সুনীতার প্রত্যাবর্তন, সঙ্গে কিছু প্রশ্ন

যে আত্মবিশ্বাস সুনীতা উইলিয়ামসদের প্রত্যাবর্তন দিল, তাতে ভর করেই এ-বার দৌড়নোর পালা। কিন্তু মোদিরা পারবেন তো? জানতে চাইছেন আকসা আসিফ

Must read

সুনীতাদের (Sunita Williams) পৃথিবীতে ফেরাবেন। নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষমতায় এসে তিনি তা রক্ষাও করেছেন। হোয়াইট হাউসের তরফে লেখা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট কথা দিয়েছিলেন, তা রেখেছেন। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাঁদের ফিরিয়ে আনতে পারেননি। ট্রাম্প এলন মাস্ককে নভশ্চরদের ফিরিয়ে আনতে আর্জি জানিয়েছিলেন। সুনীতারা ফিরেছেন। তাই এত কথা।
সুনীতাদের (Sunita Williams) মতো রাজনীতিকরাও এই ফিরে আসা নিয়ে উচ্ছ্বসিত। স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্যাপসুল অবতরণের একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই দেখা যাচ্ছে, ড্রাগন যানের পাশে একদল ডলফিন লাফালাফি করছে। দেখে মনে হচ্ছে সুনীতাদের মতোই তারাও উচ্ছ্বসিত। নভশ্চরদের ‘স্বাগত’ জানাতেই ভিড় করেছে ডলফিনের ঝাঁক।
সুনীতা উইলিয়ামসের (Sunita Williams) নিরাপদে প্রত্যাবর্তন অসাধারণ সাফল্য। সন্দেহ নেই। তাঁর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগাতে চায় ইসরোও। ইসরো চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন ইতিমধ্যেই সে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সুনীতা উইলিয়ামসের প্রণোচ্ছ্বলতা ও তাঁর দৃঢ়সংকল্প গোটা পৃথিবীর মহাকাশ অনুরাগীদের উৎসাহ জোহাবে। নাসা, স্পেসএক্স ও আমেরিকা মহাকাশ গবেষণায় কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সুনীতা উইলিয়ামসের নিরাপদে প্রত্যাবর্তনই তার প্রমাণ।
এরই মধ্যে সুনীতাদের মহাকাশ থেকে ফেরাতে কত টাকা খরচ হয়েছে, তা প্রকাশ্যে এসেছে। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সংস্থা স্পেসএক্স-এর ফ্যালকন ৯ রকেট মহাকাশযান ড্রাগন ক্যাপসুলকে পৌঁছে দিয়েছিল নির্দিষ্ট কক্ষপথে। ২০২৪ সালে কেবল এই রকেট উৎক্ষেপণের খরচ ছিল ৬৯ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৫৯৫ কোটি টাকা। আর সুনীতারা যে যানে সওয়ার হয়ে পৃথিবীতে নেমেছেন, সেই ড্রাগন ক্যাপসুলের খরচ ধরলে মোট খরচের পরিমাণ হয় প্রায় ১৪০০ কোটি মার্কিন ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর আগামী অর্থবর্ষে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংক্রান্ত দফতরের বার্ষিক বাজেট ১২,৪১৬ কোটি টাকা। সোজা কথায়, যে বিষয়টাকে নিয়ে আমরা সবাই নাচানাচি করছি, সেই দুই নভশ্চরকে ফেরানোর খরচ ইসরোর বাজেটের প্রায় সমান। সুতরাং প্রশ্ন, মোদি জমানায় মহাকাশে মানুষের সাফল্য নিয়ে এত নাচানাচি কি সাজে?
আমাদের বরং মেতে থাকা উচিত কুম্ভের পুণ্য পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে। লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তো বলেইছেন, ‘প্রয়াগরাজে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘মহাকুম্ভ’ ভারতের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ, গান্ধীজির ডান্ডি অভিযান (১৯৩০), ভগৎ সিংয়ের আত্মবলিদান (১৯৩১) এবং নেতাজির ‘দিল্লি চলো’র (১৯৪৩) মতোই একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। শিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের একটি ভাষণই হয়ে উঠেছে ভারতীয় অধ্যাত্ম চেতনার বিশ্বজয়ের মুহূর্ত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, এসবের সঙ্গেই একাসনে বসার মতো এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হল এবারে প্রয়াগরাজের পূর্ণকুম্ভ।’

আরও পড়ুন-পানিহাটি পুরসভার নতুন চেয়ারম্যান সোমনাথ দে

প্রয়াগ, হরিদ্বার, নাসিক ও উজ্জয়িনীতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কুম্ভ হয়। প্রতি ১২ বছর অন্তর একবার হয় ‘পূর্ণকুম্ভ’। তবু প্রয়াগের কুম্ভমেলা ২০২৫ শুরুর আগে থেকেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল হাজারো গাওনা বাজনা। তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে নামকরণ। লোকে যেটাকে ‘পূর্ণকুম্ভ’ বলে জানে, তার নাম দেওয়া হল ‘মহাকুম্ভ’। অন্যবার যে বিশেষ স্নানকে ‘শাহিস্নান’ বলা হয়, তা এবার ‘অমৃতস্নান’। গেরুয়া মহল থেকে দাবি করা হল— পুণ্যার্থীর সমাগমে এবং বাণিজ্যে সর্বকালীন রেকর্ড গড়বে ‘মহাকুম্ভ’! দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের দামামা তখন বেজে গিয়েছে। এবছরের শেষদিকে ভোট বিহারে। ২০২৬-এ নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু, কেরলের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে। তাই রাজনৈতিক বাণিজ্য-ভাবনাতেও মহাকুম্ভের স্থান এবার বিরাট। দেশের রাজধানীর বুকে দীর্ঘদিন যাবৎ দণ্ড ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন ‘প্রান্তিক দল’ আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এই হিসেব এবার উল্টে দেওয়ার পণ নিয়ে গেরুয়া শিবির যত কৌশল নিয়েছিল তারই একটি ছিল ‘মহাকুম্ভ’।
ত্রিবেণীসঙ্গমে অসংখ্য পুণ্যার্থীর সমাগম হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ কোনও নতুন প্রবণতা নয়, স্মরণাতীতকালের ঐতিহ্য। তবু এবারের কুম্ভমেলাকে এক নবরূপ দিতে মরিয়া ছিল মোদি-বাহিনী। তার উদ্দেশ্য পুরোটাই রাজনৈতিক। মোদি এতদিন নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ প্রজেক্ট করেছেন। সেই ‘ভারতেশ্বর’ যদি এবারের কুম্ভে ‘অলৌকিক’ না হয়ে উঠতে পারেন তবে তো গেরুয়া শিবিরের যাবতীয় কসরতের ষোলো আনাই মাটি! তাই মেলা শুরুর আগে থেকেই আরম্ভ হয়েছিল ‘সাফল্য’ তুলে ধরার ঢক্কানিনাদ। পুরো বিষয়টা কিন্তু নিতান্তই প্রচারসর্বস্ব। কোটি কোটি মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণের, সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে সাঙ্গ করার কোনও বার্তা ছিল না কোথাও।
প্রধানমনন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী-সহ হাতেগোনা কয়েকজন ভিভিআইপিকে কেন্দ্র করে নানাবিধ আদিখ্যেতাও সামনে আসে। আর এসবের নিচেই চাপা পড়ে যায় সাধারণ ভক্তদের নিরাপত্তা। সরকারি প্রশাসনের অদূরদর্শিতা, ব্যর্থতা কী মারাত্মক হতে পারে, সেটাই দেখিয়ে দিয়েছিল ত্রিবেণীসঙ্গম আর নিউ দিল্লি স্টেশনে মৃত্যুর মিছিল, অগণিত মানুষের হাহাকার, আর খবর চেপে দেওয়ার দুর্মর চেষ্টা। এ-সবের জন্যই ‘মহাকুম্ভ’ ‘মহাবিপর্যয়’ হয়ে ওঠে।
আর মোদি বাহিনী? মহাকুম্ভের শ্রেষ্ঠত্ব শতমুখে প্রচারের আগে প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল, মহাবিপর্যয়ের দায় মেনে নিয়ে দেশবাসী, পুণ্যার্থীদের কাছে দুঃখপ্রকাশ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিন্তু তিনি সে-পথে না হেঁটে মহাবিপর্যয়ের দিকগুলি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলেন। ঠিক এভাবেই বছরের পর বছর দেশবাসীর দুর্দশার দিকগুলি তিনি সযত্নে উপেক্ষা করেন। অমানবিকতা আর কাকে বলে!
আজ এরকম অবস্থা যে দেশের, ভাবলে অবাক হতে হয় যে, সেই দেশের ইসরো-র মহাকাশ অভিযানের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিল কেরলের সমুদ্রতীরের একটি প্রাচীন গির্জায়, মহাকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর কয়েক জন প্রতিভাধর বিজ্ঞানীর হাত ধরে। ড. বিক্রম আম্বালাল সারাভাই। ভারতে মহাকাশ গবেষণার পথিকৃৎ। ভারতের মহাকাশ গবেষণায় জোর দেওয়া নিয়ে তিনিই প্রথম সরব হন। তাঁকে সমর্থন করেন বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গির ভাবা।
মোদির ভারত ঐতিহ্যকে সম্মান করে। সেই সম্মান করতে গিয়ে কোথাও যেন অতীতের সাফল্যকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় তারা। তাই মহাকাশ অভিযানের চেয়ে এদেশে বেশি মাতামাতি কুম্ভমেলার ভিড় নিয়ে।
অনেকেই বলতে পারেন যে, ভারতের আর্থিক অবস্থা আমেরিকা, রাশিয়া, চিনের মতো শক্তিশালী নয়। মহাকাশ গবেষণায় বরাদ্দ তুলনায় কম। কিন্তু কম বরাদ্দ নিয়ে তো বড় প্রকল্পে নামা যাবে না। বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন করে মহাকাশ প্রযুক্তির বাজারে নামতে হবে। তাতে ভারতের নিজের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যেমন তৈরি হবে, তেমনই অন্য দেশকে যন্ত্র বিক্রি করে আয়ও বাড়ানো যাবে। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রও প্রস্তুত হবে। সেই পদক্ষেপ কিন্তু গবেষণার কাজেই আসবে।
সুনীতা উইলিয়ামসরা পৃথিবীতে নেমে এসেছেন। এই সাফল্য যে আত্মবিশ্বাস এনে দিল, তাতে ভর করেই এ বার দৌড়নোর পালা।
মোদিজিরা ভারতকে সেই দৌড়ের রাস্তায় নিয়ে যেতে পারবেন তো!

Latest article