ওগো বধূ সুন্দরী

ডাকনাম হাসি কিন্তু তিনি হাসি কিংবা কান্না দু’ধরনের চরিত্রাভিনয়ে ছিলেন সমান দক্ষ। দীর্ঘ চারদশক ধরে দুশোর বেশি ছবিতে অভিনয় করেও স্বীকৃতি পাননি। তাঁর ঝুলিতে ছিল না তেমন কোনও পুরস্কার। তবু ছিলেন ভিন্নধর্মী, সাবলীল অভিনয়ে জয় করেছেন দর্শকমন। তিনি অভিনেত্রী সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। আগামী ২১ মে তাঁর প্রয়াণদিবস।এই উপলক্ষে তাঁর অভিনয় জীবনের নানা দিক তুলে ধরলেন ড. শঙ্কর ঘোষ

Must read

নবাগতা
নামকরা পরিচালক ও চিত্রগ্রাহক দীনেন গুপ্ত নতুনদের সুযোগ দিয়েছেন বারংবার। নির্মীয়মাণ ‘আজকের নায়ক’ ছবির জন্য ‘নায়িকা চাই’ বিজ্ঞাপন দিলেন বিভিন্ন পত্রিকায় । সেইমতো এক নবাগতা ছবি-সহ আবেদন করলেন। স্টিল ফটো দেখে এবং বায়োডেটা পড়ে সন্তুষ্ট দীনেন গুপ্ত স্ক্রিন টেস্টের জন্য ডাকলেন এই নবাগতাকে। উতরে যান সসম্মানে। শমিত ভঞ্জের বিপরীতে প্রথম ছবিতেই নায়িকা হওয়ার সুযোগ পেলেন এই নবাগাতা। ওই বছরই দীনেন গুপ্তের আরেকটি ছবি ‘বসন্ত বিলাপে’ প্যারালাল নায়িকা। এখানে তাঁর বিপরীত অনুপকুমার। দুটি ছবিই মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭২ সালে। একটি ছবিতে ট্রাজেডি অপরটিতে কমেডি। দুটিতেই সমান সফল। এই অভিনেত্রী হলেন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় (Sumitra Mukherjee)।

রসময়ীর জয়যাত্রা
১৯৭২ থেকে ২০০৩ এই বছরগুলিতে অসংখ্য ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। বেশ কিছু ছবিতে তাঁর দুরন্ত অভিনয় দর্শকেরা কোনওদিন ভুলতে পারবেন না । তিনি সাগর বউকে প্রাণবন্ত করে তুললেন ‘দেবী চৌধুরানী’ ছবিতে। ‘সুজাতা’ ছবিতে করেছেন সাবলীল অভিনয়। মতিবিবি ওরফে পদ্মাবতীর ঈর্ষা, কামনাকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুললেন তিনি ‘কপালকুণ্ডলা’ ছবিতে। দেবু পণ্ডিতের গৃহিণী হিসেবে সহনশীলা গ্রাম্যবধূকে তুলে ধরলেন সুমিত্রা ‘গণদেবতা’ ছবিতে। গগন সেনের দাম্ভিক স্ত্রীর ভূমিকাতে সুমিত্রা ফাটাফাটি অভিনয় করলেন ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবিতে। ‘বিকালে ভোরের ফুল’ ছবিতে উত্তমকুমারের বিপরীতে অসাধারণ সুমিত্রা। উপেক্ষিতা কালো কুৎসিত মেয়ের চরিত্রে ‘তিলোত্তমা’ ছবিতে দর্শকদের চোখের জলে আদায় করে নিয়েছেন তিনি। পূর্ণ চক্রবর্তীর স্ত্রীর চরিত্রে নিজেকে চমৎকার ফুটিয়েছেন ‘অগ্রদানী’ ছবিতে। দজ্জাল স্ত্রীর চরিত্রে ‘রসময়ীর রসিকতা’তে সে এক অন্য সুমিত্রা। ‘প্রতিমা’ ছবিতে তাঁর অভিনয় অশ্রুসজল করে তোলে। রবীন্দ্রনাথের কমলমুখী সুমিত্রার (Sumitra Mukherjee) অভিনয়ের গুণে ‘শেষরক্ষা’ ছবিতে হয়েছে জীবন্ত।

শেখালেন উত্তমকুমার
আসলে কোনও স্কুল থেকে ডিপ্লোমা নিয়ে অভিনয় জগতে সুমিত্রা পা রাখেননি। অভিনয় এক্সপ্রেশন সবটাই ছিল শিল্পীর কাছে অঙ্কের মতো ব্যাপার। ক্যালকুলেশন মিস হলে গোটা দৃশ্য নির্মাণটাই মাটি। উত্তমকুমারের বিপরীতে অন্তত দুটি ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন তিনি। তার প্রথমটি হল ‘বিকালে ভোরের ফুল’। দ্বিতীয়টি হল ‘ওগো বধূ সুন্দরী’। শ্যুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে উত্তমকুমার চলে যেতেন সেটের পিছনের অন্ধকারে। আপন মনে সংলাপ বলে যেতেন। হাঁটাচলা করে সিনটা ঝালিয়ে নিতেন। নিজের মুখেই বলতেন ৫০০ ছবিতে অভিনয় করলেও আজকে যে ছবিটার জন্য কাজ করছ সেটা নতুন, সিকোয়েন্স নতুন। তাই রিহার্সাল দিতেই হবে। উত্তমের বিপরীতে তিনি আরও কাজ করেছেন নবদিগন্ত, আরও একজন ছবিতে।

আরও পড়ুন- শহর নোংরা করলেই জরিমানা আদায় করবে সাফাদা

যখন মিসেস সেনের ছাত্রী
সুচিত্রা সেনের সঙ্গে দু-দুটো ছবিতে কাজ করেছেন সুমিত্রা। প্রথমটি ‘দেবী চৌধুরানী’ দ্বিতীয়টি ‘দত্তা’। প্রথমটিতে কাজ করতে গিয়ে সুমিত্রা এত নার্ভাস ছিলেন যে একবার একটা দৃশ্যের বারো বার টেক করতে হয়েছিল। সুচিত্রা সেন সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন এই বারোটার কথা কারও মনে থাকবে না। সিনেমায় দেখা যাবে শেষবারেরটা। প্রশংসা হবে সেটারই।

নায়কদের সঙ্গে
উত্তমকুমার ব্যতিরেকে তিনি বাংলার প্রায় প্রতিটি নায়কের বিপরীতে নায়িকা হয়েছেন। সেই তালিকায় আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (সঙ্গিনী, গণদেবতা, সুদূর নীহারিকা, দেবদাস, অগ্রদানি, ঘরের বাইরে ঘর, রসময়ীর রসিকতা), শমিত ভঞ্জ (আজকের নায়ক, শ্রাবণ সন্ধ্যা), রঞ্জিত মল্লিক (মন্ত্রমুগ্ধ, হাতে রইল তিন, ময়না, তিলোত্তমা, শ্রীকান্তের উইল, কপালকুণ্ডলা, প্রায়শ্চিত্ত)। সন্তু মুখোপাধ্যায় (প্রতিমা, টুসি, স্বামী-স্ত্রী, বোধন), দীপঙ্কর দে (এক যে ছিল দেশ, সমাধান, মায়ের আশীর্বাদ, মোহনার দিকে), অনুপ কুমার (বসন্ত বিলাপ, ইন্দিরা, সংসারের ইতিকথা), শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় (আঁধার পেরিয়ে), মিঠুন চক্রবর্তী (বাঁশরী, পাহাড়ি ফুল) প্রভৃতি।

সবেতেই সাবলীল সুবর্ণলতা
বড়পর্দার শিল্পী হলেও ছোটপর্দার ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি। সবার নজরে পড়েন রাজা সেন পরিচালিত ‘সুবর্ণলতা’র নাম ভূমিকায়। আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণকে তিনি যেন বাস্তবায়িত করেছিলেন। রঙ্গব্যঙ্গ ধারাবাহিকে সুমিত্রা যথেষ্ট হাসিয়েছেন দর্শকদের। পেশাদারি মঞ্চেও তিনি প্রতিভার ছাপ রেখেছেন উত্তম মঞ্চে ‘শত্রু মিত্র’ নাটকের মধ্যে। তপন থিয়েটারে মনমোহিনী নাটকে প্রচুর হাসিয়েছেন।

বিড়ম্বনাময় জীবনে
শশধর মুখোপাধ্যায়ের ঘর ছেড়ে এসেছিলেন সুমিত্রা (Sumitra Mukherjee)। বিয়ে করলেন বিখ্যাত প্রযোজক রবীন্দ্রনাথ মালহোত্রাকে। দুই সন্তান নিয়ে এসেছিলেন নতুন সংসারে। মালহোত্রা সাহেব এটা পছন্দ করতেন তো ওটা পছন্দ করতেন না, এসব সবসময়ই খেয়াল রাখতেন সুমিত্রা। একবার এমনই বিপর্যয় হয় যে ছেলের ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা হচ্ছে না। ছেলে-বউয়ের সংসার ভাঙছে। এটা যে কোনও মায়ের কাছে দুঃখের ব্যাপার বইকি। কিন্তু সুমিত্রার করণীয়ই-বা কী ছিল! শ্যুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ২০০-র কাছাকাছি ছবিতে অভিনয় করলেও আর্থিক দিকটি তেমনভাবে গোছাতে পারেননি। মনে যেমন ছিল দরদ, ঠিক তেমনি খরচের হাতও দরাজ। ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। শরীর দুর্বল হল। কাজ করার শক্তি ছিল না। আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেন।

নটী বিনোদিনীর মা
দীনেন গুপ্তের নটী বিনোদিনী ছবিতে নায়িকা দেবশ্রীর মা হয়েছিলেন সুমিত্রা। সংলাপ মনে রাখতে পারছিলেন না। তবু প্রসেনজিৎ-দেবশ্রীর সহায়তায় ক্রমশ নিজের উপর আস্থা থেকে অভিনয় করতে শুরু করেছিলেন। শেষের দিকে যাত্রায় অভিনয় করতে গিয়ে শরীর খুব ভেঙে পড়েছিল। এই সময় সুমিত্রা শারীরিক ও মানসিক দু’ভাবেই ভেঙেচুরে যাচ্ছিলেন। তবুও কাজটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।। ২০০০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সরস্বতী পুজোর দিন তিনি শ্যুটিং শুরু করলেন ‘এক আকাশের নিচে’ সিরিয়ালের। এখানে তাঁর চরিত্রের নাম আম্মা। চুটিয়ে অভিনয় করলেন এখানে।

চিরন্তনী নায়িকার শেষযাত্রা
দুভার্গ্যজনকভাবে সুমিত্রা মারা গেলেন ২১ মে বুধবার। ২০০৩ সাল। কিন্তু তাঁর মরদেহ স্টুডিওতে-স্টুডিওতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ ওই দিন শ্রমজীবী মানুষের ডাকে শিল্প ধর্মঘট তথা বাংলা বন্‌ধ হয়েছিল। তাঁর এই অকালমৃত্যুতে সারা বাংলাদেশ মুহ্যমান হয়েছিল। বিশেষ করে আম্মার চরিত্রটি দর্শকদের মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল।

Latest article