বিনোদন

জাতীয় নাট্য উৎসব

শহর এখন শীতের দখলে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় কাঁপছে প্রত্যেকেই। এই সময়েই সংলাপের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে পৌষের নরম বাতাসে। কারণ, কলকাতার গিরিশ মঞ্চ এবং মধুসূদন মঞ্চে চলছে ৮ম জাতীয় নাট্য উৎসব। আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের অন্তর্গত মিনার্ভা নাট্য সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র।

আরও পড়ুন-ধুলাগড়ের কাছে রাসায়নিক বোঝাই লরিতে আগুন, ভস্মীভূত বাস – গাড়ি

৪ জানুয়ারি রবিবার, গিরিশ মঞ্চে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে হয়েছে উদ্বোধন। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা মিনার্ভা নাট্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি ব্রাত্য বসু, মন্ত্রী ডাঃ শশী পাঁজা, বিধায়ক অতীন ঘোষ, নাট্যব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষ, নাট্যব্যক্তিত্ব দেবাশিস মজুমদার, বিভাগের অধিকর্তা কৌস্তুভ তরফদার, সচিব অনুপ গায়েন প্রমুখ। মন্ত্রী ব্রাত্য বসু জানিয়েছেন, এই উৎসবের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৮৩ লক্ষ টাকা। আমাদের সরকার থিয়েটারের পিছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে, দেশের মধ্যে আর কোনও সরকার সেটা করেছে কি না সন্দেহ। এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নাট্যব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষ জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শে মিনার্ভাকে আরও অনেক মানুষের কাছে, জেলায় জেলায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন-প্র্যাকটিসে সবার আগে নেমে পড়লেন বিরাট

৯ দিনে মঞ্চস্থ হচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যের মোট ১৭টি নাটক। মূলত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়েছে নাট্যদলগুলোকে। আবেদনপত্র জমা পড়েছিল ১০১টি। স্ক্রিনিং কমিটি নাটকগুলো বাছাই করেছেন।
উদ্বোধনী নাটক ছিল ব্রাত্য বসু রচিত, অর্পিতা ঘোষ নির্দেশিত মিনার্ভা রেপার্টরি থিয়েটারের ‘মাৎস্যন্যায়’। মঞ্চস্থ হয়েছে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে। আগাগোড়া দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। নাটকটি বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ এবং উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘টাইটাস অ্যান্ড্রনিকাস’ অবলম্বনে লেখা। ঘটানো হয়েছে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন। পুষ্যভূতি বংশের সিংহাসন দখলের লড়াই, বিশেষত হর্ষবর্ধন ও রাজ্যবর্ধনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে কাহিনি আবর্তিত, যা তৎকালীন মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতিকে তুলে ধরেছে। ক্ষমতা, রাজনীতি, প্রেম ও প্রতিশোধের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও রাজপুরুষদের গোপন আন্তঃসম্পর্ক দেখানো হয়েছে। সেইসঙ্গে চিত্রিত হয়েছে একজন বীর সেনানায়কের গভীর দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগ। প্রেক্ষাপট বহু প্রাচীন। তাপ অনুভব করা যায় সমকালেও। চিরকালীন তো সেটাই, যে-সৃষ্টি দুটি পৃথক সময়কালকে সার্থকভাবে একটি সুতোয় গাঁথতে পারে। আলোচ্য নাটকটি সেই গোত্রের। কেন তিনি বর্তমান সময়ে শ্রেষ্ঠ, এই নাটকটির মধ্যে দিয়ে আরও একবার বুঝিয়ে দিয়েছেন নাটককার। পরিচালনাও অনবদ্য। কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রীলা ভট্টাচার্য, শুভজিৎ মল্লিক, সায়ন্তন কুণ্ডু, সুচেতনা পল, গৌরব মুখোপাধ্যায়, সস্মিত চক্রবর্তী, সৈকত ঘোষাল, পূজা পাল, জিতাদিত্য চক্রবর্তী, দেবাঙ্কি সুর, এসকে সামিম হোসেন, সৌম্যশেখর চক্রবর্তী, অনিরুদ্ধ সাঁপুই, পিয়ালী মুখোপাধ্যায়, রানা, সায়ন্তনী চক্রবর্তী, সর্বজিৎ সরকার, সৌম্যদীপ রায়, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, তন্ময় মণ্ডল। আবহে দিশারী চক্রবর্তী। আবহ প্রক্ষেপণে বিশ্বজিৎ বিশ্বাস। কোরিওগ্রাফি সোমা গিরি। আলো পল্লব জানা। পোশাকে অনীক ঘোষ, মাধবী বিশ্বাস, পায়েল সাহু। রূপসজ্জায় মহম্মদ আলি। সহকারী নির্দেশক বিহান মণ্ডল। প্রত্যেকেই নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। সবমিলিয়ে অনবদ্য একটি প্রযোজনা। বারবার দেখার মতো।

আরও পড়ুন-ভিডিও করে সিলেবাস শেষে উদ্যোগী সংসদ

বাকি নাটকগুলোও উচ্চ প্রশংসিত হচ্ছে। দর্শকদের ভাবাচ্ছে। জাগাচ্ছে। প্রতিদিনই দুই প্রেক্ষাগৃহ থাকছে প্রায় পূর্ণ। ৫ জানুয়ারি গিরিশ মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে লিটল থিসপিয়ান ওয়েস্ট বেঙ্গলের হিন্দি নাটক ‘চাক’। নির্দেশনায় উমা ঝুনঝুনওয়ালা। মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে নদিয়ার শান্তিপুর সাংস্কৃতিক প্রযোজিত ‘কারাগার’। নির্দেশনায় কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। ৬ জানুয়ারি, উৎসবের তৃতীয় দিন মঞ্চস্থ হয়েছে মহারাষ্ট্রের পুণের দুটি নাটক। গিরিশ মঞ্চে অভিনীত হয়েছে রাখাদি স্টুডিওর মারাঠি নাটক ‘থাকিশি সমভাদ’। নির্দেশনায় অনুপম বার্ভে। মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে সোশ্যাল মঞ্চ অ্যান্ড পিস প্রোজেক্টস-এর হিন্দি-ইংরেজি দ্বিভাষিক নাটক ‘সামথিং লাইক ট্রুথ’। নির্দেশনায় পর্ণা পিঠি। ৭ জানুয়ারি গিরিশ মঞ্চে অভিনীত হয়েছে অসমীয়া নাটক ‘ওই ইয়া’। প্রযোজনায় শিপাভূমি। নির্দেশনায় পলাশ লোইং। মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে সঞ্জয় কর নির্দেশিত বাংলা নাটক ‘রঙিন রুমাল’। প্রযোজনায় ত্রিপুরা আগরতলার নাট্যভূমি।
৮ জানুয়ারি গিরিশ মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে বাংলা নাটক ‘নিতান্ত ব্যক্তিগত’। প্রযোজনায় কলকাতার কার্টেন কল। নির্দেশনায় তীর্থঙ্কর চক্রবর্তী। মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে কলকাতার হাতিবাগান কাব্যকলা মনন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী প্রযোজিত বাংলা নাটক ‘ভুতো’। নির্দেশনায় সুমিতকুমার রায়। ৯ জানুয়ারি গিরিশ মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে মহারাষ্ট্রের পুণের আসক্ত কলা মঞ্চের মারাঠি নাটক ‘ভায়া সাভারগাঁও খুর্দ’। নির্দেশনায় সুযোগ দেশপান্ডে। মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে মহারাষ্ট্রের শচীন শিন্ডে অ্যাকাডেমি অফ পারফর্মিং আর্টস নাসিকের মারাঠি নাটক ‘কালগিতুরা’। নির্দেশনায় শচীন শিন্ডে।
জাতীয় নাট্য উৎসব চলবে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত। শুরু প্রতিদিন সন্ধে ৬-৩০ মিনিটে। মঞ্চস্থ হবে বিভিন্ন রাজ্যের মোট ৬টি নাটক। এই উৎসবে মেলবন্ধন ঘটছে নানা ভাষা, নানা মতের। সেইসঙ্গে ঘটছে পরস্পরের মধ্যে ভাববিনিময়। সুযোগ থাকছে দেখার। শেখার। জানার। শীতের জড়তা এক ঝটকায় কাটিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। আলোকালো মঞ্চ, নানা রঙের চরিত্র, বিচিত্র সংলাপ রয়েছে আপনারই অপেক্ষায়।

Jago Bangla

Recent Posts

সত্যিই আসন্ন মোদির বিদায়বেলা? বয়স নিয়ে খোঁচা গড়করির

নাগপুর : এবারে কি সত্যিই ঘনিয়ে এল মোদির বিদায়বেলা? দলের অন্দর থেকেই সুস্পষ্ট বার্তা, অনেক…

9 hours ago

জঙ্গিদের সঙ্গে গুলির লড়াই, কিশতওয়ারে শহিদ জওয়ান

শ্রীনগর : সেনাবাহিনীর (Indian Army) সঙ্গে কিশতওয়ারের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল…

9 hours ago

ট্রাম্পের শুল্কতোপের মুখেও অনড় ইউরোপের ঐক্য, পাল্টা পরিকল্পনা

ওয়াশিংটন: ইউরোপের দেশগুলির উপর শুল্কের ভার চাপিয়ে গ্রিনল্যান্ড (Greenland_America) দখল করার কৌশল নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট…

9 hours ago

সাহিত্য অ্যাকাডেমির পাল্টা জাতীয় পুরস্কার ঘোষণা করলেন স্ট্যালিন

নয়াদিল্লি : কেন্দ্রীয় সরকারের সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অভিনব পদক্ষেপ নিলেন তামিলনাড়ুর…

10 hours ago

চতুর্থবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা, বলছে জনতা

সংবাদদাতা, বারাসত : জনসুনামির সাক্ষী থাকল উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সদর বারাসত। সোমবার বারাসতের কাছারি…

10 hours ago

কমিশনের অমানবিকতার বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়ে সরব তৃণমূল, হিয়ারিং হয়রানির প্রতিবাদে মিছিল করে স্মারকলিপি প্রদান

ব্যুরো রিপোর্ট: শুনানির নামে হয়রানির প্রতিবাদে রাজ্যজুড়ে গর্জে উঠেছে তৃণমূল (ECI_TMC)। সোমবার মালদহ, কোচবিহার, রায়গঞ্জে…

10 hours ago