দুধ তো অনেক রকমই রয়েছে কিন্তু সদ্যোজাতর জন্য মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই। নবজাতকের পুষ্টি, বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন সবটাই রয়েছে মায়ের দুধে। তাই জন্মের পর থেকে ছ’মাস পর্যন্ত বিশেষজ্ঞরা মায়ের দুধের ওপরেই জোর দেন। ডায়েরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন— শেষ হবে না তালিকা যেসব রোগের বিরুদ্ধে কৃত্রিম ভ্যাকসিনের মতো কাজ করে মাতৃদুগ্ধ। যে কোনও রোগ প্রতিরোধক টিকার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
আরও পড়ুন-অথ ইতু লক্ষ্মী কথা
মায়ের দুধে থাকা পুষ্টি উপাদান
মায়ের দুধ আসলে প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন এবং কার্বোহাইড্রেটের নিখুঁত সংমিশ্রণ। এই দুধে রয়েছে অ্যান্টিবডি এবং লিউকোসাইট বা জীবন্ত শ্বেত রক্তকণিকাও যা শিশুকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। মায়ের দুধ ছাড়া এই লিউকোসাইট বা জীবন্ত কোষ আর কোনও দুধে মেলে না। মাতৃদুগ্ধে মূলত দু’ধরনের প্রোটিন থাকে : হুই এবং কেসিন। প্রায় ৬০% হুই, আর ৪০% কেসিন। প্রোটিনের এই ভারসাম্য শিশুকে দ্রুত এবং সহজে হজমের ক্ষেত্রে সাহায্য করে। এছাড়া রয়েছে ল্যাকটোফেরিন, লাইসোজাইমের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনও। এই দুধে এমন চর্বিও থাকে যা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অপরিহার্য। গর্ভাবস্থার শেষ ট্রাইমেস্টারে এগুলি মস্তিষ্কে জমা হয় এবং বুকের দুধেও পাওয়া যায়।
এই দুধে রয়েছে ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে থাকে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। মায়ের দুধে প্রধানত যে কার্বোহাইডেট পাওয়া যায় তা হল ল্যাকটোজ। ওই দুধ থেকে আসা মোট ক্যালোরির প্রায় ৪০ শতাংশই এই ল্যাকটোজ।
হলুদ প্রাণ কলোস্ট্রাম
শিশুর জন্মের পরে, মায়ের স্তন থেকে প্রথম ঈষৎ হলুদ বর্ণের যে আঠালো গাঢ় দুধ নিঃসৃত হয়, তাকে ‘কলোস্ট্রাম’ বলে। ‘কলোস্ট্রাম’ শিশুর জন্য অপরিহার্য। কারণ এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, অল্পমাত্রার ফ্যাট ও শুগার। এছাড়া রয়েছে
‘ইমিউনোগ্লোবিউলিন এ’ এক ধরনের অ্যান্টিবডি, ‘ল্যাকটিফেরিন’ একজাতীয় প্রোটিন যা সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং আয়রন শোষণে সাহায্য করে, ‘লিউকোসাইটস’ অর্থাৎ শ্বেত রক্ত কণিকা। এই শ্বেত রক্ত কণিকা থাকার কারণে প্রচুর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। যে অ্যান্টিবডিগুলো শিশুর রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ায় এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। ‘এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর’ একটি প্রোটিন যা কোষের বৃদ্ধি উদ্দীপিত করে। কলোস্ট্রাম খুব গাঢ় এবং পুষ্টিকর তাই স্বল্পমাত্রায় নিঃসৃত হলেও তা শিশুর জন্য বেশ উপকারী। কলোস্ট্রাম ‘সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোমের’ ঝুঁকি রোধ করে।
আরও পড়ুন-বিশেষ কৌশলগত সম্পর্ক মজবুত করতে ডিসেম্বরে ভারতসফরে পুতিন
জন্মেই বাইরের দুধ কেন নয়
শিশু জন্মের পর ভীষণ ক্ষুধার্ত থাকে তাই সে মায়ের দুধ জোরে জোরে টানে একে ভিগোরাস সাকিং বলে যার ফলে, মায়ের মস্তিষ্ক থেকে অক্সিটোসিন হরমোন বেরোয় এবং ‘মিল্ক লেট ডাউন রিফ্লেক্স’-এর মাধ্যমে ব্রেস্টফিডিং শুরু হয়ে যায়। কিন্তু যদি এই সময় বাইরের দুধ দেওয়া হয়, তাহলে শিশু ভিগোরাস সাকিং করতে চাইবে না কারণ সহজেই দুধটা পেয়ে যাবে। আর বাইরের দুধ বা ফর্মুলা মিল্কের স্বাদ যেহেতু বেশি ভাল স্বভাবতই সেটার স্বাদ শিশু একবার পেয়ে গেলে তখন মায়ের দুধ খেতে চাইবে না! তাই শুরুতে প্রসবের পর যে অল্প অল্প পরিমাণে মায়ের স্তন থেকে কলোস্ট্রাম বের হয় সেটাই ধীরে ধীরে পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং পরিণত দুধে পরিবর্তিত হয় পরবর্তীকালে। একটি শিশু যত বেশি ব্রেস্টফিড করবে মায়েরও দুধের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পাবে।
মায়ের দুধ নিরাপদ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এবং আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স-এর মতে শিশুর জন্ম থেকে ছ’মাস পর্যন্ত কেবলমাত্র মায়ের দুধই দেওয়া উচিত, এই ছ-মাসে অন্য কোনও পানীয় যেমন গরুর দুধ, মিছরির জল এমনকী জলও দেওয়ার প্রয়োজন নেই আর একেই বলে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং। তবে সার্বিক ভাবে দু’বছর অবধি অন্যান্য খাবারের (যাকে উইনিং ডায়েট বলা হয়) সঙ্গেই শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো খুবই প্রয়োজন। মায়ের বুকের দুধ সহজপাচ্য এবং যে তাপমাত্রায় বাচ্চাকে দুধ পান করানো দরকার, সেই তাপমাত্রাতেই পাওয়া যায়। এটি নিরাপদ এবং জীবাণুমুক্ত।
মাতৃদুগ্ধ পানে শিশুর রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ে। যেসব শিশু বুকের দুধ খায় তারা অ্যালার্জি, ডায়েরিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, কানে সংক্রমণের মতো সমস্যায় কম পড়ে। সর্দি-কাশির আশঙ্কাও অনেকাংশে কমে যায়। ডায়াবেটিসের সম্ভাবনাও অনেক কম থাকে। ক্যানসারের ঝুঁকিও কম হয়। মায়ের দুধ শিশুর হজমশক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়ক। কারণ এটা সহজপাচ্য। এতে থাকা নানা ধরনের ভিটামিন ও মিনারেলস শিশুর দেহে সহজেই প্রবেশ করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয় তার মানসিকভাবে সুস্থ হয়, এমনকী তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও স্মৃতিশক্তি অন্যদের তুলনায় ভাল হয়। মায়ের দুধ শিশুর ফুসফুসকে শক্তিশালী করে। মাতৃদুগ্ধে শিশুর অযাচিত ওজন বাড়ে না। ছোট থেকেই ওবেসিটি বা মোটা হওয়ার প্রবণতা কম থাকে।
প্রতিদিন কতটা দুধ খাবে শিশু
বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের জন্য ১০০ কিলোক্যালরি শক্তির প্রয়োজন হয়। আর মায়ের প্রতি ১০০ মিলিলিটার দুধে ৭০ কিলোক্যালরি শক্তি মেলে। সেই ভাবে হিসেব করলে দেখা যায় তিন কিলোগ্রাম ওজনের কোনও বাচ্চা যদি প্রতিদিন ৪০০-৫০০ মিলিলিটার দুধ খেতে পারে, তা হলে তার পুষ্টির চাহিদা মেটে। জন্মের পর-পরই বাইরের কোনও জিনিস খাওয়ার মতো অবস্থায় থাকে না নবজাতক কারণ গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি হলেও পূর্ণমাত্রায় তার বিকাশ ঘটে না।
সদ্যোজাত শিশুকে তার চাহিদামতো দিনে ৮-১২ বার ব্রেস্টফিড করানো যায়। জন্মের পর থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে বুকের দুধ খাওয়ানোর পরিমাণ এবং সময়সীমা বাড়তে থাকে।
জন্ম থেকে ৩ মাস বয়স পর্যন্ত সাধারণত প্রতিদিন একটি বাচ্চার ১৫০ মিলি দুধ প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ ১৫০ X বাচ্চার ওজন। ৩ মাসের পর ৬ মাস অবধি একটি বাচ্চার প্রতিদিন ১২০ মিলি দুধ প্রতি কেজি ওজন এর জন্য প্রয়োজন হয় আর ৬ মাস পূর্ণ হয়ে গেলে এই পরিমাণটাই বাচ্চার ওজন X ১০০ মিলিতে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ৬ মাস বয়সের পর বাচ্চার খাদ্যতালিকায় মায়ের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার যোগ করা হয়। যেমন ফল বা সবজির পিউরি, সুজি, ডালের স্যুপ, ফলের রস ইত্যাদি। একটি বাচ্চার ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার পর ৯ থেকে ১২ মাস অবধি বাচ্চার প্রয়োজন হয় ৬০ থেকে ৯০ মিলি দুধ প্রতি কেজি ওজনের নিরিখে দিতে হয়। তবে এটা কমবেশি হতে পারে বাচ্চা সলিড খাবার কতটা খাচ্ছে তার ওপরে ভিত্তি করে। আর এই সারাদিনের দুধের হিসেবটাকেই ৮ বারে ভাগ করে নিলে ভাল হয়। তবে কোনও বাচ্চা যদি সলিড খেতে না পারে সেইভাবে তখন মায়ের বুকের দুধ থেকেই সে পুষ্টি পেয়ে থাকে।
মায়ের দুধ বনাম বিকল্প দুধ
কখনও কখনও কিছু কারণবশত কৃত্রিম ফিডিংয়ের দরকার হতে পারে। যদি মা কর্মরতা হন কিংবা পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ তৈরি হচ্ছে না সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী বাচ্চাকে বটল ফিড বা ফর্মুলা ফিড দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। একটি বাচ্চাকে কৌটোর দুধ বা ফর্মুলা দুধ দেওয়ার জন্য আগে হাইজিন বা শুদ্ধতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে না-হলে শিশুর পেটের সমস্যা হতে পারে, সংক্রমণের ভয় থাকে। অন্যদিকে, মায়ের দুধ যেকোনও অবস্থায় পাওয়া সম্ভব। অন ডিম্যান্ড ফিডিং বা শিশু যখন খেতে চাইছে তখনই তাকে মায়ের দুধ খাওয়ানো সম্ভব। ফর্মুলা ফিডের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা বুঝে খাওয়াতে হয় মায়ের দুধের ক্ষেত্রে সেসব দেখার দরকার নেই। ফর্মুলা দুধ বেশ দামি, অন্যদিকে, মায়ের দুধ বিনামূল্যে পাওয়া যায়, এর গঠন অনেক জটিল। মায়ের দুধ সহজপাচ্য অন্যদিকে ফর্মুলা সহজপাচ্য একেবারেই নয়। এই দুধে অনেক শিশুরই পেটের সমস্যা যেমন ডায়েরিয়া, কনস্টিপেশন ইত্যাদি হতে পারে এমনকী প্রয়োজনের তুলনায় পাতলা বা ঘন করে খাওয়ালে বাচ্চার কলিক পেইন বা হজমের সমস্যাও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফর্মুলা দুধ দিন।
গরুর দুধ
অনেকেই মনে করে খাঁটি গরুর দুধ বাচ্চার জন্য উপকারী কিন্তু এই ধারণা এক্কেবারেই ভুল। একবছরের ছোট বাচ্চাদের গরুর দুধ দেওয়া যায় না কারণ গরুর দুধ সহজপাচ্য নয়। এতে অনেক বেশি পরিমাণে প্রোটিন আর মিনারেল থাকে যা শিশুর কিডনির ক্ষতি করতে পারে, এমনকী গরুর দুধে থাকা প্রোটিন থেকে অনেক সময় শিশুর অ্যালার্জি হতে পারে। এর ফলে পেটব্যথা, ডায়েরিয়া, বমি ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। জন্মের একবছর পর থেকে বাচ্চাদের গরুর দুধ দেওয়া যায় কিন্তু সে দুধ অবশ্যই পাস্তুরাইজড হতে হবে নাহলে শিশুর সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ফুল ফ্যাট দুধই ভাল কারণ ফুল ফ্যাট দুধ মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু কিছু বাচ্চার ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকে সেক্ষেত্রে তাদের এখন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বিকল্প হিসেবে আমন্ড মিল্ক, সয়া মিল্ক খেতে বলেন। ল্যাকটোজ এতে থাকে না কিন্তু প্রোটিনে ভরপুর।
ব্রেস্টমিল্ক স্টোর করতে পারেন
যেসব মা কর্মরত, তাঁরা বিকল্প দুধের ওপর নির্ভর না করে ব্রেস্টমিল্কই স্টোর করুন। সিডিসি বা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানিয়েছে উপযুক্ত পরিচ্ছন্ন পাত্রে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ব্রেস্টমিল্ক ৮ থেকে ৬ ঘণ্টা রাখা যেতে পারে। নর্মাল ফ্রিজারেও (ডিপ ফ্রিজ নয়) রাখা যায় ২৪ ঘণ্টার জন্য, তবে হাইজিন বজায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
মায়ের জন্যও উপকারী ব্রেস্টফিডিং
শিশুকে দুধ খাওয়ালে শুধু শিশুর নয় উপকৃত হন একজন মাও। মায়েদের প্রসব-পরবর্তী সুস্থতা তাড়াতাড়ি হয়, ব্রেস্টফিডিংয়ের সময় অক্সিটোসিনের মতো হরমোন মায়ের মস্তিষ্ক থেকে ক্ষরিত হয় যা ইউটেরাসকে গর্ভধারণের পূর্ববর্তী অর্থাৎ প্রি-প্রেগনেন্সি অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে আর মায়ের সঙ্গে শিশুর স্ট্রং বন্ডিং তৈরি হয়।

