ভাল থাকুন বছরভর

প্রত্যেক নতুন বছরে ভাল থাকার পাসওয়ার্ড একটাই— নিজেকে ভালবাসা এবং ভাল রাখা। তবেই না প্রিয়জনকেও ভাল রাখতে পারবেন! সুস্থতা মানে শুধুই সুস্থ মন বা শরীর নয় এমন অনেক কিছু যা জুড়লে এবং এমন অনেক কিছু যা বাদ দিলে বছরভর আপনি থাকবেন ফিট অ্যান্ড ফাইন। লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

ভোরেই হোক দিনের শুরু
২০২৬— ভোরে ওঠাই হোক প্রথম রেজোলিউশন (New Year Resolution)। যতই রাত করে বাড়ি ফিরুন না কেন ভোরেই হোক দিনের শুরু। যদিও এর জন্য জরুরি রাতে ঠিক সময় পর্যাপ্ত ঘুম। কিন্তু যদি না পারেন একান্তই চেষ্টা করুন সময়মতো খাওয়ার এবং শোওয়ার তবে ওঠা হবে নিয়মমাফিক। ভোরে ওঠা আপনার মানসিক স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে উন্নত হবে, শরীরে এনার্জির পরিমাণ বাড়বে। সবচেয়ে বড় কাজের সময় বেড়ে যাবে একলাফে অনেকটা। টাইম ম্যানেজমেন্টে আপনি হয়ে উঠবেন পাক্কা। নিজের জন্য নিরিবিলি স্পেসও পাবেন অনেকখানি।

হাইড্রেটেড থাকুন
প্রতিদিন সকালটা এক গ্লাস কুসুম গরম জল দিয়ে শুরু করুন। জল কম খাওয়ার বদ অভ্যেস দূর হোক এখন থেকেই। কারণ পর্যাপ্ত জলের অভাবে শরীরে বাসা বাঁধে নানা অসুখ। প্রতি কাজের শেষে বা অফিসে মিটিং শেষে একগ্লাস করে জল খান। জলের অভাব পূরণ করতে অন্যান্য স্বাস্থ্যকর পানীয়ও খেতে পারেন। যেমন পাতলা ডালের জল, ফলের রস, সবজির রস। এতে শরীর থাকবে হাইড্রেটেড। জল খেতে ভুলে যাচ্ছেন! তাহলে হাতের কাছেই একটা জলের বোতল রাখুন সবসময়। বা এমন কিছু খান যাতে জলীয় ভাগ বেশি (New Year Resolution)। যেমন আপেলে রয়েছে ৮৫% জল। শসায় জলের পরিমাণ হল ৯৬ শতাংশ। এরা শরীরে জলের ঘাটতি মেটাবে।

কম বসুন বেশি নড়াচড়া করুন
সারাদিন শুধু রাঁধা-বাড়া, জলখাবার, দুপুরের রান্না রাতের রান্না করলেই ভেবে নেবেন না খুব পরিশ্রম হচ্ছে। পরিশ্রম হয় হাঁটাচলায়। তাই কম বসা অভ্যেস করুন, বেশি নড়াচড়া করুন। এক কাপ চা নিয়ে একটু ঘুরে আসুন এ-ঘর ও-ঘর। একেবারেই বাড়ির বাইরে পা রাখেন না! তাহলে দুপুরের খাবার পরে ১৫ মিনিট হাঁটা অথবা যদি বসা কাজ হয় প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট করে উঠে একটু করে হাঁটার সংকল্প করুন।

চা বা কফি বেশি নয়
সকালে উঠেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে দুধ চিনি দিয়ে ঘন করে চা কফি খাওয়া যদি অভ্যেস হয় তাহলে নতুন বছরে কমিয়ে ফেলুন। চায়ে যে ক্যাটেচিন, এপিন্যালো গ্যালেট ইত্যাদি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা রোগ প্রতিরোধ করে সেটা গ্রিন টি এবং চিনি ছাড়া কালো চায়েই শুধু থাকে। চায়ের ট্যানিন আয়রন শোষণে বাধা দেয়। অন্যদিকে কফির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ফাইটো কেমিক্যালস, জেনেথিন, থিওব্রোমিনের মতো যৌগ যা একদিকে নানা রোগের প্রকোপ থেকে মুক্তি দেয় ঠিকই বেশি খেলে কফির অতিরিক্ত ক্যাফেইন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, স্ট্রেস এবং অ্যাংজাইটি বাড়ায়।

ব্যালান্সড ডায়েট করুন
মহিলাদের জন্য ব্যালান্সড ডায়েট অর্থাৎ সুষম আহার খুব জরুরি। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেল এবং জল— এই ছ’টি পুষ্টি রাখুন রোজকার খাদ্যতালিকায়। এগুলো শরীরে বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে। পরিবারের সদস্যদের ভালটা খাইয়ে নিজে না খেয়ে বা কম খেয়ে থাকবেন না কারণ আপনি যদি ভাল না থাকেন ভাল রাখবেন কীভাবে! মাঝবয়সি থেকে চল্লিশোর্ধ্ব মেয়েদের শরীরে বাড়ে ক্যালশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক, ডায়াটরি ফাইবার, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের চাহিদা। তাই ভাত-রুটি বেশি খাবেন না পরিবর্তে মরশুমি ফল, তাজা সবজি এবং দুগ্ধজাত খাবার খান। ৫০-৬০ গ্রাম প্রোটিন খেতে পারেন। মাছ, মাংস, ডিমে প্রোটিন আছে, নিরামিষের মধ্যে বিভিন্ন রকম ডাল, দানাশস্য, বাদাম খাওয়া যেতে পারে। এক কাপ ঘন সিদ্ধ ডালে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে। ছোলা, রাজমা, কিনোয়া ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন থাকে।

প্রথম পাতে রাখুন শাক-পাতা
নতুন বছরে রোজকার খাবারে প্রথমেই রাখুন নানাধরনের শাকপাতা। বাড়ির গৃহিণীরাই পারেন সবজির ডাটা, পাতাপুতি, ফেলে দেওয়া অংশ দিয়ে তরিবত করে সবজি বানাতে। সস্তায় যা পুষ্টিগুণে ভরপুর। সারাবছর রোজ পাতে একটা শাক এবং পাঁচমেশালি তরকারি রাখুন। যেসব শাক নিজে থেকে জন্মায় যেমন-কলমি শাক, গিমে শাক, বেতো শাক, থানকুনি, হেলেঞ্চা, কুলেখাড়া— এগুলো মেনুতে থাক। এছাড়া লাউশাক, মূলোশাক, সজনেশাক, পালংশাক, নটেশাক, পটলপাতা, গাঁদালপাতা এগুলো আপনাকে স্বাস্থ্যকর রাখতে একাই একশো।

আরও পড়ুন- নতুন বছরে সন্তানকে দিন নতুন পথের দিশা

নুন এবং চিনি খাওয়া কমিয়ে দিন
আজ থেকে প্রতিদিন আপনার এবং পরিবারের সবার জন্য নুন খাবার পরিমাণটা ৫ গ্রাম কমিয়ে আনুন, যা প্রায় এক চা চামচের সমান। রান্না করার সময় নুন, সয়া সস, ফিশ সস এবং অন্যান্য উচ্চমাত্রার সোডিয়াম রয়েছে এমন মশলার পরিমাণ কমিয়ে ফেলুন। খাবারের টেবিল থেকে নুন বাদ দিন। অন্যদিকে, অতিরিক্ত পরিমাণে চিনিও বাদ দিন এতে দাঁতের ক্ষয় তো হবেই ওজনটাও বাড়বে সেই সঙ্গে দেখা দিতে পারে দুরারোগ্য ব্যাধিও।

ক্যালশিয়াম নিন পর্যাপ্ত
মেয়েদের শরীরে ক্যালশিয়াম খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান। বয়স কি ৪০ পেরিয়েছে? তাহলে ক্যালশিয়ামের জোগান বাড়ান। তা না হলেই ক্রনিক রোগ জাঁকিয়ে বসবে। শরীরের কলকবজা কমজোর হয়ে পড়বে, সেইসঙ্গে রোগ প্রতিরোধ শক্তিও কমে যাবে, হবে হাড়ক্ষয়। রোজ ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম জরুরি। শাক-সবজি, ফল এবং দুধ থেকেই পাবেন আপনার শরীরের জন্য পর্যাপ্ত ক্যালশিয়াম।

ঋতুবন্ধেও ভাল থাকুন
বছর, আসবে যাবে জীবনের সহজ স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলোও থাকবে তাই যে কোনও ভাল পরিবর্তনকে স্বাগত জানান। যেমন ঋতুবন্ধ। এর ফলে মেয়েদের শরীরে ইস্ট্রোজেন ক্ষরণ কমে যায়। বয়সের এক বড় ধাপ যেখানে এসে মেজাজ, মুড স্যুইং, শরীরে ব্যথাগুলো এগুলো বাড়ে। চুল উঠতে থাকে। ত্বক বুড়িয়ে যেতে শুরু করে। শরীরের বয়স যেমনই হোক মনে বয়স বাড়তে দেবেন না। কারণ পরিবারের দায়-দায়িত্ব আপনারই। ক্যালশিয়ামযুক্ত খাবার (New Year Resolution) তো বাড়াবেনই সেই সঙ্গে ভিটামিন ডি ও ম্যাগনেশিয়ামও ডায়েটে রাখুন। সূর্যের আলো বেশি করে গায়ে লাগান। ঋতুবন্ধের পরে পেশিতে টান ধরা, ক্লান্তি, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা বেশি হয় মহিলাদের। তাই পেশি ও স্নায়ুর জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি ম্যাগনেশিয়াম। ম্যাগনেশিয়ামযুক্ত খাবার খান।

ডিজিটাল ডিটক্স করুন
যতই ফোনটাই আপনার অফিস হোক বা আপনার কাজের জগৎটা ডিজিটালই স্মার্ট (New Year Resolution) হোক না কেন এখন থেকে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার, সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যন্য, ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকা অভ্যেস করুন। স্ক্রিন টাইম কমিয়ে ফেলুন নিজের এবং বাড়ির অন্যদের। মনকে শান্ত রাখুন ওই সময়। অন্য কোনও কাজ করতে পারেন এতে মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে। এই সময়টা গান শুনতে পারেন, বই পড়তে পারেন বা হেঁটেও আসতে পারেন।

একটানা হাঁটুন না থেমে
যখন হাঁটবেন না-থেমে একটানা হাঁটুন। বাচ্চাকে হেঁটে স্কুলে দিতে যাওয়া বা বাজার-দোকান করতে গিয়ে যে হাঁটা তাতে উপকার নেই। হাঁটতে হবে একটুও না-থেমে একটানা আধঘণ্টা বা তার বেশি। সেটা রাস্তায় হতে পারে বা পার্কে, না পারলে বাড়ির ছাদে বা বড় ড্রয়িং রুমেই। সারাদিনে একবার হাঁটা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, ওজন নিয়ন্ত্রণ করবে, হাড় ও পেশি শক্তিশালী করবে, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাবে, রক্তচাপ ও খারাপ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখবে। আপনি সুস্থ মানেই পরিবার সুস্থ।

ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ দশমিনিট
বড়সড় ব্যায়ামের দরকার নেই ফ্রি-হ্যান্ডই যথেষ্ট (New Year Resolution) তবে যেটাই করুন নিজের বয়স বুঝে। একদম সময় না থাকলে দশ-পনেরো মিনিট যথেষ্ট। স্কোয়াট, পুশ-আপ, সিট-আপ, লেগ রেইস, স্পট জগিং, স্ট্রেচিং, স্কিপিং— এই ধরনের ব্যায়াম খুব হালকা অথচ কার্যকর। নিয়মিত করলে শরীর-মন দুই-ই ঝরঝরে এবং পজিটিভ থাকবে।

হাত বাড়ালেই মন ভাল
জার্নালিং করুন রোজ। রাতে শোবার আগে সারাদিনের সবটা লিখুন পজিটিভ নোটে। আর শেষে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলবেন না। সোশ্যাল মিডিয়ার পোকাটা দূরে সরিয়ে স-শরীরে সামাজিক যোগাযোগ গড়ে তুলুন। আত্মীয়, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করুন। প্রকৃতির মধ্যে সময় ব্যয় করুন দিনের মধ্যে বেশ খানিকটা সময়। বাড়িতে গাছ থাকলে পরিচর্যা করুন। আপনার মূলাধার চক্র সক্রিয় হবে। যা আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে একলাফে অনেকটা। শুধু শারীরিক কসরত নয় আরও বেশি জরুরি মানসিক প্রশান্তি তাই সারাদিনে একটা নির্দিষ্ট সময় বেছে নিন ধ্যান বা মেডিটেশন করার জন্য। মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাবে, স্ট্রেস, অ্যাংজাইটি কাটবে। ছোটখাটো সমাজসেবার কাজে নিজেকে নিযুক্ত করতে পারেন।

নিজের সঙ্গে ভাল থাকুন
কারও কাছে আপনি নগণ্য আবার কারও কাছে জঘন্য। এই জগতের সকলেই জাজমেন্টাল। কেউ ঠিক বুঝবে না ধরেই নিন তাই নিজের মতো ভাল থাকতে শিখুন নতুন বছরে। নিজেকে যত বেশি ভাল রাখবেন অন্যের সুবিচার বা অবিচার আপনার গায় এসে বিঁধবে না। নিজের সঙ্গে কথা বলেও অনেক সমস্যার সমাধান বেরয়। আমরাই আমাদের বিচারক। মন কখনও ভুল বলে না তাই মনের কথাকেই গুরুত্ব দিন।

না বলতে শিখুন
নতুন বছরে আরও ভাল থাকতে হলে না বলতে শিখুন। আমরা স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ বলে দিই। ‘না’ বলা সহজ না হলেও ‘না’ বলা শেখাটা জরুরি তা সে পরিবারে হোক বা বন্ধুদের সামনে বা অফিসে। কোথায় থামতে হবে, তা জানা জরুরি। উপরোধে ঢেঁকি গিলবেন না এতে আপনারই অস্বস্তি, অ্যাংজাইটি বাড়বে। যেটা আপনি করতে সমর্থ নন সেটায় হ্যাঁ বলার কোনও মানে নেই। সরাসরি না বলতে পারলে ঘুরিয়ে না বলতেই পারেন।

নতুন সুযোগ কাজে লাগান
প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই নতুন সুযোগ আসে। নতুন বছরের ঝাঁপিতে থাকে অনেক কিছু। আপনার জীবনে আসা নতুন সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। নিউ স্টার্ট আপের জন্য সময় বা বয়সের দরকার হয় না। দরকার ইচ্ছাশক্তির। তাই কিছু করে দেখানোর মানসিকতাকে সবসময় মনের মধ্যে লালন করুন।

Latest article