ভাষা তো আর কোনও পণ্য নয়! অথবা কোনও দেশের একক সম্পত্তিও নয়! ভাষা (Bengali Language) গড়ে ওঠে মানুষের হৃদয়ে। অভিজ্ঞতায়। ইতিহাসে। জীবনের দোলাচলে। যে-ভাষায় মা ডাকা হয়, সেই ভাষাই তো মানুষের আত্মার গভীরতম প্রকাশের ভাষা। বাংলা ভাষা তেমনই এক ভাষা— যে-ভাষা আমাদের চোখে জল আনে। কখনও আবার মুখে হাসি ফোটায়। বেদনার গভীরে আলো জ্বালায়। সেই ভাষাকে যদি কেউ অস্বীকার করে, কিংবা সীমিত করে কেবল একটি ভূখণ্ডের মধ্যে তাহলে তা শুধু একটি ভাষার অমর্যাদা নয়, অবশ্যই বলা চলে তা হল একটি গোটা জাতির আত্মবিস্মৃতির চূড়ান্ত নিদর্শন।
আজকাল এমন এক অভাবনীয় ও দুঃখজনক প্রবণতা নিশ্চয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কেউ কেউ বেশ জোরের সঙ্গেই বলছেন ‘বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই!’ আবার কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন ‘বাংলা ভাষা মানেই বাংলাদেশি ভাষা!’ এই বক্তব্য শুধু অজ্ঞতাপ্রসূত নয়, বরং এ-হল একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের আতঙ্ক ছড়ানো বক্তব্য। এ-হল এক ধরনের আত্মবিস্মৃতির বিপজ্জনক প্রকাশ, যা আমাদের ভাষাগত ও জাতিগত ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী একজন সাহিত্যসচেতন নাগরিক হিসেবে, একজন কবি ও শিক্ষক হিসেবে, আমি এই প্রবণতার ঘোর বিরোধিতা করছি। বাংলা ভাষা (Bengali Language) আমাদের হৃদয়ের ভাষা। আমাদের অস্তিত্বের ভাষা। এ-ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এ-ভাষা এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এক অতুলনীয় সংস্কৃতি। এবং এক শিকড়-সুনিবিড় চেতনার প্রতীক।
বাংলা ভাষার ইতিহাস কোনও একক ভূখণ্ডে আবদ্ধ নয়। এই ভাষার জন্মভূমি পূর্ব ও পশ্চিম মিলিয়ে পুরো বঙ্গভূমি। চর্যাপদের পঙক্তিসমূহ থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্য; গানের ভাষা থেকে আন্দোলনের ভাষা— বাংলা তার স্বাতন্ত্র্য ও সৌন্দর্য বহন করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। বাঙালি জাতির চেতনার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষারও এক বিশাল ও সুগভীর বিস্তার ঘটেছে। ধর্ম, ভূগোল বা রাষ্ট্র আলাদা হলেও বাংলা ভাষা যে আমাদের জাতিসত্তার মূল নির্যাস, একথা ভুলি কী করে!
বাংলা ভাষার জন্ম ও বিস্তার কোনও একক ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষার শিকড় গ্রন্থিবদ্ধ রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাসে। আগেই বলেছি চর্যাপদের ভাষা থেকে শুরু করে বঙ্কিম-রবীন্দ্র-নজরুলের যুগ হয়ে বর্তমান সাহিত্যের আধুনিক ধারায়। এই ভাষা একাধারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা, পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ভাষা, ত্রিপুরা ও আসামের অন্যতম ভাষা। এমনকী আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, দিল্লি, মুম্বই, আরব আমিরশাহি, আমেরিকা, ইউরোপেও ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের মুখের ভাষা। বাংলা ভাষা কোনও দেশের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। বাংলাভাষা একটি জাতির চেতনাও বটে।
বাংলাদেশ বাংলা ভাষার (Bengali Language) জন্য প্রাণ দিয়েছে। একথা মিথ্যা নয়। শিলচরের বাঙালিরাও ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। সারা পৃথিবীর ইতিহাসে এই বিষয়টি অবশ্যই গর্বের ও অবিস্মরণীয়। তাই তো আমরা বেশ আবেগের সঙ্গেই একুশে এবং উনিশে তর্পণ করি। কিন্তু তাই বলে কি রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, সুকান্ত, মাইকেল, বিভূতিভূষণ, মানিক, তারাশঙ্করের বাংলাকে অস্বীকার করা যাবে?
আরও পড়ুন-শুল্কনীতির জেরে সংকটে ভারতীয় বস্ত্রশিল্প, বিকল্প পথের খোঁজ চলছে
বাংলা ভাষা মানে শুধু ‘বাংলাদেশের ভাষা’ বললে আমরা নিজেরাই নিজেদের শিকড় কেটে ফেলছি। আমরা জানি ইংরেজের ভাষা ইংরেজি। কিন্তু আমেরিকা, ইউরোপ, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের অধিবাসী ইংরেজিতে কথা বলে বলে কী আমরা তাদের ইংরেজ বলব? পশ্চিমবঙ্গের একটি শিশুও যখন ‘মা’ বলে ডাকে, সে বাংলা ভাষাতেই বলে। দুর্গাপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, কলকাতা, মালদা, জলপাইগুড়ি, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া— এসব জায়গার মানুষ বাংলা ভাষাতেই স্বপ্ন দেখে। কবিতা লেখে। প্রেমে পড়ে। প্রতিবাদ করে। এবং মৃত্যু বরণ করে।
আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গবাসী, তারা বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রতিদিন নিজেদের জীবনের রং, রক্ত, প্রেম, প্রতিবাদ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতীক্ষাকে প্রকাশ করে চলেছি। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-নগরে-মহানগরে যখন কোনো কর্মজীবী মানুষ ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন, তখন তার সন্তানের মুখে ‘বাবা’ শব্দটি উচ্চারিত হয় বাংলায়। শহরে ও গ্রামাঞ্চলের বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোয়, সাহিত্যসভার মঞ্চে, বিজ্ঞান চর্চার অডিটোরিয়ামে, নাট্যচর্চার প্রাঙ্গণে, ফেসবুক পোস্টে, কফি হাউসের আড্ডায়— বাংলা ভাষাই ধ্বনিত হয় গভীর আবেগে।
ভাষা বিভাজনের এই রাজনীতি আসলে বাঙালির আত্মপরিচয়কে খণ্ডিত করার ষড়যন্ত্র। আমরা ভুলে যাই রাষ্ট্র পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ভাষা পরিচয় জাতিগত আত্মার পরিচয় বহন করে। মনে রাখতে হবে বাংলা কেবল একটি ভাষা নয়, এ হল সংস্কৃতি, ইতিহাস, বেদনা, ভালবাসা ও অস্তিত্বের এক জীবনদায়ী বলিষ্ঠ পরিসর। আবার স্পষ্ট করে বলছি যারা বলেন, ‘বাংলা নেই, আছে কেবল বাংলাদেশী ভাষা’, তারা চক্রান্ত করছেন আমাদের ভাষাগত ঐতিহ্য মুছে ফেলার। আমরা তো মনে রাখবই আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। পশ্চিমবঙ্গ আমাদের জন্মভূমি। বাংলা আমাদের জীবনঘনিষ্ঠ পরিচয়।
আজ বাংলাভাষা শুধু কবিতার ভাষা নয়, এ তো বিজ্ঞানের ভাষাও! বাংলায় উপন্যাস, গল্প যেমন রচিত হচ্ছে, তেমনি বাংলাতেই মহাকাশ ও নিউরোসায়েন্সের পাঠও দিচ্ছেন কেউ কেউ। বাংলাভাষার সামর্থ্য আজ অসীম। এই ভাষা দিয়ে আমরা ভালোবাসা প্রকাশ করি। অভিমান প্রকাশ করি। ঘৃণা প্রকাশ করি। প্রতিবাদ জানাই। আবার প্রতিরোধও তো গড়ে তুলি! আমাদের প্রতিবেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন মেলায় বা মহোৎসবে এই ভাষাতেই আমরা একে অপরের মন বুঝতে চেষ্টা করি। বাংলা ভাষার মাধ্যমে আমরা সাহিত্য রচনা করি। গান বাঁধি। নাটক লিখি। অভিনয় করি। চলচ্চিত্র বানাই। সোশ্যাল মিডিয়ায় মত প্রকাশ করি। আরও বেঁধে বেঁধে থাকার চেষ্টা করি। এমনকী রাজনৈতিক মতাদর্শও ছড়িয়ে দিই।
বাংলা ভাষা আমাদের জীবনের এমন এক অংশ যা আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি। কিন্তু এ ভাষার মহত্ত্ব আমরা অনেক সময় উপলব্ধি করি না। আজ যে অপুষ্পক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে বাংলা ভাষাকে শুধু সাহিত্য বা আবেগ দিয়ে ভালোবাসলেই চলবে না, প্রয়োজন জাগরণের, সংহতির এবং সচেতন প্রতিরোধের। ঘরে-বাইরে, পাঠ্যবই থেকে প্রযুক্তি, শিশুর মুখের বুলি থেকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপনা— সবজায়গাতেই বাংলাভাষাকে আপন করে তুলে ধরার সময় এসেছে। মনে রাখতে হবে একটি ভাষা শুধু তার ব্যাকরণে বাঁচে না, বাঁচে তার ব্যবহারকারীর ভালোবাসা, সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাসে।
তাই যাঁরা বলেন বাংলা ভাষা বলে কিছু নেই, তাঁরা শুধুমাত্র আমাদের ইতিহাস অথবা সাহিত্যের ধারাবাহিকতাকেই নয়, আমাদের অস্তিত্বকেও অস্বীকার করছেন। এই কথাগুলো শুধু একটি ভাষার বিরুদ্ধে অপবাদ নয়, বলা ভালো এ-একটি জাতির প্রাণপ্রবাহকে থামিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাও বটে। এই অপপ্রয়াসকে রুখতেই হবে। প্রমাণ করতে হবে বাংলা ভাষা ছিল। বাংলা ভাষা আছে। বাংলা ভাষা থাকবে। এ ভাষাকে কেউ মুছে ফেলতে পারবে না কোনওদিন।
বাংলা ভাষা আমাদের অহংকার। এ ভাষা কোনও একক দেশের, একক ধর্মের, একক মতাদর্শের নয়। এ ভাষা বাঙালির। নিশ্চয় কেউই অস্বীকার করবেন না যে, এ ভাষা পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও শ্রুতিমধুর ভাষাগুলোর একটি। আসুন বাংলা ভাষার শেকড়ের কাছে আমরা আরও দৃঢ় হয়ে দাঁড়াই। বিদ্বেষ-বিভাজনের চক্রান্তকে প্রত্যাখ্যান করি। সেই সঙ্গে গর্ব করে বলি— আমরা বাঙালি। আমাদের ভাষা বাংলা (Bengali Language)।