইকেট, হোম অ্যাডভান্টেজের দাবি তুলবেন?
বরুণও ৩ উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু জয়ের কারিগর তিনি নন, বৈভব। রাতের দিকে আস্কিং রেট ক্রমশ বাড়ছে, বল কমছে। শেষ ৬ ওভারে নব্বইয়ের বেশি রান দরকার ছিল সানরাইজার্সের। হাতে ৪ উইকেট। মনে হতে পারে রাহানে দু’দিক থেকে নারিন-বরুণকে লাগিয়ে খেলা শেষ করে দেবেন। আসলে ভুল। ক্লাব হাউসের দিক থেকে বৈভবকে নিয়ে এলেন। আর তিনি ক্লাসেনকে (৩৩) তুলে নিয়ে সানরাইজার্সকে এমন গাড্ডায় ফেলে দিলেন, সেখান থেকে তারা আর উঠে আসতে পারেনি। শেষপর্যন্ত ১৬.৪ ওভারে ১২০ রান করে সানরাইজার্স হেরে গেল ৮০ রানে। বৈভব ৪ ওভারে ২৯ রানে ৩ উইকেট পেয়েছেন। তিনিই ম্যাচের সেরা হলেন।
নীতিশ যখন রাসেলকে বাইরে ফেলতে গিয়ে ডিপে নারিনের হাতে ধরা পড়লেন, গ্যালারি লাফাতে গিয়েও দাঁড়িয়ে গেল হেনরিখ ক্লাসেনকে দেখে। এই ফর্ম্যাটে দুনিয়া জুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণ। লোকে বলে কুইন্টন ডি’কক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকা বিন্দুমাত্র চাপে পড়েনি ক্লাসেনের জন্য। তাই তিনি যতক্ষণ আছেন, ততক্ষণ নাইটদের জয় নিশ্চিত কে বলল।
সানরাইজার্সের জন্য মহা মুশকিল হল তাদের ব্যাটিং পুরোপুরি টপ অর্ডার নির্ভর। ট্রাভিস হেড, অভিষেক শর্মা, ঈশান কিশান দাঁড়িয়ে গেলে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটিয়ে দেন। যেটা প্রথম ম্যাচে কামিন্সরা ২৮৬ তুলে ফেলায় পরিষ্কার। কিন্তু তারপর টপ অর্ডার যেই ফেল করেছে, সানরাইজার্সও ব্যর্থ হয়েছে। এদিন ৪৪ রানে তাদের ৪ উইকেট চলে গেল সিমারদের দাপটে। হেড ৪, অভিষেক ২, ঈশান ২ ও নীতীশ ১৯ রান করেছেন। ঘটনা এটাই যে এরা সবাই নাইট পেসারদের শিকার।
আরও পড়ুন-ভারতকে জোর বাণিজ্যিক ধাক্কা আমেরিকার, ২৭% পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা ট্রাম্পের
এই উইকেট ভোজবাজি দেখিয়েছে। চেষ্টা হয়েছিল টার্নিং ট্র্যাক বানানোর। তবে ইডেন কিউরেটর উইকেটে হালকা ঘাস আছে বলেছিলেন। তখন অনেকে কথার কথা ধরে নিলেও ঘাসই সানরাইজার্সকে হারিয়েছে। দশম ওভারে নারিন বল করতে এসে মেন্ডিসকে (২৭) যখন আউট করলেন, সেটাই ছিল কেকেআর স্পিনারদের প্রথম উইকেট। পরের ওভারে বরুণ তুলে নেন অনিকেত বর্মাকে (৬)। তাতে এটা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মুম্বই-হার পিছনে ফেলে কেকেআর জয়ে ফিরছে।
মুম্বইয়ের মতো কলকাতাতেও শুরুর ক’টা ওভারে সিমাররা সুবিধা পায়। ওখানে মাঠের ধারে সাগর। এখানে গঙ্গা। উইকেটের নিচে আর্দ্রতা থাকেই। যেটা খেলা গড়ালে হারিয়ে যায়। কামিন্স যে নাইটদের আগে ব্যাট করতে দিলেন, সেটা এই আর্দ্রতা মাথায় রেখে। তাঁর দূরদর্শিতা কাজে লেগে গেল যখন কেকেআর ১৬ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বসল। ডি’কক (১) আরসিবি ম্যাচে রান করার পর আর রান পাচ্ছেন না। তাঁকে কামিন্স তুলে নেওয়ার পর নারিনকে (৭) ফেরালেন শামি।
পাওয়ার প্লে-তে ৫৩/২ তুলে ফেলার পর অবশ্য মনে হচ্ছিল কেকেআর (KKR) ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রাহানে আর রঘুবংশী ম্যাচ ধরে নিয়েছিলেন। পাওয়ার প্লে শেষ হতেই কামিন্স বল তুলে দেন জিশান আনসারির হাতে। এই একটা ওভার খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল বল ঘুরবে কিনা তার একটা আন্দাজ পেতে। টার্ন কিন্তু মেলেনি আনসারির। অথচ, গত ক’দিনে বল ঘোরাতে কত চেষ্টা হয়েছে। নতুন উইকেট পর্যন্ত তড়িঘড়ি রেডি করে ফেলা হল। হোম অ্যাডভান্টেজ নিয়ে এত মরিয়া ছিল হোম টিম।
হোম অ্যাডভান্টেজ ব্যাপারটা আইপিএল ১৮-তে এমন ডালপালা মেলেছে যে, জাহির খানের মতো শান্ত লোক লখনউ কিউরেটরকে পাঞ্জাবের লোক বলে চিহ্নিত করে ফেলেন। রাহানে, ফ্লেমিং কে না হোম অ্যাডভান্টেজের আওয়াজ তুলেছেন। ব্যাপারটা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, প্রাক্তনদের কয়েকজন বলতে বাধ্য হন ফ্র্যাঞ্চাইজি এত ক্ষমতাবান হয়ে গেল নাকি যে নিজেদের ইচ্ছে মতো উইকেট বানাবে! বোর্ড বলে কিছু নেই? গণ্ডি টেনে দেওয়ার সময় এসেছে।
আরসিবি ম্যাচে উপছে পড়েছিল ইডেন। এদিন অর্ধেক আসন খালি। লোক হল ৩৪ হাজার। কেন এই হাল? সিএবি কর্তারা বলছেন টিকিটের এত দাম বলে এটা হল। লোকে সব ম্যাচে এত টাকা দিয়ে খেলা দেখতে আসবে কী করে? মঙ্গলবার বিকেলের ম্যাচ লখনউয়ের সঙ্গে। সেদিন থেকে টিকিটের দাম কিছুটা কমছে। কিন্তু সূচি বদলের পর কাজের দিনে এই ম্যাচ ফেলেছে বোর্ড। সেদিন গ্যালারি ভরে কিনা সেটা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
রাহানে (৩৮) ও রঘুবংশী (৫০) ম্যাচ ধরে নিয়েছিলেন। রঘুবংশী ৩২ বলে হাফ সেঞ্চুরি করলেন। দুজনে মিলে ৭১ রান তুলে ফেলার পর রাহানে আনসারির শিকার। রঘুবংশীকে তুলে নেন মেন্ডিস। কিন্তু কেকেআর ইনিংসের সবথেকে ভাল পার্টনারশিপ হল ভেঙ্কটেশ আইয়ার ও রিঙ্কু সিংয়ের মধ্যে। ২৩.৭৫ কোটির চাপ নিয়ে সমস্যায় ছিলেন ভেঙ্কটেশ। এদিন চাপ কাটিয়ে ২৫ বলে হাফ সেঞ্চুরি। শেষপর্যন্ত ২৯ বলে ৬০ রান। পার্টনারশিপ ৯১। রিঙ্কুও রান পাচ্ছিলেন না। এদিন ১৭ বলে ৩২ নট আউট। রিঙ্কু-ভেঙ্কটেশ এই ব্যাটিং না করলে কেকেআর ২০ ওভারে ২০০/৬ করতে পারত না। পাঁচেও উঠে আসতে পারত না।