বিজয়া

সম্প্রতি হইচই-তে মুক্তি পেয়েছে পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের ক্রাইম থ্রিলার ‘বিজয়া’। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচারের আশায় এক মায়ের অদম্য লড়াইয়ের গল্প। মায়ের চরিত্রে অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় এককথায় অনবদ্য। ছাপিয়ে গেছেন নিজেকেই। সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি এই ওয়েব সিরিজটি মনে থেকে যাবে দর্শকদের। লিখছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

মা তো মা-ই হয় তাই না। ছেলেমেয়ের হাজার গালাগাল খেয়েও, বিরক্তি সহ্য করেও একটা ছোট্ট ফোন করে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করতে ভোলেন না। এই মা-ই কখনও কারও দিদি হয়ে, কারও মাসি হয়ে, পিসি হয়ে সন্তানসমকে আগলে রাখে। তিনি বড় অভিনেত্রী হন বা সাধারণ মা— তাকেই সবটাই খেয়াল রাখতে হয়। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন দুর্ধর্ষ অভিনেত্রী যিনি একাধারে একজন মা-ও, তিনি অভিনয় করতে গিয়ে প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে ভাঙেন আবার নতুন করে গড়েন। অভিনেত্রী হিসেবে কম বয়সের হ্যালুসিনেশনে ভোগেন না। চরিত্র অনুযায়ী মা, ঠাকুমা— সব কিছুতেই পারফেক্টলি ফিট হয়ে যান। চরিত্ররাই তাঁর দেহে ভর করে প্রাণ পায় ফলে নতুন ওয়েব সিরিজ ‘বিজয়া’তে বিজয়া বসুর মতো একজন মায়ের চরিত্রে অভিনয় করা তাঁর পক্ষে কী এমন কঠিন কাজ ছিল! এই চরিত্রে নিজেকে ছাপিয়ে গেছেন তিনি। সদ্য ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে স্ট্রিমিং শুরু হল পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের ক্রাইম থ্রিলার ‘বিজয়া’র (Bijoya)। সিরিজে এক বিপন্ন, অসহায় ছাপোষা মায়ের চরিত্রে স্বস্তিকার অনবদ্য অভিনয় সাড়া ফেলেছে।

‘বিজয়া’র (Bijoya) গল্প আমাদের ২০২৩-এ ঘটে যাওয়া যাদবপুরে র্যা গিং-কাণ্ডে এক ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনাকে যেন করিয়ে দেয়। এখনও সারেনি সেই দগদগে ঘা। গতবছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে এসেছিল বগুলার স্বপ্নদীপ কুণ্ডু। অনেক স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যায় সবকিছু। র্যা গিং-এর কোপে পড়ে বেঘোরে প্রাণ যায় তাঁর। সেই অভিযুক্তরা এখনও বিচারাধীন। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় আসামিরা সবাই মেধাবী ছাত্র। র্যা গিং এক সামাজিক ব্যাধি। যা বারবার আমাদের ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে যে আমরা এ কোন সমাজে বাস করছি! মেধাবী ছাত্রেরা বাবা-মার স্বপ্নকে পুঁজি করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে এসে এ কোন চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে! ঘৃণ্য কীর্তিকলাপের যে উদাহরণ তাঁরা সময় সময় রাখছে তা ঠিক কোন মানসিকতা থেকে তৈরি হয়। কেন সাধারণ ঘরের পড়ুয়ারা নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনো করতে এসে তাঁদের গোটা জীবনটাই ছারখার হয়ে যায়! এর কোনও উত্তর নেই। র্যা গিং নামের এই সামাজিক বিষফোড়া কবে পুরো নিমূর্ল হবে সেই কথা কারও জানা নেই। তাই এই সমাজের বহু নামী এবং অনামী মানুষ, নামজাদা ব্যক্তিত্ব, কলমচিরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। লেখালেখি হয়েছে, ছবি তৈরি হয়েছে, উদ্দেশ্য একটাই সচেতনতা বাড়ানো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। মানুষের মনে এক প্রতিবাদী বার্তা পৌঁছে দেওয়া। অন্যায় বন্ধের ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এমনই এক প্রচেষ্টা করেছেন পরিচালক সায়ন্তন ঘোষাল।

আরও পড়ুন- আজ জিতলেই সিরিজ ভারতের

‘বিজয়া’র (Bijoya) গল্প নৈহাটির ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে নীলাঞ্জন বসু এবং মা বিজয়া বসুকে নিয়ে। মেধাবী ছেলের ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর মা নিজের সমস্ত সঞ্চয় জড়ো করে ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য। মনকে শক্ত করে তার জীবনের একমাত্র চলার সঙ্গী, নয়নের মণিকে শহরের খ্যাতনামা কলেজে পড়তে পাঠায় বিজয়া। একদিকে বাড়ির উপর স্বার্থান্বেষী মুনাফালোভী কনট্রাক্টরের নজর। অন্যদিকে, ছেলেকে বাইরে পড়তে পাঠানোর দুঃশ্চিন্তা। এর মাঝেই ঘটে যায় অঘটন। কলেজ যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ছেলে নীলাঞ্জন র্যা গিং-এর শিকার হয়। তিনতলা থেকে পড়ে যাওয়ার খবর আসে তার মায়ের কাছে। গুরুতর জখম হয় নীলাঞ্জন। কিন্তু কেন? কীসের ভয়? কোন লজ্জায় ছেলের এই ভয়ঙ্কর পরিণতি! শুরু হয় তদন্ত। রায় হয় বিপক্ষে। বিজয়া জানেন, তাঁর ছেলে আর যাই হোক আত্মহত্যা করবে না। তাহলে কার ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হল নীলকে? উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় এক মায়ের লড়াই। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে থাকা সন্তানের দিকে তাকিয়ে মায়ের করুণ আর্তি। অত্যাচারকে আত্মহত্যার নাম দিয়ে বিষয়টা সহজ করে দেওয়ার চক্রান্ত, সমাজের উঁচু মাথাদের কালো চেহারা সবটাই উঠে আসে একে একে বিজয়ার সামনে। একটা সময় সাধারণ সুইসাইডের কেস থেকে একজন মা কী করে আসল সত্যিটা এবং অপরাধীদের বের করে আনে এবং নীলাঞ্জনেরই বা কী হয় সেটাই দেখা যাবে এই সিরিজে। টানটান প্লট আর চরিত্রায়ণ ভীষণ নিখুঁত। দুর্দান্ত অভিনয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশংসিত এই ওয়েব সিরিজ। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় এর আগেও বহুবার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কিন্তু এবার তিনি নিজেই নিজেকে ছাপিয়ে গেছেন। মায়ের মমতা, সারল্যের সঙ্গে দুর্দমনীয় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং কান্নায় ভেঙে পড়ার বিভিন্ন অভিব্যক্তিকে ভীষণ নৈপুণ্যের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে থাকা ক্ষমতাশালী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির চরিত্রটিকেও যথাযথ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সাহেব চট্টোপাধ্যায়। এই ওয়েব সিরিজের ইউএসপি এর চিত্রনাট্য এবং ঝরঝরে সংলাপ। কোথাও এতটুকু অতিরঞ্জিত মনেই হবে না। চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন রোহিত এবং সৌম্য।

এই ওয়েব সিরিজটিতে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অভিনেত্রী জানান যে, তাঁর অভিনীত চরিত্র বিজয়া নৈহাটির এক সাধারণ গৃহবধূ। চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে আমি গায়ে আঁচল দিয়ে সাদা শাড়ি পরেছি। হাঁটাচলার মধ্যে শহুরে ভাব কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলাম। পরিচালকের এমন এক প্রচেষ্টাকে অভিনন্দন। এই ওয়েব সিরিজটিতে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় এবং সাহেব চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও রয়েছেন বিদীপ্তা চক্রবর্তী, দেবদত্ত রাহা, জিৎ সুন্দর, রৌনক দে ভৌমিক প্রমুখ। সিরিজের ‘মা’ ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় হয়েছে।

Latest article