সম্পাদকীয়

ইস্ট-মোহন-বেগান আর এসআইআর সমাচার

পাড়ার খোকনদা অনেকদিন আগেই কথাটা বলেছিলেন। ১০০ শতাংশ বিশ্বাস করতে মন চায়নি, কিন্তু এখন বুঝছি, ওটাই আসল কথা।
বিজেপি একটি পুরোদস্তুর বাংলা-বিরোধী দল, বঙ্গ মনন ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের কোনও যোগাযোগ নেই।
তাই, তাই-ই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রবীন্দ্রনাথ সান্যাল হয়ে যাওয়া কিংবা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বঙ্কিমদা বলে সম্বােধন কোনও বিচ্ছিন্ন, মুখ ফসকে অনবধানবশত হয়ে যাওয়া বিষয় নয়।
এসবই হল বাংলা বিরোধিতার, ধারাবাহিক বঙ্গ-বিদ্বেষের লাগাতার বিড়ম্বনা।
বাংলার সঙ্গে কোনও বিষয়ে, ভাষায়, ইতিহাসে কিংবা ভূগোলে ন্যূনতম সংযোগ নেই বলেই কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী বাংলার দুটি ফুটবল ক্লাবের নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে হিমশিম খেলেন।
দিকে দিকে বাগানগুলোকে শ্মশান বানাচ্ছে মোদি সরকার। তাই মোহনবাগান তাঁর উচ্চারণে হল ‘মোহনবেগান’।
‘বেঙ্গল’ শব্দটার প্রতি তাঁর দলের ভয়ানক অ্যালার্জি। সেই সুবাদে ইস্টবেঙ্গল হল ‘ইস্টবেগান’।
বিকৃত ধ্বনি সাযুজ্যে, বাংলার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দলকে জুড়ে দিয়ে, ওই মন্ত্রিমশাই ষড়যন্ত্রী মশাই হিসেবে তৃপ্তি পেতে পারেন, কিন্তু আমরা যা বোঝার তা আরও একবার বুঝে গেলাম।
পাড়ার খোকনদা তো এই উচ্চারণ বিকৃতিতে আরও একটি বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তার জিজ্ঞাসা, কেন এতকিছু থাকতে ‘বেগান’ অনুসর্গটির প্রতি কেন্দ্রীয় বিজেপি-র, কল্যাণ চৌবের নিজের শিবিরের, এত প্রীতি পক্ষপাত?
খোকনদা বলছে, এর পিছনে আছে একটি বাংলা প্রবচন। ‘বেগুন গাছে আঁকশি দিয়ে বেগুন পাড়া।’
উচ্চতার খর্বতার কারণে একেবারে খাটো গাছ থেকে বেগুন পাড়তে হলে আঁকশি ব্যবহার করে অনেকে এবং এজন্য উপহাসাস্পদ হয়। অনুরূপভাবে, ‘সার’কে আঁকশি হিসেবে ব্যবহার করে বঙ্গ ভোটের ফসল পাড়তে গিয়ে বিজেপি টের পাচ্ছে, এত খর্বকায় তাদের সাংগঠনিক সামর্থ্য যে ‘সার’-র আঁকশিও বাংলার খেত থেকে নির্বাচনী সাফল্যের বেগুন ঘরে তুলতে পারবে না। এই অনুভবেই বাংলা-বেঙ্গল সব বেগুন থেকে, বাগান থেকে, ‘বেগান’-এ পরিণত হয়েছে।
মানতে পারেন, নাও পারেন, তবে কথাটা মোটেও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
বঙ্গের ‘বেগান’ খেতে এসআইআর তথা ‘সার’-এর অসারত্ব মূলত তিনটে কারণে ফুটে উঠেছে। খর্বাকৃতি বিজেপির সাংগঠনিক শক্তিকে সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত মগডালে পৌঁছে দেবে কি, ‘স্যার’ এখন নিজেই ধুল্যবলুণ্ঠিত। দেখা যাচ্ছে ‘স্যার’-এর খসড়া তালিকায় যাঁরা সন্দেহভাজন কিংবা বাতিল, তাঁদের অধিকাংশই এসইসব মহিলা ভোটার যাঁদের বিবাহ-পরবর্তী পর্যায়ে পদবিতে বদল (স্বামীর পদবি গ্রহণের কারণে) নির্বাচন কমিশনের অ্যালগোরিদমে মিস ক্লাসিফিকিশনে আক্রান্ত, নির্বাচন কমিশন খেই পাচ্ছে না, তাই বিবাহিতা মহিলারা পদবি বদলের কারণে হিয়ারিং-এ ডাক পাচ্ছেন, হেনস্থার মুখে পড়ছেন।

আরও পড়ুন-ঘুরে আসুন মোরাচি চিঞ্চোলি

৯০ শতাংশের বেশিক্ষেত্রে নামের ব্যাপারে গরমিল এবং তার জন্য বিভ্রান্তি ওই অ্যালগোরিদমজনিত বিভ্রাটের কারণে, বিএলএ-দের যদি শুনানিতে উপস্থিত থাকতে দেওয়া হত, তাহলে হয়ত বিষয়টার মসৃণতর সমাধান সম্ভব হত। কিন্তু, তেমনটা তো ভ্যানিশ কুমার চান না, ফলে, যা হওয়ার তাই হচ্ছে।
এই অ্যালগোদিম-এর মিসক্লাসিফিকেশনের বেশিরভাগ শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।
২০২৫-এর ডিসেম্বরে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৮ জনের নাম বাদ পড়েছে। কোনরকম নোটিশ না দিয়ে কিংবা শুনানির ব্যবস্থা না করেই, ওই নামগুলো কেটে দেওয়া হয়েছে।
‘এরোনেট’ (ERONET) পোর্টালে ‘ডিসপোজড ফর্ম ৭’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়েই বিপুল সংখ্যক ভোটারকে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত এবং ভুয়ো বলে বাদ দেওয়া হয়েছে।
লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির শিকার যে ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটার, তাঁদের তালিকা প্রকাশেও নির্বাচন কমিশনের বেনজির গড়িমসি।
এছাড়া, কোনও সরকারি নথি ছাড়াই শুধুমাত্র হোয়ার্টসঅ্যাপের মাধ্যমে বিএলও-দের সঙ্গে যোগাযোগ করছে ও তাঁদের নির্দেশ দিচ্ছে কমিশন যা কার্যত বেআইনি। কারণ, হোয়াটসঅ্যাপ কোনও আইনসিদ্ধ যোগাযোগ মাধ্যম নয়,আদালতে এর কোনও বৈধতা, মান্যতা নেই। বাংলায় ‘সার’ চালু হওয়ার শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা প্রেরণ ও মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে তার আধিকারিকদের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলি দিয়েছে যা কার্যত আইনবহির্ভূত প্রথাবহির্ভূত কার্যকলাপ। লিখিতভাবে নির্দেশ প্রদানের ব্যবস্থা কার্যত করবে শায়িত কিংবা সেটির চিতাগ্নি প্রজ্বলিত। কার এত তাড়াহুড়ো? কে এসব কাজ করাচ্ছে? কেনই বা করাচ্ছে?
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, বিএলএ-রা এসআইআর-এর সকল পর্যায়ে ভোটারদের সাহায্য করার জন্য হাজির থাকবে। তাহলে কেন তাঁদের শুনানি কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না?
সুপ্রিম কোর্ট বিএলও-দের আদেশ দিয়েছিল সমাধিক্ষেত্র শ্মশানঘাট প্রভৃতি স্থানের ডেথ রেজিস্টার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেই তথ্য খসড়া তালিকা প্রণয়ণে কাজে লাগাবে। সেটা হল কই?
তিনবার যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হলে তবেই খসড়া তালিকায় ভোটার বিষয়ক তথ্য ‘সংগ্রহযোগ্য নয়’ বলে চিহ্নিত হবে, এমনটাই ছিল শীর্ষ আদালতের নির্দেশিকায়। সে নির্দেশ না মেনেই তো একতরফাভাবে, অযৌক্তভাবে নাম কেটে খসড়া তালিকা প্রণয়ন ও প্রকাশ করে দেওয়া হল, কেন?
পূর্ব ঘোষিত ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই এনুমারেশন পিরিয়ডকে ২৪ নভেম্বর অবধি সীমায়িত করা হল কেন?
এ-সব প্রশ্নের উত্তর না দিতে পেরে বিজেপি-র আঁকাশি হয়ে নির্বাচনী বেগুন পাড়ার কমিশন মহা গন্ডগোল পাকিয়েছে। আর সেই রাগে, বিজেপির ক্রীড়ামন্ত্রী বাগান-বেঙ্গল-বেগান-এর প্যাঁচে বাংলার ফুটবলকে ফাঁসিয়েছেন।
কথাটা একেবারে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
গন্ধটা, থুড়ি গন্ডগোলটা, বড়ই সন্দেহজনক।

Jago Bangla

Recent Posts

দিনের কবিতা

‘জাগোবাংলা’য় (Jago Bangla) শুরু হয়েছে নতুন সিরিজ— ‘দিনের কবিতা’ (poem of the day)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের…

7 minutes ago

মঙ্গলবার ডায়মন্ড হারবারে সেবাশ্রয়-২ পরিদর্শনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের ছোট ছোট অসুবিধাগুলিকে দূর করে তাদের জীবন সহজ করা। সেবার মধ্যে দিয়ে কঠিন বাধা…

32 minutes ago

সত্যিই আসন্ন মোদির বিদায়বেলা? বয়স নিয়ে খোঁচা গড়করির

নাগপুর : এবারে কি সত্যিই ঘনিয়ে এল মোদির বিদায়বেলা? দলের অন্দর থেকেই সুস্পষ্ট বার্তা, অনেক…

10 hours ago

জঙ্গিদের সঙ্গে গুলির লড়াই, কিশতওয়ারে শহিদ জওয়ান

শ্রীনগর : সেনাবাহিনীর (Indian Army) সঙ্গে কিশতওয়ারের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল…

10 hours ago

ট্রাম্পের শুল্কতোপের মুখেও অনড় ইউরোপের ঐক্য, পাল্টা পরিকল্পনা

ওয়াশিংটন: ইউরোপের দেশগুলির উপর শুল্কের ভার চাপিয়ে গ্রিনল্যান্ড (Greenland_America) দখল করার কৌশল নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট…

10 hours ago

সাহিত্য অ্যাকাডেমির পাল্টা জাতীয় পুরস্কার ঘোষণা করলেন স্ট্যালিন

নয়াদিল্লি : কেন্দ্রীয় সরকারের সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অভিনব পদক্ষেপ নিলেন তামিলনাড়ুর…

10 hours ago