ফের রাস্তায় রায়বাঘিনী মমতা। আর, তাঁর দু’পাশে এবং পিছনে উদ্দীপ্ত জনতা।
নমস্কার প্রতি-নমস্কার বিনিময় চলছে। সেইসঙ্গে পায়ে পায়ে জনস্রোত এগোচ্ছে।
একে ‘মিছিল’ কিংবা ‘পদযাত্রা’ বললে এর মাত্রাটা টের পাওয়া যায় না। মমতা অনুসারী এই জনতরঙ্গের একটাই বাচনিক প্রকাশ হতে পারে।
সেটা হল, জনস্রোত। জননেত্রীর পায়ে পায়ে তরঙ্গায়িত জনস্রোত কলকাতাকে আরও একবার কল্লোলিনী করে তুলল।
নেত্রী বলছিলেন, দিল্লির বঞ্চনা, লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে, বাংলার ও বাঙালির অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে, ‘রাস্তাই আমাদের রাস্তা।’
আরও পড়ুন-ভিডিও করে সিলেবাস শেষে উদ্যোগী সংসদ
আর, শীতার্ত সূর্য ডোবার লগ্নে, কুয়াশা নেমে আসার অব্যবহিত আগে, শহর কলকাতা বুঝে যাচ্ছিল, এ হল E2 (‘ই’-এর বর্গফল)-এর বিরুদ্ধে M3 (‘ম’-এর ঘনফল’)।
ইলেকশন কমিশন আর ‘ইডি’ অর্থাৎ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের জোড়া হামলা রুখতে মা-মাটি-মানুষের বিস্ফোরণ।
৯ জানুয়ারি, ২০২৬-এর অপরাহ্নের অগ্নিহোত্রী বিবস্বান তার প্রস্থানের পূর্বে জেনে গেল, অগ্নিকন্যার অগ্নিস্পর্শে জনতার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিস্পর্ধার স্বরূপ কেমন হয়।
প্রকৃতিলোকে যখন বেলা নিভু নিভু তখনও কেমন করে প্রাণে প্রাণে আগুন জেগে থাকে কলকাতার রাস্তায়, তাহেরপুরের মাঠে, দিল্লিতে দুঃশাসনের দফতরের সামনে।
কলকাতায় স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাহেরপুরের নেতাজি পার্ক মাঠে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
আর নয়াদিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদরা। ডেরেক ও’ব্রায়েন থেকে শতাব্দী রায়। মহুয়া মৈত্র থেকে প্রতিমা মণ্ডল। নবীন-প্রবীণ সবাই।
হাজরা মোড়ে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বলছিলেন, এদিনের জনজোয়ারে বাংলার পুনরুভ্যুত্থানের ইঙ্গিত সংকেতিত হল। এই হাজরা মোড়েই তো সিপিএম-এর ডান্ডা নেমে এসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। সে প্রসঙ্গ স্মরণের অনুষঙ্গে গোটা দেশ বুঝে নিচ্ছিল, এবারও যে লড়াই দ্যোতিত হল আজকের মিছিল থেকে, সেটাই সেদিনকার মতো অবিনাশী, অপ্রতিরোধ্য, বিজেপির বিরুদ্ধে।
সেদিন যারা বাম ছিল, আজ তাদেরই একটা বড় অংশের মদতে ‘ব’-এর নীচে পুটকি-র ‘.’ অনুষঙ্গে ‘র’ হয়েছে।
শাহ থেকে সেলিম, কাঁথির মেজ খোকা থেকে আলিমুদ্দিনের বুড়ো খোকা, সবাই বলেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইডি-র হাত থেকে নিজের দলের ভোট-কৌশল বিষয়ক ফাইল উদ্ধার করে এনে বিরাট ‘অসাংবিধানিক’ কাজ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আর আজকের কলকাতা-তাহেরপুর-দিল্লি একযোগে বুঝিয়ে দিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সক্রিয় হয়ে ইডি-র ভোট কৌশল-চুরির পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে থাকেন, তবে তিনি বেশ করেছেন।
বাংলা দখলে এই চুরির চেষ্টা প্রতিহত করে তিনি উচিত কাজি করেছেন। কমিশনকে দিয়ে হরিয়ানা থেকে বিহার, মহারাষ্ট্র থেকে রাজস্থান, সব এক-এক করে নিজেদের কব্জায় এনে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল মো-শা-দের, ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা দখলের ছক যে মোদি-শাহ বঙ্গ দখলে প্রয়োগ করতে পারবে না, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ–প্রতিশোধের ব্যারিকেডে যে তাদের ঠোক্কর খেতেই হবে, তা আজকের কলকাতা, তাহেরপুর, দিল্লি, একযোগে বুঝিয়ে দিল।
আরও পড়ুন-‘বাংলার বাড়ি’ ও ‘পথশ্রী’র রাস্তা, দুই প্রকল্পে জনসংযোগে জোর রাজ্যের
মিছিল, থুড়ি জনতার ঢেউ, যত পায়ে পায়ে এগিয়েছে কলকাতার রাজপথে রায়বাঘিনীর সঙ্গে, তত একটা একটা করে প্রতি জিজ্ঞাসায় বৈধতা পেয়েছে ৮ জানুয়ারি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা, জনতার দরবারে।
জননেত্রীর প্রতিবাদী পদচারণায় সাংবিধানিক সংকটের গন্ধ পাচ্ছেন কাঁথির মেজ খোকা থেকে আলিমুদ্দিনের ধেড়ে খোকা।
কিন্তু, আজ এই শহর, এই রাজ্য, জানতে চাইছে, যেদিন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ চেপে দেওয়ার তাগিদে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল, সেদিন সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়নি?
সিবিআইয়ের এক নম্বরকে যখন দু’নম্বর গ্রেফতার করতে গেল, আর মোদিজির দূত হয়ে অজিত দোভাল অলোক ভার্মাকে ফোনে শাসাল, সেদিন সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়নি? আর আস্থানাকে বাঁচানোর জন্য মাঝরাতে নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে যেদিন অলোক ভার্মাকে সিবিআইয়ের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল, সেদিন সাংবিধানিক সংকট হয়নি?
আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের সিইও ছন্দা কোচরের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর জন্য যেদিন সিবিআই আধিকারিককে বদলি করা হল, সেদিন সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়নি?
মহারাষ্ট্রে অজিত পাওয়ার, কাঁথির শুভেন্দু অধিকারী কিংবা অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মারা যখন দল বদলে অপরাধমুক্ত হন, তখন সাংবিধানিক সংকট দেখা যায় না?
নির্বাচন ঘোষণার পর যখন বিহারে ঘুষ দেওয়ার আঙ্গিকে ভোট বৈতরণী পার হওয়ার জন্য মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, আর ভোটে জেতা হয়ে গেলেই সেই ‘জুমলা’ প্রকল্প বন্ধ করে হাতে কাঁচকলা ধরিয়ে দেওয়া হয়, তখন সাংবিধানিক সংকট দেখা যায় না?
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, নির্বাচন-সহ সকল স্বায়ত্তশাসনাধীন সংস্থাগুলোকে নির্লজ্জভাবে মুখে লাগাম পরিয়ে দেওয়া হয়, তখন সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয় না?
সাংবিধানিক সংকট দেখা গেলে কি কলকাতা হাইকোর্টে ইডি-র আবেদন জরুরি ভিত্তিতে শুনতে অস্বীকার করতেন প্রধান বিচারপতি?
ভোট চোররা এখন ডেটা চুরিতে নেমেছে। সেই অবৈধ চৌর্য অভিযানে বাধাদান অসাংবিধানিক, মানতে চাইল না কলকাতা।
মিছিল যখন হাজরা মোড়ে থামল, তখন শহর শান্ত অথচ প্রত্যয়ী ভাঙ্গিতে জানতে চাইল জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দিল দুঃশাসনের রক্তচক্ষুর দিকে, এই যে আজ দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদদের হেনস্থা, টানাহেঁচড়া, শারীরিক নিগ্রহ করল, সেটা সংবিধানসম্মত তো?
শহরে তখন সন্ধে নামছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলছেন, ‘জয় বাংলা’।
আগুন ছড়িয়ে পড়ছে ঠোঁট থেকে ঠোঁটে। বুক থেকে বুকে। প্রতিবাদী আগুনে তখন জেদের উত্তাপ।
বাংলা বুঝতে পারছে, মানুষ, জনতরঙ্গের প্রতিটি জনবিন্দু বলছে, ‘‘মাগো ভাবনা কেন, …আমরা হারব না, তোমার মাটির একটি কোনাও ছাড়ব না…তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।”

