নভঃনীতা ৯ কাহন

নাহ্ কোনও ইতিহাস নয়, বরং এক নতুন ভবিষ্যতের জন্ম দিল নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামসের মহাশূন্য থেকে ২৮৬ দিন পর পৃথিবীর বুকে ফিরে আসার সত্যিটা। আঁকা হল অজস্র অন্তরীক্ষ-স্বপ্ন ও সম্ভাবনার পটচিত্র। বাজল আরও গভীর মহাকাশ উন্মোচনের হুইসেল; সেইসব নানা বিষয় তুলে ধরেছেন তুহিন সাজ্জাদ সেখ

Must read

এই তো সবে দিন পনেরো পেরিয়েছে; তার মধ্যে শেষ দিন দশেক হল ঘটনাটা আমার নজরে পড়েছে, ঘুমের মধ্যেই ছোট্ট রিফাত যেন কেমন করে সব চার হাত-পা উঠিয়ে নানারকম অঙ্গিভঙ্গি করছে; যেন ও সাঁতার কাটছে; কিছুক্ষণ এমন করার পর আবার বিছানার উপর উল্টেপাল্টে যাচ্ছে; প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বুঝতে না পারলেও আজ বিষয়টি বেশ পরিষ্কার; মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামস (Sunita Williams) ও তাঁর সঙ্গী বুচ উইলমোরের অন্তরীক্ষে থাকা এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার আকর্ষণীয় ভিডিওগুলো ওর শিশুমনে গভীর দাগ কেটেছে; ঘুমের মধ্যেই ও হয়তো মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে! এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক— ১৯ মার্চ, ২০২৫ বুধবার ভারতীয় সময় ভোর ৩:২৭ মিনিটে মহাকাশের বুকে ভাসমান ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন থেকে দীর্ঘ ন’মাস পর ওঁদের পৃথিবীর বুকে ফিরে আসার ঘটনাটি সত্যিই গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতোই!

প্রত্যাশার অবতরণ
উত্তর আমেরিকার ইস্টার্ন ডেলাইট টাইম জোন অনুযায়ী ঘড়িতে তখন ৫:৫৭ মিনিট, মঙ্গলবার, ১৮ মার্চ, ২০২৫, ভারতবর্ষে তখন বুধবার ভোর প্রায় সাড়ে তিনটে, স্পেস-এক্স ড্রাগন মহাকাশযান নাসার অ্যাস্ট্রোনট নিক হেগ, সুনীতা উইলিয়ামস (Sunita Williams), বুচ উইলমোর, ও রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রসকসমসের কসমোনট আলেকসান্দর গরবুনভকে নিয়ে আমেরিকা উপসাগরীয় ফ্লোরিডার টালাহাসি উপত্যকা অঞ্চলে সফল অবতরণ করেছে। এই দৃশ্য গোটা বিশ্বকে রোমাঞ্চিত করে তুলেছে। পৃথিবী থেকে প্রায় চারশো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন; প্রতি ৯০ মিনিটে একবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৬ বার এই স্টেশনটি পৃথিবীর চারপাশে ঘুরপাক খায়। সেখান থেকেই নাসার স্পেস-এক্স ড্রাগন স্পেসক্রাফট ওঁদের নিয়ে ভারতীয় সময় ১৮ মার্চ সকাল ১০:৩৫ মিনিটে রওনা দেয়।
দীর্ঘ ন’মাসের নিসর্গ যাপনের পর নাসার ক্রু-৯ ড্রাগন ক্যাপসুলের উপর ভর দিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসার যাত্রাটি অতটা সহজ ছিল না। প্রতি ঘণ্টায় ২৮০০০ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে এমন ক্যাপসুলটি পৃথিবীর বুকে পৌঁছতে বিজ্ঞানীদের বহু ঝক্কি সামলাতে হয়েছে, একথা মুখে না বললেও চলে! অত্যন্ত গতিবেগসম্পন্ন ক্যাপসুলটি প্রথমে পৃথিবীকে দু’বার প্রদক্ষিণ করার পর তাকে নিম্ন কক্ষপথে নামিয়ে নানা বৈজ্ঞানিক উপায়ে সঠিক সময়ে নিচের দিকে অবতরণ করানোর চেষ্টা হয়। বিজ্ঞানীদের কড়া নজরদারিতে চলেছিল ওই ৪২২ কিলোমিটারের অবতরণ যাত্রা। দুশ্চিন্তা তার চরম সীমায় পৌঁছেছিল যখন ক্যাপসুলটি পৃথিবীর আবহাওয়া মণ্ডলের মধ্যে প্রবেশ করছিল, সেই সময়ের বিপদের কথা ভেবে। বাতাসের উচ্চচাপ ও ঘনত্বের কারণে উচ্চ গতিসম্পন্ন ক্যাপসুলটি আবহাওয়ামণ্ডলে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় তাপমাত্রা, প্রায় ১৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কল্পনা চাওলার সময় এই বিপদটাই হয়েছিল, আগুন লেগে গিয়েছিল ক্যাপসুলটিতে! তবে এবারে বিজ্ঞানীরা ছিলেন অত্যন্ত সজাগ।
টালাহাসি উপত্যকায় ক্যাপসুলটি অবতরণ করার ঠিক চল্লিশ মিনিট আগে এই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়। প্রচণ্ড তাপে বায়ুমণ্ডলের বাতাস আয়নিত হয়ে প্লাজমায় পরিণত হয়, ৬-৭ মিনিটের জন্য কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে ক্যাপসুলের যোগাযোগ হয় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। তবে বিপদ এড়াতে ক্যাপসুলটির মধ্যেই ছিল কম্পিউটার— এই ধরনের সমস্যা হলে কী করতে হবে সেই নির্দেশ নভশ্চরদের আগেই দেওয়া হয়েছিল। ক্যাপসুলটির নিচে তাপমাত্রা কমানোর জন্য ‘হিট সিট’ থাকলেও, অবতরণের ঠিক দু’মিনিট আগে ক্যাপসুল থেকে দুটি প্যারাসুট বেরিয়ে আসে, এক ধাক্কায় গতিবেগ কমে আসে ঘণ্টাপ্রতি ৬০০ কিলোমিটার। তারপর আরও দুটো প্যারাসুট, গতিবেগ কমে দাঁড়ায় ১১০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। শেষমেশ ঘণ্টায় প্রায় ২৫ কিলোমিটার বেগে টালাহাসির উপকূলে জলের উপর নেমে আসে ক্যাপসুলটি। অতঃপর স্পেস-এক্সের রেসকিউ ভেসেল তাঁদের উদ্ধার করে।

দুঃসাহসী নভশ্চর
বাষট্টি বছর বয়সি ব্যারি ইউগেন বুচ উইলমোর আসলে একজন ইউনাইটেড স্টেটস নেভি টেস্ট পাইলট। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এভিয়েশন সিস্টেমের উপর মাস্টার ডিগ্রিধারী উইলমোর ২০০০ সালের জুলাই মাস নাগাদ একজন স্পেসফ্লাইট পাইলট হিসেবে নাসায় যোগদান করেন। এদিকে সুনীতা উইলিয়ামস (Sunita Williams), অনেকেই আবার ভালবেসে ডাকেন সুনি বা সোনিকা, ওহিও প্রদেশের ইউক্লিডে ১৯৬৫ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা দীপক ও মা বনি পান্ডিয়া। তিনিও প্রথমে আমেরিকার ন্যাভাল অ্যাকাডেমি জয়েন করেন, তখন ১৯৮৭ সালের মে মাস। ১৯৮৯ সালের জুন মাস নাগাদ তাঁর পদোন্নতি হয় একজন ন্যাভাল এভিয়েটর হিসেবে এবং তিনি ভার্জিনিয়ার হেলিকপ্টার কমব্যাট সাপোর্ট স্কোয়াড্রনে যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালের জুন মাসে তিনি নাসায় যোগ দেন এবং আগস্ট মাসে শুরু হয় তাঁর ট্রেনিং।
একজন মহাকাশচারী হিসেবে সুনীতার প্রথম অন্তরীক্ষ অভিযান ছিল ‘এক্সপেডিশন ১৪/১৫’, ২০০৬ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে ২২ জুন, ২০০৭। এরপর ২০১২ সালে দ্বিতীয় বার, ১৪ জুলাই থেকে ১৮ নভেম্বর, এক্সপেডিশন ৩২/৩৩। একজন দক্ষ মহাকাশচারী হিসেবে তিনি যথেষ্টই খ্যাতিসম্পন্ন। দায়িত্ব পড়েছিল আমেরিকার বোয়িং কোম্পানির স্পেস ফ্লাইটের নভশ্চর-সহ বাণিজ্যিক টেস্টের। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪-এর ৫ জুন উইলিয়ামস এবং উইলমোর দুজনেই ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে অ্যাটলাস V রকেটে বোয়িং কোম্পানির স্টারলাইনার স্পেসক্রাফটের সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পরের দিন ৬ জুন তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছে যান। ওটা ছিল মাত্র সপ্তাহখানেকের সফর; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ডকিং করার পর স্টারলাইনার স্পেসক্রাফটের কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ ধরা পড়ে। নাসার বিজ্ঞানীরা পড়েন মহাবিপদে! ঠিক করা হয় স্পেসক্রাফটটিকে কোনও মহাকাশচারী ছাড়াই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে। সেই মতোই ৬ সেপ্টেম্বর স্টারলাইনার ফিরেও আসে। কিন্তু ওই মহাশূন্যে রয়ে যায় সুনীতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর।

আরও পড়ুন-যোগ্যদেরও চাকরি গেল কেন সমাধানের সন্ধানে মুখ্যমন্ত্রী

প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা
ইতিমধ্যে তাঁদের ফিরিয়ে আনার নানা পরিকল্পনা করা হয়। শেষমেশ ঠিক করা হয় নাসার নবম কমার্শিয়াল ক্রু মিশনের আওতায় তাঁদের পৃথিবীতে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে। কথামতোই ২৮ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডা থেকেই নাসার অ্যাস্ট্রোনট নিক হেগ এবং রাশিয়ার কসমোনট আলেকসান্দর গরবুনভ স্পেস-এক্সের ক্রু-৯ ড্রাগন মহাকাশযান নিয়ে ফ্যালকন-৯ রকেটে রওনা দেন মহাকাশের উদ্দেশ্যে। পরদিনই ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের হারমনি মডিউলের ফরওয়ার্ড-ফেসিং পোর্টে ক্রু-৯ ক্যাপসুলটি ডকিং করে। নাসার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উইলিয়ামস ও উইলমোরকে ‘এক্সপেডিশন ৭২/৭৩’-র অন্তভুর্ক্ত করে হেগ ও গরবুনভের সঙ্গে
ক্রু-৯ ড্রাগনকে পৃথিবীর বুকে ফিরিয়ে আনা হয় গত ১৯ মার্চ, ২০২৫। প্রায় দীর্ঘ
ন’মাস পর!

রহস্যময় মহাকাশ যাপন
এখন সাধারণ মানুষের মনে ওই ন-মাস মহাকাশ যাপন কেমন ছিল, তা নিয়ে উঠেছে কৌতূহলের ঝড়। খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা, কাজকর্ম, এমনকী প্রতিদিনের শৌচ-কাজ কেমন ছিল— সেসব এখন হাই টপিক। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের মধ্যে বছরের প্রায় সবসময়ই চার-পাঁচজন উপস্থিত থাকেন। কাজ ও ঘোরাফেরার জন্য বরাদ্দ জায়গাটি একটি ছয়-বেডরুমের বাড়ির চেয়েও বড়; সঙ্গে রয়েছে তিনটে বাথরুম, দুটি ডাইনিং রুম, একটি জিম এবং ঘুমানোর জন্য সাতটি প্রাইভেট কুয়ার্টার। মজার কথা, ঘুমোনো অনুভূমিক না উলম্বিক হবে সেটা নিজের পছন্দ, বালিশটাও যা খুশি তাই। তবে খাবার মন যা চাই তাই, পৃথিবী থেকেই কার্গো স্পেসক্রাফটের মাধ্যমে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয় স্টেশনে, অবশ্যই সেগুলোকে ফ্রিজ-ড্রাই, থার্মোস্ট্যাবিলাইজড এবং ভ্যাকুয়াম-প্যাকেটজাত করে পাঠানো হয়।
মহাশূন্যে জলের বড্ড অভাব, স্পেস স্টেশনের মধ্যে গ্রাভিটি এতই কম যে অনেক সময় জিরো গ্র্যাভিটিও বলা হয়। এইরকম মাইক্রো বা জিরো গ্র্যাভিটি অঞ্চলে যে কোনও কিছু, এমনকী একবিন্দু জলও ভেসে বেড়ায়। তাই নভশ্চরেরা সেইভাবে স্নান করেন না, প্রয়োজন হলে স্পঞ্জ-বাথের মতো তোয়ালে ভিজিয়ে শরীর মুছে ফেলেন। স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে অনেক সময় ধুতে হয় না এমন শ্যাম্পু কিংবা তরল সাবানও ব্যবহার করেন। সময়ে চুলের যত্নও একইভাবে নেওয়া হয়। এবারের সুনীতা উইলিয়ামসের মাথার খোলা চুলও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মহাকাশচারীরা মহাশূন্যে খোঁপা কি বাঁধেন না! সত্যি বলতে জিরো গ্র্যাভিটিতে চুলের যত্ন নেওয়া বেশ কঠিন— কোনও টান না থাকায় চুল নিচের দিকে ঝুলে থাকে না, সহজেই পরিষ্কার করা যায়, চিটচিটে হয় না, ফুরফুরে থাকায় চুলে কোনও ভেজা ভাব থাকে না। তবে কেউ চুল বাঁধবেন না খোলা রাখবেন, এটা ব্যক্তিগত ইচ্ছে।
জলের অভাব এবং জিরো গ্র্যাভিটির জন্যে ওঁরা কাপড়ও কাচেন না, একই পোশাক যতদিন সম্ভব পরে থাকেন। পানীয় জল সীমিত হওয়ায় তাঁদের প্রস্রাব পর্যন্ত পরিশুদ্ধ করে পান করার যোগ্য করে তোলা হয়। স্টেশনে রয়েছে ফেনেলযুক্ত নির্দিষ্ট প্রস্রাব করার টিউব, খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয় যন্ত্রটি, নইলে একফোঁটা মূত্র যদি ছিটকে বাইরে পড়ে তাহলে তা পুরো স্পেস স্টেশন জুড়ে ঘুরে বেড়াবে! শুধু কি এসবই— নাহ্ এর বাইরের নানা বিষয় সাধারণ মানুষের মনে দাগ কেটেছে, বিশেষ করে মহিলা মহাকাশচারীদের নিয়ে। প্রকৃতির নিয়মে যদি কারও মাসিক শুরু হয় ওই মহাশূন্যে, তা হলে? প্রশ্নটা থেকেই যায়। এ-কারণেই হয়তো মেয়েদের মহাকাশ পাড়ি দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু ১৯৮৩ সালের জুনে আমেরিকার প্রথম মহিলা হিসেবে স্যালি রাইড মহাশূন্যে পাড়ি দিয়েছিলেন সেদিন থেকেই সকল স্টিরিওটাইপের বাঁধ ভেঙেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন পিরিয়ড কোনও ব্যাপার নয়— হলে হবে, তাঁদের সঙ্গে থাকে ট্যাম্পুন, স্যানিটারি প্যাড, কিংবা মেন্সট্রুয়েশন কাপ। তবে আজকাল সবাই হরমোনাল কন্ট্রাসেপটিভ বা ইন্ট্রা-ইউটেরাইন ডিভাইসের মতো পন্থা ব্যবহার করে মহাকাশযাত্রার সময় মাসিক বন্ধ রাখার পথ বেছে নিচ্ছেন।
অন্তরীক্ষে যখন দীর্ঘ সময় কাটানোর প্রশ্ন ওঠে তখন আরও একটি বিষয় মানুষকে ভাবিয়ে তোলে— তা হল মানুষের স্বাভাবিক যৌনতার কথা। সত্যিই কি ওই শূন্যে কেউ যৌনাচারে লিপ্ত হন? এ-বিষয়ে নাসার তরফে কোনও সঠিক তথ্য মেলেনি, তবে ২০০৯ সালে যখন নাসা লুনার আউটপোস্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি অন্তরীক্ষ অভিযানের পরিকল্পনা করেন তখন থেকেই বিষয়টি জীববিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে স্পেস স্টেশনের মধ্যে জিরো গ্র্যাভিটির কারণে মানুষ ভাসমান অবস্থায় থাকে। অবস্থানগত স্থিতিশীলতার অভাব, রক্ত সংবহন ও চাপ কম থাকে, স্বাভাবিকভাবেই টেস্টোস্টেরন লেভেল কমে যায়, শারীরিক উত্তেজনা সৃষ্টি কম হয়। এই অবস্থায় যদিও বা যৌনাচার সম্পন্ন হয়, তবে উচ্চবিকিরণের জন্য গর্ভসঞ্চার বিকৃত হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি
বৈজ্ঞানিক হিসেবে মহাশূন্যের ওই বিকিরণ মানবদেহের অগণিত লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে দেয়, ফলে মহাকাশে দীর্ঘদিন অবস্থান করলে কোনও নভশ্চর রক্তাল্পতায় ভুগতে পারেন। সুনীতা এবং বুচের ক্ষেত্রেও এটাই মনে করা হচ্ছে তাঁরা এই ন’মাসে যেন ন’বছরের সমান বিকিরণের শিকার হয়েছেন। এই রেডিয়েশন ক্যানসার এবং হৃদরোগের জন্ম দিতে পারে। দীর্ঘদিন জিরো গ্র্যাভিটিতে নৈসর্গিক নির্বাসন পালন করার ফলে বৈজ্ঞানিক মহলের আশঙ্কা তাঁরা হয়তো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে অনেক সময় নেবেন। কেননা, ওই মহাকাশে প্রতিদিন দু’ঘণ্টা এক্সারসাইজ করা সত্ত্বেও মাত্র পাঁচদিনে ২০% মাংশপেশির ঘনত্ব কমে গেছে; প্রতিমাসে হাড়ের ঘনত্ব কমেছে ১.৫% হারে। তার উপর দীর্ঘদিন স্টেশনে আটকে থাকার যে মানসিক পীড়ন সে ব্যথা তো রয়েছেই! এইসব কিছু চিন্তাভাবনা করেই নাসার চিকিৎসকরা উইলিয়ামস এবং উইলমোরকে প্রথমেই ৪৫ দিনের কড়া কোয়ারান্টাইন পালন করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং আশা রেখেছেন হয়তো বছরও লেগে যেতে পারে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে।

মহাশূন্যে গবেষণা
তবে এতসব বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও ওই ২৮৬ দিনে বুচ এবং সুনীতা একসঙ্গে অন্তরীক্ষে ১২১,৩৪৭,৪৯১ মাইল ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং পৃথিবীর চারিদিকে ৪৫৭৬টি কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেছেন। চালিয়েছেন দীর্ঘ ৯০০ ঘণ্টার নিবিড় গবেষণা; সম্পন্ন করেছেন ১৫০টি সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট ও তাদের মধ্যেকার টেকনোলজিক্যাল ডেমনস্ট্রেশন। রেডিও কম্পাঙ্কের অ্যান্টেনা সরানো, এক্স-রে টেলিস্কোপের ফিল্টার লাগানো থেকে স্টেম সেল টেকনোলজির ক্ষমতা নিরীক্ষণ; মহাশূন্যে উদ্ভিদের বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে প্রথম কাঠের তৈরি উপগ্রহকে নিয়োগ করার প্রস্তুতি— সবকিছুই করেছেন ওই দিনগুলোতে। খোঁজ করেছেন রক্তের প্রদাহ, অটোইমিউন ডিজিজ কিংবা ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধের উপায়; জানার চেষ্টা করেছেন ওই অন্তরীক্ষে কী মাইক্রো অর্গানিজম বেঁচে থাকে?

উত্তমাশা
তাঁদের এইসব বৈজ্ঞানিক খোঁজ আগামী দিনগুলোতে সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে অমূল্য সম্পদ হয়ে দেখা দেবে, এমনটাই দাবি বৈজ্ঞানিক সমাজের। তবে সমস্ত মহাজাগতিক, মানসিক, যান্ত্রিক ও শারীরিক বিপত্তি উপেক্ষা করে সুনীতা ও তাঁর সঙ্গীদের সাফল্যের সঙ্গে পৃথিবীর বুকে ফিরে আসা এবং হাসিমুখে তাঁদের বিশ্ববাসীর প্রতি অভিবাদন আমাদের আজীবন মনে থাকবে। ওইদিন ১৯ মার্চ বুধবার রাতে সমগ্র বিশ্ববাসীর সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষের গুজরাতের মেহসানা জেলার ঝুলাসান গ্রামের মানুষেরা আনন্দে ভেসেছিল; কেননা ঝুলাসান সুনীতার পূর্বপুরুষের ভিটে। ভারতবাসী হিসেবে নভঃনীতা সুনীতার (Sunita Williams) জন্য আমরা সত্যিই গর্বিত।

Latest article