শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দকে উপেক্ষা করে ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর বাংলা তথা ভারতের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে নবজাগরণের ইতিহাস চর্চা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে আরও একটি নাম স্বাভাবিকভাবে চলে আসে— ভগিনী নিবেদিতা। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতা সম্পর্কে যতটা চর্চা হয়েছে, তার তুলনায় শ্রীমা সারদাদেবী সম্পর্কে আমরা বেশি কিছু জানি না। মা অনেক বেশি অধরা, অজানা হয়ে আছেন। তাঁকে চেনা, জানা ও তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে আমাদের, বিশেষ করে ঐতিহাসিকদের, অজ্ঞানতাজনিত উপেক্ষা সীমাহীন বললে ভুল বা হবে না।
আরও পড়ুন-বিদেশি পর্যটকেরা এখন বাংলামুখী, কেরল-গোয়ার মিলিত সংখ্যার দ্বিগুণ উপস্থিতি
মায়ের জীবনীগ্রন্থসমূহ পাঠ করলে মনে হয় তাঁর জীবনখানি চলেছিল দুই সমান্তরাল লাইনের উপর দিয়ে। ভগবতী ও মানবী এই দুই পাশাপাশি লাইনের উপর দিয়ে চালিত তাঁর জীবনখানি বিচিত্র সুন্দর। লৌকিক মাপকাঠিতে তিনি একজন সাধারণ ভারতীয় নারী। স্বরূপত তিনি শক্তিস্বরূপিণী জগন্মাতার আংশিক প্রকাশ। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর এক গুরুভাইকে লিখেছিলেন— মা-ঠাকরুণ কী বস্তু বুঝতে পারনি, এখনও কেউ পারেনি, ক্রমে পারবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী আক্ষরিকভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে। মায়ের অসাধারণ জীবনের মহিমা ক্রমেই প্রকাশিত হচ্ছে। মায়ের জীবনচর্যা ও বাণী বিশ্ববাসীকে আকর্ষণ করছে। প্রায় তিন দশক আগে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের একটি সভায় স্বামী ভূতেশানন্দ বলেছিলেন, শ্রীমা ক্রমশ প্রকাশ্য। রামকৃষ্ণ সহধর্মিনী সারদাকে দেখতেন মা আনন্দময়ী রূপে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, রামকৃষ্ণ এবং মা অভিন্ন, যেমন ব্রহ্ম ও শক্তি এক ও অভিন্ন।
আরও পড়ুন-গিরিরাজকে পালটা তৃণমূলের
মা সমস্ত গোঁড়ামি, শুচি-অশুচির ঊর্ধ্বে ছিলেন। বিবেকানন্দের আহ্বানে মার্গারেট (পরবর্তীকালে ভগিনী নিবেদিতা) ভারতবর্ষে এসেছিলেন ভারতীয় নারীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ভারতবর্ষের রূপরেখা দেখবার পর মার্গারেটকে জানতে হবে ভারতের নারী সম্পর্কে। পাশ্চাত্য নারী মার্গারেট যাতে ভারতের নারী-আদর্শের মধ্যে নবজন্ম গ্রহণ করতে পারেন, সেইজন্য স্বামীজি তাঁকে এনে সমর্পণ করলেন ওই আদর্শের পরাকাষ্ঠা জননী সারদাদেবীর পদতলে। নিবেদিতার সঙ্গে সারদাদেবীর প্রথম সাক্ষাৎ ১৭ মার্চ, ১৮৯৮তে। যে দিনটি সম্বন্ধে নিবেদিতা তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন ‘Day of days’। স্বামীজির আশঙ্কা ছিল, মা এক বিদেশিনীকে কীভাবে গ্রহণ করবেন। তাঁর সব আশঙ্কা দূর হল। সারদাদেবী নিবেদিতাকে সাদরে ও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করলেন, যেন কত যুগের ঘনিষ্ঠতা। মা-র আন্তরিকতায় নিবেদিতা অভিভূত হলেন। মা ইংরেজি ভাষা জানতেন না। কিন্তু তার জন্য ভাবের আদানপ্রদানে কোনও সমস্যা হয়নি। মা নিবেদিতাকে ‘খুকি’ ডাকতেন। নিবেদিতার সঙ্গে সারদাদেবীর শেষ সাক্ষাৎ ১২ মে, ১৯১১। মধ্যে ১২ বছরের কিছু বেশি ব্যবধান। এই সময়ের মধ্যে উভয়ের অজস্রবার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। ভারতবাসের একেবারে শুরুর দিকে নিবেদিতা কিছুদিন শ্রীমায়ের সঙ্গে বসবাস করেছিলেন। ১৮৯৮-এর এপ্রিল মাসের শেষের দিকে শ্রীমা বেলুড় মঠের নতুন কেনা জমিতে প্রথম পদার্পণ করলে, ভগিনী নিবেদিতা তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন এবং মঠের জমি ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন।
সারদাদেবীর স্কুল-কলেজের ডিগ্রি ছিল না। কিন্তু শিক্ষার প্রতি অনুরাগ মায়ের মধ্যে সবসময় দেখা যেত। বালিকা অবস্থায় তিনি পড়াশোনা আরম্ভ করলে ঠাকুরের (রামকৃষ্ণের) ভাগনে হৃদয় তাতে বাধা দেন। লক্ষ্মী (ঠাকুরের ভাইঝি) পাঠশালা থেকে পড়ে এসে মাকে বাড়িতে পড়াতেন। দক্ষিণেশ্বরে ভব মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে প্রতিদিন এসে মাকে পড়াত ও পড়া দিত। পরিণত বয়সে মা তাঁর ভাইঝি মাধু ও রাধুকে পড়াতেন। গৌরী-মার আশ্রমের ছাত্রীদের পড়াশোনায় তিনি খুব উৎসাহ দিতেন। এছাড়া নিজের অল্পশিক্ষিত শিষ্য-শিষ্যাদেরও বিদ্যাচর্চায় অনুরাগী করে তুলতেন। নিছক পুঁথিগত বিদ্যাই নয়, পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে, সেই সম্পর্কেও তিনি কৌতূহলী ছিলেন। শিষ্যদেরও উৎসাহ দিতেন এই বলে— ‘দেখ মা, যেখান দিয়ে যাবে তার চতুর্দিক কী হচ্ছে না হচ্ছে সব দেখে রাখবে। আর যেখানে থাকবে, সেখানকারও সব খবরগুলি জানা থাকা চাই।’
আরও পড়ুন-স্কুলের অনুষ্ঠানে সাংসদ-বিধায়কদের উপস্থিতি এবার কি বাধ্যতামূলক হচ্ছে?
মা চাইতেন মেয়েরা লেখাপড়া শিখুক এবং স্বাবলম্বী হোক। শ্রীমা ও বিবেকানন্দের অনুপ্রেরণা ও সাহায্যে অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের পর ভগিনী নিবেদিতা মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন। ১৮৮৮ এর ১৩ নভেম্বর শ্রীমা সারদাদেবী বিদ্যালয়টির উদ্বোধন করলেন। বিবেকানন্দ এবং শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যান্য সন্ন্যাসী শিষ্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। নিবেদিতাকে অনেক প্রতিরোধ ও সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। শ্রীমা সবসময় তাঁর পাশে ছিলেন। নানাভাবে সাহস ও সাহায্য জুগিয়েছিলেন। মা উপলব্ধি করেছিলেন, লেখাপড়া শিখলেই মেয়েরা স্বাবলম্বী হবে এবং তাঁরা নিজেরাই নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে। খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপারে মা কখনও নিজের মতকে অপরের উপর চাপিয়ে দেননি। একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মার সময়ে গ্রামাঞ্চলে মানুষ সাধারণত চা খেতেন না। কলকাতা শহরেও তখন চায়ের প্রচলন খুব একটা হয়নি। কলকাতা থেকে যে সমস্ত ভক্ত জয়রামবাটিতে আসতেন এবং চা-পানে অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁদের জন্য মা ভোরে ঘুম থেকে উঠে পায়ের ব্যথা নিয়ে দুধ সংগ্রহ করতে যেতেন, যাতে ওই ভক্তরা চা-পান করে তৃপ্ত হন। অথচ মা কদাচিৎ চা পান করতেন। এত করুণা।
শ্রীমার মধ্যে জাত-পাত বর্ণ বৈষম্যবোধ একেবারে ছিল না। তিনি বলতেন, আমজাদ (মার মুসলমান ভক্ত) যেমন আমার সন্তান, তোমরাও একইভাবে আমার সন্তান। কোনও তফাত নেই। বেলুড় মঠে একজন ভৃত্যকে চুরি করার দায়ে স্বামীজি মঠ থেকে তাড়িয়ে দেন। ভৃত্যটি কলকাতায় এসে মার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। মার নির্দেশে তাঁকে আবার কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এক সন্ন্যাসী শিষ্যকে মা বলেছিলেন, তোমরা তো ঘর-সংসার করোনি। সংসারী মানুষের দুঃখ-কষ্ট কী বুঝবে। ছেলেটি হয়তো অভাবে পড়ে চুরি করেছে। ক্ষমা করে দাও।
শ্রীমা দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পনা ও যুক্তিবাদী ছিলেন। প্লেগের সেবাকার্যে টাকার জন্য বেলুড় মঠের জমি বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাব এবং মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রমে পূজার ব্যবস্থা না রাখার প্রসঙ্গে মা যুক্তির সাহায্যে সমস্যার সমাধান করেছিলেন। শুধু বিবেকানন্দ নন, অন্য সন্ন্যাসীরা সমস্যায় পড়লে মায়ের কাছে সমাধান চাইতেন। তাই শ্রীমাকে ‘সংঘজননী’ হিসাবে সকলেই মান্য করতেন। সবশেষে উল্লেখ করি, স্টেটসম্যানের সম্পাদক ও বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী এস কে রাডক্লিফের যখন প্রথম সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেল, তিনি তাঁর স্ত্রীকে লিখেছিলেন— ‘জন্মাবার পরে আমি ওই সন্তানটিকে নিয়ে যাব সারদাদেবীর কাছে, যিনি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাদাসিধে হিন্দু নারী, তবু আমার ধারণায় বর্তমান পৃথিবীর মহত্তমা নারী।’

