সম্পাদকীয়

উন্নয়নের অর্থনীতিতেও ছকভাঙা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

উন্নত গণতন্ত্র সর্বদাই উন্নয়নের অনুকূল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকতর রাজনীতিবিদরা উন্নয়নের রাস্তা পিছনে ফেলে সমঝোতার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই বদ্ধপরিকর। এইসবের মধ্যেও বিকল্প রাজনীতিক চরিত্র মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata banerjee)। তাইতো বোধহয় ভূভারতে পশ্চিমবঙ্গ এমনই এক রাজ্য যার উপরে টিকে আছে বিরোধীদের যত আশা ও আকাঙ্ক্ষা। আর কেন্দ্রের অধীনস্থ সরকার নাস্তানাবুদ করতে বদ্ধপরিকর এই সরকার’কে। উন্নয়নের থেকে নজর ঘোরাতে একে একে কুৎসা অপপ্রচারকে সঙ্গী, শেষে অবশ্য কোনও ব্রহ্মাস্ত্রই কাজে লাগে না, কারণ পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রের ভিত উন্নয়নের স্তম্ভেই দাঁড়িয়ে। তাইতো বিরোধীরা স্বাধীন স্বরে কুৎসাকে বেছে নিয়েছে উন্নয়নের দ্বার আটকাতে। আসলে যে কোনও সরকার চলে তার আর্থিক সচ্ছলতার মানদণ্ডের উপর।

বর্তমান সময়ে ভারতবর্ষের প্রতিটা রাজ্য কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদানের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল, তাইতো উন্নয়ন করতে গেলে দাসত্ব স্বীকার করা অনিবার্য। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে হয়তো এই দাসত্ব প্রথা খাটে না, কারণ যে ভূমি জন্ম দিয়েছে স্বামী বিবেকানন্দকে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে, ক্ষুদিরাম বসুর মতো বিপ্লবীদের, যারা ইংরেজদের ২০০ বছরের শাসনের ভিত নাড়িয়ে স্বাধীনতা কেড়ে এনেছিল, সেই ভূমি আর যাই হোক মাথা নত করে না। তাই বলে কি উন্নয়ন হবে না? সে আবার হয় নাকি! উন্নয়নও হবে গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা হবে। আর সেই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের কম্বিনেশন যদি দেখতে হয় তবে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে একবার পা রাখতে হবে। এই যে আমরা বলি ভোটের সময় দু’বেলা নানান রাজ্য থেকে বিরোধী নেতা-নেত্রীরা পশ্চিমবঙ্গে আসেন, তার কারণ হল উন্নয়নকে কপি পেস্ট করতে।

মানুষের প্রয়োজনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata banerjee) সরকার নানান উন্নয়নের মডেল সময়ে সময়ে সামনে আনেন, যা কপি করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি অন্যান্য রাজ্যের ভোট বৈতরণী পার করতে সক্ষম হয়। তার প্রমাণস্বরূপ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড, কন্যাশ্রীর মতো জনমুখী প্রকল্প। চেনা ছকের বাইরে গিয়ে আর্থিক বাধা কাটিয়ে কীভাবে একটি সরকার জনমুখী প্রকল্প চালিয়ে যেতে পারে তা সত্যি অবাক করার মতো। করোনা সময়কালে আমরা দেখেছি সারা বিশ্ব যখন অর্থনৈতিকভাবে রুদ্ধ তখন পশ্চিমবঙ্গ পথ দেখিয়েছে কীভাবে করোনাকে মোকাবিলা করতে হয়। করোনা-পরবর্তী সময়কালে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভাটা দেখা দিয়েছে। রুজি-রোজগারের রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের অবস্থা হয়েছিল তথৈবচ। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে ৮ দফা নির্বাচনী প্রক্রিয়া ঘোষণা করেছিল যার ফলস্বরূপ কোভিড সংক্রমণের হারও ৩ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৩৩ শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়। তবে নির্বাচনের ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তৃতীয়বারের জন্য তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়েছিল।

আরও পড়ুন-গাড়ির ধাক্কা! কুনো-র নিখোঁজ চিতা শাবকের মৃত্যু

আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য হল যে, সেই বছরই অর্থাৎ অর্থাৎ ৪ মে ২০২১ থেকে কেন্দ্রীয় সরকার ৮ বার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে এবং ২০২০-২০২১ সালে কোভিডের মধ্যেও বিপুল পরিমাণে ৩.৭১ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব হিসেবে সংগ্রহ করেছে। এখানেই শেষ নয়, ২০২০-এর মে মাসে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য যেখানে ৫৮৪.৫০ টাকা ছিল বর্তমানে তা ৮৭৯ টাকা, অর্থাৎ দাম বেড়েছে ২৯৪.৫০ টাকা অর্থাৎ ৫০ শতাংশেরও বেশি। যেখানে সাধারণ মানুষকে সুরাহা দেওয়ার কথা, সেখানে এইরকম গণবিরোধী পদক্ষেপ সত্যিই অকল্পনীয়। কোভিড মহামারীর পরেও ২০২০-২০২১ অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি যেখানে নেগেটিভ সেখানে বাংলা জিডিপি সদর্থকভাবে ১.০৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকী ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ভারতে ইনডেক্স অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন (ম্যানুফ্যাকচারিং) বৃদ্ধি ২০২২-২৩ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালে ৫ শতাংশ, সেখানে বাংলার বৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে গ্রস স্টেট ভ্যালু আ্যডেড অর্থাৎ জিএসভিএ আনুমানিক ৭.২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলা ধরা ছিল সেখানে জাতীয় গড় ৬.৫৩ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে প্রথম অ্যাডভান্স এস্টিমেট ৬.৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যার সর্বভারতীয় বৃদ্ধির হার ৬.৩৭ শতাংশ। বর্তমানে রাজ্য সরকারের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রায় দু’লক্ষ কোটি টাকার মতো পাওনা, যার প্রধান ক্ষেত্রগুলো হল গরিব মানুষের বাড়ি তৈরি, গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ, ১০০ দিনের কাজের মতো জনমুখী প্রকল্পের। এত আর্থিক ধাক্কা সামলেও রাজ্য তার নিজস্ব তহবিলের উপর ভর করে সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা খরচে ৩৯ কোটি কর্মদিবস সৃষ্টি করেছে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ১২৩৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬১ কোটি শ্রমদিবস সৃষ্টি করেছে। এক অর্থবর্ষে বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৫৬ শতাংশ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির এক অনবদ্য প্রয়াস। বাংলার বাড়ি ও সমানতালে তৈরি করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রাপকদের জন্য। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধা সত্ত্বেও কেন বলুন তো চেনা ছকের বাইরে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এতটা ভিন্ন, কারণ যে কোনও সমস্যার যদি মূলে পৌঁছনো যায় তবে সেখান থেকে সফলতা আসে।

নিজস্ব আয়ের তহবিল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ জনগণের প্রয়োজনীয়তা মিটিয়ে অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের চাহিদা মিটিয়ে সেই সফলতার শিখরে পৌঁছেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দুয়ারে রেশন, কর্মসংস্থানের সন্ধান (এমএসএমই-তে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এক নম্বরে) ও মাথার উপর বাংলার বাড়ি যেন পরিপূরক খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের। আরও একটা তথ্য না দিলেই নয়, ২০১১ সাল থেকে ২০২৫ সাল (৩১ জুলাই) পর্যন্ত বাংলায় ৮০ শতাংশ কারখানা বেড়েছে, সুতরাং বেকারত্বের হ্রাস যে হয়েছে তা তো পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে। সত্যি কথা বলতে, সাধারণ মানুষ রাজনীতির আকচাআকচি চায় না, বা বেশিদিন মনেও রাখে না। মানুষ মনে রাখে উন্নয়ন। যে বাড়ির মানুষটা স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নতির ফলে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন সেই বাড়ির মানুষটাকে জিজ্ঞাসা করুন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। যে বাড়ির মানুষটা ‘সেবাশ্রয়’-এ গিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন, সেই বাড়ির মানুষটাকে জিজ্ঞাসা করুন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। যে বাড়ির মানুষটা মাসের শেষে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, বিধবাভাতা, বার্ধক্যভাতা পায় তাকে জিজ্ঞাসা করুন উন্নয়ন কী! যে বাড়ির ছেলেটা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখত আজ স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ডে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, তাকে জিজ্ঞাসা করুন জনমুখী প্রকল্প কী! ছক কষা পুরুষশাসিত সমাজে মহিলারা নানা প্রকল্পের ছোঁয়ায় আজ ছক ভেঙে স্বনির্ভর হয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসা করুন কর্মসংস্থানের কথা। তাহলেই মিলিয়ে নিতে পারবেন গণতন্ত্রের সংকটের মধ্যেও উন্নয়নের ধ্বজা কীভাবে উড়ছে পশ্চিমবঙ্গে।

Jago Bangla

Recent Posts

রাজ্যের কৃষি গবেষণায় বড় সাফল্য, উচ্ছ্বসিত মুখ্যমন্ত্রী

রাজ্যের কৃষি গবেষণায় বড় সাফল্যের কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (CM Mamata Banerjee)। মঙ্গলবার নিজের…

28 minutes ago

আরও একধাপ এগোলেন! ভ্যান্স-রুবিওকে সঙ্গে নিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখল ট্রাম্পের

গ্রিনল্যান্ড (Greenland_Donald Trump) দখলে মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার একধাপ এগিয়ে মঙ্গলবার ট্রাম্প তাঁর…

3 hours ago

নিজের কেবিনে একাধিক মহিলার সঙ্গে অশ্লীল আচরণ, সাসপেন্ড পুলিশকর্তা

এক নয়, একাধিক! নিজের দফতরে মহিলাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর শাস্তি পেলেন সেই পুলিশ আধিকারিক। কর্নাটক…

6 hours ago

রাজ্যে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

প্রতিদিন ১ ডিগ্রি করে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। কলকাতা (Kolkata) থেকে আগামী কয়েকদিনে প্রবল শীতের কনকনানি…

6 hours ago

সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি, নেপথ্যে কোন অঙ্ক?

নয়াদিল্লি : অভূতপূর্ব ঘটনা বিজেপিতে (BJP)। মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই বিজেপি সভাপতি পদে বসলেন নীতিন…

6 hours ago

সিআরপিএফ ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার নাবালিকা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করল ক্ষুব্ধ তৃণমূল

নয়ডা : ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যে এখন নারী-নিরাপত্তার নামে যে কতবড় প্রহসন চলছে তা আরও…

7 hours ago