মনস্তত্ত্বের ভাষায় আগোরাফোবিয়া বা ভয় রোগে আক্রান্ত অপর্ণা। সারাক্ষণ আতঙ্ক কাজ করে। সেই ভয়ের কারণে সে বাড়ি থেকে বেরয় না। সবসময় কী যেন এক দুশ্চিন্তা। প্রতিটা পরিস্থিতিকেই খুব ভয় পায়। তার মধ্যে নতুন মাতৃত্ব ফলে একই সঙ্গে প্রসবোত্তর বিষণ্ণতাতেও ভোগে অপর্ণা। সন্তানকে নিয়ে ভয়। সবসময় ভাবে এই বুঝি অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রতিবেশীদের প্রতি সন্দেহজনক মনোভাব রয়েছে তাঁর। অকারণে বারবার করে হাত ধোয়। নিজের স্বামীকে পর্যন্ত কাছে আসতে দেয় না। কেউ বাড়ির সামনে পটকা ফাটালে সে পুলিশ ডেকে আনে! পাড়ার লোক ওকে পাগলি পাগলি ডাকে। এক তীব্র মানসিক সঙ্কটের শিকার অপর্ণা। কিন্তু প্রথম থেকেই এমনটা ছিল না সে। বাস্তবে খুব মিষ্টি একটা মেয়ে। স্কুলে কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করত। কোনও এক সময় একটা বড় ট্রমা তাকে বদলে দিয়েছে। সেই ট্রমা বা আঘাত তাকে অনেকগুলো দিক থেকে খুব বিশ্রীভাবে বেঁধে ফেলেছে। আজ তাঁর মানসিক সুস্থতা নেই। অস্থিরতা কাজ করে সবসময়। বর্তমানটা খুব অগোছালো হয়ে গেছে। সেই কারণেই সে বাড়ি থেকে কোথাও বেরয় না। এতকিছু জীবনে দেখেছে যে এই পরিস্থিতিতে এসে ভীষণ প্যারানয়েড। এমতাবস্থায় অপর্ণা একদিন একটা খুন দেখে ফেলে, কিন্তু তার পাড়ার লোকজন কেউ এগুলো বিশ্বাস করে না, এমনকী পুলিশও না। তখন সে বোঝে যে এই লড়াইটা তার একার। যে বাড়িতে মার্ডার হয় সেখানে একটি মেয়ে থাকে, যে মেয়েটিকে বাঁচানোর দায়িত্বও এখন তার। অতীতে কি ট্রমা সহ্য করেছিল অপর্ণা? তার এই মানসিক অবস্থা কেন হল? ও সত্যি কোনও মার্ডার দেখেছিল? কী করবে এবার সে? জানতে হলে যেতে হবে পরিচালক মৈনাক ভৌমিকের নতুন ছবি ‘গৃহস্থ’ (Grihostho) দেখতে। সাইকোলজিকাল থ্রিলার ফলে ছবিটা দেখতে বসলে চিন্তার লড়াই চলবে মনে। সারাক্ষণ কী হয়, কী হয় মনে হবে। ইন্টারেস্টিং প্লট, সেই সঙ্গে টান-টান চিত্রনাট্য।

নায়িকা বলতে আমরা যা বুঝি মৈনাক ভৌমিকের ‘গৃহস্থ’র ‘অপর্ণা’ ঠিক তেমনটা নয়। স্বপ্নের রাজকন্যা সে নয়, সে দোষেগুণে ভরা একজন মানুষ। তার পরিবার, প্রতিবেশী সবাই সাধারণ। অনেক জটিল মনস্তত্ত্বের বিন্যাস রয়েছে, অনেক ক’টা ডার্ক লেয়ার রয়েছে অপর্ণা-চরিত্রে যার ফলে চরিত্রটা খুব ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠেছে। আবার এমন চরিত্রে আমরা এর আগে ঋতাভরীকেও দেখিনি। এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রী ঋতাভরী চক্রবর্তী জানালেন, খুব ইন্টারেস্টিং একটা স্ক্রিপ্ট। পড়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। মৈনাকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কাজটা করা কতটা সম্ভব হবে। কারণ অনেকগুলো ডার্ক লেয়ারের কাজ, এমনটা আমরা সচরাচর বাংলা ছবিতে দেখি না। ভীষণ চ্যালেঞ্জিং একটা চরিত্র। শুধু অভিনয় নয় আরও বিভিন্ন রকমের চ্যালেঞ্জ নিয়েছি ছবিটা করতে গিয়ে। এমন একটা কাজ করতে পেরে বেশ ভাল লেগেছে। আমার কেরিয়ারে অন্যতম এক্সপেরিমেন্টাল কাজ এটা। আর মৈনাকের মতো ফিল্মমেকার কমই আছেন। সেটে ও খুবই চিলড একজন ডিরেক্টর। পরিচালক মানে সেলিব্রিটি, এই বিষয়টাই ওঁর মধ্যে নেই। সবাইকে স্পেস দিয়েছে ফলে গোটা প্রোজেক্টটা আমাদের সবার হয়ে উঠেছিল।

শোনা গিয়েছিল এই ছবিটার সঙ্গে ঋতাভরী খুব ইনভলভ শুরু থেকেই। ঋতাভরী নাকি নিজে অনেকটা ক্যামেরাও করেছেন এই ছবিতে। সেই প্রসঙ্গে ছবি তৈরির গোটা অভিজ্ঞতার কথা জানালেন পরিচালক মৈনাক ভৌমিক। তিনি বললেন, ‘মানুষের জীবন নিয়ে ছবি করাটাই আমার অভ্যেস। ফিল্ম শুটিং মানেই যে হায়ারার্কি, পরিচালক সর্বেসর্বা, বাকিরা সবাই একটু খাটো— এই ধারণাটা বদলাতে চেয়েছিলাম। তাই টেকনিশিয়ানদের একটু রিল্যাক্স করতে দিয়ে আমরা সবাই অর্থাৎ পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা মিলে শ্যুটিংয়ের অনেকটা কাজ তোলার চেষ্টা করেছি। ফলে ঋতাভরীও ক্যামেরা করেছে এই ছবিতে, আমি নিজে লাইটম্যানদের সঙ্গে আলো ধরেছি, আরও অনেক কিছু করেছি আমরা। ছবির বাজেট কম ফলে ঠিক যেভাবে একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি তৈরি হয় সেভাবেই ছবিটা আমরা তৈরি করেছি এবং ভীষণ ভাল অভিজ্ঞতা হয়েছে গোটা টিমের।’

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র-ঐতিহ্য মেনেই চলবে বিশ্বভারতী, দায়িত্ব নিয়ে উপাচার্য

কিছুদিন আগে যখন টিজার লঞ্চ হয়েছিল ‘গৃহস্থ’র (Grihostho) তখন থেকেই দর্শকদের আগ্রহ তুঙ্গে ছিল। টিজার অনুযায়ী দর্শক-প্রত্যাশার পূর্তি হয়েছে বলাই যায়। টান টান উত্তেজনায় ভরা গল্প। থ্রিলারের সবরকম মালমশলা রয়েছে। রহস্য, খুন, রক্ত, ভয়, স্মৃতি, অবচেতন গৃহস্থের প্রতিটি দৃশ্য, আপনাকে নিজের মনকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করবে। ছবিতে ঋতাভরী চক্রবর্তীকে অতি-সাধারণ রূপটানহীন একটি সাধারণ লুক দেওয়া হয়েছে। ঋতাভরীকে নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা ‘বহুরূপী’ ছবির পরে অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। এখানেও সেই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করতে পারলেন কি না সেই দায়িত্ব দর্শকদের ওপর থাক। তবে এমন গল্প যা বাংলা ছবির দর্শক আগে দেখেনি হলপ করে বলতে পারি।

ছবির প্রযোজক এস কে মুভিজ, পরিবেশনায় অশোক ধানুকা ও হিমাংশু ধানুকা। ‘গৃহস্থ’র (Grihostho) গল্প লিখেছেন পরিচালক মৈনাক ভৌমিক। চিত্রনাট্য এবং গোটা ছবিটা ডিজাইন করেছেন তিনিই। ছবিতে অনুপম রায়ের কণ্ঠে একটাই গান রয়েছে। মুখ্য ভূমিকায় ঋতাভরী চক্রবর্তী আর সৌরভ দাস ছাড়াও রয়েছেন অনুষা বিশ্বনাথন, আরিয়ান ভৌমিক, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহেব ভট্টাচার্য প্রমুখ। সৌরভ দাস, আরিয়ান, অনুষা বিশ্বনাথন সবাই তাঁদের চরিত্রে যথাযথ। সবার অভিনয়ই বেশ ভাল।

Jago Bangla

Recent Posts

মঙ্গলবার ডায়মন্ড হারবারে সেবাশ্রয়-২ পরিদর্শনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের ছোট ছোট অসুবিধাগুলিকে দূর করে তাদের জীবন সহজ করা। সেবার মধ্যে দিয়ে কঠিন বাধা…

22 minutes ago

সত্যিই আসন্ন মোদির বিদায়বেলা? বয়স নিয়ে খোঁচা গড়করির

নাগপুর : এবারে কি সত্যিই ঘনিয়ে এল মোদির বিদায়বেলা? দলের অন্দর থেকেই সুস্পষ্ট বার্তা, অনেক…

10 hours ago

জঙ্গিদের সঙ্গে গুলির লড়াই, কিশতওয়ারে শহিদ জওয়ান

শ্রীনগর : সেনাবাহিনীর (Indian Army) সঙ্গে কিশতওয়ারের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল…

10 hours ago

ট্রাম্পের শুল্কতোপের মুখেও অনড় ইউরোপের ঐক্য, পাল্টা পরিকল্পনা

ওয়াশিংটন: ইউরোপের দেশগুলির উপর শুল্কের ভার চাপিয়ে গ্রিনল্যান্ড (Greenland_America) দখল করার কৌশল নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট…

10 hours ago

সাহিত্য অ্যাকাডেমির পাল্টা জাতীয় পুরস্কার ঘোষণা করলেন স্ট্যালিন

নয়াদিল্লি : কেন্দ্রীয় সরকারের সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অভিনব পদক্ষেপ নিলেন তামিলনাড়ুর…

10 hours ago

চতুর্থবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা, বলছে জনতা

সংবাদদাতা, বারাসত : জনসুনামির সাক্ষী থাকল উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সদর বারাসত। সোমবার বারাসতের কাছারি…

10 hours ago