প্রণমামি শিবং শিব কল্পতরু

কখনও তিনি নটরাজ, কখনও মহাকাল আবার কখনও অর্ধনারীশ্বর। তিনি দেবাদিদেব মহাদেব। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ফাল্গুনের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে দেশ জুড়ে পালিত হবে মহাশিবরাত্রি। লিখলেন তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক

Must read

শিব মানেই দেবাদিদেব মহাদেব। তিনি দেবতাদেরও দেবতা। তাঁর পুজো। এর বিশেষ মাহাত্ম্য এবং তাৎপর্য থাকবে এ তো বলাই বাহুল্য। আসুন দেখে নেওয়া যাক শিবরাত্রির মাহাত্ম্য।
নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভাবায় চ
নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ
নমঃ শিবায়ঃ চ শিবতারায় চ
অর্থাৎ, মুক্তি সুখ ও সংসার সুখের দাতাকে লৌকিক ও মোক্ষ সুখের কারককে কল্যাণ রূপ ও ভক্তজনের কল্যাণ রূপ ও কল্যাণ দাতাকে নমস্কার।
ঈশান সংহিতার স্তোত্র অনুযায়ী, ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে জ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে শিব অভির্ভূত হওয়ায় মহাশিবরাত্রি উৎসব পালিত হয়।
ফাল্গুনের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর পবিত্র দিনে মহাসমারোহে দেশের সর্বত্র পালিত হয় মহাশিবরাত্রি উৎসব।
পুরাণ অনুযায়ী—
“ ফাল্গুন কৃষ্ণ চতুর্দশ্যামাদিদেবো মহানিশি
শিবলিঙ্গতয়োদ্ভূতঃ কোটিসূর্যসমপ্রভ।।”
ফাল্গুন কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে চন্দ্র-সূর্যের কাছে থাকে। সেই সময় জীবনরূপী চন্দ্রের শিবরূপী সূর্যের সঙ্গে মিলন ঘটে।
অতএব এই চতুর্দশী তিথিতে শিব পুজো করলে তা মহাপুণ্য ও মনস্কামনা পূরণের দিন বলেই ভক্তদের বিশ্বাস।

আরও পড়ুন-বাংলার প্রাচীন শিবমন্দির

শিবরাত্রি শিবের দিব্য অবতরণের মঙ্গলসূচক তিথি। নিরাকার থেকে সাকার রূপে এদিনই অবতারিত হয়েছিলেন মহাদেব। এই অবতরণের রাত্রি মহাশিবরাত্রি নামে খ্যাত।
কাম, ক্রোধ, মোহ লোভের মতো বিকার থেকে মুক্ত করে পরম সুখ শান্তি ও ঐশ্বর্য প্রদানের মধ্যে এই ব্রত পালনের মাহাত্ম্য লুকিয়ে রয়েছে।
পুরাণ অনুযায়ী, অগ্নি শিবলিঙ্গ হিসেবে প্রকট হয়েছিলেন। এই শিবলিঙ্গের আদি বা অন্ত ছিল না। শিবলিঙ্গের সবার উপরের অংশ খোঁজার জন্য ব্রহ্মা হাঁসের রূপ ধারণ করেন।
অন্যদিকে শিবলিঙ্গের ভিত খোঁজার জন্য বরাহ অবতার নেন বিষ্ণু। কিন্তু ব্রহ্মা-বিষ্ণু দু’জনেই মহেশ্বরের আদি অন্ত খুঁজতে বিফল হন।
শিবতত্ত্ব অনুযায়ী ঋষিরা এক এবং অদ্বিতীয় ঈশ্বরের সৃষ্টির স্থিতি লয়ের কাজকে পৃথকভাবে নির্দেশ করার জন্য তিনটি নাম অনুসরণ করেছিলেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। এই অর্থে মহেশ্বর তথা শিব, সৃষ্টি তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত।
শিব নিজে কালচক্র কিন্তু কালের অধীন নন। কালকে তিনি গ্রাস করে নেন। তিনি সাংসারিক গুণাগুণের ঊর্ধ্বে। ত্রিগুণাতীত। তাঁর জন্ম-মৃত্যু নেই। সবকিছু ধ্বংসের পর তিনি ব্রহ্মস্বরূপ। নিরাকার মহাশক্তি হিসেবে বিন্দুবৎ বিরাজ করেন নব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে।
শিবের সর্বাধিক পরিচিত পৌরাণিক নাম হল শম্ভু, শংকর, শিব। এছাড়াও বেদের বিভিন্ন স্তোত্রে নীলগ্রীব, নীললোহিত বিশেষণগুলো সুচারুরূপে উল্লেখ রয়েছে।
আর কাহিনি অনুযায়ী, মহাশিব রাত্রির দিনে চৌষট্টিটি স্থানে শিবলিঙ্গ প্রকট হয়। তার মধ্যে শুধুমাত্র বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের নাম জানা গিয়েছে। এই কারণেই এই দিন অত্যন্ত শুভ মানা হয়।
আরও একটি প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এই তিথিতেই শিবশক্তি অর্থাৎ শিব-পার্বতীর মিলন হয়েছিল। তাই শিব-পার্বতীর বিয়ের রাত হিসেবে পালিত হয় এই উৎসব।
ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর দিনই বৈরাগ্য ত্যাগ করে গৃহস্থ জীবনে প্রবেশ করেন শিব।
পুরাণে শিবতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই রূপক কাহিনিগুলো ছড়িয়ে পড়েছে।
এখানে শিব শ্মশানে-মশানে ঘোরেন। ভিক্ষে করে খান, ছাইভস্ম গায়ে মাখেন, বাঘছাল পরিধান করেন, গলায় সাপ জড়িয়ে থাকেন, নন্দী ভৃঙ্গি ভূত-প্রেত তাঁর অনুচর ইত্যাদি নানা লৌকিক গল্প রয়েছে।
শিব বৈরাগীর মতো ত্যাগী কিন্তু তাঁর আবার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে ভরপুর সংসার।
শিবের স্ত্রীর নানা নাম। সতী, গৌরী, পার্বতী, গঙ্গা, কালী। পুত্রেরা হলেন ভৈরব, কার্তিক, গণেশ। কন্যারা হলেন মানসকন্যা মনসা, ভৈরবী।
তবে শিব সংসারী হলেও মুক্তির সাধক তিনি।

আরও পড়ুন-ইতিহাসের সামনে সতর্ক মোলিনা

তাঁর জীবনাচরণের মধ্যে দিয়ে লক্ষ্য করা যায় যে, কীভাবে কাম, ক্রোধ, লোভ বা আসক্তি, হিংসা, অহম মোহ, মাৎসর্য ত্যাগ করে উচ্চতর জীবনাদর্শ তৈরি করা যায়।
শিব চরিত্রের অনন্য বহুমুখী প্রকাশ দেখা যায় পুরাণের কাহিনিতে।
তাঁর অসীম দৈবশক্তি। তিনি যোগীর শ্রেষ্ঠ, চেহারা সুঠাম, নীরোগ, ত্রিনয়নে জ্ঞানের আলো। ভোগীর মতো স্থূল নয়।
চতুষ্পদ পশু-প্রাণীদের রক্ষাকর্তা তিনি। তাই তিনি পশুপতি শিব।
তবে লৌকিক শিবের এমন রূপ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যাবতীয় অমঙ্গলকে তিনি বিনাশ করেন। শিল্পকলাতে ও অপরিসীম দক্ষ তিনি।
তিনি নৃত্যশিল্পের অধিপতি। তাই তো তিনি দেবাদিদেব মহাদেব। জনগণের আপনার জন।
শিবের বৈচিত্রময় রূপে জগৎরক্ষায় নানাভাবে নানা সময় আবির্ভূত হয়েছেন এই পৃথিবীতে।
কখনও তিনি সর্বজনীন শিব, কখনও নটরাজ, কখনও মহাকাল, কখনও লিঙ্গাকারে কখনও অর্ধনারীশ্বর হিসাবে।
ধ্যানমন্ত্রে বলা হয়েছে, রজতগিরি সদৃশ্য শুভ্রোজ্জ্বল, মাথায় চন্দ্রকলা।
চাঁদের ষোড়শ কলা, এটি হল এই চন্দ্রকলা।
অন্যায় দমনের জন্য তাঁর হাতে পরশু বা কুঠার।
মৃগ তথা পশুদের বরাভয়দানকারী, প্রসন্ন বদন,পদ্মাসনে অধিষ্ঠিত ব্যাঘ্রচর্মের ওপর।
তাঁর পঞ্চমুখ। পাঁচটি মুখের মধ্যস্থিত মুখটির নাম কল্যাণ সুন্দরম, ডানদিকের শেষ মুখটি হল দক্ষিণেশ্বর। ডানদিকের মাঝেরটি হল ঈশান, বাঁদিকের শেষ হল বামদেব, আরেকটি হল কালাগ্নি।
জগৎ পালনের কঠোরতা বিষণ্ণতা কমলতা চরম ভয়ঙ্করতা এবং মৃদু ভীষণতা তাঁর মুখগুলোতে তাঁর চরিত্রগুণের পরিচয় বহন করে।
তাঁর জটায় গঙ্গাধারা, শস্য-শ্যামলা ঊর্বর ভূমিকে রক্ষায় তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করায়।
সনাতন শাস্ত্রে বিশ্বাস করা হয় যে, বিশ্বজগৎ বারবার সৃষ্টি এবং ধ্বংস হয়।
আটশো চৌষট্টি কোটি বছরে ব্রহ্মার একদিনে কল্প হয়। কল্পের শেষে সব ধ্বংস হয়। তাই প্রতীক স্থাপন করে সৃষ্টিকে মধ্য অংশের সৃষ্টির পর দৃশ্যমান প্রকৃতিকে এবং শীর্ষ ভাগে বিনাশের কর্তা হিসেবে শিবের ভূমিকাকে তুলে ধরা হয়েছে।
মহাকালচক্রে শিব ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করেন। তখন তিনি কালগ্রাসী। নবতর সৃষ্টির জন্য তা রুদ্র রূপ ধারণ করেন।

আরও পড়ুন-জেলাশাসকদের কড়া নির্দেশ দিলেন মুখ্যসচিব

নটরাজ লয় কালে জগতে যে কম্পন প্লাবন অগ্নি বিচ্ছুরণ দেখা যায় তার মূল হল শিবের তাণ্ডবনৃত্য। তারই শিল্পরূপ নৃত্য ও মুদ্রা, এই কারণে তাঁর এই রূপের নাম নটরাজ। পুরাণে সতীর দেহত্যাগে তিনি নৃত্য করেছিলেন বলেও উল্লেখ রয়েছে।
লিঙ্গপুরাণ, কালিকাপুরাণ, নাথ লোকগাথা, তামিল মন্দির গাথায় অর্ধনারীশ্বর রূপের পরিচয় পাওয়া যায়।
এইসব কাহিনিতে নানা ভিন্নতা রয়েছে।
লিঙ্গ পুরাণে সৃষ্টিকারী পদ্মের উপর ধ্যানাসনে উপবিষ্ট ব্রহ্মাকে অর্ধনারী অর্ধনর রূপে দর্শন দিয়েছিলেন।
তখন ব্রহ্মা নিজেকে দু’ভাগ করে নর-নারী প্রকৃতি সৃষ্টি করেন।
দক্ষিণ ভারতের তামিল মন্দিরের গায়ে দেখা যায় ভৃঙ্গি অনুচর শিবকে পার্বতী বিহীন প্রদক্ষিণ করতে চাইলে পার্বতী তাঁকে অভিশাপ দেন তখন শিব সেই রূপ ধারণ করে তার সমাধান করেন।
নাথ লোককথায় বলা হয় কয়েকজন সাধু শিবের দর্শন করতে হলে শিবের অর্ধনর ও অর্ধনারীর রূপ দেখেন এবং পুজো করেন।
কালিকাপুরাণে বলা আছে গঙ্গা সম্পর্কে শিবের অনুরাগের সন্দেহে পার্বতীর অভিমান ভাঙাতে তিনি হরপার্বতী রূপ ধারণ করেন।
শিবরাত্রি ফাল্গুন মাসের চতুর্দশী তিথিতে কেন পালন করা হয় তা নিয়ে কোনও কোনও পুরাণে বলা হয়েছে এই পৃথিবীতে শিব-ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টিতে অংশ নিয়েছিলেন তাই তিনি ‘বিশ্ব বদাং বিশ্ববীজং।’
শিবরাত্রি কেন মহানন্দে এবং মহাসমার পালন করা হয় এই কারণে যে, সতীর দেহত্যাগের পর শিব-পার্বতীর বিবাহের তিথি এই দিনে।
শিব-পার্বতী হলেন মিলন প্রেম ও শক্তির আধার।
মহাশিবরাত্রির উৎসব তাঁদের এই মিলন ও আত্মিক বন্ধনকে উদযাপন করে। শিবরাত্রি আসলে হল শিব ও পার্বতীর মিলন উৎসব। ধ্বংসের দেবতা শিবের সঙ্গে এই রাতে মিলন ঘটে প্রেম, সৌন্দর্য ও উৎপাদন ক্ষমতার দেবী পার্বতীর। দেবী পার্বতীর অন্য নাম হল শক্তি। শিবশক্তির মিলনের উৎসব শিবরাত্রি।
আবার পুরাণে এও বলা হয়েছে, এই তিথিতে তিনি সমুদ্রমন্থনের বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হন। অন্য দেবতার পুজো যেমন দিনের বেলাও হয়, তবে ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে রাতের বেলা কেন শিবের পুজো করা হয়?
কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ভগবান শিব তমোগুণ সম্পন্ন। সুতরাং তমোময়ী রাত্রি তাঁর পছন্দ। রাত্রি সংহারকালকেই প্রতিনিধিত্ব করে। কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে চাঁদ সম্পূর্ণ রূপে ক্ষীণ থাকে, জীবের ভেতরে তামসী প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়।
যেমন তোড়ে জল বা বান আসার আগে বাঁধ দিতে হয় সেই রকম চন্দ্রের ক্ষয় আসার আগে ঐ তামসী প্রবৃত্তি নিবারণের জন্য ভগবানে শঙ্করের আরাধনা শাস্ত্রকারেরা বিধান দিয়েছেন।
সংহারের পর নতুন সৃষ্টি অনিবার্য। আমরা দেখেছি যে প্রকৃতিতে ফাল্গুন মাসে সব পাতা ঝরে গিয়ে ধীরে ধীরে নতুন পাতা গজায়। এটা সৃষ্টির নতুন রূপ।

আরও পড়ুন-ভাই ছুটি

সেই লগ্নেই হয় এই মহাশিবরাত্রি উৎসব।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং সকাল থেকেই শিবমন্দিরগুলোতে ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে। ওম নমঃ শিবায় বা হরহর মহাদেব পুণ্যার্থীদের পবিত্রধ্বনিতে ভোর থেকেই পালিত হয় এই মহা উৎসব।
মন্দিরগুলোতে গোটা রাত ধরে চলে বিশেষ পুজো। কোথাও কোথাও হয় আবার শিবের রুদ্রাভিষেক।
শিবের ব্রতকথা অনুযায়ী, একদিন এক শিকারি বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে শিকার না পেয়ে একটি বেলগাছের ডালে আশ্রয় নেয়। গাছের পাতা ছিঁড়ে নিচে ফেলতে থাকে সে।
গাছের নিচেই সেখানে ছিল একটি শিবলিঙ্গ। বেলপাতা পেয়ে শিব অত্যন্ত খুশি হন এবং তাঁকে আশীর্বাদ করেন।
শ্রাবণ মাস, প্রদোষ ব্রত, সোমবার মাসিক শিবরাত্রি এবং মহাশিবরাত্রি উৎসব ভগবান শিবের উপাসনা এবং আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য বিশেষ দিন বলে মনে করা হয়।
শিবের পুজোয় তাই বেলপাতা অত্যন্ত আবশ্যক। ধুতরো ফুল ও ফল, অপরাজিতা শিবের অত্যন্ত প্রিয়।
কালকূট কথা অনুযায়ী, এই দিন এই দেবতা ও রাক্ষসদের সমুদ্রমন্থনের ফলে ভয়ানক কালকূট বিষ উঠে আসে। সৃষ্টির রক্ষা করতে মহাদেব সেই বিষ নিজের কণ্ঠে ধারণ করেন। বিষে তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে যায়। তাই তাঁর আরেক নাম নীলকণ্ঠ।
চতুর্দশীতে তাই পালিত হয় মহাশিবরাত্রি।
ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় করুণাত্রায় হেতবে
নিবেদিতামি চাত্মানং ত্বং গতিং পরমেশ্বরম।।

Latest article